দুই আঙুল দিয়েই মার্টিন গাপটিলের ইতিহাস

সব দুর্ঘটনা জীবনকে থমকে দেয় না। কিছু দুর্ঘটনা জীবনকে বদলেও দেয়। পরিবর্তন করে দেয় সবকিছু। খুলে দেয় নতুন সম্ভাবনার দুয়ার।

সব দুর্ঘটনা জীবনকে থমকে দেয় না। কিন্তু দুর্ঘটনা জীবনকে বদলেও দেয়। পরিবর্তন করে দেয় সবকিছু। খুলে দেয় নতুন সম্ভাবনার দুয়ার।সব দুর্ঘটনা জীবনকে থমকে দেয় না। কিছু দুর্ঘটনা জীবনকে বদলেও দেয়। পরিবর্তন করে দেয় সবকিছু। খুলে দেয় নতুন সম্ভাবনার দুয়ার। মার্টিন গাপটিলের দুর্ঘটনাও তাঁর জীবনকে থমকে না দিয়ে খুলে দিয়েছে সম্ভাবনার দরজা।

ম্যাচে সবে দু’টো বল হয়েছে তখন ৷ স্কোরবোর্ডে নিউজিল্যান্ডের রান ৪-০ ৷ মার্টিন গাপটিলের নামের পাশে একটা বাউন্ডারি৷ জেরোম টেলরের পরের বলটা গাপটিল মেরেছিলেন স্কোয়ার লেগে ৷ হাতে এসে যাওয়া ক্যাচটা ফেলে দেন মারলন স্যামুয়েলস ৷

সেই গাপটিলই ইনিংসের ৫০তম ওভারের প্রথম বলটা পাঠালেন ওয়েস্টপ্যাক স্টেডিয়ামের ছাদে ৷ বলটার গতিপথ শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বাউন্ডারির বাইরে বসে থাকা সতীর্থ ও কোচদের দিকে দু’টো আঙুল দেখালেন গাপটিল ৷ পরে জানা যায়, ব্যাটিং কোচ ক্রেইগ ম্যাকমিলানের জন্য ছিল সেটা ৷ ‘কেক টিন’ নামে পরিচিত এই স্টেডিয়ামের ছাদে গাপটিলের আগে বল ফেলেছিলেন একমাত্র ম্যাকমিলানই ৷ সেই কৃতিত্বের দ্বিতীয় ভাগিদার হয়ে কোচের দিকে জোড়া আঙুল দেখালেন৷

কী আশ্চর্য! দু’টো আঙুল যেন পিছুই ছাড়ে না গাপটিলকে ৷ সেই ১৪ বছর বয়স থেকে৷ ফর্কলিফ্ট ট্রাকের একটি দুর্ঘটনায় পড়ে বাঁ পায়ের তিনটি আঙুল বাদ দিতে হয়৷ সেই থেকে বাঁ পায়ে দু’টো আঙুল ৷ ফিল্ডিং, অফ স্পিন, ব্যাট হাতে ওপেন সব তা নিয়ে ৷ তাই গাপটিলের সেঞ্চুরি বা ম্যাচ জেতানো ইনিংস মানেই উঠে আসে দু’আঙুলের গল্প ৷ গাপটিল কিন্তু  সেই ১৪ বছরেই কাটিয়ে উঠেছিলেন মানসিক যন্ত্রণা ৷ ‘নিউজিল্যান্ডের কোন খেলোয়াড় যদি তাকে দেখতে আসতো, তাহলে ভাল হতো।’ সে সময় কিউই অধিনায়ক স্টিফেন ফ্লেমিং তাকে দেখতে হাসপাতাল যান। সে কথা মনে রেখেছিলেন যেন গাপটিল। এভনডেল কলেজে পড়াশোনার সময় প্রথম একাদশে গাপটিলের সাথে খেলতেন স্কট স্টাইরিস। স্টাইরিশ বলেন, দুর্ঘটনার পর মজা করেই আমরা তাকে ‘টু টোজ’ (দুই আঙুলে) নামে ডাকতাম। শনিবার এই ‘টু টোজ’-এ কুপোকাৎ ক্যারিবীয়রা। কিইউদের ব্যাটিংটা এদিন বলা চলে যেন গাপটিল শো। ‘দ্য ফিস’ নামেও সতীর্থদের কাছে পরিচিত তিনি। ক্যারিবীয় বোলারদের ছোবলে মাছের মতোই পিছলে গেছেন বারবার।  আঙুল হারানোর বেদনা নিয়ে গাপটিল একবার বলেন, ‘পায়ের ওপর দিয়ে ট্রাক উঠে যাওয়ার পর জীবনে সবচেয়ে বড় কষ্ট পাই। তবে সৌভাগ্য আমার- গায়ের ওপর দিয়ে ট্রাকটি ওঠেনি।’

শনিবার ওয়েলিংটনে গাপটিলের ইনিংস মন ভরিয়েছে ক্রিকেটপ্রেমীদের৷ ওয়ানডেতে যেখানে ব্যাটসম্যানরা চেষ্টা চালাচ্ছেন নিত্যনতুন শট আবিষ্কার করার, সেখানে গাপটিলের ডাবল সেঞ্চুরি ক্রিকেটীয় শটে ৷ অনেকে বলছিলেন, ওয়েস্টপ্যাকের বাউন্ডারি ছোট ! ঘটনা হল, গাপটিলের ১১টি ছক্কার মধ্যে আটটিই ৭৫ মিটারের বেশি ৷ তাই বেশিরভাগ মাঠেই ছয় হওয়া আটকাতো না ৷ জাক কালিস বলেই দিয়েছেন, ‘বিশ্বকাপে আমার দেখা এর থেকে ভালো ইনিংস আর মনে করতে পারছি না৷’ কালিসের ব্যাখ্যা, ‘কোয়ালিটি ৷ রীতিমতো স্ট্রেট ব্যাটে খেলে ১১১ বলে ১০০ ৷ তারপর রানটা করল খুব দ্রুত৷’ গাপটিলের ব্যাটিংয়ে যেন সত্যিই চারটে গিয়ার ছিল শনিবার৷ শুরুর ‘দেখে খেলো’ নীতি পাল্টে পরে ‘ম্যাককালামময়’ ৷ ১৫০ থেকে ২০০ করলেন ১৮ বল ৷ নিজের ইনিংস সম্পর্কে গাপটিলের কী ধারণা ? বলছেন, ‘চেষ্টা করছিলাম, বেশি স্কোয়ারের দিকে না মেরে যতটা সম্ভব সোজা খেলার ৷ এটাই আসল ৷ এই মুহূর্তে কাজটা হচ্ছেও দারুণ ৷’

ওয়েস্ট ইন্ডিজের বোলাররা এই বিশ্বকাপে একবার এবি ডি ভিলিয়ার্সের বিস্ফোরক মূর্তি দেখেছেন৷ এ দিন দেখলেন কিইউ ‘সাইলেন্ট কিলার’কে ৷ গাপটিল ২১৫ টপকে যাওয়ার পর ক্রিস গেইল নিজে এসে অভিনন্দন জানিয়ে যান ৷ যা নিয়ে গাপটিল পরে বলেন, ‘গেইল আমাকে শুভেচ্ছা জানিয়ে বলল, ওয়েলকাম টু দ্য লিগ ৷ আমার কী রকম হাসি পেয়ে গিয়েছিল ৷’ শুভেচ্ছা এখন আসছে লাগাতার৷ যদিও গাপটিলের মাথায় ঢুকে পড়েছে নিজের শহর মঙ্গলবার অকল্যান্ডে দক্ষিণ আফ্রিকার সঙ্গে সেমিফাইনাল ৷

বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ রানের ইনিংস৷ আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে তিন ফরম্যাটেই সেঞ্চুরি ৷ এই মুহূর্তে বিশ্বকাপে ৪৯৮ রান করে শুধু কুমার সাঙ্গাকারার পিছনে ৷ মার্টির পরিচয় এখন শুধু ‘টু টোজ’ নয়, রীতিমতো ‘স্টার’ ৷

ভিলিয়ার্সের টিমকে কিন্তু গাপটিলকে সেঞ্চুরি করতে দেওয়া যাবে না ৷ ইতিহাস বলছে, ক্রিকেটের তিন ফরম্যাটেই গাপটিলের সেঞ্চুরি মানে সেই ম্যাচে কখনও  হারে না নিউজিল্যান্ড ৷

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *