যেভাবে নির্মমভাবে খুন হলেন ব্লগার নিলয়

স্ত্রী আশামনি জানান, চার যুবকের মধ্যে একজনের কাছে পিস্তল ও তিন জনের কাছে রামদা ছিল।

স্ত্রী আশামনি জানান, চার যুবকের মধ্যে একজনের কাছে পিস্তল ও তিন জনের কাছে রামদা ছিল।নিজ বাসায় অনেকটা স্ত্রী ও শ্যালিকার সামনেই নির্মমভাবে কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছে ব্লগার নিলাদ্রি চ্যাটার্জিকে। তিনি ব্লগে নিলয় নীল নামে লেখালেখি করতেন।

ব্লগার নিলয় হত্যায় চার যুবক জড়িত ছিলেন বলে জানিয়েছেন তার স্ত্রী আশামনি। তিনি জানান, চার যুবকের মধ্যে একজনের কাছে পিস্তল ও তিন জনের কাছে রামদা ছিল। তাদের একজনের মুখে দাড়ি ছিল। হত্যার সময় তিনি ‘বাঁচাও’ ‘বাঁচাও’ বলে চিৎকার করলেও কেউ এগিয়ে আসেনি বলে জানান আশামনি।

শুক্রবার বিকেলে তিনি সাংবাদিকদের নিলয় হত্যার ঘটনা বর্ণনা করেন।

এসময় তিনি বলেন, ‘দুপুর ১২টার দিকে আমার স্বামী বাজার থেকে ফিরে ড্রয়িং রুমে ল্যাপটপ নিয়ে বসেন। এসময় আমি ছাড়াও আমার ছোটবোন তন্বী ছিলাম বাসায়। এমন সময় হঠাৎ করে ২০-২১ বছর বয়সী জিন্সের প্যান্ট পরা এক যুবক দরজা খুলতেই বাসায় ঢোকেন। তিনি বাসা ভাড়া নেবেন বলে নিজ থেকেই দু’বার পুরো ফ্ল্যাট ঘুরে দেখেন।’

আশামনি বলেন, ‘এরপর আমি বলি, আমরা তো বাসা ছাড়ছি না, বাসা ভাড়া নেবেন কীভাবে? বাড়িওয়ালাকেও তো এ বিষয়ে কিছু বলিনি। এসময় ওই যুবক বলেন, ‘বাড়িওয়ালাই আমাকে দেখে যেতে বলেছেন। একথা বলে হাতে মোবাইলেও যেন কী যেন করছিলেন।’

ঘটনার বর্ণনায় তিনি বলেন, ‘আমি বিষয়টি ড্রয়িং রুমে আমার স্বামীকে জানাতে যাই। এর মধ্যে আরও তিন যুবক বাসায় ঢোকেন। এদের একজনের ম‍ুখে দাড়িও ছিল। তারা ভেতরে ঢুকেই দরজা বন্ধ করে দেন। তিনজন যুবকের হাতে রামদা ও একজনের হাতে পিস্তল ছিল।’

আশামনি বলেন, ‘একজন আমার মাথায় পিস্তল ঠেকিয়ে বারান্দায় রেখে ভেতর থেকে দরজা লক করে দেয়। একইভাবে অন্য রুম থেকে তন্বীকেও এখানে নিয়ে আসে। এরপর এক সঙ্গে ‘আল্লাহু আকবর’ বলে আমার স্বামীকে কুপিয়ে হত্যা করে চলে যায় তারা। বারান্দায় আমি বারবার ‘বাঁচাও, ‘বাঁচাও’ বলে চিৎকার দিলেও কেউ এগিয়ে আসেনি আমার স্বামীকে বাঁচাতে।’

হত্যার দায় স্বীকার করে বিবৃতি দিয়েছে আনসার আল ইসলাম (আল কায়েদা ভারতীয় উপমহাদেশ, বাংলাদেশ শাখা) নামে একটি সংগঠন।

এই বিবৃতিটি গণমাধ্যমে পাঠানো হয়েছে ansar.al.islam.bd@gmail.com এই ইমেইল ঠিকানা থেকে।

এতে বলা হয়েছে, আনসার-আল-ইসলামের মুজাহিদিনরা হামলা চালিয়ে আল্লাহ ও রাসুলের দুশমন নিলয় নীলকে হত্যা করেছেন। এই অপারেশন খিুলগাঁও এলাকায় ৭ আগস্ট দুপুর ১টা ৪৫ মিনিটে সম্পন্ন হয়।

আরো যারা আল্লাহ ও রাসুলের ‍দুশমন রয়েছে তাদের হত্যারও হুমকি দেয়া হয়েছে বিবৃতিতে।

প্রায় আড়াই মাস আগে ফেসবুকে দেওয়া এক স্ট্যাটাসে নিজের জীবন সংশয়ের কথা প্রকাশ করেছিলেন নিলয়। জানিয়েছিলেন তাঁকে অনুসরণ করার কথা। বিষয়টি নিয়ে থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করতে গিয়েছিলেন নিলয়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তা করতে পারেননি।

গত ১৫ মে ফেসবুকে নিলয় লিখেছিলেন, ‘জিডি করতে যেয়ে আরো উদ্ভট পরিস্থিতির সম্মুখীন হই।’ তিনি আরো লেখেন, ‘ঘটনাস্থলের আওতায় থাকা একটি থানায় গেলে তারা জিডি নিল না, তারা বলল আমাদের থানার অধীনে না, এটা অমুক থানার অধীনে পড়েছে ওখানে যেয়ে যোগাযোগ করুন, আর যত তাড়াতাড়ি সম্ভব দেশ ছেড়ে চলে যান।’

তবে নিলয় কোন থানায় জিডি করতে গিয়েছিলেন তা ওই স্ট্যাটাসে জানাননি।

নিলয়ের ফেসবুক ওয়াল থেকে সেই স্ট্যাটাসটি হুবহু তুলে ধরা হলো-
“আমাকে দুজন মানুষ অনুসরণ করেছে গত পরশু। ‘অনন্ত বিজয় দাশ হত্যার’ প্রতিবাদে আয়োজিত প্রতিবাদ সমাবেশে যোগদান শেষে আমার গন্তব্যে আসার পথে এই অনুসরণটা করা হয়। প্রথমে পাবলিক বাসে চড়ে একটা নির্ধারিত স্থানে আসলে তারাও আমার সাথে একই বাসে আসে। এরপর আমি লেগুনায় উঠে আমার গন্তব্যস্থলে যাওয়া শুরু করলে তাদের মধ্যে একজন আমার সাথে লেগুনায় ওঠে। লেগুনায় বসে আমার মনে পড়ে বাসে তো এই ব্যক্তিই ছিল কিন্তু তারা তো দুজন ছিল। মনে মনে ভাবি হতেই পারে, একজনের গন্তব্য অন্যদিকে তাই সে চলে গেছে।

এ পর্যন্ত ব্যাপার স্বাভাবিক ছিল, কিন্তু পরবর্তীতে লেগুনায় বসে সেই যুবক ক্রমাগত মোবাইলে টেক্সট করছিল যা দেখে আমার সন্দেহ হয়। আমি আমার নির্ধারিত গন্তব্যস্থলের আগেই নেমে গেলে আমার সাথে সেই তরুণও নেমে পড়ে। আমি বেশ ভয় পেয়ে সেখানের একটি অপরিচিত গলিতে ঢুকে যাই। পরে পেছন ফিরে তাকিয়ে দেখি ওই তরুণের সঙ্গে বাসে থাকা আরেক তরুণ এসে যোগ দিয়েছে এবং তারা আমাকে আর অনুসরণ না করে গলির মুখেই দাঁড়িয়ে আছে। তখন থেকে আমি নিশ্চিত হলাম যে আমাকে অনুসরণ করা হচ্ছে কারণ তাদের দুজনের গন্তব্য একই জায়গায় হলেও তারা ভিন্নভাবে এসেছিল এবং আমাকে অনুসরণ করেছিল। আমি গলির আরো অনেক ভেতরে যেয়ে রিকশা নিয়ে হুড ফেলে আমার গন্তব্যস্থলে যাই এবং পরে কাছের এক বন্ধুর সহযোগিতায় আপাত নিরাপদেই পৌঁছাই।‘

‘এই ঘটনায় জিডি করতে যেয়ে আরো উদ্ভট পরিস্থিতির সম্মুখীন হই। প্রথমেই এক পুলিশ অফিসার ব্যক্তিগতভাবে জানিয়েছিল যে এই ধরনের জিডি পুলিশ নিতে চায় না কারণ ব্যক্তির নিরাপত্তা সংক্রান্ত ব্যাপারে যে কর্মকর্তা জিডি গ্রহণ করবে তার অ্যাকাউন্টেবিলিটি (জবাবদিহিতা) থাকবে সেই ব্যক্তির নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য। আর যদি ওই ব্যক্তির কোনো সমস্যা হয়, সেই ক্ষেত্রে ওই পুলিশ কর্মকর্তার দায়িত্বে অবহেলার জন্য চাকরি পর্যন্ত চলে যেতে পারে। থানায় জিডি করতে ঘুরেও একই চিত্র দেখলাম, অনুসরণকালে অনেকগুলো থানা অতিক্রম করার জন্য গতকাল ঘটনাস্থলের আওতায় থাকা একটি থানায় গেলে তারা জিডি নিল না, তারা বলল আমাদের থানার অধীনে না, এটা অমুক থানার অধীনে পড়েছে ওখানে যেয়ে যোগাযোগ করুন, আর যত তাড়াতাড়ি সম্ভব দেশ ছেড়ে চলে যান।”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *