ভালো থাকুক স্বজন হারানো পরিবারগুলো

ভালো থাকুক স্বজন হারানো পরিবারগুলো।

তাহসিন আহমেদ
১৬ জানুয়ারি ২০১৮-তে ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্স ফ্লাইট ২১১ এর পাইলট আবিদ সুলতানের ফেসবুক প্রোফাইল পিকচারে তাঁর বন্ধু মইন উদ্দিন কমেন্ট করেছিলেন, ‘বন্ধু কোনদিন কি আমার তোর পাশে ককপিটে বসা হবে না?’ উত্তরে আবিদ সুলতান বলেছিলেন ‘অবশ্যই হবে বন্ধু’।

দুই বন্ধুর একসাথে আর ককপিটে বসা হয়ে উঠেনি।

স্বামীর মৃত্যুর খবর গোপন রাখা হয়েছিল আবিদ সুলতানের স্ত্রী আফসানা খানমের কাছে। এরপর তিনি শুনলেন তাঁর স্বামী বেঁচে নেই। স্বামীর শোকে মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ বা স্ট্রোকে আক্রান্ত হন তিনি। গত ১৮ মার্চ বিকালে উত্তরার বাসায় মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ বা স্ট্রোকে আক্রান্ত হওয়ার পর তাঁকে রাজধানীর শের-ই-বাংলা নগরে অবস্থিত ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেস ও হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। ২৩ মার্চ সকাল সাড়ে নয়টার দিকে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান। আবিদ-আফসানার একমাত্র ছেলে তানজিদ সুলতান মাহি। সামান্য কটা দিনের ব্যবধানে বাবা মা দুজনই দুনিয়া ছেড়ে চলে গেলেন। একা রয়ে গেলো সে। তবে মেনে নিতে হয়েছে সবকিছু।

গত বছরের ১২ মার্চ ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্স ফ্লাইট ২১১ ঢাকার শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে নেপালের কাঠমান্ডুর ত্রিভূবন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর যাবার কথা ছিল। কিন্তু কে জানত সেই বিমানের ফিরতি ফ্লাইট বলে কিছু থাকবে না। বিমানটি আগুনে পোড়ার সাথে সাথে ৫৩জন নিহত হবার সাথে সাথে থেমে যার ৫৩টি পরিবারের স্বপ্ন।

মৃত্যুকে খুব কাছ থেকে দেখেও বেঁচে ফিরেছিলেন কিন্তু আবারও ১৫ দিনের মাথায় মৃত্যুর কোলে ঢলে পরতে হল ৪৩ বছর বয়সী শাহীন বেপারীকে। ঢাকার সদরঘাটে অবস্থিত করিম অ্যান্ড সন্স নামে একটি কাপড়ের দোকানে ম্যানেজার হিসেবে চাকরি করতেন তিনি। ৯ বছরের একমাত্র মেয়ে সূচনার বাবা তিনি।

প্লেন বিধ্বস্তের ঘটনায় মাথার কিছু অংশ পুড়ে যাওয়ার পাশাপাশি শাহীনের ডান পা ভেঙে গিয়েছিল। এ ছাড়া তার শরীরের পেছন দিকেও আঘাত লাগে। দুর্ঘটনার পরপর শাহীনকে নেপাল সেনাবাহিনীর সদস্যরা কাঠমান্ডু মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করেন।

বিয়ের মাত্র ১৩দিনের মাথায় মধুচন্দ্রিমার জন্য নেপালের রাজধানী কাঠমাণ্ডুকে বেঁছে নিয়েছিল আঁখি মনি ও মিনহাজ বিন নাসির দম্পতি। অথচ সেই আনন্দযাত্রা পরিণত হল অনন্তযাত্রায়।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে একটি হাতের ছবি ভাইরাল হয়েছিল ইউএস-বাংলা ট্রাজেডির পর। হাতটিতে মেহেদির নকশা। হাতে দুটি পাথরের আংটি জ্বলজ্বল করছিল। হাতের চামড়া পুড়ে ঝুলে গেছে। হাতটি ছিল আঁখি মনির। মৃত্যুর আগে শেষ নিঃশ্বাস থাকা পর্যন্ত আঁখি মনি ও মিনহাজ বিন নাসির একজন আরেকজনের আঙ্গুল ধরে ছিল।

গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলার নগর হাওলা গ্রামের বাড়িতে প্রিয় একটি বাগান ছিল আলোকচিত্রী প্রিয়কের। বাড়ির ব্যালকনি থেকে দেখা যেত একটি ডালিম গাছ। সেই ডালিম গাছের নিচে চিরনিদ্রায় শায়িত হন আলোকচিত্রী প্রিয়ক। অথচ এই ডালিম গাছের নিচে বসে নেপাল ভ্রমণের অভিজ্ঞতার বর্ণনা দেয়ার কথা ছিল তাঁর।

ছোট্টমণি প্রিয়ন্ময়ী তামাররা আলোকচিত্রী প্রিয়কের একমাত্র কন্যা। মাত্র ৩ বছর বয়সী এই ফুটফুটে শিশুটির খুব ইচ্ছে হয়েছিল বিমানে চড়ার। কে জানত বিমানে চড়ার শখ পূরণ করতে চিরদিনের জন্য না ফেরার দেশে পাড়ি জমাতে হবে ।

প্রিয়ন্ময়ীর ইচ্ছা ছিল খেলনা ভর্তি লাগেজ নিয়ে দাদুকে গল্প শোনানোর। কিন্তু মৃত্যুর কাছে হার মেনে খেলনা ভর্তি লাগেজের বদলে কফিনবন্দি লাশ হয়ে তাঁকে ফিরতে হল দাদুর বাড়ি। নেপালের হাসপাতালে প্রিয়ন্ময়ীর ছোট্ট লাশটি দেখে কান্না ধরে রাখতে পারেননি চিকিৎসকরাও। খেলার জায়গা সেই ডালিম গাছের নিচে বাবার পাশে মাটির বিছানায় কাটাতে হবে ছোট্টমণি প্রিয়ন্ময়ীকে। দাফনের সময় ছোট্ট ওই শিশুটির লাশ যখন সামনে আনা হয় কেউই নিজেদের আবেগ সংবরণ করতে পারেনি। সবার চোখের কোণ ভিজে উঠেছিল কান্নায়। কেউ অঝোরে, কেউ কেঁদেছেন নীরবে।

প্রিয়কের মা ফিরোজা বেগমের ইচ্ছে ছিল, বাসার ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে যাতে জীবনের বাকিটা সময় ছেলে ও নাতনির কবর দেখে এবং দোয়া করে সময় কাটাতে পারেন- আর তাই এখানেই হলো তাদের শেষ শয্যা।

নেপালের কাঠমাণ্ডু ইউএস-বাংলা বিমান ট্র্যাজেডিতে প্রাণে বেঁচে যায় প্রিয়কের স্ত্রী অর্থাৎ প্রিয়ন্ময়ীর মা আলিমুন নাহার অ্যানি। সারাটা জীবন তাঁকে কন্যা ও স্বামী হারানোর কষ্টকে মেনে নিয়ে বেঁচে থাকতে হবে।

জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত সাহসিকতার সঙ্গে নিজের দায়িত্ব পালন করেছেন পৃথুলা রশীদ। যাত্রীদের ফেলে ককপিট ছেড়ে যাননি জীবনের অন্তিম মুহূর্তেও। সেই সাহসী মেয়ে হয়ত মৃত্যুকে আগেই দেখতে পেয়েছিলেন। ৩ ফেব্রুয়ারি শেষ ফেসবুক স্ট্যাটাস দিয়েছিলেন Avled শিরোনামে। সুইডিশ ভাষায়। যার বাংলা অর্থ মৃত। স্ট্যাটাস দেয়ার ১০দিন পর তিনি আসলেই মৃত। শুধু ফেসবুকের ছবি অথবা পুরাতন ছবির এ্যালবামে তিনি থাকবেন সৃতি হয়ে। হয়ত আমাদের পৃথুলার কথা মনে না থাকলেও তাঁর পরিবার, স্বজন অথবা বন্ধুবান্ধবদের কাছে সারাজীবন তিনি স্মরণীয় থাকবেন সাহসী মেয়ে হিসেবেই। পৃথুলার

মা রাফেজা বেগম আগেই বলেছিলেন, মৃত্যুকে আলিঙ্গন করেছেন তার মেয়ে।

পৃথুলার বাবা আমিনুর রশীদ বললেন, মেয়ের স্বপ্ন ছিল বৈমানিক হবে। ককপিটে বসে বিমান চালানোর স্বপ্ন পূরণ করেছে নিজের শ্রমঘামে। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে বিমান দুর্ঘটনার কারণে বাবা-মা’র শঙ্কায় থাকতে কখন কী হয়। কিন্তু মেয়ের স্বপ্ন বলে কথা, তাই বাধা দেননি। কিন্তু ধারণাই করতে পারেননি একদিন এমন কিছু হবে।

ঢাকায় জন্ম বাবা-মায়ের একমাত্র সন্তান পৃথুলার। ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্সের প্রথম নারী পাইলট। ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্সে পাইলট/ফার্স্ট অফিসার হিসেবে যোগ দেন ২০১৬ সালের জুলাইতে। তিনি প্রশিক্ষণ নেন আরিরাং ফ্লাইং স্কুল থেকে। ২০১২ সালে পৃথুলা আরিরাংয়ের তৃতীয় ব্যাচের প্রশিক্ষণার্থী ছিলেন। দুই বছরের কমার্শিয়াল পাইলট লাইসেন্স কোর্স শেষ করেছিলেন তিনি। বাংলাদেশের বেসরকারি বিমান সংস্থার পাইলটরা বেনারকে জানান, বাংলাদেশের তিনটি বেসরকারি বিমান পরিবহন সংস্থায় কমপক্ষে আড়াইশ’ বৈমানিক কাজ করেন। এর মধ্যে নারী ১৫ জনের বেশি নন। আর সরকারি সংস্থা বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের ১৯৩ পাইলটের মধ্যে নারী আছেন ১০ জন।

শুক্রাবাদের ৮১ নম্বরের চারতলা বাড়িতে থাকতেন সানজিদা হক বিপাশা-রফিক জামান রিমু দম্পতি। ছয় বছরের সন্তান অনিরুদ্ধকে নিয়ে সুখের সংসার ছিল তাঁদের। পুরো একটি পরিবারকে শেষ করে দিয়েছে বিমান দুর্ঘটনা।

স্বামী রফিক জামান রিমু এক সময় সাংবাদিকতার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। এরপর তিনি প্রতিবন্ধী শিশুদের নিয়ে কাজ করেন। রিমু-বিপাশা দম্পতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেছেন। তাদের একমাত্র ছেলে অনিরুদ্ধ ধানমণ্ডি বয়েজ স্কুলে কেজি ওয়ানে পড়ত। স্ত্রী, সন্তান ও বৃদ্ধ মাকে নিয়ে শুক্রাবাদে নিজেদের বাড়ির তৃতীয় তলায় থাকতেন রিমু। বিপাশা বেসরকারি সংস্থা সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সহযোগী সমন্বয়ক হিসেবে কাজ করতেন। লাল টিপ দিতে পছন্দ করতেন।

অফিসের কম্পিউটারে এখনও লাগানো আছে একটা লাল টিপ। কত আনন্দ নিয়ে তারা নেপালে যাচ্ছিলেন। এই রকম একটি পরিবার এক মুহূর্তে সবাইকে ছেড়ে চলে গেল। তবে স্বজনদের বুকের গহিনে আমৃত্যু জেগে রবে হাজারো স্মৃতি।

শোক, দুঃখ ও কষ্টকে ছাপিয়ে ইউএস-বাংলা ট্রাজেডিতে স্বজন হারানো পরিবারগুলো হয়ত স্বাভাবিক জীবনে অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছে। কিন্তু রাতের নিস্তব্ধতা ভেদ করে সন্তান হারানো বাবা-মার কষ্ট আমৃত্যু তাঁদের অশ্রুসিক্ত করবে । অথবা ভাই হারানো বোনের কান্না। কিংবা বোন হারানো ভাইয়ের কান্না। ছবির এ্যালবাম, পুরনো স্মৃতি মনে করে পরিবারগুলো হারিয়ে ফেলা প্রিয় মানুষকে খুঁজবেন। ভালো থাকুক স্বজন হারানো পরিবারগুলো।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *