সোহাগী জাহান তনুর বিদেহী আত্মার শেষ চিঠি
মতামত

সোহাগী জাহান তনুর বিদেহী আত্মার শেষ চিঠি

সোহাগী জাহান তনুর বিদেহী আত্মার শেষ চিঠিকাজী এম এ আনোয়ার

প্রিয় সহপাঠীরা,
আমি তনু। আজ প্রায় ৮ দিন হল আমাকে ধর্ষণ করে হত্যা করা হয়েছে। তোমাদের মাঝে আমি আর কোন দিনই ফিরে আসব না। তোমরা আর দেখবে না সদা হাস্যময় আমার মায়াবী মুখখানি। তবে তোমরা যদি আমাকে দেখতে চাও, কুমিল্লা সরকারি ভিক্টোরিয়া কলেজের ইতিহাস বিভাগে যাবে। আমাকে দেখতে না পেলেও, হয়ত আমার বিদেহী আত্মার উপস্থিতি টের পাবে। হয়ত অনুভব করবে আমার তীব্র মৃত্যু যন্ত্রণা আর গোঙ্গানীর হৃদয় বিদারক শব্দ। হয়ত তখন দেখবে না কিভাবে শিয়াল-শকুন মার্কা স্বাধীন দেশের জানোয়াররা আমাকে নিয়ে হলী খেলছিল। আমার মৃত্যু নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্তু ওরা আমাকে আঘাতের পর আঘাত করতে ছিল। হয়ত তোমরা জানবে না কি নির্মম ভাবে আমাকে হত্যা করা হল। কুমিল্লা সেনানিবাসের পাহাড় হাউস পানির ট্যাংকির এলাকায় আমার লাশ ছুঁড়ে ফেলে যায়। তোমরা হয়ত রাতে সেনানিবাসের পাহাড় হাউস এলাকার বাতাশে আমার মরণ চিৎকার শুনতে পাবে। হয়ত একদিন তোমরা ভুলে যাবে আমাকে কিন্তু আমি স্বাধীন দেশের লজ্জা নিয়ে বিচারের আশায় ছুটে বেড়াব। এ বিচার শুধু আমার একার না, এ বিচার বিগত কালের নির্যাতিত, ধর্ষিত ও অপহত হাজারো তনুর না পাওয়া বিচার। আমি তোমাদের কাছে এসে আর গান শুনাতে পারব না। তবুও আমার বিদেহী আত্মার করুণ আকুতি তোমাদের জানাতে চাই।

২ দিন আগেই ছিল ২৬ মার্চ, মহান স্বাধীনতা দিবস। ১৯৭১ সালের এই দিনে পূর্ব বাংলার আপামর জনগণ নির্যাতন-নিপীড়ন ও দমন থেকে বাঁচতে স্বাধীনতা ঘোষণা করেছিলো। আমার পিতা ও পিতামহরা যুদ্ধ ঘোষণা করে ছিলেন? শুরু হলো অধিকার আদায়ের জন্য যুদ্ধ। মুক্তির জন্য যুদ্ধ। বিজয়ও অর্জিত হলো ১৬ ডিসেম্বরে। কিন্তু এটা কোন ধরণের বিজয়? কোথায় সেই স্বাধীনতা? কোথায় সেই বীর বাঙ্গালী যাঁরা যুদ্ধ করেছিল একটি স্বাধীন দেশ গড়ার জন্য যেখানে থাকবে শুধু স্বাধীনতা? আজ শুধু চেতনা ধারীদের স্বাধীনতা অর্জন হয়েছে। আজও প্রায় প্রতিদিন যত্রতত্র হরহামেশাই ঘটছে ধর্ষণ এবং ধর্ষিত হচ্ছে সত্যিকারের মুক্তিযুদ্ধাদের মা-বোনেরা। জীবিত থাকাবস্থায় আমি জানতে পারি নি যে আমি পরাধীন। স্বাধীনতা কেবল উচু শ্রেণীর মানুষ গুলোর জন্য। বিজয়ের সূর্য উদিত হওয়ার আগেই যে অস্তমিত তা আমি কখনোই উপলব্দি করিনি। হয়েনাদের ভংকর ছোবল আমার পরাধীনতার পুরস্কার দিয়ে চিরতরে বিদায় করে দিল।

আমরা কি শুধু উদযাপন করা বা চেতনা দেখাতে স্বাধীনতা পেয়েছি? তানা হলে আমাদের স্বাধীনতার কাঙ্ক্ষিত রাষ্ট্র কোথায়? আমি ভীষণ ভাবে লজ্জিত এই ভেবে যে আমি এমন এক দেশে জন্ম গ্রহণ করেছিলাম যেখানে আমার মত শতশত নারী পতিত-ধর্ষিত হয়ে নিপাতিত হলেও চেতনা ব্যবসায়ীদের মন কাঁদে না। আমাকে যখন নির্মম ভাবে ধর্ষণ করে হত্যা করা হল। তখন আমার সাথে কি পৈশাচিক আচরণ করা হয়েছিল তা হয়ত তোমরা কোন দিনই বুঝবে না। হয়েনার দল ছিড়ে ছিড়ে আমার দেহখানি খেয়ে ছিল। আমি চিৎকার করে বলেছিলাম, আমাকে আর মারিস না রে। আমি বেঁচে থাকতে চাই। ওরা আসুরিক ধ্বংসলীলায় এমনভাবে মেতে উঠছিল যে আমার কথা শুনতে পাই নি। ওরা মানুষ ছিল না। ওদের চেহারা কেমন হায়েনা মত। শকুনের মত ওদের ঠোট আর দাতগুলো ছিল কুমিরের মত বীভৎস। ওরা আমার নিথর দেহ খানি নিয়ে অবাধ আন্দোত্সব মেতে উঠছিল। বন্য কুকুরগুলো আমার ক্ষতবিক্ষত দেহ খানি ফেলে রেখে চলে গেল। এই নির্মম নিষ্ঠুরতার মধ্য আমি কত বার মা-বাবার মুখ গুলো দেখতে চেয়েছিলাম ছিলাম। আমি চিৎকার করে ও বলতে পারিনি, বাবা, আমাকে বাঁচাও। আমাকে হত্যার পর ছয়দিন অতিবাহিত হলেও, এখনো পর্যন্ত মানুষ রূপী জগন্য পিশাচেরা গ্রেফতার হয়নি। তবে কি আমার মত গোটা দেশটাকেও ধর্ষণ করে হত্যা করা হয়েছে? এখনো কেন আমার স্বাধীন দেশের হাইকোর্ট স্বতঃপ্রবৃত্ত হয়ে রুল জারী করল না? তবে কি আমার কোন অধিকার এখন পর্যন্তু প্রতিষ্ঠিত হয় নি?

মহান স্বাধীনতা দিবসে ওই মড়া-থেকো ভূতগুলো হয়ত স্বাধীনতা উপভোগ করছে। হাইরে আমার স্বাধীন দেশ! যে দেশে নিস্পাপ লোকদের বিরুদ্ধে অলীক ও অসত্য সাক্ষ্য বা প্রামাণিক তথ্য সংগ্রহ করে বিশ্বাসঘাতক সাজিয়ে ফাঁসিতে ঝুলানো হতে পারে; যে দেশে আসল রাজাকার মন্ত্রী হয়ে চেতনার ঝান্ডা বয়ে বেড়াতে পারে; যে দেশে পা চাটা লোকগুলো তোষামোদের দক্ষতায় প্রধান মন্ত্রীর খুব আস্থাভাজন হতে পারে, সে দেশ কি সত্যি স্বাধীন? সে দেশে কি আমার মত সাধারণ নারীদের কোন স্বাধীনতা থাকতে পারে? আমি কখনো বিশ্বাস করতে পারি না, বাংলাদেশ ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা লাভ করে ছিল। যে দেশের সেনাবাহিনীরা নিজেদের দেশের অভ্যন্তরে নৃ-তাত্ত্বিক ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠীর যুবতী মেয়েদের নিয়ে ধর্ষণ করতে পারে, সে দেশে সেনাবাহিনীকে কতটুকু মহান ভাবতে পারি? পাকিস্তানী হানাদাররা আমাদের মা-বোনদেরকে যতটা না বেইজ্জত করেছিল, আমাদের সেনাবাহিনী কি তার থেকে কম করত, যদি তারাও সেই রকম সুযোগ পেত? প্রশ্নটা আমি রেখে গেলাম, তোমাদের কাছে? কারণ আমি এই সুরক্ষিত সেনানিবাসেই ধর্ষিত, অভিহত ও অবশেষে অপহত হয়েছি। আমাদের সেনাবাহিনী কে বলছি, ক্ষমা নেই তোমাদের। তোমরা আমার দেশের সাধারণ মানুষের টাক্সের অর্থে বিলাসিতা কর অথচ অন্যায় কারীদেরকে রক্ষা করতে তোমরা এত উদ্গ্রীব? তোমাদের লজ্জা থাকা দরকার। আমার হত্যার বিচার না করে তোমরা কিভাবে তোমাদের মা, স্ত্রী ও মেয়ের দিকে তাকাবে? তোমরা এত নির্লজ্জ কেন? আমার এই নৃশংস ঘটনার মধ্য দিয়ে তোমাদের ব্যর্থতা প্রকাশ হল। এটা আমার কলঙ্ক নয়, এটা তোমাদের মা, বোন বা মেয়েদের কলঙ্ক। তোমাদের কন্যারা যখন তোমাদেরকে বাবা বলে ডাকবে, তখন একটু খেয়াল করে দেখবে, তোমাদের মেয়েদের মধ্যে আমি লুকায়ে আছি।

আমি একা তনু ধর্ষিত হয়নি, প্রতিদিন ধর্ষিত হচ্ছে শতশত তনু। ধর্ষিত হচ্ছে বাংলাদেশের অরক্ষিত স্বাধীনতা? আমি এই অব্যবস্থিত ধর্ষিত স্বাধীনতাকে কি স্বাধীনতা বলতে পারি? আমি ক্ষমা করব না তোমাদের কে। ক্ষমা করব না তোমাদের অলীক স্বাধীনতা কে, যতদিন না আমার মত হাজার হাজার ধর্ষিতা তনুদের স্বাধীকার ফিরিয়ে দিতে না পারবে। চেতনার আড়তদারদেরকে বলছি, আমার মত তোমাদের মেয়ে, বোন বা মায়েরা যদি ধর্ষিত হত, তাহলে কি তোমরা তোমাদের চেতনা গুটিয়ে বসে থাকতে? তোমাদের মূল্যহীন চেতনা দিয়ে আমার মত তনুদের স্বাধীনতা দলিত ও মথিত করে যাবে কিন্তু আসল ধর্ষকরা চিরকালই তোমাদের কৃপা পেয়ে অধিকার বঞ্চিত তনুদের ধর্ষণ করে হত্যা করে যাবে একের পর এক।

অবশেষে আমি তরুণদেরকে বলছি, তোমাদের অদম্য ইচ্ছাশক্তি আছে, আছে অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর মত সাহস। এটা দিবালোকের মত সত্য, তোমরা আর কখনো আমার জীবন ফিরিয়ে দিতে পারবে না। পারবে না আমার বাবা-মার কাছে আমাকে ফিরিয়ে দিতে। বন্ধ হবে না আমার মায়ের আহাজারি। মায়ের অগ্নিঝরা অশ্রু নিবৃত্ত করতে তোমরা হয়ত কখনোই পারবে না। পূর্ণতা দিতে পারবে না মায়ের বুকের শুন্যতা। তবে হাজারো তনুকে ওই সব হায়েনাদের থেক রক্ষ করতে পারবে। প্রতিবাদ-বিক্ষোভ অব্যাহত থাকা সত্বেও আমার হত্যাকাণ্ডের তদন্তে দৃশ্যত কোন অগ্রগতি নেই। কিন্তু কোথায় যেন রহস্য রয়ে গেছে। আমার এই নৃশংস হত্যার রহস্য উন্মোচন করে অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা তোমাদের দায়িত্ব।

তোমাদের কাছে আমার শেষবারের মত অনুরোধ, ধর্ষকদের চিহ্নিত করে সমাজ থেকে বের করে দাও। মেরুদন্ডহীন সরকারকে ক্রমাগত চাপ প্রয়োগ করতে থাক, যাতে ওই সকল শিয়াল শকুনদের কে প্রকাশ্যে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে হত্যা করা হয়। ওদের কবরে কেউ মাটি দিতে যাবে না বা কাউকে মাটি দিতে যেতেও দিবে না। পারলে ওদের কবরে আগুন জ্বালিয়ে দিয়ে অবশিষ্ট হিংস্র জানোয়ারদের কাছে সতর্ক বার্তা পৌঁছে দিও। যাতে অনাগত কালের সহজ সরল তনুরা বাকী হায়েনাদের দ্বারা নির্যাতিত ও অবদমিত না হয়। মনে রেখ, আর যদি ধর্ষকরা বিনা বিচারে মুক্তি পায় বা রাজনৈতিক ক্ষমতা প্রয়োগ করে ধরা ছোঁয়ার বাইরে থেকে যায়, তোমাদের মা-বোনরা হয়ত একদিন আমার মত ভাগ্য বরণ করতে পারে।

আমি বিদায় জানোবা না হে বন্ধু। সদা তোমাদের চিত্তে, তোমাদের ভাবাবেগে থাকব অটুট। পশ্চিমের আকাশে যখন সূর্য পড়ে যাবে, ওখন হয়ত নীল আকাশে মেঘের ফাঁকে ফাঁকে আমাকে দেখতে পাবে। যদি এক বিন্দু জল তোমাদের মুখে ঝরে পড়ে, কষ্ট পেয়ো না। সযত্নে মুছে দিও। হয়ত তোমাদের ছেড়ে থাকার ব্যাথায় চোখে কোণ থেকে কয়েক ফোঁটা অশ্রু গড়ে পড়তে পারে।

ভাল থেকো বন্ধুরা।

তোমাদের তনু

লেখকঃ প্রাক্তন প্রভাষক, রিগাল কলেজ, লন্ডন; আইন উপদেষ্টা এসইবি সলিসিটর, লন্ডন

শিরোনাম ডট কম পোর্টালে প্রকাশিত মতামত লেখকের ব্যক্তিগত, যা আমাদের সম্পাদকীয় নীতির আওতাভুক্ত নাও হতে পারে।

শিরোনাম ডট কম
শিরোনাম ডট কম । অনলাইন নিউজ পোর্টাল Shironaam Dot Com । An Online News Portal
http://www.shironaam.com/

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *