পুঁজিবাজারে চার মাসে সূচকের পতন ৯০৪ পয়েন্ট

পুঁজিবাজার বিপর্যয় রোধে ২০১১ সালে বিএসইসি পুনর্গঠন করাসহ বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হলেও পুঁজিবাজারে স্বাভাবিক অবস্থা ফিরে আসেনি।

পুঁজিবাজার বিপর্যয় রোধে ২০১১ সালে বিএসইসি পুনর্গঠন করাসহ বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হলেও পুঁজিবাজারে স্বাভাবিক অবস্থা ফিরে আসেনি। গত ১ জানুয়ারি ডিএসইর প্রধান সূচক ডিএসই ব্রড ইনডেক্স ছিল ৪ হাজার ৯৪১ পয়েন্ট। টানা দরপতনের কারণে ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত সময় ডিএসইর ব্রড ইনডেক্স ৯০৪ পয়েন্ট কমে ৪ হাজার ৪৭ পয়েন্টে নেমে আসে।

টানা দরপতনের পাশাপাশি ডিএসইতে লেনদেনও তলানিতে নেমেছে। চলতি বছরের ৮২ কার্যদিবসের মধ্যে তিন দিন লেনদেন ৫০০ কোটি এবং সাত দিন লেনদেন ৪০০ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। বাকি ৭২ দিনের মধ্যে তিন দিন লেনদেন হয়েছে ২০০ কোটি টাকার কম।

বাকি দিনগুলো ২০০ থেকে ৪০০ কোটি টাকার মধ্যে লেনদেন হয়েছে। এই সময় ডিএসইতে মোট লেনদেন ছিল প্রায় ২৫ হাজার ১৬৯ কোটি টাকা। গড়ে লেনদেনের পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ৩০৬ কোটি টাকা।

২০১০ সালে পুঁজিবাজারের ভয়াবহ বিপর্যয়ের সাড়ে চার বছর পরও পরিস্থিতির তেমন কোনো উন্নতি হয়নি। বরং পরিস্থিতি স্বাভাবিক হচ্ছে এই আশ্বাসে নতুন করে কয়েক দফায় বিনিয়োগ করে প্রতারিত হয়েছেন লাখ লাখ বিনিয়োগকারী। এই দীর্ঘ সময়ও পরিস্থিতির কোনো উন্নতি না হওয়ায় হতাশ হয়ে পুঁজিবাজার ছেড়েছেন অনেক বিনিয়োগকারী।

পুঁজিবাজার বিপর্যয় রোধে ২০১১ সালে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) পুনর্গঠন করাসহ বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হলেও পুঁজিবাজারে স্বাভাবিক অবস্থা ফিরে আসেনি। ওই বছরের ১৫ মে বর্তমান কমিশনের চেয়ারম্যান অধ্যাপক খায়রুল হোসেন দায়িত্ব নেন।

দায়িত্ব নিয়ে তিনি প্রথম দিনই মিডিয়াকে বলেন, পরবর্তী ছয় মাসের মধ্যে বাজার পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হলে পদত্যাগ করব। কিন্তু গত চার বছরেও পরিস্থিতির কোনো উন্নতি হয়নি। তারপরও তিনি স্বপদে দায়িত্ব পালন করছেন। একই সঙ্গে বর্তমান কমিশন আগের কমিশনের মতোই উচ্চ হারে প্রিমিয়াম দিয়ে দুর্বল মৌলভিত্তিসম্পন্ন কোম্পানির আইপিওর অনুমোদন, লোকসানি কোম্পানির রাইট শেয়ার অনুমোদন দিচ্ছে।

এতে করে প্রভাবশালীরা নানা ফন্দি-ফিকিরের মাধ্যমে পুঁজিবাজার থেকে শত শত কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। বিনিয়োগকারীদের অভিযোগ, বর্তমান কমিশন আগের মতোই বিনিয়োগকারীদের চেয়ে প্রভাবশালীদের স্বার্থরক্ষায় তত্পর রয়েছে।

জানা গেছে, আগের চার বছরের ন্যায় নতুন বছরেও বিপর্যয়ের কবল থেকে বের হতে পারেনি পুঁজিবাজার। অব্যাহত দরপতনে আগের মতোই নতুন বছরেও পুঁজি হারাচ্ছেন লাখ লাখ বিনিয়োগকারী। চলতি বছরে ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত চার মাসে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) প্রধান মূল্যসূচক ডিএসই ব্রড ইনডেক্স হারিয়েছে ৯০৪ পয়েন্ট।

একই সময় অধিকাংশ কোম্পানির শেয়ারের দাম কমায় ডিএসই বাজার মূলধন হারিয়েছে ৩০ হাজার কোটি টাকা। একই অবস্থা অপর পুঁজিবাজার চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জেও (সিএসই)।

এদিকে টানা দরপতনের ধাক্কা সামলাতে না পেরে অনেক বিনিয়োগকারী লোকসানে শেয়ার বিক্রি করে দিয়ে পুঁজিবাজার ছেড়েছেন। পরবর্তীতে এসব বিনিয়োগকারী নিরাপদ মনে করে সঞ্চয়পত্র কিনছেন। ফলে গত বছর ৯ হাজার কোটি টাকা সঞ্চয়পত্র বিক্রির লক্ষ্যমাত্রা থাকলেও তা ১৫ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যায়।

এদিকে প্রতিদিনই শেয়ারের দাম কমার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে কমছে আর্থিক ও শেয়ার লেনদেন। চলতি বছরের গতকাল পর্যন্ত লেনদেন হওয়া ৮২ কার্যদিবসের মধ্যে ৪৯ দিনই শেয়ারের দাম কমেছে। এ সময় ডিএসইতে গড় আর্থিক লেনদেন পরিমাণও ৩০০ কোটি টাকায় নেমে আসে। লেনদেনের এই নিম্নমুখী অবস্থার কারণে সক্ষমতা হারাচ্ছে দুই স্টক এক্সচেঞ্জের স্টেকহোল্ডাররা। এতে করে এই খাতে কর্মরত প্রায় হাজার হাজার কর্মকর্তা-কর্মচারীর চাকরিও হুমকির মুখে পড়েছে।

ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের ব্রোকারেজ হাউসগুলোর সক্ষমতা ধরে রাখতে দৈনিক ৪০০ থেকে ৫০০ কোটি টাকা গড় লেনদেন প্রয়োজন হলেও বর্তমানে তা হচ্ছে না। বাজার বিশ্লেষকদের মতে, রাজনৈতিক অস্থিরতার নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে পুঁজিবাজারে।

রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা না এলে পুঁজিবাজার বর্তমান অবস্থা থেকে উত্তরণের কোনো সম্ভাবনা নেই। এই অবস্থা চলতে থাকলে স্টক এক্সচেঞ্জসহ ব্রোকারেজ হাউসগুলোর লোকসান দিয়ে বেশিদিন ব্যবসা পরিচালনা করা সম্ভব হবে না। ফলে এই খাতে বিপর্যয় নেমে আসবে।

এ বিষয়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক অর্থ উপদেষ্টা ও পুঁজিবাজার বিশ্লেষক ড. এবি মীর্জ্জা মো. আজিজুল ইসলাম বলেন, রাজনৈতিক অস্থিরতা বর্তমানে কিছুটা কমলেও সার্বিক অর্থনীতি এখনও অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছে। আর এই অবস্থায় শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ করা ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় অনেকে এই খাত থেকে বিনিয়োগ তুলে নিয়ে সঞ্চয়পত্র কিনছেন। ফলে পুঁজিবাজারে ঝুঁকি নিয়ে বিনিয়োগ করতে এই মুহূর্তে অনেকেই আগ্রহী নন।

মীর্জ্জা আজিজুল ইসলাম আরও বলেন, হরতাল-অবরোধের কারণে অধিকাংশ কোম্পানির উত্পাদন বিপণন যথাসময়ে করতে পারছে না। এতে করে কোম্পানিগুলো ভালো লভ্যাংশ দিতে পারবে না। আর এই কারণে কেউ নতুন করে শেয়ার কিনতে চাইবে না। আবার যাদের হাতে শেয়ার রয়েছে তারাও তা বিক্রি করে দিয়ে যতটুকু মূলধন পাচ্ছেন তা তুলে নিচ্ছেন।

অন্যদিকে বিএসইসির আইপিওর অনুমোদন দেওয়ার ক্ষেত্রে অনেক প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। আমার মনে হয়, এ ক্ষেত্রে তাদের কিছু দুর্বলতা রয়েছে—এটা কাটিয়ে ওঠা উচিত।

অন্যদিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষক ও পুঁজিবাজার বিশ্লেষক অধ্যাপক আবু আহমেদ বলেন, রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে দেশের অর্থনীতি বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। এই অবস্থায় পুঁজিবাজারে স্থিতিশীলতা আশা করা যায় না। রাজনৈতিক সঙ্কট কাটলে, দেশের অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব পড়লে পুঁজিবাজারও ঘুরে দাঁড়াবে।

এদিকে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের সাবেক সভাপতি মো. রকিবুর রহমান বলেন, শুধু রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে পুঁজিবাজারে দরপতন হচ্ছে—এটা আমার মনে হয় না। তবে অনেকগুলো কারণের মধ্যে এটি একটি কারণ হতে পারে।

তিনি বলেন, বাজারের এই অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য যাদের সক্রিয় অংশগ্রহণ করার কথা তারা তা করছে না। বরং প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ, আইসিবি, বিভিন্ন মার্চেন্ট ব্যাংক ও ব্রোকারেজ হাউস এই মুহূর্তে বাজারে কোনো বিনিয়োগ করছে না। ফলে বাজার আরও নেতিবাচক দিকে যাচ্ছে। সরকার, অর্থ মন্ত্রণালয় ও বিএসইসির উচিত বাজারের দরপতনের মুহূর্তে যাদের রুল প্লে করার কথা তারা কেন করছে না, তা বের করা।

অন্যদিকে বাংলাদেশ পুঁজিবাজার বিনিয়োগকারী সমন্বয় পরিষদের সাধারণ সম্পাদক আ ন ম আতাউল্লাহ নাঈম বলেন, পুঁজিবাজারের এই বিপর্যয়ের সময় বাজারকে সাপোর্ট না দিয়ে আইসিবি কম দামে শেয়ার কিনে ব্যবসা করছে। অথচ এটা তাদের প্রধান কাজ নয়। তিনি আরও বলেন, রাজনৈতিক অস্থিরতার সুযোগে বড় বড় বিনিয়োগকারী কম দামে বাজার থেকে শেয়ার হাতিয়ে নিচ্ছে।

তাই আমাদের দাবি দেশের অর্থনীতি, পুঁজিবাজার ও বিনিয়োগকারীদের স্বার্থে সরকার ও বিরোধী দলকে রাজনৈতিক সমঝোতায় এসে দেশের অর্থনীতিকে বাঁচাতে হবে। অন্যদিকে এ ব্যাপারে বিএসইসি চেয়ারম্যান অধ্যাপক খায়রুল হোসেনের সঙ্গে মোবাইলে যোগাযোগ করা হলে তার কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *