প্রথমবারের মতো ফাইনালে নিউজিল্যান্ড

অকল্যান্ডে রুদ্ধশ্বাস উত্তেজনার ম্যাচটি দুলছিল পেন্ডুলামের মতো। যে ম্যাচে দক্ষিণ আফ্রিকাকে হতাশার সাগরে ডুবিয়ে ম্যাচ জিতে গেছে নিউজিল্যান্ড।

অকল্যান্ডে রুদ্ধশ্বাস উত্তেজনার ম্যাচটি দুলছিল পেন্ডুলামের মতো। যে ম্যাচে দক্ষিণ আফ্রিকাকে হতাশার সাগরে ডুবিয়ে ম্যাচ জিতে গেছে নিউজিল্যান্ড।অকল্যান্ডে রুদ্ধশ্বাস উত্তেজনার ম্যাচটি দুলছিল পেন্ডুলামের মতো। যে ম্যাচে দক্ষিণ আফ্রিকাকে হতাশার সাগরে ডুবিয়ে ম্যাচ জিতে গেছে নিউজিল্যান্ড। প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের ফাইনালে উঠেছে কিউইরা। ইডেন পার্কে দক্ষিণ আফ্রিকাকে ডিএল মেথডে ৪ উইকেটে পরাজিত করেছে নিউজিল্যান্ড। ডেল স্টেইনকে ছক্কা মেরে কিউইদের প্রথম বিশ্বকাপ ফাইনাল নিশ্চিত করেন গ্র্যান্ট ইলিয়ট। প্রোটিয়াদের আশ্রয় হলো পুরনো ‘চোকার্স’অপবাদই।

প্রথমে ব্যাট করে দক্ষিণ আফ্রিকা ৫ উইকেটে ২৮১ রান করে। কিন্তু বৃষ্টি আইনে নিউজিল্যান্ডের টার্গেট দাঁড়ায় ৪৩ ওভারে ২৯৮ রান। ১ বল বাকি থাকতে ৬ উইকেটে ২৯৯ রান করে ম্যাচ জিতে নেয় নিউজিল্যান্ড। এলিয়ট ম্যাচ সেরা হন।

স্বাগতিকদের শুরুটা অবশ্য ছিল উড়ন্ত। ডেল স্টেইন, মরকেল, ফিল্যান্ডারদের পিটিয়ে চাতু বানিয়েছেন ম্যাককালাম। তার ব্যাটে ৬ ওভারেই বিনা উইকেটে ৭১ রান তোলে কিউইরা।  নাথান অ্যাস্টলের পর নিউজিল্যান্ডের মাটিতে ওয়ানডেতে তিন হাজার রানও পূর্ণ করেন তিনি। ২২ বলে ৩১তম হাফ সেঞ্চুরি করেন ম্যাককালাম।

সপ্তম ওভারে প্রোটিয়াদের ম্যাচে ফেরান মরনে মরকেল। তার প্রথম বলেই পুল করতে গিয়ে ম্যাককালাম ক্যাচ দেন স্টেইনের হাতে। শেষ হয় ২৬ বলে ম্যাককালামের ৫৯ রানের (৮ চার, ২ ছয়) বিধ্বংসী ইনিংস। কেন উইলিয়ামসনকেও (৬) বোল্ড করেন মরকেল। গাপটিল রান আউট হন ৩৪ রান করে। দলীয় ১৪৯ রানে রস টেলর আউট হলে চতুর্থ উইকেট হারায় ব্ল্যাক ক্যাপসরা। টেলর ৩০ রান করেন।

পঞ্চম উইকেটে গ্র্যান্ট ইলিয়ট ও কোরি অ্যান্ডারসন হতাশ করেন প্রোটিয়াদের। হাফ সেঞ্চুরিও করেন দুজনেই। তাদের জুটি থামে ১০৩ রান যোগ করে। চতুর্থ হাফ সেঞ্চুরি করা কোরি অ্যান্ডারসনকে ফেরান মরকেল। অ্যান্ডারসন ৫৭ বলে ৫৮ রান (৬ চার, ২ ছয়) করেন। এলিয়ট তোলে নেন ৮ম হাফ সেঞ্চুরি। থিতু হতে পারেননি রনকি। তবে ইলিয়ট ছিলেন অনড়।

ভেট্টোরিকে নিয়ে দলকে এগিয়ে নেন এলিয়ট। ১৮ বলে ২৯, ১২ বলে ২৩ রানের সমীকরণটা সহজ করে আনেন তিনি। ৬ বলে ১২ রানের হিসেবটা ধরে রাখতে পারেননি স্টেইন। দুই বলে দুই রান দিলেও তৃতীয় বলে ভেট্টোরি চার মারেন। চতুর্থ বলে এক রান। পঞ্চম বলে ইলিয়টের লং অন দিয়ে বিশাল ছয়। যা উড়িয়ে নিয়ে গেল দক্ষিণ আফ্রিকার সর্বস্ব। গ্যালারিতে আছড়ে পড়ে ‘চোক’ প্রথা প্রতিষ্ঠিত হলো। ইলিয়ট ৭৩ বলে অপরাজিত ৮৪ রান (৭ চার, ৩ ছয়) করেন। ভেট্টোরি অপরাজিত ৭ রান করেন। দক্ষিণ আফ্রিকার মরকেল ৩টি  উইকেট পান।

এর আগে টস জিতে ব্যাট করতে নেমে ৩১ রানেই দুই ওপেনার ডি কক (১৪) ও আমলার (১০) উইকেট হারায় দক্ষিণ আফ্রিকা। দুজনই বোল্টের শিকার হন। ডু প্লেসিস ও রিলি রুশোর ব্যাটে ঘুরে দাঁড়ায় প্রোটিয়ারা। তারা ৮৩ রানের জুটি গড়েন। রুশোকে ফিরিয়ে কিউইদের ম্যাচে ফেরান কোরি অ্যান্ডারসন। ৩৯ রান করে গাপটিলের হাতে ক্যাচ দেন রুশো।

চতুর্থ উইকেটে ডু প্লেসিস ও অধিনায়ক ডি ভিলিয়ার্সের ব্যাটে বড় স্কোরের ভিত পায় দক্ষিণ আফ্রিকা। তাদের জুটি ১০২ রান পূর্ণ করতেই বৃষ্টি নামে ইডেন পার্কে। ঘন্টা দেড়েক বৃষ্টিতে বন্ধ থাকে ম্যাচ। বৃষ্টির আগে ৩৮ ওভার শেষে প্রোটিয়াদের সংগ্রহ ছিল ৩ উইকেটে ২১৬ রান। বৃষ্টির পর ম্যাচ শুরু হতেই উইকেট হারায় প্রোটিয়ারা। দ্বিতীয় বলেই ডু প্লেসিস কোরি অ্যান্ডারসনের শিকার হন। ১৫তম হাফ সেঞ্চুরি করা ডু প্লেসিস ১০৭ বলে ৮২ রান (৭ চার, ১ ছয়) করেন। ভেঙে যায় ডু প্লেসিস-ভিলিয়ার্সের ১০৩ রানের জুটি।

বৃষ্টির পর পাঁচ ওভার খেলার সুযোগ পেয়েছিল দক্ষিণ আফ্রিকা। যেখানে ব্যাট হাতে কিউইদের উপর তোপ দাগান ডেভিড মিলার। ১৮ বলে ৪৯ রানের ঝড়ো ইনিংস খেলে আউট হন মিলার। তিনি ৬টি চার ও ৩টি ছক্কা হাঁকান। ৪৬তম হাফ সেঞ্চুরি করেন ডি ভিলিয়ার্স। ৪৫ বলে ৬৫ রান (৮ চার, ১ ছয়) করে অপরাজিত ছিলেন তিনি। নিউজিল্যান্ডের পক্ষে কোরি অ্যান্ডারসন ৩টি, বোল্ট ২টি করে উইকেট নেন।

চোখের জলে বিদায়

১৯৯২ থেকে ২০১৫, মোট সাতটি বিশ্বকাপ। এর মধ্যে চারটিতেই সেমিফাইনালের টিকিট নিশ্চিত করেছিল দক্ষিণ আফ্রিকা। কোয়ার্টার ফাইনাল দুবার। একবারই মাত্র প্রথম পর্ব থেকে বাদ, সেটা ২০০৩ সালে। আশা ছিল চতুর্থ প্রচেষ্টায় সফল হবে দক্ষিণ আফ্রিকা, পূরণ হবে স্বপ্নের ফাইনালে উঠার স্বপ্ন। কোয়ার্টার ফাইনাল জেতার পর বেশ আত্ববিশ্বাসীই ছিল প্রোটিয়া শিবির। অধিনায়ক এবিডি ভিলিয়ার্স যেমন বলেছিলেন, ‘কেউ আমাদের থামাতে পারবে না’। কিন্তু তার সেই ধারণা মিথ্যা প্রমাণ করল বিশ্বকাপের সহ-আয়োজক নিউজিল্যান্ড। চার উইকেটের জয়ে প্রোটিয়াদের কাঁদিয়ে প্রথমবারের মতো ফাইনালে নিউজিল্যান্ড। সপ্তমবারের মতো সেমিতে এসে ফাইনালের দেখা পেল নিউজিল্যান্ড, এর জন্য কম কাঠখড় পোড়াতে হয়নি কিউই শিবিরকেও। সবচেয়ে বিস্ময়কর, এখন পর্যন্ত বিশ্বকাপে অপরাজিত নিউজিল্যান্ড শিবির।

দারুন উত্তেজনাকর ম্যাচে বৃষ্টি নাটক ছিল আরও চরমে। ৪৩ ওভারে দক্ষিণ আফ্রিকার সংগ্রহ ২৮১, পাঁচ উইকেট হারিয়ে। তখনই বৃষ্টি শুরু। দক্ষিণ আফ্রিকা খেলতে পারেনি বাকি ওভারগুলো। জয়ের জন্য নিউজিল্যান্ডের টার্গেট দাঁড়ায় ৪৩ ওভারেই ২৯৮ রান। দুরুহ এমন টার্গেট ঝড়ো ইনিংসে শুরু করেন কিউই দলপতি ব্রেন্ডন ম্যাককালাম। মাঝে ইলিয়ট ও অ্যান্ডারসনের দুর্দান্ত এক জুটি। শেষটা ইলিয়টিই করেছেন লং অনে ছক্কা হাকিয়ে।

বেশী আফসোসে পুড়তে পারেন প্রোটিয়া অধিনায়ক ভিলিয়ার্স। সহজ একটি রান আউটের সুযোগ নষ্ট করেছেন তিনি। বিদায় করতে পারতেন কোরি অ্যান্ডারসনকে। তখন ঐ উইকেটের পতন হলে ম্যাচের দৃশ্য পাল্টে যেতে পারত। এরপর শুরু হয় বাজে ফিল্ডিং আর ক্যাচ ছাড়ার মহড়া। যদিও শেষের দিকে দুর্দান্ত ফিল্ডিংয়ের কারণেই জয়ের স্বপ্ন জোরালো করেছিল দক্ষিণ আফ্রিকানদের। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তা আর হয়নি।

২০১১ বিশ্বকাপে এই নিউজিল্যান্ডের কাছে হেরে বিদায় নিয়েছিল দক্ষিণ আফ্রিকা। এবার সেমিতেও। ২০১৯ বিশ্বকাপে দক্ষিণ আফ্রিকার অবস্থা কী হবে? তার জন্য অপেক্ষা করতে হবে আরও চারটি বছর।

সংক্ষিপ্ত স্কোর

দক্ষিণ আফ্রিকা : ২৮১/৫, ওভার ৪৩ (প্লেসিস ৮২, ভিলিয়ার্স* ৬৫, মিলার ৪৯; অ্যান্ডারসন ৩/৭২, বোল্ট ২/৫৩)

নিউজিল্যান্ড : ২৯৯/৬, ওভার ৪২.৫ (ইলিয়ট* ৮৪, ম্যাককালাম ৫৯, অ্যান্ডারসন ৫৮; মর্কেল ৩/৫৯)

ফল : নিউজিল্যান্ড ৪ উইকেটে জয়ী (ডি/এল মেথডে)

ম্যাচ সেরা : গ্র্যান্ট ইলিয়ট (নিউজিল্যান্ড)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *