সালাহ উদ্দিন আহমেদ নিখোঁজের ২ মাস আজ

বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব সালাহ উদ্দিন আহমেদ নিখোঁজ হওয়ার দুই মাস পূর্ণ হলো আজ।

বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব সালাহ উদ্দিন আহমেদ নিখোঁজ হওয়ার দুই মাস পূর্ণ হলো আজ।বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব সালাহ উদ্দিন আহমেদ নিখোঁজ হওয়ার দুই মাস পূর্ণ হলো আজ।

এখনও ঘুমের মধ্যে বাবাকে স্বপ্ন দেখে ডুকরে কেঁদে ওঠে বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব সালাহ উদ্দিন আহমেদের ছোট মেয়ে ফারিবা আহমেদ রাইবা। রাতে ঘুমোতে যাওয়ার আগে ভাবে, সকালে উঠেই হয়তো প্রাণপ্রিয় বাবাকে বুকে জড়িয়ে ধরতে পারবে। কিন্তু সে আশা পূরণ না হওয়ায় দিনভর মন খারাপ করে থাকে। গুলশানের একটি ইংরেজি মাধ্যম স্কুল থেকে এ বছর ও-লেভেল পরীক্ষা দিচ্ছে রাইবা। আর ছোট ছেলে ইউসুফ আহমেদের দিন শুরু হয় বাবার পরিধেয় কাপড় আর ব্যবহার্য জিনিসপত্র নেড়েচেড়ে। প্রতিদিন ঘুম থেকে উঠেই ছোট্ট লাইব্রেরিতে গিয়ে বাবার চশমা, ঘড়ি আর বই নিয়ে মন খারাপ করে বসে থাকে নবম শ্রেণীর ছাত্র ইউসুফ। ছোট এ দুই সন্তানকে নিয়ে স্বামী সালাহ উদ্দিন আহমেদের জন্য অপেক্ষার প্রহর যেন শেষ হচ্ছে না হাসিনা আহমেদের। লেখাপড়ার জন্য বর্তমানে সালাহ উদ্দিন আহমেদ ও হাসিনা আহমেদ দম্পতির বড় ছেলে ইব্রাহিম আহমেদ কানাডা এবং মেয়ে ফার্মিজ আহমেদ মালয়েশিয়ায় অবস্থান করছেন।

কান্নাজড়িত কণ্ঠে হাসিনা আহমেদ বলেন, স্বামী নিখোঁজ হওয়ার পর তার সবকিছু এলোমেলো হয়ে গেছে। চার সন্তানকে নিয়ে তিনি আর্থিক কষ্টে পড়েছেন। সংসদ সদস্য থাকাকালীন সময়ে সম্মানীর টাকাগুলো এতদিন ব্যাংকে গচ্ছিত ছিল জানিয়ে তিনি বলেন, ওই টাকা তুলে এখন সন্তানদের লেখাপড়া ও অন্যান্য খরচ মেটাচ্ছেন।

হাসিনা আহমেদ বলেন. আইনশৃংখলা বাহিনীর সদস্য পরিচয়ে সালাহ উদ্দিন আহমেদকে তুলে নিয়ে যাওয়ার তিন দিন আগে তাদের দুই গাড়িচালক খোকন ও শফিক এবং ব্যক্তিগত সহকারী ওসমানকে আটক করে পুলিশ। পরে তাদের গুলশান ও বাড্ডা থানার দুটি বিস্ফোরক আইনের মামলায় গ্রেফতার দেখিয়ে কারাগারে পাঠানো হয়। ওই তিনটি পরিবারের ভরণ-পোষণও এখন তাকে বহন করতে হচ্ছে।

হাসিনা আহমেদ জানান, বাবাকে না পেয়ে ছেলে-মেয়েরা সারাক্ষণ মন খারাপ করে থাকে। ঠিকমতো স্কুলেও যেতে চায় না। বাবা নিখোঁজ হওয়ার পর প্রস্তুতি ভালো না হওয়ায় ছোট মেয়ে ফারিবা আহমেদ রাইদা এ বছর ও-লেভেল পরীক্ষা দিতে চাইছিল না। তাকে অনেক বুঝিয়ে রাজি করানো হয়েছে। বড় দুই সন্তান লেখাপড়ার জন্য দেশের বাইরে থাকলেও সব সময় ফোন করে কান্নাকাটি করে। আত্মীয়-স্বজনরাও যোগাযোগ রাখতে ভয় পায় বলে জানান হাসিনা আহমেদ।

গত ১০ মার্চ রাতে উত্তরা ৩ নম্বর সেক্টরের ১৩-বি নম্বর সড়কের একটি বাড়ীর দোতালার ফ্ল্যাটে ঢুকে অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিরা সালাহ উদ্দিন আহমদকে ধরে নিয়ে যায় । সেসময়ে ৩ নম্বর সেক্টরের নিরাপত্তা কর্মীরা ও কয়েকজন প্রত্যক্ষদর্শী গনমাধ্যমকে বলেছিলেন, তাকে ধরে নিয়ে যাওয়ার আগে ওই বাসার কাছেই আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর পিকআপ দাড়াঁনো ছিলো এবং ওই পিকআপে আসা সদস্যরা সেখানে কর্তব্যরত ৩ নম্বর সেক্টর কল্যাণ সমিতির নিয়োগ করা নিরাপত্তাকর্মীদের কাছে ১৩-বি নম্বর সড়কটির অবস্হান জানতেও চেয়েছিলেন ।

ঘটনার শুরু থেকে পরিবার সালাহউদ্দিনের পরিবার আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকেই দায়ী করে আসছে । সালাহ উদ্দিনের স্ত্রী হাসিনা আহমেদ বলেন, সালাহউদ্দিনের খোজে একাধিকবার তার গুলশানের বাড়ীতে ডিবি পরিচয়ধারীরা তল্লাশী চালিয়েছিলেন । বাসার নিচে বাসার নিচে সব সময় গোয়েন্দা সদস্য নজরদারী করেছেন । হাসিনা আহমেদ বলেন , দুই মাস হয়ে গেলো তাকে ফিরে পাওয়ার আশা করছি আমরা ।

গতকাল পুলিশের উত্তরা বিভাগের উপকমিশনার মো: ইকবাল একটি গনমাধ্যমের সাংবাদিককে বলেন , সালাহ উদ্দিনের পরিবার কোনো মামলা বা সাধারন ডায়েরী (জিডি) করেনি । পুলিশ একটি জিডি করেছে । এ বিষয়ে তদন্ত প্রতিবেদন তৈরির কাজ চলছে ।

এর আগে একইভাবে নিখোঁজ হন বিএনপির নেতা ও ওয়ার্ড কমিশনার চৌধুরী আলম ও বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক ইলিয়াস আলী। তবে সালাহ উদ্দিনের মত বড় মাপের নেতা এই প্রথম নিখোঁজ হলেন।

শনিবার বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব ও সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকনের নেতৃত্বে বিএনপির একটি প্রতিনিধি দল ডিএমপি কমিশনারের সঙ্গে বৈঠক করেন। এরপর এক সংবাদ সম্মেলনে ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকন আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেছেন, বিএনপির নিখোঁজ যুগ্ম মহাসচিব সালাহ উদ্দিন আহমেদ জীবিত আছেন। ডিএমপি কমিশনার আছাদুজ্জামানের সঙ্গে তার কার্যালয়ে সাক্ষাতের পর তিনি এই আশা ব্যক্ত করেন। তাকে অচিরেই ফিরে পাবেন বলেও জানান তিনি।

বিএনপি নেতা ইলিয়াস আলী নিখোঁজের আজ ৩ বছর ২৩ দিন। আর বিনপির অপর নেতা চৌধুরী আলম নিখোঁজের ৪ বছর ১১ মাস ৫ দিন চলছে। এখনো তাদের কোন খোঁজ দিতে পারেনি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীসহ কেউ।

গত জানুয়ারির ১ তারিখে ২০ দলীয় জোটের মুখপাত্র বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভীকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পরিচয়ে তার বাসা থেকে তুলে নেয়া হয়। তার ২ দিন পর তাকে গুলশান থানার একটি মামলায় গ্রেফতার দেখিয়ে তাকে হাসপতালে ভর্তি করে গোয়েন্দা পুলিশ।

এরপর গত ৫ জানুয়ারি বিএনপি-জামায়াতসহ ২০ দলীয় টানা অবরোধ ও হরতালের সময় আত্মগোপনে থেকে বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব সালাহ উদ্দিন আহমেদ দেশের বিভিন্ন গণমাধ্যমে সংগঠনের কর্মসূচিসহ বক্তব্য বিবৃতি দিয়ে আসছিলেন। তাকে গ্রেফতার করতে সাদা পোশাকের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা তার বাসাসহ বিভিন্ন জায়গায় অভিযান চালায়। কিন্তু তাকে গ্রেফতার বা আটক করতে পারেনি। সালাহ উদ্দিনকে গ্রেফতার করতে তার ব্যক্তিগত সহকারী ওসমান গণিকে গত ৫ মার্চ মিরপুরের একটি বাসা থেকে গ্রেফতার করা হয়। এরপর গুলশানে সালাহ উদ্দিনের বাসার সামনে থেকে শফিক ও খোকন নামে তার দুই গাড়ি চালককে আটক করা হয়। পরে গত ১০ মার্চ মঙ্গলবার রাত সাড়ে ১১টায় রাজধানীর উত্তরার একটি বাসা থেকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পরিচয়ে তাকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়। এসময় তার দুই গৃহপরিচারিকাকে নিয়ে যাওয়া হয় বলে সালাহ উদ্দিন আহমেদের পরিবার ও দলের পক্ষ থেকে এ দাবি করা হয়। এরপর থেকে তিনি নিখোঁজ রয়েছেন।

এ ঘটনার পর র‌্যাব, পুলিশসহ আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে জানানো হয়, তারা সালাহ উদ্দিন আহমেদকে গ্রেফতারের জন্য চেষ্টা করে আসছিল। তবে তার সন্ধান না পাওয়ায় তাকে গ্রেফতার বা আটক করেনি তারা। তিনি আত্মগোপনে আছেন কিনা বা কোথায় আছেন সেটাই খতিয়ে দেখছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা। ঘটনার পর একাধিক মন্ত্রী ও সরকার দলের নেতারা বলেছেন, সালাহ উদ্দিন আহমেদ আত্মগোপনে রয়েছেন।

এ ঘটনার পর উত্তরা গুলশান থানায় জিডি করতে গেলে তাদেরকে উত্তরা পশ্চিম থানায় পাঠানো হয়। পরে সেখানেও জিডি নিতে অপারগতা প্রকাশ করে। একপর্যায়ে উচ্চ আদালতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জবাবদিহিতার কারণে পুলিশ বাদী হয়ে জিডি করেন। এর আগে পুলিশের আইজি ও স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীও সালাহ উদ্দিন আহমেদকে আটক বা গ্রেফতারের বিষয়টি অস্বীকার করেন। তারা বলেন, তাকে উদ্ধারের জন্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে চেষ্টা করা হচ্ছে।

এরপর সালাহ উদ্দিন আহমেদকে খুঁজে বের করার জন্য তার স্ত্রী সাবেক এমপি হাসিনা আহমেদ হাইকোর্টে এক রিট আবেদন করেন। পরে আদালতে তাকে হাজির করার প্রশ্নে হাইকোর্ট কারণে দর্শানোর নোটিশ জারি করেন। হাইকোর্ট স্বরাষ্ট্র সচিব, পুলিশের আইজি এবং র‌্যাবের ডিজিসহ সংশ্লিষ্টদের প্রতি কারণ দর্শানোর নোটিশ জারি করেন।

গত বৃহস্পতিবার ওই রিট আবেদনের শুনানি হয়। আগামী ১৫ এপ্রিল বুধবার রিট আবেদনের ব্যাপারে আদালত রায় দেবেন বলে আদালত সূত্রে জানা গেছে। এছাড়া সালাহ উদ্দিন আহমেদের স্ত্রী হাসিনা আহমেদ তার স্বামীকে খুঁজে বের করতে প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে একাধিকবার আবেদন করেছেন। আর প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাতের চেষ্টাও করে আসছেন।

এ ব্যাপারে উদ্বেগ প্রকাশ করে সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়া এক বিবৃতিতে বলেন, সরকার ঘটনার দায় এড়াতে পারে না।

বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া দলের যুগ্ম মহাসচিব সালাহ উদ্দিন আহমেদের মুক্তি দাবি করেন। তিনি সরকারের উদ্দেশে বলেন, আমাদের যুগ্ম মহাসচিব সালাহ উদ্দিন আহমেদকে মুক্তি দিন।

অন্যথায় পরিণতি শুভ হবে না। গুলশানের বেগম জিয়ার রাজনৈতিক কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন। এসময় তিনি দলের অপর যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী আহমেদেরও মুক্তি দাবি করেন।

এদিকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও সালাহ উদ্দিন আহমেদের নিখোঁজ নিয়ে ‘বক্তব্য’ দিয়েছেন।

প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তার কাছে দেশের সবচেয়ে বিশ্বস্ত তথ্য থাকার কথা সকল মহল বিশ্বাস করেন। তিনি কিসের ভিত্তিতে সালাহ উদ্দিনকে নিয়ে বক্তব্য দিয়েছেন। তা নিয়েও নানা মহলে প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে।

এদিকে গত ১৯ মার্চ রাতে গাইবান্ধা জেলার ফুলছড়ি থানার দুর্গম চরাঞ্চলে সালাহ উদ্দিন আহমেদের লাশ পাওয়ার গুজব উঠেছিল। পরে সেখানে গাইবান্ধা জেলা পুলিশ সুপারের নেতৃত্বে তল্লাশি চালিয়ে কোনো লাশের সন্ধান পাননি। পরে এই গুজব ছড়ানোর দায়ে চট্টগ্রাম থেকে দুজনকে গ্রেফতারও করা হয়।

এর আগে গত ২০১২ সালের ১৭ এপ্রিল বিএনপির কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক এম ইলিয়াস আলী রাতের আঁধারে ঢাকার বনানী থেকে নিখোঁজ হন। নিখোঁজ ইলিয়াস আলীর সন্ধান আজও মেলেনি।

সরকারের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কিংবা গোয়েন্দা সংস্থার কেউই এ ঘটনার কোনো কিনারা করতে পারেনি। এমনকি ইলিয়াস আলী আদৌ বেঁচে আছেন কিনা- এ হদিসও কেউ দিতে পারছেন না। স্ত্রী-সন্তান আজও তার প্রতীক্ষায়। প্রায় তিন বছরেও সন্ধান মেলেনি এই বিএনপি নেতার। ফলে ইলিয়াস আলী গুম হওয়ার ঘটনাটি রহস্যাবৃতই রয়ে গেছে। নিখোঁজ ইলিয়াস আলীকে উদ্ধারে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তর্জন গর্জনও বন্ধ হয়ে গেছে। এরপরও ছেলে ফিরে আসবে এই আশায় পথ চেয়ে আছেন মা সূর্যবান বিবি। তিনি সাংবাদিকদের দেখলেই তার একটাই আর্তি প্রধানমন্ত্রীর কাছে আমার ছেলে ভিক্ষা চাই। আমি আর কিছু চাই না। ইলিয়াস আলীকে একবার দেখে মরতে চাই। কিন্তু তিনি আদৌ জানেন না তার ছেলে ফিরবে কি না।

এর আগে গত ২০১০ সালের ২৫ জুন বিএনপি নেতা ও ওয়ার্ড কমিশনার চৌধুরী আলমকে কারওয়ান বাজার এলাকা থেকে গোয়েন্দা পুলিশের পরিচয়ে তুলে নেওয়া হয়। তার নিখোঁজের প্রায় ৪ বছর ১১ মাস ৫ দিন মাস পার হলেও এখনো কোন সন্ধান করতে পারেনি কেউ। তবে তার পরিবারের সদস্যরা বলছেন, তাদের ধারণা চৌধুরী আলম এখনো বেঁচে আছেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *