যুদ্ধে ক্ষতবিক্ষত শিশুর প্রতি খ্রিস্টান নারীর ভালবাসা
সাময়িকী

যুদ্ধে ক্ষতবিক্ষত শিশুর প্রতি খ্রিস্টান নারীর ভালবাসা

যুদ্ধে ক্ষতবিক্ষত শিশুর প্রতি খ্রিস্টান নারীর ভালবাসা। শিশুটির নাম ফারাহ (Farah)। ফিলিস্তিনের গাজার বেইত লাহিয়ার একটি শিশু। বেইত লাহিয়া ইসরাইল সীমান্তের কাছাকাছি একটি অঞ্চল এবং অঞ্চলটিতে প্রায়ই ফিলিস্তিন ও ইসরাইলের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে থাকে।

২০১১ সালে ইসরাইলি হামলায় ছোট্ট ফারাহ তার মা, দাদা, চাচী ও তিন চাচাকে হারায়। একই হামলায় ফারাহও মারাত্মকভাবে দগ্ধ হন। হামলায় তার শরীরের বিভিন্ন অংশ পুড়ে যায়।

বর্বর ইসরাইলি হামলায় আহত ফারাহ’র সাহায্যে এগিয়ে আসে ‘প্যালেসটাইন চিলড্রেন রিলিফ ফান্ড’ (Palestine Children’s Relief Fund) নামে একটি সংস্থা। সংস্থাটি গাজার বিশৃঙ্খল অবস্থা থেকে তাকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেয় এবং যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ার সান দিয়েগো শহরে নিয়ে গিয়ে চিকিৎসার ব্যবস্থা করে। চিকিৎসার অংশ হিসেবে সেখানে ফারাহ আরব বংশোদ্ভূত কয়েকটি আমেরিকান পরিবারে ঠাঁই হয়।

সেখানে প্রথম অতিথি পরিবারের সঙ্গে থাকার সময় ফারাহ’র শরীরে প্লাস্টিক সার্জারি করা হয়। বাবা-মা ছাড়া একটি অপরিচিত পরিবেশে ছোট্ট এক শিশুর জন্য এমন জটিল অপারেশন প্রক্রিয়াও ছিল বেদনাদায়ক।

প্রায় এক মাস পর শিশুটিকে আমাল জুবরান (Amal Jubran) নামে এক সাবেক নার্সের পরিবারে ঠাঁই হয়। ফিলিস্তিনি বংশোদ্ভূত আমাল জুবরান একজন খ্রিস্টান নারী। জুবরান ফিলিস্তিনের হাইফা শহরে জন্মগ্রহণ করেন। শিশুটির নয় মাসের চিকিৎসা প্রক্রিয়ায় জুবরানের পুরো পরিবার ফারাহ’র প্রতি অত্যন্ত আবেগপ্রবণ হয়ে পরে। শিশুটিকে শারীরিকভাবে আরোগ্য লাভে এবং মানসিক উন্নয়নে জুবরান ও তার পুরো পরিবারের ভূমিকা ছিল অসাধারণ।

ফারাহ সুস্থ হয়ে গাজায় ফিরে যাওয়ার সময়টা জুবরান ও তার পরিবারের জন্য ছিল আরো একটি কষ্টের ব্যাপার। শিশুটির বিদায়ে ভেঙ্গে পরেন ওই পরিবারের সদস্যরা। নিজে খ্রিস্টান হয়ে মুসলিম এক শিশুর প্রতি তার ভালবাসা সত্যিই এক বিরল ঘটনা। ফারাহকে এক নজর দেখার জন্য প্রায় তিন বছর পর গাজায় ছুটে যান জুবরান।

ইতোমধ্যে ফারাহ গাজায় তার নতুন পালিত মায়ের পরিবারের সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নিয়েছে এবং আমাল জুবরানের স্নেহের পরশ কিংবা ক্যালিফোর্নিয়ায় তার ওই সময়ের দিনগুলো সর্ম্পকে মোটেও স্মরণ নেই শিশুটির।

ফারাহ তার নিজ শহর গাজায় ফিরে আসার পর তার যথেষ্ট শারীরিক উন্নতি না হওয়ায় এবং সাধারণ জীবনধারা নিয়ে আমাল বেশ অসন্তুষ্ট প্রকাশ করেন। ফারাহকে নিয়ে আমালের প্রত্যাশা যে আরো বেশি কিছু ছিল।

ফারাহ এই বেদনাদায়ক জীবন ও তার প্রতি আমাল জুবরানের ভালবাসার কাহিনী নিয়ে ‘ফারাহ: গাজার যুদ্ধের ক্ষতবিক্ষত’ (Farah: Scarred by Gaza’s War) নামে চলচ্চিত্র নির্মাণ করেছেন ফাহিন উমর নামে আরেক আমেরিকান। তিনি যেমনটি বলছিলেন:

একজন চলচ্চিত্রকার হিসেবে আমি সবসময় জোরালো গল্পকে পছন্দ করি। গাজায় নিজ বাড়িতে ইসরাইলি হামলায় দগ্ধ হয়ে তিন বছরের শিশু ফারাহ তীব্র যন্ত্রনায় কাতরাচ্ছে এবং চিকিৎসার জন্য যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ে আসা হচ্ছে – এ খবরটি শুনার পর আমি ঠিক করলাম ফারাহ’র জীবন কাহিনী নিয়ে চলচ্চিত্র নির্মাণ করব।

ক্যালিফোর্নিয়ার সান দিয়াগোতে এক বছরের চিকিৎসা চলাকালীন সময়ে শিশুটি একটি অতিথি পরিবারের সঙ্গে থাকবে। এটি জেনে আমি অবাক হয়ে যাই। এমন অস্থিতিশীল সময়ে শিশুটি একটি অপরিচিত পরিবেশে, অপরিচিত মানুষের সঙ্গে কেমন করে নিজেকে খাপ খাইয়ে নিবে? শিশুটি ও তাকে আশ্রয় দেয়া পরিবারটিতেই শেষ পর্যন্ত কি প্রভাব ফেলবে?

শিশুটি সান দিয়াগোতে পৌছানোর পর থেকেই আমি আমার ক্যামেরা নিয়ে তাকে সবসময় অনুসরণ করার সিদ্ধান্ত নেই। আমি জানতাম না শিশুটির গল্পের পিছনে কি রহস্য লুকিয়ে আছে। যাই হোক, আমি পুরো নয় মাস ফারাহ ও জুবরানের পরিবারের পক্ষ থেকে নেয়া বিভিন্ন পদক্ষেপ রেকর্ড করে রাখি। ওই নয় মাসে ফারাহকে তিনটি বেদনাদায়ক সার্জারি অপারেশনের মুখোমুখি হতে হয়। জুবরানের সংস্পর্শে শিশুটি ধীরে ধীরে সুস্থ হতে থাকে।

ফারাহ’র জীবন কাহিনী নিয়ে চলচ্চিত্রটি নির্মাণ করা খুব সহজ কাজ ছিল না। এটি নির্মাণ করতে তেমন অর্থ আমার ছিল না। চলচ্চিত্রটির প্রাথমিক খরচের টাকা জোগার করতে আমি একটি তহবিল গঠন করি।

ফিলিস্তিনের একজন শিশুর জীবন নিয়ে ফিল্মের অর্থায়ন যুক্তরাষ্ট্রে খুব সহজ ব্যাপার নয়। যুক্তরাষ্ট্রের গণমাধ্যম মাধ্যমগুলো প্রায়ই বিভিন্ন লবিস্ট মাধ্যমের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে থাকে। এ কারণেই এখানকার গণমাধ্যমগুলো ফিলিস্তিনিদের ব্যাপারে নীরব ভূমিকা পালন করে থাকে।

ছোট্ট একটি শিশুর এত দুঃখ-কষ্ট সহ্যের ঘটনা ব্যক্তিগতভাবে প্রত্যক্ষ করাও আমার জন্য অত্যন্ত বেদনাদায়ক ছিল। তার এই কষ্টের গল্প আমাকেও প্রতিদিন একই রকম কষ্ট দিত। একইভাবে ফারাহকে শরীরিকভাবে সুস্থ হতে দেখেও খুব ভাল লাগত।

প্রায় তিন বছর পর ২০১৩ সালে আমি এবং আমাল জুবরান গাজায় গিয়ে ফারাহকে দেখার সুযোগ পাই। চলচ্চিত্র নির্মাণের জন্য গাজার মতো স্থানে নিজের সন্তানদের ছেড়ে আসার সিদ্ধান্তটা খুব কঠিন ছিল। কেননা এখানে ইসরাইল ও ফিলিস্তিনিদের মধ্যে যেকোনো সময়ে সহিংস সংঘাতের ঘটনা ঘটতে পারে। আমাদের গাজায় আসতে সহায়তা করার জন্য আমি বিশেষভাবে ইব্রাহীম আহমেদকে ধন্যবাদ দিতে চাই। তিনি গাজায় আমাদের বিভিন্নভাবে সহায়তা দিয়েছেন। তিনি ছিলেন আমাদের সর্মথনের একটি বড় উৎস।

চলচ্চিত্র নির্মাণের ব্যাপারটি ব্যক্তিগত এবং পেশাগতভাবে খুব চ্যালেঞ্জিং একটা প্রজেক্ট ছিল। ছবিটির নির্মাণ সম্পন্ন করতে আমার পাঁচ বছর সময় লেগেছে। কিন্তু আমি বিশ্বাস করি, এটি অন্যদের অনুপ্রাণিত করতে এবং একটি কার্যকর প্রভাব সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়েছে। শিশুটির জন্য জুবরানের পরিবারের ভূমিকা ছিল অসাধারণ। তার মতো আমরাও চেষ্টা করলে অন্যদের কষ্টের জীবনে একটু সুখ বয়ে আনতে পারি। ফিলিস্তিন-ইসরাইলের মতো দ্বন্দ্ব নিরসনে আমাদের সবারই দায়িত্ব রয়েছে।

একটি শিশুকে আদর-যত্ন করে সুস্থ করে তোলার পরে তার প্রতি বেশ আবগপ্রবণ হওয়াটাই স্বাভাবিক। ফারাহ’র নিরাময়ের জন্য আমাল জুবরান নিঃস্বার্থভাবে চেষ্টা করেছে। এজন্যই শিশুটিকে গাজায় ফিরে যাওয়ার জন্য বিদায় জানানোটা জুবরানের জন্য খুব কঠিন ছিল। গাজার মতো বিপদজনক স্থানে শিশুটিকে দেখতে আসার সিদ্ধান্ত তার পরম ভালবাসারই বর্হিপ্রকাশ। গাজায় আসলে চ্যালেঞ্জিং পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হবে- জেনেও জুবরান তাকে দেখার জন্য পাগলের মতো ছুটে আসে।

আমি আশা করি, এই গল্প অন্য নারীদেরকেও অনুপ্রাণিত করবে; যাদের ভূমিকাকে আমরা প্রায়ই অবমূল্যায়ন করে থাকি।

আল জাজিরা অবলম্বনে ভাষান্তর মো. রাহল আমীন

শিরোনাম ডট কম
শিরোনাম ডট কম । অনলাইন নিউজ পোর্টাল Shironaam Dot Com । An Online News Portal
http://www.shironaam.com/

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *