ঐতিহ্যবাহী হার্ডিঞ্জ ব্রিজের শতবর্ষ পূর্তি

পাকশীর পদ্মা নদীর ওপর নির্মিত ঐতিহ্যবাহী হার্ডিঞ্জ ব্রিজটির বয়স বুধবার ১০০ বছরে পড়ল।

পাকশীর পদ্মা নদীর ওপর নির্মিত ঐতিহ্যবাহী হার্ডিঞ্জ ব্রিজটির বয়স বুধবার ১০০ বছরে পড়ল।পাকশীর পদ্মা নদীর ওপর নির্মিত ঐতিহ্যবাহী হার্ডিঞ্জ ব্রিজটির বয়স বুধবার ১০০ বছরে পড়ল।

ব্রিটিশ স্থাপত্যশৈলীর অনন্য নিদর্শন ও এশিয়ার অন্যতম এই রেলওয়ে সেতুর শতবর্ষ পূর্তির সাক্ষী হতে পেরে আনন্দে উদ্বেলিত পাবনাবাসী। দিনটিকে স্মরণীয় করে রাখতে ব্রিজের পাশে বিকেলে আয়োজন করা হয়েছে নানা অনুষ্ঠানের।

প্রাপ্ত তথ্যে জানা যায়, ঈশ্বরদী থেকে ৫ মাইল দক্ষিণে এবং পূর্বের সাঁড়াঘাট স্টেশন থেকে ৩-৪ মাইল পূর্ব-দক্ষিণে পাকশী নামক স্থানে তৎকালীন পাবনা ও নদীয়া জেলার পদ্মা নদীর ওপর নির্মিত হার্ডিঞ্জ ব্রিজটি।

প্রসিদ্ধ রেলসেতুটি পুরনো কাগজপত্রে ‘লোয়ার গ্যাঞ্জেস ব্রিজ, সাঁড়া’ নামে এক সময় খ্যাত ছিল।

অবিভক্ত ভারতের কলকাতার সঙ্গে আসাম এবং ইস্ট বেঙ্গলের যোগাযোগ সহজীকরণের লক্ষ্যে ১৮৮৯ খ্রীষ্টাব্দে পদ্মা নদীর ওপর সেতু নির্মাণের উদ্যোগ নেয় ব্রিটিশ সরকার। তৎকালীন অবিভক্ত ভারতের পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গে পূর্ববঙ্গের যোগাযোগ সহজ করার লক্ষ্যে ১৮৮৯ সালে পদ্মা নদীর উপর এই সেতুর নির্মাণ প্রক্রিয়া শুরু হয়। ব্রিটিশ প্রকৌশলী স্যার রবার্ট গেইলসের তত্ত্বাবধানে ২৪ হাজার শ্রমিক ব্রিজের নির্মাণ কাজ শুরু করেন।

পাকশী বিভাগীয় সেতু প্রকৌশল কার্যালয় সূত্র জানায়, ১৯০৯ সালের প্রথম ভাগে প্রাথমিক জরিপ, জমি অধিগ্রহণ ও প্রয়োজনীয় পাথরাদি সংগ্রহের কাজ শুরুর মধ্য দিয়ে পৃথিবীর বৃহত্তম রেল সেতুগুলোর অন্যতম হার্ডিঞ্জ ব্রিজের নির্মাণ কাজ শুরু হয়ে তা শেষ হয়েছিল ১৯১৪ সালের ডিসেম্বরে। নির্মাণ কাজ শেষ হওয়ার পরপরই ১৯১৫ সালের ১ জানুয়ারি ব্রিজের ওপর দিয়ে মালগাড়ি ও ২৫ ফেব্রুয়ারি আপ মালগাড়ির চলাচল শুরু হয়। এর পর ১৯১৫ সালের ৪ মার্চ ভারতের তৎকালীন গভর্নর জেনারেল

দীর্ঘ ২০ বছর আলোচনার পর ১৯০৮ খ্রীষ্টাব্দে প্রস্তাবটি গৃহীত হয়। ১৯০৯ সালের প্রথমভাগে প্রাথমিক জরিপ, জমি অধিগ্রহণ ও প্রয়োজনীয় পাথরাদি সংগ্রহের কাজ শুরু হয়। এর পর ১৯১০ খ্রীষ্টাব্দে ২৪ হাজার ৪শ’ লোকবল দিয়ে পৃথিবীর বৃহত্তম রেলসেতুগুলোর অন্যতম হার্ডিঞ্জ ব্রিজের নির্মাণ কাজ শুরু হয় পদ্মা নদীর ওপর। আর ৪ কোটি ৭৫ লাখ ৫০ হাজার ভারতীয় রুপী ব্যয়ে ১৯১৪ সালের ডিসেম্বরের মধ্যেই নির্মাণ শেষ হয় ১ দশমিক ৮১ কিলোমিটার দৈর্ঘের এই রেলসেতুটির।

নির্মাণ কাজ শেষ হওয়ার পর পরই ১৯১৫ সালের ১ জানুয়ারি ব্রিজের ওপর দিয়ে ডাউন মালগাড়ি ও ২৫ ফেব্রুয়ারি আপ মালগাড়ির চলাচল শুরু হয়। এর পর ১৯১৫ সালের ৪ মার্চ ভারতের তৎকালীন গভর্নর জেনারেল লর্ড হার্ডিঞ্জ আনুষ্ঠানিক হার্ডিঞ্জ ব্রিজটির উদ্বোধন করেন। এর পর ব্রিজের ওপর দিয়ে যাত্রীবাহী গাড়ি বা প্যাসেঞ্জার ট্রেন চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করা হয়। পরে তার নামানুসারে এর নামকরণ করা হয় ‘হার্ডিঞ্জ ব্রিজ’।

সেতুটি নির্মাণের প্রধান প্রকৌশলী ছিলেন ব্রিটিশ প্রকৌশলী মি. রবার্ট গেইলস। এই রেলব্রিজের ভারবহন ক্ষমতা ১ হাজার ৯২৭ টন। সেতুটি খুলনা থেকে পার্বতীপুর পর্যন্ত ব্রডগেজ রেলপথকে সংযুক্ত করেছে। শৈল্পিক কারুকার্য খচিত ঐতিহ্যময় হার্ডিঞ্জ ব্রিজ গত ১০০ বছর ধরে আকৃষ্ট ও মুগ্ধ করে চলেছে পর্যটকদের মন।

একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের সময় সেতুটির ১২ নম্বর স্প্যানটি মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হলে এগার মাস ট্রেন চলাচল বন্ধ ছিল। পরের বছর ১৯৭২ খ্রীষ্টাব্দের অক্টোবরে সংস্কারের মাধ্যমে পুনরায় চালু করা হয়।

পৃথিবীর দীর্ঘতম রেলসেতুগুলোর একটি এই সেতুটিতে রয়েছে মূল ১৫টি স্প্যান, যার প্রতিটির (একটি থেকে অন্যটির) বিয়ারিংদ্বয়ের মধ্যবর্তী দৈর্ঘ্য ১৪৫ ফুট ১.৫ ইঞ্চি। স্প্যানগুলোর উচ্চতা ৫২ ফুট। প্রতিটি স্প্যানের ওজন ১২৫০ টন। প্রধান ১৫টি স্প্যান ছাড়াও সেতুর উভয় পাশে রয়েছে ৩টি করে অতিরিক্ত ৬টি ল্যান্ডস্প্যান। ল্যান্ডস্প্যানগুলোর প্রতিটির বিয়ারিংদ্বয়ের দৈর্ঘ্য ৭৫ ফুট। নির্মাণশৈলী ও নান্দনিক দৃশ্যপটে চোখজুড়ানো হার্ডিঞ্জ সেতুটি সেই সময়ের বর্ষায় সর্বোচ্চ পানির লেভেল থেকে ৪০ ফুট এবং গ্রীষ্মে সর্বনিম্ন পানিপ্রবাহ থেকে ৭১ ফুট উচ্চতায় নির্মিত হয় এ কারণে, যাতে সেতুর নিচ দিয়ে স্টিমারসহ বড় বড় নৌকা নির্বিঘ্নে চলাচল করতে পারে।

পাকশী এলাকার প্রবীণ শিক্ষক রেজাউল আলম মিন্টু বলেন, ‘এই ব্রিজ আমাদের ইহিতাস ঐতিহ্যের অংশ, আমাদের গৌরব। পাকিস্তান আমলে ব্রিজটি মাঝে মধ্যে পরিষ্কার করে ধোয়ামোছা করা হতো, রঙ করা হতো। কিন্তু এখন সেগুলো দেখা যায় না। এ কারণে এর গুণগতমান নষ্ট হওয়া নিয়ে আমরা শঙ্কার মধ্যে আছি। শুধু ১০০ বছর নয়, আরও এক বা দুশ’ বছর এই ব্রিজটি টিকে থাক— এ কামনা করি।’

শতবর্ষী হার্ডিঞ্জ ব্রিজের নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা হার্ডিঞ্জ ব্রিজ পুলিশ ক্যাম্পের ইনচার্জ আব্দুল আউয়াল বলেন, ‘আমরা ছোটবেলায় এই ব্রিজের ইতিহাস পড়েছি। আমি তো ভাবতেই পারছি না সেই ব্রিজের একশ’ বছর পূর্তি হচ্ছে। আর সেই সময় আমি এই ব্রিজের নিরাপত্তার দায়িত্বে আছি। খুবই ভাল লাগছে, নিজেকে গর্বিত মনে হচ্ছে।’

পশ্চিমাঞ্চল পাকশী বিভাগীয় রেলওয়ের ব্রিজ ইঞ্জিনিয়ার আরিফুল ইসলাম বলেন, ‘সেতু বিভাগ থেকে হার্ডিঞ্জ ব্রিজের পরিচর্যা ও রক্ষণাবেক্ষণ নিয়মিত করা হচ্ছে। আজ একশ’ বছর পরেও এই ব্রিজের গঠন চমৎকার অবস্থায় আছে। তারপরও এই ব্রিজের স্থায়িত্ব আরও কিভাবে বাড়ানো যায় সে চিন্তা থেকে কাজ করে যাচ্ছে রেল কর্তৃপক্ষ।’

এদিকে হার্ডিঞ্জ ব্রিজের শতবর্ষ উদযাপন উপলক্ষে চলছে নানা আয়োজন। এ জন্য শতবর্ষ উদযাপন কমিটি গঠন করা হয়েছে। হার্ডিঞ্জ ব্রিজ শতবর্ষ উদযাপন কমিটির আহ্বায়ক অধ্যাপক আবুল কালাম আজাদ জানান, কমিটির পক্ষ থেকে ব্রিজের পাশে প্যান্ডেল তৈরির কাজ চলছে। বিকেল তিনটা থেকে অনুষ্ঠান শুরু হবে। কেক কাটা হবে, ব্রিজের একটি অংশ আলোকসজ্জা করা হবে। এ ছাড়াও থাকবে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *