৮৮তম অস্কার: সেরা অভিনেতা ডিক্যাপ্রিও

৮৮তম অস্কার: সেরা অভিনেতা ডিক্যাপ্রিও

৮৮তম অস্কার: সেরা অভিনেতা ডিক্যাপ্রিওপ্রায় ২ দশকের অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে অবশেষে টাইটানিক খ্যাত নায়ক লিওনার্দো ডি ক্যাপ্রিওর হাতে উঠলো অস্কার পুরস্কার।

‘দ্য রেভন্যান্ট’ মুভিতে অনবদ্য অভিনয়ের জন্য ‘চলচিত্র জগতের নোবেল’ খ্যাত অস্কার পুরস্কার জয় করেন ডি ক্যাপ্রিও। এর আগে ৬ বার নমিনেশন পেলেও কোনো বারই পুরস্কার জিততে পারেননি দারুন জনপ্রিয় এই অভিনেতা।

বরাবরের মতোই লস এঞ্জেলসের ডলবি থিয়েটারে বসেছিল বিনোদন জগতে বছরের সবচেয়ে প্রতীক্ষিত আসর। ৮৮তম অস্কারের পর্দা উঠেছে ‘সাদা অস্কার’ হওয়ার বিতর্ককে মাথায় নিয়ে।

সেরা অভিনেতার অস্কার জয়ী ডি ক্যাপ্রিও পুরস্কার গ্রহন করতে গেলে উপস্থিত দর্শকরা তাকে দাঁড়িয়ে সম্মান প্রদর্শন করেন।

লস অ্যাঞ্জলসে আমেরিকা সময় ২৮ ফেব্রুয়ারি বিকেল সাড়ে পাঁচটা থেকেই ডলবি হাউসে এসে জড়ো হন হলিউডসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সিনেমা সম্পর্কিত বিশেষ তারকা অভিনেতা, অভিনেত্রী ও নির্মাতারা। রসবোধে ঠাসা হোস্ট ক্রিস রকের অসাধারণ পরিবেশনায় এবারের অস্কার অ্যাওয়ার্ড অনুষ্ঠান শুরুটা হয় বেশ উচ্ছ্বাস নিয়ে। নানা ধরনের পরিবেশনার পর অ্যাওয়ার্ড অনুষ্ঠানে ফিরেন ক্রিস রক। একে একে মঞ্চ কাঁপিয়ে ঘোষণা করা হয় চূড়ান্ত মনোনয়ন পাওয়া বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে জায়গা পাওয়া অভিনেতা, অভিনেত্রী, নির্মাতা, সিনেমাটোগ্রাফারসহ অসংখ্য কলাকূশলীদের নাম।

অস্কারে সেরা ছবির পুরস্কার পেয়ে সবাইকে চমকে দেন ‘স্পটলাইট’। সেরা নির্মাতা হিসেবে পুরস্কার জিতে নিলেন আলেজান্দ্রো গঞ্জালেস ইনারিতু। সেরা অভিনেত্রী হিসেবে চমক দেখান ব্রে লারসন। যদিও সকলেই ভেবে নিয়েছিল এবারের আসরে অস্কারের সেরা অভিনেত্রী হতে পারেন ‘জয়’ ছবির জন্য জেনিফার লরেন্স। কিন্তু সেই অনুমানকে ভরকে দিয়ে সেরা অভিনেত্রীর পুরস্কার নিলেন ব্রে লারসন। ‘রুম’ ছবিতে অনবদ্ধ অভিনয় করে এ পুরস্কার ভাগিয়ে নেন তিনি।

লিও এর আগে গোল্ডেন গ্লোব এবং বাফটা পেয়েছেন। পেয়েছেন স্ক্রিন অ্যাক্টর্স গিল্ড পুরস্কার। এখনও অবধি ‘রেভেন্যান্ট’-এর পুরস্কার-দৌড় মসৃণ। ফলে অনেকেরই মনে হচ্ছিল, অস্কার ঘোষণাটা স্রেফ সময়ের অপেক্ষা। আবার উল্টো মতটি ছিল, ‘দ্য রেভেন্যান্ট’ ভয়ঙ্কর কষ্টসাধ্য ছবি হতে পারে। কিন্তু এটা লিও-র সেরা ছবি নয়।

মজার কথা হলো, অস্কার কমিটির কাছে ‘পিচ’ করার সময়েও ছবির পিছনে কত পরিশ্রম, কত প্রতিকূলতা, লিও কত ঝুঁকি নিয়েছেন ইত্যাদি সবিস্তার বলা হয়েছে। বিশুদ্ধ অভিনয়ের দিকটা কম। সমালোচকরা বলছেন, ছবিটার প্রতিটি ফ্রেম যেন অস্কার জেতার জন্য মরিয়া। দেখো আমরা কী ভীষণ কষ্ট করছি, এই ঘোষণাটা সেখানে জাঁকালো। এক জন আকাডেমি সদস্য বলেই দিয়েছেন তিনি লিওনার্দোকে ভোট দেননি। তিনি মনে করেন, একটা ছবি খুব কষ্ট করে তৈরি, এটা অস্কার পাওয়ার কারণ হতে পারে না। কিন্তু তার এই ব্যাখ্যা টিকেনি। অস্কার পেলেন লিও।

জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে কথা বললেন ডিক্যাপ্রিও

‘দ্য রেভেন্যান্ট’ ছবির জন্য সেরা অভিনেতার অস্কার পাওয়া ডিক্যাপ্রিও যখন অস্কার মঞ্চে পুরস্কার নিতে উঠলেন, ডলবি থিয়েটারের হলঘরজুড়ে তখন হর্ষধ্বনি। সেটা থামতে কিছুটা সময় লাগল। সে পর্যন্ত হাসিমুখে অপেক্ষা করলেন লিওনার্দো।

এরপর সেই আকাঙ্ক্ষিত মুহূর্ত। সেরা অভিনেতার অস্কার গ্রহণের পর লিওনার্দো জানালেন তাঁর অনুভূতি। ছবির সঙ্গে জড়িত সবাইকে ধন্যবাদ জানালেন। ধন্যবাদ জানালেন বাবা-মাকে, দর্শকদের।

তবে শুধু ধন্যবাদ দিয়েই দায়িত্ব শেষ করেননি। বিশ্বের সবাইকে জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে একত্র হওয়ার আহ্বান জানালেন। বললেন, এখনই সময় প্রতিবাদ জানানোর, পৃথিবীকে বাঁচানোর।

লিওনার্দো ডিক্যাপ্রিওর অস্কার বক্তব্য

সবাইকে অনেক ধন্যবাদ। একাডেমিকে ধন্যবাদ, এই রুমে যাঁরা বসে আছেন, তাঁদের সবাইকে ধন্যবাদ। এ বছর দুর্দান্ত কাজ করে আমার সঙ্গে যাঁরা মনোনয়ন পেয়েছিলেন, তাঁদের সবাইকে অভিনন্দন। ‘দ্য রেভেন্যান্ট’ ছিল অবিশ্বাস্য একদল অভিনেতা ও কলাকুশলীর অক্লান্ত পরিশ্রমে তৈরি পণ্য। সবার আগে আমার ভাই মিস্টার টম হার্ডির চেষ্টার কথা বলব। টম, পর্দায় তোমার অভিনয়কে ছাড়িয়ে যাওয়ার ক্ষমতা বাস্তবে একমাত্র তোমার বন্ধুত্বের রয়েছে। আমার জীবনের সেরা সিনেমা অভিজ্ঞতা তৈরি করার জন্য তোমাকে ধন্যবাদ।

ফক্স এবং নিউ রিজেন্সির সবাইকে ধন্যবাদ, আমার পুরো দলকে ধন্যবাদ। আমার ক্যারিয়ারের শুরু থেকে যাঁরা ছিলেন, সবাইকে আমার ধন্যবাদ দিতে হবে। আমার বাবা-মাকে ধন্যবাদ, তাঁদের ছাড়া এর কিছুই সম্ভব হতো না। এবং আমাদের বন্ধুদের ধন্যবাদ, আমি সবাইকে ভালোবাসি এবং তোরা জানিস, তোরা আমার কী।

এবং সবশেষে আমি শুধু বলতে চাই, ‘দ্য রেভেন্যান্ট’ ছিল বিশ্বের প্রকৃতির সঙ্গে একজন মানুষের সম্পর্ক নিয়ে। ২০১৫ সালে যে বিশ্বকে আমরা সবাই অনুভব করেছি, সেটা ছিল পৃথিবীর ইতিহাসে উষ্ণতম বছর। আমাদের প্রোডাকশন টিমকে দক্ষিণ মেরুতে যেতে হয়েছে বরফ খোঁজার জন্য। জলবায়ু পরিবর্তন বাস্তবতা, এখনই জলবায়ু পরিবর্তিত হচ্ছে।

মানব সম্প্রদায় ও পৃথিবীর জন্য এটাই এখন সবচেয়ে বড় হুমকি এবং এটা থামাতে আমাদের সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে, আর আলসেমি করা ঠিক হবে না। বিশ্বজুড়ে সেসব নেতাকে আমাদের সমর্থন দিতে হবে, যাঁরা বড় বড় দূষণকারীর পক্ষে নন, বরং মানবতার পক্ষে কথা বলছেন।

বিশ্বের আদিবাসী মানুষের জন্য, কোটি কোটি সুবিধাবঞ্চিত মানুষের জন্য আমাদের কথা বলতে হবে, যাঁরা জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। আমাদের সন্তানদের সন্তানের জন্য, তাদের জন্য আমাদের কথা বলতে হবে। আমাদের প্রতিবাদ লোভের রাজনীতির কারণে প্রতিনিয়ত ডুবে যাচ্ছে।

আজকে রাতে এই চমৎকার পুরস্কারের জন্য সবাইকে ধন্যবাদ জানাচ্ছি। আমাদের বিশ্বকে আমরা ছেড়ে দিতে পারি না। আজকের রাতটা আমি চলে যেতে দিতে পারি না। সবাইকে অসংখ্য ধন্যবাদ।

অস্কারে হ্যাটট্রিক করলেন লুবেজকি

‘গ্র্যাভিটি’ ছবির জন্য ২০১৪ সালে, পরের বছর ‘দ্য বার্ডম্যান’-এর জন্য। আর এ বছর ‘দ্য রেভেন্যান্ট’ ছবির জন্য অস্কারে সেরা সিনেমাটোগ্রাফারের পুরস্কার জিতে নিলেন মেক্সিকান সিনেমাটোগ্রাফার ইমানুয়েল লুবেজকি।

অর্থাৎ পরপর তিনবার অস্কার জিতে অস্কারে হ্যাটট্রিক করলেন লুবেজকি। এর আগে অনেকে তিনবার অস্কার জিতেছেন।

তবে পরপর তিনবার, অর্থাৎ হ্যাটট্রিকের দুর্লভ সম্মান শুধু লুবেজকিরই রয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

ভিত্তোরিও স্টোরারো, আর্থার মিলার ও উইনটন হচ তিনবার অস্কার জিতেছিলেন।

চারবার অস্কার পাওয়ার তালিকায় রয়েছেন জোসেফ রটেনবার্গ ও লিওন শামোরি। এর মধ্যে শামোরি ১৯৪৫ ও ১৯৪৬ সালে পরপর দুবার অস্কার জিতেছিলেন।

পরপর দুবার অস্কার জেতার তালিকায় আরো রয়েছেন ডব্লিউ হাওয়ার্ড গ্রিন (১৯৩৭, ১৯৩৮), জন টল (১৯৯৫, ১৯৯৬)।

সেরা সিনেমাটোগ্রাফার হিসেবে হ্যাটট্রিক অস্কার পাওয়া লুবেজকি মোট আটবার অস্কার মনোনয়ন পেয়েছেন। ১৯৯৬ সালে ‘আ লিটল প্রিন্সেস’ ছবির জন্য প্রথমবার, এরপর ‘স্লিপিং হলো’ (১৯৯৯), ‘দ্য নিউ ওয়ার্ল্ড’ (২০০৬), ‘চিলড্রেন অব মেন’ (২০০৭), ‘ট্রি অব লাইফ’ (২০১২), ‘গ্র্যাভিটি’ (২০১৪), ‘বার্ডম্যান’ (২০১৫), ‘দ্য রেভেন্যান্ট’ (২০১৬) ছবির জন্য অস্কার মনোনয়ন পান।

একনজরে ৮৮তম অস্কার

সেরা সিনেমা : স্পটলাইট

সেরা অভিনেত্রী : ব্রি লারসন (রুম)

সেরা অভিনেতা : লিওনার্দো ডিক্যাপ্রিও (দ্য রেভেন্যান্ট)

সেরা পার্শ্ব-অভিনেত্রী : অ্যালিসিয়া ভিক্যান্ডার (দ্য ড্যানিশ গার্ল)

সেরা পার্শ্ব-অভিনেতা : মার্ক রাইল্যান্স (ব্রিজ অব স্পাইস)

সেরা চলচ্চিত্র পরিচালক : আলেহান্দ্রো গঞ্জালেস ইনারিতু (দ্য রেভেন্যান্ট)

সেরা চিত্রনাট্য (মৌলিক) : স্পটলাইট

সেরা চিত্রনাট্য (অ্যাডাপ্টেড) : দ্য বিগ শর্ট

সেরা বিদেশি ভাষার চলচ্চিত্র : সান অব সাউল (হাঙ্গেরি)

সেরা অ্যানিমেটেড সিনেমা : ইনসাইড আউট

সেরা স্বল্পদৈর্ঘ্য অ্যানিমেটেড সিনেমা : বিয়ার স্টোরি

সেরা প্রামাণ্যচিত্র : অ্যামি

সেরা স্বল্পদৈর্ঘ্য প্রামাণ্যচিত্র : অ্যা গার্ল ইন দ্য রিভার : দ্য প্রাইস অব ফরগিভনেস

সেরা চিত্রগ্রহণ : ইমানুয়েল লুবেজকি, দ্য রেভেন্যান্ট

সেরা মৌলিক সুর : দ্য হেটফুল এইট

সেরা মৌলিক গান : রাইটিং’স অন দ্য ওয়াল (স্পেকটার)

সেরা সম্পাদনা : ম্যাড ম্যাক্স : ফিউরি রোড

সেরা শিল্প নির্দেশনা : ম্যাড ম্যাক্স : ফিউরি রোড

সেরা স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র : অ্যাভ মারিয়া

সেরা শব্দ সম্পাদনা : ম্যাড ম্যাক্স : ফিউরি রোড

সেরা শব্দমিশ্রণ : ম্যাড ম্যাক্স : ফিউরি রোড

সেরা ভিজ্যুয়াল ইফেক্টস : এক্স মেশিনা

সেরা পোশাক পরিকল্পনা : ম্যাড ম্যাক্স : ফিউরি রোড

সেরা রূপ ও চুল সজ্জা : ম্যাড ম্যাক্স : ফিউরি রোড

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *