৮৬ হাজার ৬৫৭ কোটি টাকার ঘাটতি বাজেট

২০১৫-১৬ অর্থবছরের জন্য অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত যে বাজেট ঘোষণা করেছেন তাতে যে পরিমাণে ঘাটতি রাখা হয়েছে, তা স্মরণকালের মধ্যে সবচেয়ে বেশি।

২০১৫-১৬ অর্থবছরের জন্য অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত যে বাজেট ঘোষণা করেছেন তাতে যে পরিমাণে ঘাটতি রাখা হয়েছে, তা স্মরণকালের মধ্যে সবচেয়ে বেশি।২০১৫-১৬ অর্থবছরের জন্য অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত যে বাজেট ঘোষণা করেছেন তাতে যে পরিমাণে ঘাটতি রাখা হয়েছে, তা স্মরণকালের মধ্যে সবচেয়ে বেশি।

অর্থবছরে বাজেটে ঘাটতি ধরা হয়েছে ৮৬ হাজার ৬৫৭ কোটি। চলতি অর্থবছরের বাজেটে ঘাটতি ধরা হয়েছে ৬১ হাজার ৩৪৬ কোটি টাকা। এক বছরের ব্যবধানে বাজেট ঘাটতি বেড়েছে ২৫ হাজার ৩১১ কোটি টাকা। ঘাটতি বাড়ার হার ৪১ দশমিক ২৬ শতাংশ। আগে কখনোই এত বেশি হারে বাজেট ঘাটতি বাড়েনি। ঘাটতির পরিমাণ অস্বাভাবিক মাত্রায় বাড়ানো হলেও বাজেটের আকার বাড়ানো হয়েছে স্বাভাবিক গতিতে। চলতি অর্থবছরের তুলনায় আগামী অর্থবছরের বাজেটের আকার বাড়ছে ৪৪ হাজার ৫৯৪ কোটি টাকা বা ১৭ দশমিক ৮০ শতাংশ। মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) আকার বাড়ার কারণে বেড়েছে বাজেটের আকার। এ কারণে বেড়েছে বাজেট ঘাটতির পরিমাণ। জিডিপির হিসাবে বাজেট ঘাটতির হার ৫ শতাংশের মধ্যেই রাখা হয়েছে। অন্যান্য সময়েও জিডিপির হিসাবে বাজেট ঘাটতি ৪ থেকে ৫ শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা হয়েছিল। ফলে সংখ্যা বা পরিমাণে ঘাটতির পরিমাণ বাড়লেও সার্বিক অর্থ ব্যবস্তার ওপর এর কোনো নেতিবাচক প্রভাব পড়বে না। এদিকে ব্যবসায়ীরা বলেছেন, সরকার বাজেট ঘাটতি পূরণে বেশি মাত্রায় ঋণ নিলে বেসরকারি খাত ঋণ পাওয়া থেকে বঞ্চিত হবে। সরকার বেশি ঋণ নেয়ার কারণে ঋণের সুদের হার কমছে না। ফলে সরকারের মাত্রাতিরিক্ত ঋণের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বেসরকারি খাত। ২০১০-১১ অর্থবছরের তুলনায় ২০১১-১২ অর্থবছরে বাজেটের আকার বেড়েছে ৩১ হাজার ৪১৯ কোটি টাকা বা ২৩ দশমিক ৭৭ শতাংশ। ওই অর্থবছরে ঘাটতির পরিমাণ বেড়েছিল ১১ হাজার ৩৩৮ কোটি টাকা বা ৩৭ দশমিক ৭৬ শতাংশ। ২০১১-১২ অর্থবছরের তুলনায় ২০১২-১৩ অর্থবছরে বাজেটের আকার বেড়েছিল ২৮ হাজার ১৪৯ কোটি টাকা বা ১৭ দশমিক ২১ শতাংশ। ঘাটতি বেড়েছিল ৫ হাজার ৭৫৩ কোটি টাকা বা ১৪ দশমিক ২০ শতাংশ। ২০১২-১৩ অর্থবছরের তুলনায় ২০১৩-১৪ অর্থবছরে বাজেটের আকার বেড়েছিল ৩০ হাজার ৭৫৩ কোটি টাকা বা ১৬ দশমিক ০৪ শতাংশ। একই সময়ে ঘাটতির পরিমাণ বেড়েছিল ২ হাজার ৩৩৮ কোটি টাকা বা ৫ দশমিক ৮০ শতাংশ। ২০১৩-১৪ অর্থবছরের তুলনায় ২০১৪-১৫ অর্থবছরে বাজেটের আকার বেড়েছিল ২৮ হাজার ১৫ কোটি টাকা বা ১২ দশমিক ৫৯ শতাংশ। বাজেট ঘাটতি বেড়েছিল ১২ হাজার ৯৮৪ কোটি টাকা বা ২৬ দশমক ৮৫ শতাংশ। ২০১৪-১৫ অর্থবছরের তুলনায় ২০১৫-১৬ অর্থবছরে বাজেটের আকার বাড়ছে ৪৪ হাজার ৫৯৪ কোটি টাকা বা ১৭ দশমিক ৮০ শতাংশ। বাজেট ঘাটতি বাড়ছে ২৫ হাজার ৩১১ কোটি টাকা বা ৪১ দশমিক ২৬ শতাংশ।

অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত বৃহস্পতিবার বিকেল সাড়ে ৩টায় জাতীয় সংসদে ২০১৫-১৬ অর্থবছরের এ প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেট পেশ করেন। একই সঙ্গে চলতি ২০১৪-১৫ অর্থবছরের সংশোধিত বাজেট ও অর্থবিল ২০১৫ সংসদে উপস্থাপন করেন তিনি।

প্রস্তাবিত বাজেটে মোট অভ্যন্তরীণ সম্পদ আহরণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ২ লাখ ৮ হাজার ৪৪৩ কোটি টাকা এবং সামগ্রিক ঘাটতির পরিমাণ হচ্ছে ৮৬ হাজার ৬৫৭ কোটি টাকা। অভ্যন্তরীণ ব্যাংক ব্যবস্থা ও সঞ্চয়পত্র থেকে ঋণ গ্রহণ এবং বৈদেশিক ঋণ ও অনুদান থেকে এ ঘাটতি পূরণ করা হবে। সুতরাং বাজেট বাস্তবায়ন, লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী রাজস্ব আদায় ও কাঙ্ক্ষিত বৈদেশিক সহায়তা অর্জন করা উচ্চাভিলাষী এ বাজেটের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

রাজস্ব আদায়ে লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে প্রস্তাবিত বাজেটে কর ও ভ্যাটের আওতা বাড়ানো হয়েছে। একই সঙ্গে কিছু নতুন পদক্ষেপও নেওয়া হয়েছে। ফলে স্বাভাবিকভাবেই মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্তের ওপর করের বোঝা বাড়বে। অন্যদিকে নতুন বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে উদ্যোক্তাদের বেশ কিছু সুবিধা ও ছাড় দেওয়া হলেও বাণিজ্য উদারীকরণের লক্ষ্যে আমদানি শুল্ক ও সম্পূরক শুল্কের হার কমানো হয়েছে।

অন্যান্যের মধ্যে বাজেটে সামাজিক নিরাপত্তা ও ভর্তুকি খাতে বরাদ্দ বাড়ানো হয়েছে। পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ (পিপিপি), পদ্মা সেতু, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়ন ইত্যাদি খাতেও বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এ ছাড়া শিশুদের জন্য প্রথমবারের মতো ঘোষণা করা হয়েছে পৃথক শিশু বাজেট আর ছিটমহলবাসীদের জন্য রাখা হয়েছে বিশেষ বরাদ্দ।
প্রস্তাবিত বাজেটের মোট আকার বা ব্যয়ের পরিমাণ ধরা হয়েছে ২ লাখ ৯৫ হাজার ১০০ কোটি টাকা। এটি জিডিপির ১৭ দশমিক ২ শতাংশ।

এবারের বাজেট ২০১৪-১৫ অর্থবছরের মূল বাজেটের চেয়ে ৪৪ হাজার ৫৯৪ কোটি টাকা বেশি। গত অর্থবছরে বাজেটের আকার ছিল ২ লাখ ৫০ হাজার ৫০৬ কোটি টাকা।
নতুন বাজেটে জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৭ শতাংশ। যা গতবার ছিল ৭ দশমিক ৩ শতাংশ।

সম্পদ আহরণ, ঘাটতি ও অর্থায়ন
বাজেটে মোট অভ্যন্তরীণ সম্পদ আহরণের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ২ লাখ ৮ হাজার ৪৪৩ কোটি টাকা। এটি গত অর্থবছরের চেয়ে ২৫ হাজার ৪৮৯ কোটি টাকা বেশি। গতবার এ লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১ লাখ ৮২ হাজার ৯৫৪ কোটি টাকা।

অভ্যন্তরীণ সম্পদ আহরণের বাইরে প্রস্তাবিত বাজেটে মোট ঘাটতির পরিমাণ হচ্ছে ৮৬ হাজার ৬৫৭ কোটি টাকা। এটা জিডিপির ৫ শতাংশ। গত অর্থবছরে মূল বাজেটে মোট ঘাটতির পরিমাণ ছিল ৬৭ হাজার ৫৫২ কোটি টাকা টাকা।

ঘাটতি পূরণ
বাজেটের ঘাটতি পূরণ করা হবে অভ্যন্তরীণ ব্যাংক ব্যবস্থা ও সঞ্চয়পত্র এবং বৈদেশিক ঋণ ও অনুদান থেকে। এর মধ্যে বৈদেশিক ঋণ বাবদ ৩২ হাজার ২৩৯ কোটি টাকা (গত অর্থবছরে এ খাতে ছিল ২৬ হাজার ৫১৯ কোটি টাকা), বৈদেশিক অনুদান বাবদ ৫ হাজার ৮০০ কোটি টাকা (গত অর্থবছরে এ খাতে ছিল ৬ হাজার ২০৬ কোটি টাকা), ব্যাংকিং খাত থেকে ৩৮ হাজার ৫২৩ কোটি টাকা (গত অর্থবছরে এ খাতে ছিল ৩১ হাজার ২২১ কোটি টাকা) ও ব্যাংক বহির্ভূত খাত থেকে ১৮ হাজার কোটি টাকা (গত অর্থবছরে এ খাতে ছিল ১২ হাজার ৫৬ কোটি টাকা) নেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে বাজেটে।

ব্যাংক বহির্ভূত খাতের মধ্যে সঞ্চয়পত্র খাত থেকে ১৫ হাজার কোটি টাকা (গত অর্থবছরে এ খাতে ছিল ৯ হাজার ৫৬ কোটি টাকা) ও অন্যান্য খাত থেকে ৩ হাজার কোটি টাকা (গত অর্থবছরে এ খাতে ছিল ৩ হাজার কোটি টাকা) নেওয়া হবে।

উন্নয়ন ব্যয়
প্রস্তাবিত বাজেটে উন্নয়ন খাতে মোট ১ লাখ ২ হাজার ৫৫৯ কোটি টাকা ব্যয়ের প্রস্তাব করা হয়েছে। এর মধ্যে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) খাতে ৯৭ হাজার কোটি টাকা ও এডিপি বহির্ভূত খাতে ৩ হাজার ৩৩৯ কোটি টাকা ব্যয় করা হবে। এ ছাড়া কাজের বিনিময়ে খাদ্য (কাবিখা) ও স্থানান্তর খাতে ১ হাজার ৫৮৭ কোটি টাকা ব্যয় করা হবে।
বিদায়ী অর্থবছরের মূল বাজেটে উন্নয়ন খাতে মোট ৮৬ হাজার ৩৪৫ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছিল। এর মধ্যে এডিপি-তে বরাদ্দের পরিমাণ ছিল ৮০ হাজার ৩১৫ কোটি টাকা ও এডিপি বহির্ভূত খাতে ৩ হাজার ৪৬৯ কোটি টাকা। এছাড়া কাজের বিনিময়ে খাদ্য (কাবিখা) ও স্থানান্তর খাতে ব্যয়ের পরিমাণ ধরা হয়েছিল ১ হাজার ৪৯৩ কোটি টাকা।

অনুন্নয়ন ব্যয়
প্রস্তাবিত বাজেটে অনুন্নয়ন খাতে মোট ১ লাখ ৮৪ হাজার ৫৫৯ কোটি টাকা ব্যয়ের প্রস্তাব করা হয়েছে। বিদায়ী অর্থবছরের মূল বাজেটে অনুন্নয়ন খাতে মোট ব্যয়ের পরিমাণ ধরা হয়েছিল ১ লাখ ৫৪ হাজার ২৪১ কোটি টাকা।

অনুন্নয়ন ব্যয়ের মধ্যে শীর্ষে রয়েছে অনুন্নয়ন রাজস্ব খাতে ব্যয়। মোট বাজেটের অর্ধেকেরও বেশি ব্যয় হচ্ছে এ খাতে। এর মধ্যে অভ্যন্তরীণ ঋণের সুদ বাবদ ৩৩ হাজার ৩৯৬ কোটি টাকা (চলতি অর্থবছরে এ খাতে বরাদ্দ ছিল ২৯ হাজার ৩০৫ কোটি টাকা) ও বৈদেশিক ঋণের সুদ বাবদ ১ হাজার ৭১৩ কোটি (চলতি অর্থবছরে এ খাতে বরাদ্দ ছিল ১ হাজার ৭৩৮ কোটি টাকা) টাকাসহ অনুন্নয়ন রাজস্ব খাতে মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ১ লাখ ৬৪ হাজার ৫৭১ কোটি টাকা (চলতি অর্থবছরে এ খাতে বরাদ্দ ছিল ১ লাখ ২৮ হাজার ২৩১ কোটি টাকা)।

এ ছাড়া প্রস্তাবিত বাজেটে অন্যান্য খাতের মধ্যে অনুন্নয়ন মূলধন খাতে ১৯ হাজার ৯৮৮ কোটি টাকা (চলতি অর্থবছরে এ খাতে বরাদ্দ ছিল ২৬ হাজার ১০ কোটি টাকা) এবং খাদ্য হিসাবে ২২৭ কোটি টাকা (চলতি অর্থবছরে এ খাতে বরাদ্দ ছিল ৩০৯ কোটি টাকা) ব্যয় করা হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *