Punjabs-900-years-old-village-Gulyana

যে গ্রামের বয়স ৯০০ বছর

পাকিস্তানের গুজর খান নামক অঞ্চল থেকে দশ কিলোমিটার দক্ষিণে অবস্থিত একটি গ্রাম গুলিয়ানা। প্রায় ৯০০ বছরের পুরনো এই গ্রামটি ঘিরে আছে পুরনো সব দালান, হাভেলি, মন্দির এবং শিখ সমাধি। পাকিস্তানের জন্ম হওয়ার আগ পর্যন্ত এই গ্রামটি ছিল মূলত শিখ সম্প্রদায়ের অন্যতম দুর্গ এলাকা। গ্রামটি সম্পর্কে পাকিস্তানের কোনো দপ্তরেই কোনো তথ্য পাওয়া যায় না। যতটুকু পাওয়া যায় তাও জানার জন্য যেতে হয় গুলিয়ানা গ্রামে। কারণ ওই গ্রামে এখনও গুলজার খান নামের একজন ৮৫ বছর বয়সী বৃদ্ধ আছেন, যিনি এখনও তার স্মৃতি থেকে কিছু কিছু ঘটনার বয়ান করতে পারেন।

গুলজার খান প্রতিদিন খুব সকালে ঘুম থেকে ওঠেন এবং সকালের কাজ সেরে বন্ধুদের নিয়ে বাড়ির পাশের বটগাছের তলায় বসেন আড্ডা দেয়ার জন্য। দেশ ভাগ হওয়ার আগের গল্পই মূলত ওই আড্ডার মূল বিষয়। দেশভাগের সময় কি ঘটেছিল গুলিয়ানায় কিংবা দেশভাগের ফলে কার লাভ বা ক্ষতি হয়েছে এই হিসেব মেলান তিনি বা তারা। কিন্তু তিনি নিজেও জানেন যে, এই হিসেব মিলিয়ে আদতে এখন আর কোনো লাভ নেই। তবু সময়ের প্রয়োজন আর নিজের সঙ্গে ইতিহাসের দায় মেটাতেই এখনও মুখে মুখে গল্পের ছলে অনেক অজানা কথা তিনি বলে যান। যে কাজ পাকিস্তান সরকারের করার দরকার ছিল, সেই কাজ গুলজার খান নিজ চেষ্টায় করে যাচ্ছেন।

আমার সঙ্গে যখন গুলজার খানের আলাপচারিতা হয়, তখন জানতে পারি যে দেশভাগের আগ পর্যন্ত এই গ্রামটি ছিল মূলত হিন্দু ও শিখ ধর্মাবলম্বী অধ্যুষিত। দিওয়ান পৃথিবী চাঁদ, টেক চাঁদ এবং বক্সী মতি রাম ছিল এই গ্রামের নামকরা হিন্দুদের মধ্যে অন্যতম। এরাই মূলত গুলিয়ানার ব্যবসা নিয়ন্ত্রন করতো এবং পার্শ্ববর্তী শহরগুলোর সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক রক্ষা করতো। ঘটনাগুলোর এতো নিখুত বর্ননা তিনি দিচ্ছিলেন যে, প্রতিটি নদী-পাহাড়-লেক-পর্বত এবং আদিবাসী গোষ্ঠিগুলোকে যেন দিব্যচোখে দেখতে পারছিলাম। গুলিয়ানা গ্রামটি মূলত পোতোহার অঞ্চলের অংশ। আর এই অঞ্চলের শিখ ব্যবসায়িদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিলেন বালি সিং এবং তারা সিং। এই দুই সিংয়ের হাত ধরেই মূলত গুলিয়ানায় স্কুল, হাসপাতাল, হাভেলি, মন্দির স্থাপিত হয়েছিল। যদিও আজ সেখানে মাত্র চারটি হাভেলি, একটি মন্দির এবং দুইটি সমাধি খুব অযত্নের সঙ্গে রয়েছে।

তারা সিংয়ের তিনতলা হাভেলি এখনও অক্ষত অবস্থায় দাড়িয়ে আছে। বাড়ির সামনের দরজাটি বেশ নকশাদার। গ্রাম থেকে মাত্র এক কিলোমিটার পূর্বে রয়েছে দুটি শিখ সমাধি। এর একটি বেশ বড়, যার নাম শিখারা। শিখ এবং হিন্দু ধর্মের মিথের অনেক চরিত্র দেখা যায় এই সমাধি মন্দিরের বিভিন্ন অংশে। সমাধির অন্য আরেক দেয়ালে দেখা যাচ্ছে, বালা এবং মারদানা নামের দুই শিষ্য দ্বারা পরিবেষ্টিত বাবা গুরু নানক। আর পশ্চিম পাশের দেয়ালে আছে হনুমান ও লক্ষণের সঙ্গে রাম-সীতা। দক্ষিণের দেয়ালে আছে গোপীদের সঙ্গে ক্রীড়ারত কৃষ্ণ ও রাধা। আর উত্তরের দেয়ালে চিত্রিত আছে শিব ও তার স্ত্রী পার্বতী এবং বিষ্ণুর সঙ্গে লক্ষী।

ধারনা করা হয় এই মন্দিরটি তৈরি করেছিলেন টেক চাঁদের নাতি বক্সী মতি রাম। গুলজার খানের মতে, টেক চাদ দেশভাগের পরে ইসলাম ধর্ম গ্রহন করেছিলেন এবং তার রোশন, ভীরা এবং শাল নামে তিন সন্তানও ছিল। যারা দেশভাগের পর ভারতে চলে যান। দুঃখজনক হলেও সত্যি, গ্রামটি অনেক ঐতিহ্যবাহী নিদর্শন নিয়েও অনেক অযত্ন আর অবহেলার ভেতর দিয়ে যাচ্ছে। সরকারী কোনো পৃষ্ঠপোষকতা তো নেই, উপরন্তু স্থানীয় ভূমিদস্যুরা বিভিন্ন উপায়ে পুরাতাত্ত্বিক নির্দশনগুলো নষ্ট করে ফেলছেন ব্যক্তিগত স্বার্থে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *