শরণার্থী সঙ্কটে মধ্যপ্রাচ্যের ধনী দেশগুলো নিশ্চুপ

উপসাগরীয় অঞ্চলের সুপার-ধনী হিসেবে খ্যাত সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, কুয়েত ও বাহরাইন এ সঙ্কটে নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করছে।

উপসাগরীয় অঞ্চলের সুপার-ধনী হিসেবে খ্যাত সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, কুয়েত ও বাহরাইন এ সঙ্কটে নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করছে।মধ্যপ্রাচ্যের শরণার্থীদের আশ্রয় না দেয়ার জন্য ইউরোপের দেশগুলোর কঠোর সমালোচনা করা হচ্ছে। কিন্তু উপসাগরীয় অঞ্চলের সুপার-ধনী হিসেবে খ্যাত সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, কুয়েত ও বাহরাইন এ সঙ্কটে নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করছে।

এ পাঁচটি ধনী দেশ এ ব্যাপারে এক রকম চোখ বুঁজে আছে। তবে, একমাত্র ব্যতিক্রম তুরস্ক। দেশটি ইতোমধ্যে প্রায় ২০ লাখ শরণার্থীকে আশ্রয় দিয়েছে এবং তাদের পেছনে ৬০০ কোটি ডলার খরচ করেছে।

এ অভিবাসী সংকট নিয়ে ইউরোপের রাজনীতিবিদদের মধ্যে চলছে বিতর্ক। কোন দেশ কতজন শরণার্থীকে আশ্রয় দিবে মূলত সেটা নিয়ে এ বির্তক। কিন্তু উপসাগরীয় অঞ্চলের সুপার-ধনী রাষ্ট্রগুলো সিরিয়ার একটি উদ্বাস্তুকেও তাদের দেশে আশ্রয় দিতে অস্বীকার করেছে।

গৃহযুদ্ধ ও জঙ্গিগোষ্ঠি আইএসের হুমকি থেকে বাঁচতে ৪০ লাখের বেশি সিরীয় নাগরিক দেশটি ছেড়ে পালিয়ে অন্যত্র যেতে বাধ্য হয়েছেন।

এসব অভিবাসীদের একটি বড় অংশ বসবাস করছে তুরস্ক, লেবানন, জর্ডান, মিসর ও ইরাকের জনাকীর্ণ উদ্বাস্তু শিবিরে। বাকিরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ইউরোপের দীর্ঘ পথে যাত্রা করছেন।

অবশিষ্ট সবকিছু ফেলে এসব উদ্বাস্তু মধ্যপ্রাচ্য থেকে হাজার হাজার মাইল ভ্রমণ করে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে মধ্য ইউরোপে, বিশেষকরে জার্মানি ও অস্ট্রিয়ার মতো দেশগুলিতে প্রবেশ করার চেষ্টা করছে। অন্যরা নৌকা, ট্রেন ও ট্রাকের উপর ছিঁচকে চোরের মতো যুক্তরাজ্যে ঢুকার চেষ্টা করছে।

চলতি বছর প্রায় ৩,০০০ শরণার্থী সমুদ্রপথে ইউরোপে পৌঁছানোর চেষ্টাকালে মারা গেছে। কিন্তু তার পরেও প্রায় প্রতি রাতেই ছোট ছোট শিশুদের নিয়ে এসব শরণার্থীরা জীবন আশঙ্কার ঝুঁকি নিয়েই ইউরোপ পৌঁছানোর কয়েক শতাধিক প্রচেষ্টা চালিয়েছেন।

এমনই এক প্রচেষ্টায় মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে তিন বছর বয়সী আইলান কুর্দির। তুরস্কের বোড্রম থেকে গ্রিকের কস দ্বীপ পৌঁছানোর চেষ্টাকালে নৌকা ডুবে মর্মান্তিক মৃত্যু হয় তার।

সিরিয়ার প্রতিবেশী উপসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলিতে এসব শরণার্থীদের কাউকে প্রবেশ করার অনুমতি দেওয়া হয়নি। যদিও উপসাগরীয় অঞ্চলের এ দেশগুলির জিডিপি বিশ্বের শীর্ষ ৫০টি দেশের তালিকায় রয়েছে।

আরব বিশেষজ্ঞ সুলতান সৌদ আল- কাসেমি জানান, এদেশগুলোর সম্মিলিত সামরিক বাজেট ৬৫ বিলিয়ন পাইন্ডেরও বেশি।

তিনি বলেন, ‘উপসাগরীয় দেশগুলোকে অবশ্যই এটি উপলব্ধি করতে হবে যে, সিরিয়ার উদ্বাস্তু গ্রহণ বিষয়ে এখন তাদের নীতির পরিবর্তন করার সময় এসেছে। এটাকে নৈতিক, মানবিক এবং দায়িত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে তাদের গ্রহণ করতে হবে।’

অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের উদ্বাস্তু ও অভিবাসী বিষয়ক প্রধান শেরিফ ইলসায়েদ আলী এ দেশগুলোর নিষ্ক্রিয়তাকে চরম ‘লজ্জাজনক’ হিসেবে অভিহিত করেছেন।

তিনি বলেন, ‘এই সঙ্কটের দায়িত্ব ভাগ করে নিতে এবং শরণার্থীদের প্রতি প্রকৃত সমবেদনা প্রকাশে উপসাগরীয় দেশগুলোর রেকর্ড অত্যন্ত ভয়াবহ ও হতাশাজনক। এটি অত্যন্ত নিন্দনীয়।’

উপসাগরীয় অঞ্চলের কোনো দেশই ১৯৫১ সালের রিফিউজি কনভেনশনে স্বাক্ষর করেনি। ওই কনভেনশনে কোনো ব্যক্তি জাতি, ধর্ম, জাতীয়তার কারণে নির্যাতিত হওয়ার ভয়ে অন্য দেশে পালিয়ে গেলে তাকে শরণার্থী সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে।

বিবিসির এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ধনী উপসাগরীয় দেশগুলিতে ওয়ার্ক পারমিট ও ‘ব্যয়বহুল’ পর্যটক ভিসার জন্য সিরীয়রা এখনো আবেদন করতে পারেন কিন্তু তা খুব কমই মঞ্জুর করা হয়।

কোয়ার্টজ নিউজ ওয়েবসাইটের ব্যবস্থাপনা সম্পাদক ববি ঘোষ জানান, উপসাগরীয় অঞ্চলের এ দেশগুলোর ক্ষমতা রয়েছে উদ্বাস্তুদের জন্য দ্রুত গৃহ নির্মাণ করার।

যদিও এ দেশগুলো গৃহহীন উদ্বাস্তুদের সাহায্য করার একটি বড় অঙ্কের অর্থ সহায়তা করেছেন। রিলিফওয়েভের তথ্য অনুযায়ী, জর্ডানে শরণার্থী শিবিরের যাবতীয় ব্যয়ভার বহন করেছে সংযুক্ত আরব আমিরাত। এ শিবিরগুলোতে হাজার হাজার সিরিয় আশ্রয় নিয়েছে।

ইতোমধ্যে লেবানন, তুরস্ক ও জর্ডানে আশ্রয় নেয়া সিরিয় শরণার্থীদের জন্য তহবিল, খাদ্য, আশ্রয় ও পোশাক দান করেছেন সৌদি আরব এবং কাতার।

সহায়তা প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে উপসাগরীয় দেশগুলো মোট ৫৮.৯ কোটি পাউন্ড মূল্যের সহায়তা করেছেন। কিন্তু এটি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে তুলনায় চার গুণ কম।

সিরিয়ার সহিংসতার প্রভাব মোকাবেলায় যুক্তরাজ্য ইতোমধ্যে ৯১.৮ কোটি পাউন্ড সহায়তা দিয়েছে। এছাড়াও, উদ্বাস্তুদের সহায়তার জন্য প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরন ব্রিটেনের সাহায্যের পরিমান আরো ১ বিলিয়ন পাউন্ড বাড়ানোর ঘোষণা দিয়েছেন।

এতে ব্রিটেনের অবদান সম্মিলিতভাবে সংযুক্ত আরব আমিরাতের দেয়া ৩৫.৯ কোটি পাউন্ড, কাতারের ১৫.৭ কোটি পাউন্ড এবং সৌদি আরবের চেয়ে ৩৮.৭ কোটি পাউন্ডেরও বেশি।

ববি ঘোষ লিখেছেন, যেসব জায়ান্ট নির্মাণ কোম্পানি দুবাই, আবুধাবি ও রিয়াদের ঝাঁকজমকপূর্ন বিশাল বিশাল টাওয়ার নির্মাণ করেছেন, উপসাগরীয় দেশগুলোর উচিত শরণার্থীদের জন্য আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণের জন্য সেসব কোম্পানির সাথে চুক্তি করে দ্রুত গৃহ নির্মাণ করা।

জাতিসংঘের মতে, সিরীয় উদ্বাস্তুদের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ মধ্যপ্রাচ্যের দেশসমূহে আশ্রয় নিয়েছে। এদের মধ্যে ১৯ লাখ উদ্বাস্তু তুর্কি শরণার্থী শিবিরে বাস করছেন। এছাড়া লেবাননে ১১ লাখ, জর্দানে ৬,২৯,০০০ জন, উত্তর ইরাক ও মিশরে ২,৪৯,০০০ জন উদ্বাস্তু আশ্রয় নিয়েছে।

চলতি বছর ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইউরোপে পৌঁছানোর চেষ্টাকালে ২৪০০ উদ্বাস্তু পানিতে ডুবে মারা গেছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *