সব্যসাচী লেখক সৈয়দ শামসুল হক আর নেই
জাতীয়

সব্যসাচী লেখক সৈয়দ শামসুল হক আর নেই

সব্যসাচী লেখক সৈয়দ শামসুল হক আর নেইসব্যসাচী লেখক সৈয়দ শামসুল হক আর নেই। ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন। মঙ্গলবার বিকাল ৫টা ২৫ মিনিটে রাজধানীর ইউনাইটেড হাসপাতালে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৮১ বছর। দীর্ঘদিন তিনি ফুসফুসের ক্যান্সারের সঙ্গে লড়াই করেছেন।

সৈয়দ শামসুল হকের জন্ম ২৭ ডিসেম্বর ১৯৩৫। তিনি কুড়িগ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। কবিতা, উপন্যাস, নাটক, ছোটগল্প তথা সাহিত্যের সকল শাখায় সাবলীল পদচারণার জন্য তাকে ‘সব্যসাচী লেখক’ বলা হয়। সব্যসাচী লেখক হিসেবে তার পরিচিতি ব্যাপক।

লন্ডনের রয়াল মার্সডেন হাসপাতালে চার মাস চিকিৎসার পর গত ২ সেপ্টেম্বর সৈয়দ শামসুল হক দেশে ফেরেন। এর আগে গত ১৫ এপ্রিল ফুসফুসের সমস্যা নিয়ে তিনি লন্ডনে যান এবং সেখানে পরীক্ষায় তাঁর ক্যানসার ধরা পড়ে। লন্ডন থেকে ফিরলে তাঁকে ইউনাইটেড হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। তাঁর চিকিৎসার দায়িত্ব নিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

বাংলা সাহিত্যে অসাধারণ অবদান রাখার জন্য এই কবি ও লেখক ১৯৬৬ সালে বাংলা একাডেমি পুরস্কার, ১৯৮৪ সালে একুশে পদক এবং ২০০০ সালে স্বাধীনতা পদক লাভ করেন।

সৈয়দ শামসুল হক মাত্র ২৯ বছর বয়সে বাংলা একাডেমি পুরস্কার পান। বাংলা একাডেমি পুরস্কার পাওয়া সাহিত্যিকদের মধ্যে তিনিই সবচেয়ে কম বয়সে এ পুরস্কার লাভ করেন।

সৈয়দ সিদ্দিক হুসাইন ও হালিমা খাতুন দম্পতির আট সন্তানের প্রথম সন্তান সৈয়দ শামসুল হক। পিতা সৈয়দ সিদ্দিক হুসাইন পেশায় ছিলেন হোমিওপ্যাথিক ডাক্তার। তিনি ডাক্তারি চর্চা করতেন।

এক ছেলে ও এক মেয়ের গর্বিত জনক জনাব হক ব্যক্তিজীবনে প্রথিতযশা লেখিকা ডা. আনোয়ারা সৈয়দ হকের স্বামী।

সৈয়দ শামসুল হকের ভাষ্য অনুযায়ী তার রচিত প্রথম পদ তিনি লিখেছিলেন এগারো-বারো বছর বয়সে। টাইফয়েডে শয্যাশায়ী কবি তার বাড়ির রান্নাঘরের পাশে সজনে গাছে একটি লাল টুকটুকে পাখি দেখে দুলাইনের একটি পদ “আমার ঘরে জানালার পাশে গাছ রহিয়াছে/ তাহার উপরে দুটি লাল পাখি বসিয়া আছে” রচনা করেন।

এরপর ১৯৪৯-৫০ সালের দিকে ম্যাট্রিক পরীক্ষার পরে ব্যক্তিগত খাতায় ২০০টির মতো কবিতা রচনা করেন। সৈয়দ শামসুল হকের প্রথম লেখা প্রকাশিত হয় ১৯৫১ সালের মে মাসে। ফজলে লোহানী সম্পাদিত ‘অগত্যা’ পত্রিকায়। সেখানে ‘উদয়াস্ত’ নামে তার একটি গল্প ছাপা হয়।

সব্যসাচী লেখক কবি সৈয়দ শামসুল হকের মৃত্যুর খবরে তাঁর জন্মভূমি কুড়িগ্রামের সর্বত্র শোকাবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। বিশেষ করে তাঁর পরিবারসহ জেলার সাহিত্য-সাংস্কৃতিক অঙ্গনে নেমে এসেছে শোকের ছায়া।

কবির মৃত্যুতে কুড়িগ্রাম শহরের পুরাতন থানা পাড়ায় তাঁর পৈত্রিক বাড়িতে শোকাবহ অবস্থা বিরাজ করছে।

স্থানীয় সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট কবির মৃত্যুতে তাৎক্ষণিকভাবে কুড়িগ্রাম প্রেসক্লাবে সভা আহ্বান করে তাঁর দাফনসহ শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে। এ সময় সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট কুড়িগ্রামে তিনদিনের শোক ঘোষণা করে।

গুণী লেখক সৈয়দ শামসুল হকের ইচ্ছে অনুযায়ী জন্মভূমি কুড়িগ্রামের সরকারি কলেজ মাঠে বুধবার জানাজা শেষে কলেজ চত্বরে দাফন করা হবে।

সমকালীন বাংলা কবিতা ও বহুমাত্রিক সৃষ্টিশীলতার কবি সৈয়দ শামসুল হকের মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করেছে বিএনপি। ফুসফুসের ক্যান্সারে আক্রান্ত সৈয়দ হক আজ রাজধানীর ইউনাইটেড হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। তাঁর মৃত্যুতে গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করেছেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।

দলটির যুগ্ম মহাসচিব খায়রুল কবির খোকনের পাঠানো এক শোকবার্তায় বিএনপি মহাসচিব বলেন, ‘মরহুম সৈয়দ শামসুল হক যদিও কবিতা, নাটক, গল্প, উপন্যাস, চলচ্চিত্রসহ সাহিত্যের সব শাখায় স্বচ্ছন্দ ছিলেন তথাপিও সব ছাপিয়ে কবি পরিচয়টিই প্রধান মনে করতেন তাঁর সাহিত্যাঙ্গনের বন্ধুরা। গত শতকের ষাট, সত্তর ও আশির দশকে অনেক চলচ্চিত্রের চিত্রনাট্যের সঙ্গে চলচ্চিত্রের জন্য গানও লিখেছেন তিনি। তাঁর লেখা গান হায়রে মানুষ রঙিন ফানুস, অনেক সাধের ময়না আমার, তোরা দেখ দেখ দেখরে চাহিয়া, চাঁদের সাথে আমি দেব না তোমার তুলনার মতো বহু গান এখন মানুষের মুখে মুখে ফেরে।’

‘সব্যসাচী লেখক সৈয়দ শামসুল হক স্বাধীনতা সংগ্রাম ও স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে সক্রিয় ছিলেন বলেই দেশবাসী তাঁর মৃত্যুতে শোকে মুহ্যমান। তাঁর মতো একজন বরেণ্য, প্রতিভাবান এবং প্রথিতযশা কবি ও সাহিত্যিকের মৃত্যুতে দেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে যে ক্ষতি হলো তা সহজে পূরণ হওয়ার নয়।’

বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সৈয়দ শামসুল হকের বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনা করেন এবং শোকাহত পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানান।

সব্যসাচী লেখকের কালজয়ী গ্রন্থসমূহ

প্রবন্ধ
হৃৎ কলমের টানে (১ম খণ্ড১৯৯১, ২য় খণ্ড১৯৯৫)

ছোট গল্প
তাস (১৯৫৪)
শীত বিকেল (১৯৫৯)
রক্তগোলাপ (১৯৬৪)
আনন্দের মৃত্যু (১৯৬৭)
প্রাচীন বংশের নিঃস্ব সন্তান (১৯৮২)
সৈয়দ শামসুল হকের প্রেমের গল্প (১৯৯০)
জলেশ্বরীর গল্পগুলো (১৯৯০)
শ্রেষ্ঠ গল্প (১৯৯০)

কবিতা
একদা এক রাজ্যে (১৯৬১)
বিরতিহীন উৎসব (১৯৬৯)
বৈশাখে রচিত পংক্তিমালা (১৯৭০)
প্রতিধ্বনিগণ (১৯৭৩)
অপর পুরুষ (১৯৭৮)
পরাণের গহীন ভিতর (১৯৮০)
নিজস্ব বিষয় (১৯৮২)
রজ্জুপথে চলেছি (১৯৮৮)
বেজান শহরের জন্য কোরাস (১৯৮৯)
এক আশ্চর্য সংগমের স্মৃতি (১৯৮৯)
অগ্নি ও জলের কবিতা (১৯৮৯)
কাননে কাননে তোমারই সন্ধানে (১৯৯০)
আমি জন্মগ্রহণ করিনি (১৯৯০)
তোরাপের ভাই (১৯৯০)
শ্রেষ্ঠ কবিতা (১৯৯০)
রাজনৈতিক কবিতা (১৯৯১)
নাভিমূলে ভস্মাধার
কবিতা সংগ্রহ
প্রেমের কবিতা
ধ্বংস্তূপে কবি ও নগর (২০০৯)

উপন্যাস
এক মহিলার ছবি (১৯৫৯)
অনুপম দিন (১৯৬২)
সীমানা ছাড়িয়ে (১৯৬৪)
নীল দংশন (১৯৮১)
স্মৃতিমেধ (১৯৮৬)
মৃগয়ায় কালক্ষেপ (১৯৮৬)
স্তব্ধতার অনুবাদ (১৯৮৭)
এক যুবকের ছায়াপথ (১৯৮৭)
স্বপ্ন সংক্রান্ত (১৯৮৯)
বৃষ্টি ও বিদ্রোহীগণ (১ম খণ্ড১৯৮৯, ২য় খণ্ড ১৯৯০)
বারো দিনের শিশু (১৯৮৯)
বনবালা কিছু টাকা ধার নিয়েছিল (১৯৮৯)
ত্রাহি (১৯৮৯)
তুমি সেই তরবারী (১৯৮৯)
কয়েকটি মানুষের সোনালী যৌবন (১৯৮৯)

শ্রেষ্ঠ উপন্যাস (১৯৯০)
নির্বাসিতা (১৯৯০)
নিষিদ্ধ লোবান (১৯৯০)
খেলা রাম খেলে যা (১৯৯১)
মেঘ ও মেশিন (১৯৯১)
ইহা মানুষ (১৯৯১)
মহাশূন্যে পরাণ মাষ্টার
দ্বিতীয় দিনের কাহিনী
বালিকার চন্দ্রযান
আয়না বিবির পালা
কালঘর্ম
দূরত্ব
না যেয়ো না
অন্য এক আলিঙ্গন
এক মুঠো জন্মভূমি
বুকঝিম ভালোবাসা
অচেনা
আলোর জন্য
রাজার সুন্দরী

কাব্যনাট্য
পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায় (১৯৭৬)
গণনায়ক (১৯৭৬)
নুরুলদীনের সারা জীবন (১৯৮২)
এখানে এখন (১৯৮৮)
কাব্যনাট্য সমগ্র (১৯৯১)
ঈর্ষা

কথা কাব্য
অন্তর্গত

গল্প
তাস
রক্ত গোলাপ

অনুবাদ
ম্যাকবেথ
টেম্পেস্ট
শ্রাবণ রাজা (১৯৬৯)

শিশুসাহিত্য
সীমান্তের সিংহাসন (১৯৮৮)
আনু বড় হয়
হড়সনের বন্দুক

অন্যান্য
শ্রেষ্ঠ গল্প
শ্রেষ্ঠ উপন্যাস
শ্রেষ্ঠ কবিতা
মুখ (১৯৯১)
পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায় [৩]

চলচিত্র
নিষিদ্ধ লোবান অবলম্বনে গেরিলা ছবিটি তৈরি হয়েছে।

শিরোনাম ডট কম
শিরোনাম ডট কম । অনলাইন নিউজ পোর্টাল Shironaam Dot Com । An Online News Portal
http://www.shironaam.com/

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *