ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তায় সন্তানদের হত্যা?
জাতীয়

ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তায় সন্তানদের হত্যা?

ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তায় সন্তানদের হত্যা? যেই মায়ের বিরুদ্ধে শিশু সন্তানদের হত্যার অভিযোগ, তার নাম মাহফুজা মালেক জেসমিন। তিনি ব্যবস্থাপনা বিভাগ থেকে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করলেও ছিলেন সাধারণ গৃহিণী।

মায়ের এই স্বীকারোক্তি প্রথমে বিশ্বাস করতে চাননি র‌্যাবের জিজ্ঞাসাবাদকারী কর্মকর্তারাও। বিস্মিত হন সবাই। এ কি করে সম্ভব! নেপথ্য কারণ অন্য কিছু থাকতে পারে বলে ধারণা ছিল সবার। একারণে রাতভর চলে জোর প্রচেষ্টা। নানা কায়দায়, নানা কৌশলে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয় তাকে। কিন্তু মায়ের একই স্বীকারোক্তি। ছেলেমেয়েদের ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তায় ছিলেন, এটাই একমাত্র কারণ। পরে অবশ্য আফসোস করেছেন। বলেছেন, দুশ্চিন্তা উপশমের জন্য যদি মানসিক চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতেন তবে এই পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হতো না। দুই সন্তানকে হত্যার স্বীকারোক্তি মা দিয়েছে ঠিকই, কিন্তু রহস্য রয়েই গেল, সঙ্গে অনেক প্রশ্নও। ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তায় কি মা তার সন্তানদের মেরে ফেলতে পারেন?

সন্তানদের ঘাতক মাহফুজা নাটক সাজিয়ে বলেন, ‘গত ২৮ ফেব্রুয়ারি তাদের বিবাহবার্ষিকী ছিল। বাবা-মার ১৪তম বিবাহবার্ষিকী উদযাপন উপলক্ষে তারা বনশ্রীর ক্যান্ট চায়নিজ রেস্টুরেন্টে রাতের খাবার খান। খাওয়ার পর অবশিষ্ট অংশ সঙ্গে করে বাসায় নিয়ে আসেন। পরদিন ওই খাবার খেয়ে ভাই-বোন অসুস্থ হয়ে পড়ে এবং ‘বিষক্রিয়ায়’ মারা গেছে।’

র‌্যাব কর্মকর্তারা জানান, ঘটনার পর পারিপার্শ্বিক অবস্থা বিবেচনা করে তাদের মনে হয়েছে এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে পরিবারের লোকজন জড়িত থাকতে পারে। একারণে ঘটনার পরপরই র‌্যাব বাসার দারোয়ান, দুই গৃহ শিক্ষক ও দুই আত্মীয়কে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করে। বনশ্রীর বাসায় অবস্থানকারী অরণী ও আলভীর দাদি র‌্যাব কর্মকর্তাদের জানিয়েছেন, তিনি বিকালে অরণীর গৃহ শিক্ষক চলে যাওয়ার পর ঘর থেকে কারও কান্নার শব্দ পান। এ সময় তিনি জেসমিনের ঘরের দরজা বন্ধ পান। কয়েক মিনিট পরে জেসমিন তাকে দুই সন্তান আর পৃথিবীতে নেই বলে জানায়।

রাজধানীর রামপুরার বনশ্রীতে দুই ছেলে-মেয়ে অরণি (১৪) ও আলভিকে (৬) হত্যার পর তাদের মা মাহফুজা মালেক জেসমিন অনুতপ্ত হন। সেই অনুশোচনা থেকেই দুই ছেলে-মেয়ের লাশের পাশে বসে কিছুক্ষণ কাঁদেন। এরপর শুরু করেন নিজেকে বাঁচানোর পরিকল্পনা। সেই পরিকল্পনা অনুযায়ী তার স্বামী আমান উল্লাহ আমানকে ফোন করে বলেন, অরণি ও আলভি কেমন যেন করছে। তাদের দ্রুত হাসপাতালে নিতে হবে।

পরে আমান উল্লাহর বাসায় আসতে দেরি হবে জেনে বোন মিলাকে ফোন করে বিষয়টি জানান। কয়েকজনের সহায়তায় নিহত দুই ছেলে-মেয়ের নিথর দেহ নিয়ে যান স্থানীয় আল-রাজি হাসপাতালে। সেখান থেকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে নেয়া হয়। এরপর চিকিৎসক ময়না তদন্তের জন্য অরণি ও আলভির মরদেহ ঢামেক মর্গে পাঠায়।

বৃহস্পতিবার দুপুর সোয়া ১টায় আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে মুফতি মাহমুদ বলেন, ‘মা মাহফুজা মালেক ম্যানজেমেন্টে মাস্টার্স করেছেন। এছাড়া তিনি দুই বছর জামালপুরের দেওয়ানগঞ্জ স্কুল অ্যান্ড কলেজে শিক্ষকতাও করেন। তিনি উচ্চশিক্ষিত হওয়ায় ছেলে-মেয়ের পড়াশোনা নিয়ে দুশ্চিন্তাগ্রস্ত ছিলেন। এরই প্রেক্ষাপটে গত ২৯ তারিখ বিকেল সাড়ে ৫টায় তাদের গৃহশিক্ষক চলে যাওয়ার পর নিজের বেডরুমে দুই সন্তানকে শ্বাসরোধে হত্যা করেন মাহফুজা।’

মুফতি মাহমুদ জানান, মায়ের বেডরুমে ছেলে আলভি আগে থেকেই ঘুমানো ছিল। পরে মা মেয়ে অরণিকে ডেকে নেন তার কক্ষে। এরপর ওড়না প্যাঁচিয়ে হত্যার চেষ্টা চালান। এসময় দু’জনের মধ্যে ধস্তাধস্তিও হয়। পরে মেয়েকে শ্বাসরোধ করে মারতে সমর্থ হন মা। এরপর ছেলে আলিকে ঘুমন্ত অবস্থায় শ্বাসরোধ করে মারা হয়।

তিনি আরো জানান, এ বিষয়ে এখন মামলার প্রস্তুতি চলছে। এরপর তদন্ত সাপেক্ষে আরো বিস্তারিত তথ্য জানা যাবে।

গত সোমবার রাজধানীর রামপুরা এলাকার বনশ্রীর বি ব্লকের ৪ নম্বর সড়কের ৯ নম্বর বাড়ির পঞ্চম তলার একটি বাসা থেকে দুই ভাইবোনকে অচেতন অবস্থায় উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেলে নেয়া হয়। রাত ৮টার দিকে হাসপাতালে নেয়ার পরপরই কর্তব্যরত চিকিৎসক তাদের মৃত ঘোষণা করেন। নিহত দুই শিশুর মধ্যে ১৪ বছর বয়সী নুসরাত আমান অরণী ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের ইস্কাটন শাখার সপ্তম শ্রেণির ছাত্রী ছিল। আর তার ছোটভাই আলভী আমান (৬) পড়তো হলি ক্রিসেন্ট স্কুলের নার্সারিতে। তাদের বাবা আমানুল্লাহ একজন গার্মেন্ট ব্যবসায়ী।

সন্তান হত্যায় স্ত্রীর বিরুদ্ধে স্বামীর মামলা

রাজধানীর বনশ্রীতে দুই শিশু হত্যার ঘটনায় রামপুরা থানায় একটি মামলা দায়ের করা হয়েছে। শিশুদের বাবা আমান উল্লাহ বাদী হয়ে বৃহস্পতিবার রাত ১০টার দিকে এই মামলাটি করেন।

রামপুরা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রফিকুল ইসলাম জানান, বৃহস্পতিবার রাতে দুই শিশুর বাবা তার স্ত্রীকে আসামী করে একটি হত্যা মামলা (মামলা নং ১) দায়ের করেছেন।

রেস্টুরেন্টের খাবার খেয়ে তারা মারা যায় বলে প্রথমে পরিবারের পক্ষ থেকে বলা হয়। তবে ময়নাতদন্ত শেষে মঙ্গলবার ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগের প্রভাষক ডা. প্রদীপ বিশ্বাস জানান, শিশু দুটিকে শ্বাসরোধে হত্যার আলামত মিলেছে। তাদের শরীরে আঘাতের চিহ্ন রয়েছে।

দুই সন্তানকে হত্যায় সক্ষম কি না তা নিয়ে সংশয়

রাজধানীর বনশ্রীর শিশু দুটিকে শ্বাসরোধ করেই হত্যা করা হয়েছে। তবে মা মাহফুজা জেসমিন একাই দুই সন্তানকে হত্যা করতে সক্ষম কি না তা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের ফরেনসিক বিভাগ।

ফরেনসিক রিপোর্টে হত্যার আলামত পাওয়া গেছে জানিয়ে ওই বিভাগের সহকারী অধ্যাপক সোহেল মাহমুদ বলেন, ‘আলামতে নাকে-মুখে ও গলায় চাপ দিয়ে শ্বাসরোধে হত্যার আলামত পাওয়া গেছে। এছাড়া আমরা যে ধরনের আলামত পেয়েছি তার ভিত্তিতে বলা যায়, একজনের পক্ষে এ হত্যাকাণ্ড সংঘটিত করা দুষ্কর। বিশেষ করে, চৌদ্দ বছরের একটি মেয়েকে চেতনানাশক না খাইয়ে অথবা ঘুমন্ত অবস্থায় না থাকলে এক জনের পক্ষে শ্বাসরোধে হত্যা করাটা কঠিন।’

তিনি আরো বলেন, ‘তবে দুই শিশুর ভিসেরা পরীক্ষার জন্য মহাখালীতে পাঠানো হয়েছে। প্রতিবেদন হাতে আসার পর এ বিষয়ে বিস্তারিত জানা যাবে।’

শিরোনাম ডট কম
শিরোনাম ডট কম । অনলাইন নিউজ পোর্টাল Shironaam Dot Com । An Online News Portal
http://www.shironaam.com/

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *