‘অবিলম্বে জাতীয় নির্বাচন দিয়ে গণতন্ত্রের পথে আসুন’

'অবিলম্বে জাতীয় নির্বাচন দিয়ে গণতন্ত্রের পথে আসুন'

'অবিলম্বে জাতীয় নির্বাচন দিয়ে গণতন্ত্রের পথে আসুন'আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে অবিলম্বে জাতীয় নির্বাচনের উদ্যোগ নিয়ে গণতন্ত্রের পথে আসতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া।

বিএনপির চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া ক্ষমতাসীন সরকারকে উদ্দেশ্য করে বলেছেন, গণতন্ত্রের পথে আসুন নইলে ঠেকানো যাবে না। জনগণ জেগে উঠলে এর পরিণতি হবে ভয়াবহ।

মঙ্গলবার বিকালে রাজধানীর নয়াপল্টনে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে অয়োজিত ‘গণতন্ত্র হত্যা দিবস’ উপলক্ষে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল আয়োজিত এক বিশাল সমাবেশে তিনি এ কথা বলেন। নানা তালবাহানার পর শর্তসাপেক্ষে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে সমাবেশ করার অনুমতি পায় বিএনপি।

মঙ্গলবার সকাল থেকেই ঢাকা ও এর আশপাশের এলাকা থেকে নয়াপল্টনমুখী হয় বিএনপি সমর্থক হাজার হাজার নেতাকর্মী। বেগম খালেদা জিয়া সমাবেশস্থলে পৌঁছার আগেই মতিঝিল, ফকিরাপুল, কাকরাইল মোড় ছাপিয়ে গোটা এলাকা এক জনসমুদ্রে পরিণত হয়।

বিকাল ৪টায় বক্তৃতা শুরু করেন খালেদা জিয়া। গোড়াতেই শত বাধা উপেক্ষা করে কয়েক ঘন্টার নোটিশে সমাবেশ সফল করায় নেতাকর্মীদের ধন্যবাদ জানান। তিনি বলেন, জনগণকেই আওয়ামী লীগের ভয়। বিএনপির পাশে জনগণ রয়েছে তাই সরকার দিশেহারা।

৫ জানুয়ারি ‘গণতন্ত্র হত্যা দিবস’ উল্লেখ করে বেগম খালেদা জিয়া বলেন, এই সরকার গণতন্ত্রকে হরণ করেছে। মানুষের ভোটাধিকার কেড়ে নিয়েছে। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি এ দেশে কোনো নির্বাচন হয়নি। নির্বাচন কেন্দ্রগুলোতে মানুষের বদলে কুকুর বসে থাকতে দেখা গেছে। তিনি এ সরকারের লুটপাট, গুম-হত্যা, অন্যায়-অবিচারের বিস্তারিত বিবরণী দিয়ে অবিলম্বে একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠানের পথে সরকারকে আসার আহ্বান জানান।

তিনি বর্তমান নির্বাচন কমিশনারকে সরকারের আজ্ঞাবহ ও অথর্ব উল্লেখ করে অবিলম্বে পদত্যাগ করে সরে দাড়ানোর আহ্বান জানান।

খালেদা জিয়া বলেন, ‘আওয়ামী লীগ থাকলে ধর্মনিরপেক্ষতাও থাকে না, নিরাপত্তাও থাকে না। জঙ্গিবাদ আওয়ামী লীগের তৈরি। রাস্তায় পড়ে থাকা লোকজনকে ধরে র‍্যাবের কার্যালয়ে নিয়ে যায়। তারপর বলে, এই যে আমরা জঙ্গি ধরেছি। গুলশানের ঘটনায় আমি জানতে চাই, কেন এখনো একজনকে ধরা হলো না।’

বিএনপির নেত্রী বলেন, ‘সামনেই ভাষা আন্দোলনের মাস। ২৫ ফেব্রুয়ারি বিডিআর হত্যাকাণ্ডে সঙ্গে জড়িত আওয়ামী লীগ, হাসিনা। তারা পরিকল্পিতভাবে দেশকে পঙ্গু করে দেয়। গুলজার, ভালো অফিসার ছিল। সন্ধ্যা পর্যন্ত বেঁচে ছিল। র‍্যাব পিলখানার গেটে ছিল। অনুমতি পায়নি বলে ভেতরে যায়নি। মইন ইউ (সাবেক সেনাপ্রধান মইন ইউ আহমেদ) কেন হাসিনার ওখানে বসে ছিল। শেখ হাসিনার হাত ক্ষমতায় আসার পর থেকেই রক্তে রঞ্জিত। আমরা কোনো রকম জঙ্গিবাদ চাই না।’

সাবেক সরকারপ্রধান বলেন, ‘এই যে নির্বাচন উপজেলা নির্বাচন হলো। তারপর দেখল যে তাদের অবস্থান ভালো নয়। মেয়র নির্বাচন হলো, প্রত্যেকটা নির্বাচনেই আমরা অংশ নিয়েছি।

প্রত্যেকটাতে বিএনপির প্রার্থী বিজয়ী হয়েছে। একটু ফেয়ার নির্বাচন হলে, জনগণের ভোট দিতে পারলে নির্বাচন সুষ্ঠু হয়। বিএনপি জয়লাভ করে।আপনারা দেখেননি ঢাকা সিটিতে কী নির্বাচন হয়েছে, চট্টগ্রামে? আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সঙ্গে নিয়ে তারা আমাদের বিজয়কে ছিনিয়ে নিয়েছে। জোর করে নির্বাচন ছিনতাই করে নিয়ে গেছে। পৌরসভা নির্বাচন হলো- নতুন নিয়ম করল, মেয়র নির্বাচন হবে দলীয় মার্কা দিয়ে।’

‘ঢাকা শহরে ফ্লাইওভার করলেই কোনো উন্নয়ন হয় না। সারা দেশে কোনো উন্নয়ন নেই। আওয়ামী লীগের সরকারের আমলে কৃষি উপকরণের মূল্য তিনগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। কৃষক পাটের দাম পাচ্ছে না। কৃষকের ধান কিনতে হবে প্রকৃত মূল্য দিয়ে। কৃষি উপকরণের দাম কমাতে হবে। আজকে কৃষককে বাঁচাতে হবে। বেকারত্ব বাড়ছে, একে একে শিল্পকারখানা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। গার্মেন্টস শিল্প আজকে ধ্বংসের পথে। রিহ্যাব ভালো নেই। দেশের অর্থনীতিকে ধ্বংস করে ফেলছে।’

‘বিএনপির গন্ধ পেলে সরকারি চাকরি পায় না কেউ। আওয়ামী লীগ বললেই চাকরি পেয়ে চায়। এখন বিদেশে যাওয়া প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। এই সরকারের দুর্নীতির জন্য আজ কেউ শ্রমিক নিতে চায় না। আর ব্যবসায়ী যারা আছে, বিদেশি বিনিয়োগের জন্য বাংলাদেশে আসুন, দেশি যারা আছে দেশে বিনিয়োগ করুন। কমিশন না দিলে কাউকে ব্যবসা করতে দেয় না।’

সমাবেশে খালেদা জিয়া বলেন, ‘জ্বালানি তেলের দাম কমছে না কেন? আমি মনে করি, অবিলম্বে গ্যাস, বিদ্যুৎ, জ্বালানি তেলের দাম অবিলম্বে কমানো উচিত। ছাত্ররা তোমাদের একটা কথা বলি, কেবল হাততালি দিলে হবে না। তোমাদের প্রস্তুত থাকতে হবে। ঐক্যবদ্ধ হতে হবে।’

সাবেক প্রধানমন্ত্রী আরো বলেন, এখন তো নির্বাচন হয় না, দখল হয়। বহু সাংবাদিক এরই মধ্যে বেকার হয়ে গেছে। আওয়ামী লীগ ছাড়া পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দেয় না। এমনকি সাংবাদিকদের হত্যা করা হয়েছে। সাগর-রুনির হত্যার বিচার কি হয়েছে? এ জন্য কাউকে কি গ্রেফতার করা গেছে? আমার দেশ পত্রিকার সম্পাদক মাহমুদুর রহমানকে মিথ্যা মামলা দিয়ে আটকে রাখা হয়েছে। তাঁর মুক্তির দাবি জানাচ্ছি। মাহমুদুর রহমান মান্নাকেও মিথ্যা মামলা দিয়ে জেলে রাখা হয়েছে। তারও মুক্তি দাবি করছি।’

‘টকশোতে কারা যাবে, কারা যাবে না সরকার বলে দেবে। সরকারের বিরুদ্ধে কেউ কথা বললেই পরদিন তাঁর বিরুদ্ধে মামলা, রাষ্ট্রদ্রোহী মামলা দিয়ে কণ্ঠস্বর রোধ করা হয়।

আজকে কেউ সত্য কথা বলতে পারে না। বাংলাদেশে আজকে মানবাধিকার নেই। গুম-হত্যা এখন প্রতিদিনের ঘটনা। টকশোতে কথা বলার জন্য মামলা হয়েছে। দেশ ছাড়া হয়েছে।’

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর উদ্দেশে খালেদা জিয়া বলেন, ‘আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভাইয়েরা অর্থাৎ পুলিশ, র‍্যাবসহ যাঁরাই রয়েছেন, অন্যায় নির্দেশ মানবেন না। আমরা কারো চাকরি খাব না। সবার চাকরি ঠিক থাকবে। প্রশাসনকে বলব, আপনাদেরও কারো চাকরি খাওয়া হবে না। বরং মেধা-যোগ্যতা অনুযায়ী প্রমোশনের ব্যবস্থা করব। সে বিএনপি হোক আর আওয়ামী লীগ হোক।’

এক বছরেরও বেশি সময় পর কোনো জনসভায় ভাষণ দিতে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া বিকেলে তিনটার কিছু আগে মঞ্চে ওঠেন। এ সময় নেতাকর্মীরা স্লোগানে স্লোগানে তাকে শুভেচ্ছা জানান। তিনি হাত নেড়ে নেতাকর্মীদের শুভেচ্ছার জবাব দেন।

সমাবেশকে কেন্দ্র করে নয়াপল্টন, নাইটিঙ্গল মোড়, আরামবাগ, ফকিরাপুল, বিজয়নগর এবং এর আশপাশের এলাকায় বিপুলসংখ্যক নেতাকর্মী উপস্থিত হন। দৃশ্যত বিএনপি অফিসের সামনের বিশাল এলাকা কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে যায়।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায়ের সভাপতিত্বে সমাবেশ আরো বক্তব্য রাখেন, বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ, লে. জে. (অব.) মাহবুবুর রহমান, আসম হান্নান শাহ, ব্যারিস্টার জমিরউদ্দিন সরকার, ড. আবদুল মঈন খান, নজরুল ইসলাম খান, বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান হাফিজ উদ্দিন আহমেদ, সেলিমা রহমান, আব্দুল্লাহ-আল নোমান, চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা খন্দকার মাহবুব হোসেন, এ জেড এম জাহিদ হোসেন, অ্যাডভোকেট জয়নাল আবদিন প্রমুখ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *