স্বাদ বর্ধনকারী টেস্টিং সল্টে মানবদেহের ভয়াবহ ক্ষতি
সাময়িকী

স্বাদ বর্ধনকারী টেস্টিং সল্টে মানবদেহের ভয়াবহ ক্ষতি

অনেকে এখনো জানেন না টেস্টিং সল্ট একটি নিরব ঘাতক। মানবদেহের জন্য ভয়াবহ ক্ষতির কারণ হলেও থেমে নেই টেস্টিং সল্ট বা স্বাদ লবণের ব্যবহার।

টেস্টিং সল্ট সব ধরনের খাবারে ব্যবহার হয় না। বিশেষ করে স্যুপ, মাংস দিয়ে তৈরি খাবার, নুডলস, চনাচুর, বিস্কুট, স্ন্যাকস, চায়নিজ খাবার ও ফাস্ট ফুডের দোকানগুলোতে প্রচুর পরিমাণ টেস্টিং সল্ট ব্যবহার হয়। এছাড়া দেশের বাজারে যেসব পটেটো চিপস বিক্রি হয়, তাতে মাত্রাতিরিক্ত টেস্টিং সল্ট ব্যবহার করা হয়।

ভারতের উত্তর প্রদেশের বারবানকি এলাকার এক খাদ্য নিরাপত্তা কর্মকর্তা একটি বহুজাতিক কোম্পানির খাদ্যে টেস্টিং সল্ট পাওয়ার প্রমাণ দেয়ায় দেশজুড়ে তোলপাড় সৃষ্টি হয়। যার প্রেক্ষিতে সরকার বহুজাতিক কোম্পানির পণ্যটি নিষিদ্ধ করতে বাধ্য হয়। তবে আমেরিকার ফুড এ- ড্রাগ এডমিনিস্ট্রেশন (এফডিএ) টেস্টিং সল্ট নিষিদ্ধ করেনি। এর নেপথ্য কারণ টেস্টিং সল্ট উৎপাদন ও বিপননকারীরা মার্কিন অর্থনীতি প্রকারান্তরে নিয়ন্ত্রণ করে থাকে।

টেস্টিং সল্ট একটি রাসায়নিক উপাদান, যা খাবারকে মুখরোচক বা মজাদার করার লক্ষ্যে বেশি ব্যবহৃত হয়। এটি ব্যাপক পরিমাণে ব্যবহার করলে স্বায়ুতন্ত্রের ব্যাপক ক্ষতি হতে পারে। বিজ্ঞানীরা একে স্বায়ু-বিষ বলে থাকেন। কৃত্রিম স্বাদ বর্ধনকারী উপাদানের মধ্যে টেস্টিং সল্ট বা মনো সোডিয়াম গ্লুকোমেট হচ্ছে একটি উল্লেখযোগ্য উপাদান। প্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে বহু বছর ধরে এবং আমেরিকায় প্রায় দুই দশকের বেশি সময় ধরে টেস্টিং সল্ট ব্যবহার হয়ে আসছে। টেস্টিং সল্টের নিজস্ব কোনো পুষ্টিমান নেই। এটি খাদ্যের গন্ধ এবং স্বাদকে বহুগুণ বৃদ্ধি করতে পারে বলে খাদ্যশিল্পে এটি খুব বেশি ব্যবহার হয়।

কোনো খাবারে টেস্টিং সল্ট আছে কিনা তা খাবার মুখে দিয়েই বোঝা সম্ভব। কোনো খাবারে ঝাঁঝালো নোনা স্বাদ পাওয়া গেলে বুঝতে হবে তাতে টেস্টিং সল্ট আছে। এ জিনিস আজকাল বাংলাদেশের বাজারে যে সব কথিত পটেটো চিপস বিক্রি হয় তাতে মাত্রাতিরিক্ত টেস্টিং সল্ট ব্যবহার করা হয়। ব্যবহার হয় চিকেন ফ্রাই থেকে শুরু করে নানা খাদ্যে। স্নায়ুতে বিষক্রিয়া তৈরি করে এমন এই উপাদানের ব্যবহার আজকের বাংলাদেশে ব্যাপক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে।

বিজ্ঞানের ভাষায় স্নায়ু-বিষ আর ভোজন রসিকের ভাষায় টেস্টিং সল্ট বা স্বাদ লবণ। চাইনিজ রেস্টুরেন্টে বেশি ব্যবহারের কারণে এর মাধ্যমে সৃষ্ট রোগকে বলে ‘চাইনিজ রেস্টুরেন্ট সিনড্রোম’। যারা চাইনিজ খাবারে বেশি অভ্যস্ত তাদের এই রোগে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কাও বেশি থাকে। অনেকে আবার বাসায় তৈরি নাস্তাতেও নিয়মিত টেস্টিং সল্ট ব্যবহার করেন। শরীরে বেশি পরিমাণ টেস্টিং সল্ট প্রবেশে বমি ভাব, মাথাব্যথা, অনিন্দ্রা, খাবারে অরুচি, স্মৃতিশক্তি হ্রাস, দেহের অংশ বিশেষের কাপুনি, বুকে চাপ অনুভব, কোনো কারণ ছাড়া দুর্বল লাগা, হাতের তালু বা পায়ের তালু ও গলায় জ্বালা অনুভব করে মানুষ। সবচেয়ে মারাত্মক ব্যাপার হলো শেষ পর্যন্ত পার্কিনসন্স ডিজিজ বা আলজেইমার্স ডিজিজের মতো মারাত্মক অসুখ হতে পারে।

ভারতের উত্তর প্রদেশের বারাবানকি এলাকা। বারাবানকি খাদ্য নিরাপত্তা কার্যালয়ের খাদ্য নিরাপত্তা কর্মকর্তা সঞ্জয় সিং গত বছরের ১০ মার্চ হোলি শুরুর ঠিক আগ মুহূর্তে, নিয়মিত অভিযানের অংশ হিসেবে পটেটো চিপসসহ বিভিন্ন প্যাকেটজাত শিশুখাদ্যে দূষণ পরীক্ষার সময়ে একটি বিক্রয়কেন্দ্র থেকে একটি বহুজাতিক কোম্পানির কয়েকটি নুডলসের প্যাকেট নমুনা হিসেবে সংগ্রহ করেন। এসব নমুনা তিনি গোরাখপুরে সরকারি গবেষণাগারে (ল্যাবরেটরি) পরীক্ষার জন্য পাঠিয়ে দেন। গবেষণাগারের পর্যবেক্ষণে নুডলসে ভোক্তার শরীরের জন্য ক্ষতিকর উপাদান এমএসজি-র (মনোসোডিয়াম গ্লোটামেট) অস্তিত্ব ধরা পড়ে। এ ব্যাপারে নিশ্চিত হওয়ার জন্য সঞ্জয় ওই নুডলসের আরও বেশ কয়েকটি নমুনা সংগ্রহ করে গোরাখপুরে পাঠিয়ে দেন। কিন্তু এবারেও একই ফলাফল পাওয়া যায়।

সঞ্জয় সিং এসব অনিয়মের বিষয় বহুজাতিক কোম্পানির নজরে আনেন। প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে তখন কলকাতায় সেন্ট্রাল ফুড ল্যাবেরেটরিতে সম্পূর্ণ নতুনভাবে পরীক্ষার (ফ্রেস টেস্ট) দাবি জানানো হয়। কলকাতার এই সরকারি গবেষণাগারের পর্যবেক্ষণে এমএসজি ছাড়াও এগুলোতে মাত্রাতিরিক্ত সীসার উপস্থিতি নিশ্চিত করা হয়। দেখা যায়, অনুমোদিত পরিমাণের চেয়ে এগুলোতে প্রায় আটগুণ বেশি সীসা (১৭ দশমিক ২ পার্টস পার মিলিয়ন-পিপিএম) রয়েছে। বিষয়টি তিনি তার ওপরস্থ কর্মকর্তাদের কানে তোলেন। ফলে এটি পরিণত হয় জাতীয় ঘটনায় (ন্যাশনাল ইস্যু)। আর সেই চাপে কেন্দ্রীয় সরকারকেও গত জুন মাসে বহুজাতিক কোম্পানির ওই নুডলস নিষিদ্ধ করার ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিতে হয়।

শিরোনাম ডট কম
শিরোনাম ডট কম । অনলাইন নিউজ পোর্টাল Shironaam Dot Com । An Online News Portal
http://www.shironaam.com/

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *