প্রথম প্রান্তিকেই রাজস্ব ঘাটতি ৬০০০ কোটি টাকা

অর্থবছরের শুরুতেই রাজস্ব ঘাটতি ৬,০০০ কোটি টাকা

অর্থবছরের শুরুতেই রাজস্ব ঘাটতি ৬,০০০ কোটি টাকাজাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) চলতি অর্থবছরের শুরুতেই হোঁচট খেল উচ্চ লক্ষ্যমাত্রার রাজস্ব আহরণের ক্ষেত্রে। অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে (জুলাই-সেপ্টেম্বর) এনবিআরের রাজস্ব ঘাটতি দাঁড়িয়েছে প্রায় ৬,০০০ কোটি টাকা।

এ ঘাটতি পূরণে রাজস্ব ফাঁকি বন্ধের ওপর জোর দিচ্ছে সংস্থাটি। সে লক্ষ্য নিয়েই জোরেশোরে মাঠে নামার পরিকল্পনা করছে তারা।

চলতি (২০১৫-১৬) অর্থবছরের বাজেট বাস্তবায়নে বড় অঙ্কের রাজস্ব আহরণের লক্ষ্য নির্ধারণ করে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। তবে অর্থবছরের সূচনা প্রান্তিকের পূর্বাভাস বলছে, লক্ষ্যে পৌঁছার বিষয়টি দুরূহ হতে পারে।

চলতি অর্থবছরের জন্য ২ লাখ ৯৫,১০০ কোটি টাকার বাজেট ঘোষণা করেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। এ ব্যয় নির্বাহে অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে সংস্থানের লক্ষ্য প্রায় ২ লাখ ৮,০০০ কোটি টাকা।

এর মধ্যে শুধু এনবিআরের রাজস্ব আহরণের লক্ষ্য ১ লাখ ৭৬,৩৭০ কোটি টাকা; গত অর্থবছরের সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় যা প্রায় ৩০ শতাংশ বেশি। এর মধ্যে আয়কর থেকে আসার কথা ৬৫,৯৩২ কোটি, ভ্যাট থেকে ৬৩,৯০২ কোটি ও শুল্ক থেকে ৪৬,৫৩৬ কোটি টাকা।

অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে এনবিআরের রাজস্ব আহরণের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, এ সময়ে সংস্থাটি আহরণ করেছে ৩০,৯১০ কোটি টাকা। জুলাই-সেপ্টেম্বর প্রান্তিকে রাজস্ব আহরণের লক্ষ্য ছিল ৩৬,৭০৮ কোটি টাকা। এ হিসাবে প্রথম প্রান্তিকে ঘাটতির পরিমাণ ৫,৭৯৮ কোটি টাকা।

এছাড়া পুরো অর্থবছরে রাজস্ব আহরণে ৩০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি ধরা হলেও প্রথম প্রান্তিকে অর্জন হয়েছে ৯.৫১ শতাংশ।

অর্থবছরের প্রথম দিকে ঘাটতি থাকলেও শেষ দিকে এসে তা পূরণ হয়ে যাবে বলে মনে করছে এনবিআর।

জানতে চাইলে সংস্থাটির চেয়ারম্যান মো. নজিবুর রহমান বলেন, অর্থবছরের প্রথম দিকে রাজস্বে কিছুটা ঘাটতি আছে। তবে শেষ পর্যন্ত লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা সম্ভব হবে।

তিনি বলেন, আগামী ডিসেম্বরে রাজস্ব পরিস্থিতি মূল্যায়ন করা হবে। তখন প্রকৃত অবস্থা বোঝা যাবে। তাছাড়া আয়কর রিটার্ন দাখিলের সময় দুই মাস বাড়িয়ে ৩০ নভেম্বর করা হয়েছে। এ সময়ে বেশকিছু রাজস্ব জমা হবে। ফলে ধীরে ধীরে ঘাটতি কমে আসবে। আর ঘাটতি মোকাবেলায় তিনজন সদস্য সার্বক্ষণিক মনিটরিংয়ের দায়িত্ব পালন করছেন। এ উদ্যোগ ভালো ফল দেবে।

প্রথম প্রান্তিকে আয়কর, ভ্যাট ও শুল্ক— সব খাতেই রাজস্ব আহরণে ঘাটতি রয়েছে। জুলাই-সেপ্টেম্বর সময়ে আয়কর থেকে রাজস্ব আহরণের লক্ষ্য ছিল ১১,৫৭৭ কোটি টাকা। এর বিপরীতে আহরণ হয়েছে ৯,৫৫১ কোটি টাকা। অর্থাৎ এ খাতে ঘাটতি রয়েছে ২,০২৬ কোটি টাকা। গত অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় এ খাতে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৮.৮০ শতাংশ।

ভ্যাট থেকে চলতি অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে আহরণের লক্ষ্য ছিল ১৩,৯১৬ কোটি টাকা। এর বিপরীতে আহরণ হয়েছে ১১,৪৯৯ কোটি টাকা। এ হিসাবে ভ্যাট থেকে রাজস্ব আহরণে ঘাটতি রয়েছে ২,৪১৭ কোটি টাকা। গত অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিক থেকে এ খাতে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১০.৪ শতাংশ।

আমদানি শুল্ক বাবদ জুলাই-সেপ্টেম্বর সময়ে ১১,২১৫ কোটি টাকা সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছিল এনবিআর। এর বিপরীতে সংগৃহীত হয়েছে ৯,৮৫৫ কোটি টাকা। অর্থাৎ এ খাত থেকে অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ১,৩৬০ কোটি টাকা। তবে গত অর্থবছরের তুলনায় খাতটিতে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৮.১৬ শতাংশ।

২০১৪-১৫ অর্থবছরের বাজেট প্রস্তাবে এনবিআরের মাধ্যমে রাজস্ব আহরণের লক্ষ্য ধরা হয় ১ লাখ ৪৯,৭২০ কোটি টাকা। কিন্তু অর্জন না হওয়ার শঙ্কায় গত এপ্রিলে তা সংশোধন করে ১ লাখ ৩৫,২৮৭ কোটি টাকা করা হয়। ফলে অর্থবছরটিতে খরচের লাগামও টেনে ধরতে হয় সরকারকে।

আড়াই লাখ কোটি টাকার বাজেট ঘোষণা করা হলেও শেষ পর্যন্ত তা ২ লাখ ৩৮,০০০ কোটি টাকায় নেমে আসে। চলতি অর্থবছরও রাজস্ব ঘাটতি পূরণ না হলে শেষ পর্যন্ত সংশোধনের দিকে এগোতে হতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ড. এবি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম বলেন, গত অর্থবছর উচ্চাভিলাষী প্রবৃদ্ধি ধরে রাজস্ব প্রাক্কলন করা হয়েছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তা অর্জন হয়নি। কর-জিডিপি অনুপাত বাড়ানোর জন্য চলতি অর্থবছরও বড় প্রবৃদ্ধি ধরা হয়েছে। তবে রাতারাতি এ অনুপাত বাড়ানো সম্ভব নয়। ফলে চলতি অর্থবছরও রাজস্ব লক্ষ্য সংশোধন করার প্রয়োজন হতে পারে।

তিনি বলেন, রাজস্ব বাড়ানোর জন্য এনবিআর কিছু উদ্যোগ নিয়েছে। কিন্তু সেগুলো যথেষ্ট নয়। রাজস্ব বাড়াতে হলে করের আওতা উপজেলা পর্যন্ত বিস্তৃত করতে হবে।

গত অর্থবছর সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রায় শুল্ক আহরণের লক্ষ্য ছিল ৩৭,৫০০ কোটি টাকা। এছাড়া ভ্যাট থেকে আহরণের লক্ষ্য ছিল ৪৮,২৬৪ কোটি ও আয়কর থেকে ৪৯,২৬৪ কোটি টাকা। অর্থবছর শেষে এ লক্ষ্য অর্জন করা সম্ভব হয়েছিল। তবে অর্থবছরের শুরুতে রাজস্বের যে লক্ষ্য ধরা হয়েছিল, তা থেকে বেশ দূরেই ছিল প্রকৃত আহরণ।

রাজস্ব আদায় কম হওয়ায় চরম অসন্তুষ্ট অর্থমন্ত্রী

রাজস্ব আদায় কম হওয়ায় চরম অসন্তুষ্ট অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত।

বাংলাদেশ সফররত রাশিয়ার নিউক্লিয়ার কমিশনের ভাইস প্রেসিডেন্টের সঙ্গে আজ মঙ্গলবার দুপুরে সচিবালয়ে বৈঠকের পর সাংবাদিকদের ব্রিফিংকালে তিনি এ অসন্তোষ প্রকাশ করেন। এ পরিস্থিতির জন্য জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) অভ্যন্তরীণ বিরোধকে দায়ীও করেছেন অর্থমন্ত্রী।

চলতি অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে কম রাজস্ব আদায় হওয়ায় অসন্তোষ প্রকাশ করে তিনি বলেন, “এটা ব্যাড সিগন্যাল। আই এম আনহ্যাপি।”

এ পরিস্থিতির জন্য এনবিআরের অভ্যন্তরীণ বিরোধকে দায়ী করে প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যানকে ডেকে কথা বলবেন বলেও সাংবাদিকদের জানান অর্থমন্ত্রী।

তবে চলতি অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে কী পরিমাণ রাজস্ব আদায় হয়েছে এবং তা আগের বছরের তুলনায় কতটা কম সে ব্যাপারে নির্দিষ্ট করে কিছু বলেননি তিনি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *