মুক্তধারার ২৫ বছর এবং আমাদের প্রাণের বইমেলা
সাময়িকী

মুক্তধারার ২৫ বছর এবং আমাদের প্রাণের বইমেলা

মুক্তধারার ২৫ বছর এবং আমাদের প্রাণের বইমেলাকাজী জহিরুল ইসলাম

চারদিকে সরব উত্তেজনা, নিউ ইয়র্কে বইমেলা হচ্ছে। আমি নতুন এসেছি এই শহরে, বাসা-বাড়ি গোছানো, বাচ্চাদের জন্য ভাল স্কুল খোঁজা, নতুন কর্মপরিবেশে নিজেকে মানিয়ে নেওয়া, কত ব্যস্ততা। এই শহরে বসবাসরত শিল্প-সাহিত্য জগতের মানুষ বলতে চিনি কবি শহীদ কাদরী আর লেখক হাসান ফেরদৌসকে। আরো একজনকে চিনি, তিনি সাপ্তাহিক বাংলা পত্রিকার সাংবাদিক হাবিবুর রহমান। হাবিব ভাই মুক্তধারা থেকে আমার “জানা-অজানা আফ্রিকা” বইটি কিনে পুরো বইটি ধারাবাহিকভাবে সাপ্তাহিক বাংলা পত্রিকায় ছেপে দেন। এরপর আমার ইমেইল অ্যাড্রেস খুঁজে বের করে আমার সাথে যোগাযোগ করেন, আরো লেখা চান। তখন আমি বাস করি পশ্চিম আফ্রিকার আইভরিকোস্টে। সেই থেকে চিনি হাবিব ভাইকে। কাউকে চিনি বা না চিনি বইমেলা কথাটি শুনেই বুকের ভেতরটা কেমন মোচড় দিয়ে উঠলো। আমাকে যেতেই হবে। ওখানে যারা আসবেন তাদের সঙ্গে বইয়ের একটা সুসম্পর্ক আছে, কাজেই ওরা আমার আপনজন। আমি আপনজনদের টানে ছুটে যাই নিউ ইয়র্ক বইমেলায়। এইতো সেদিনের কথা, ২০১৪ সালের মে মাস। এস্টোরিয়ার এক সুবিশাল স্কুল ভবনে বসেছে ২৩তম বই মেলা। আরকোপোলিসের মতো বিশাল চারটি থামের মাঝখানে কয়েক ধাপ প্রশস্ত সিঁড়িপথ। সিঁড়িতে বসে, খোলা আকাশের নিচে কবিতা পড়ছেন কবি দাউদ হায়দার। তাকে ঘিরে রেখেছেন আমেরিকা, ইউরোপে বসবাসরত একদল কবিতাপ্রেমী প্রবাসী বাংলাদেশীর সঙ্গে বেশ ক’জন ঢাকা-কোলকাতার ভক্ত। আমাকে দেখে দাউদ ভাই হাত দেখালেন। কবিতা পাঠে যেন ছেদ না পড়ে, তাই আমি ছুটে গেলাম স্কুল ভবনের ভেতরে। সেদিন ছিল মেলার শেষ দিন। হাতে সময় কম। এই অল্প সময়ে যতখানি পারা যায় দেখে নিতে চাই, ছুঁয়ে ছুঁয়ে দেখতে চাই মেলায় আসা নতুন বই, ঘ্রাণ নিতে চাই প্রিয় গ্রন্থগুলোর।

ঢাকা এবং কোলকাতার বাইরে আজ এটিই সবচেয়ে বড় বাংলা বইয়ের মেলা। মুক্তধারা নামের একটি বইয়ের দোকান আজ থেকে ২৫ বছর আগে নিউ ইয়র্কে শুরু করেছিল এই বইমেলা। আজ এর দায়িত্বে রয়েছে একটি সমৃদ্ধ সংগঠন, মুক্তধারা ফাউন্ডেশন। সেদিনের সেই তরুণ বিশ্বজিৎ সাহা আজ এক পরিণত পুরুষ, তিনিই এই ফাইন্ডেশনের সুযোগ্য চেয়ারম্যান। এই প্রতিষ্ঠানের সাথে আজ জড়িত আছেন উত্তর আমেরিকার শিল্প-সাহিত্যের অনেক পুরোধা ব্যক্তিত্ব।

ভেতরে ঢুকেই দেখা হলো বাংলা প্রকাশের নির্বাহী প্রধান, লেখক হুমায়ূন কবীর ঢালীর সাথে। ‘আরে জহির ভাই, এই শেষ দিনে আইলেন। এই লন আপনের ছয় ঠ্যাং’। “ছয় ঠ্যাংঅলা নীল সাপ” বাচ্চাদের জন্য লেখা আমার নতুন বই, প্রকাশ করেছে বাংলা প্রকাশ। তিনি আমাকে ৫ কপি দিলেন। বইটি ২০১৪ সালের ফেব্রুয়ারীর বইমেলায় বের হয়েছে। এই প্রথম হাতে পেলাম। বইটিকে আমি বুকের সঙ্গে চেপে ধরি, গালে ঘষি। বাংলা প্রকাশের স্টল থেকে আরো কয়েকটি বই কিনি। অন্যান্য স্টলগুলি ঘুরে ঘুরে দেখি। এরপর যাই মুক্তধারার স্টলে। যাকে খুঁজছি তিনি নেই। তিনি বিশ্বজিৎ সাহা, মুক্তধারা নিউ ইয়র্কের স্বত্বাধিকারী। তিনিই এই বইমেলার মূল আয়োজক। কত কাজ তার। মূল মঞ্চে অনুষ্ঠানগুলো সময়মত হচ্ছেতো, মেলায় আগত অতিথিরা কেউ মন খারাপ করছে নাতো, মঞ্চের-স্টলগুলোর সাজগোজ থেকে শুরু করে স্যুভেনির প্রকাশনা, শিল্পীদের সিডিউল, ঢাকা থেকে আগত বিশেষ মেহমানদের থাকা-খাওয়ার বন্দোবস্ত, মেলার খরচের জন্য টাকা জোগাড় করাসহ প্রায় প্রতিটি বিষয়েই তাকে লক্ষ্য রাখতে হচ্ছে। সব বিভাগেই দায়িত্বরত কেউ না কেউ আছেন, তবুও তার টেনশনের শেষ নেই। কোত্থেকে তিনি ছুটতে ছুটতে এলেন। ‘দাদা, মেলায় আসার জন্য অনেক ধন্যবাদ’। এই ধন্যবাদটি দিতে তিনি ভুল করেন না। আমি শারমিন আহমদের “নেতা ও পিতা তাজউদ্দীন আহমদ” বইটি কিনে নিয়ে অন্য স্টলের দিকে এগিয়ে যাই। নিউ ইয়র্কে বসবাসরত শিল্প-সাহিত্যের অনুরাগী প্রায় প্রতিটি মানুষই কোন না কোনভাবে এই মেলার সাথে জড়িয়ে আছেন, সেই থেকে নিজের অজান্তেই আমিও এই বই মেলার একজন গেছি।

এ বছর, অর্থাৎ ২০১৫ এর বইমেলায়, উদ্বোধনী বিকেলের মঙ্গল শোভাযাত্রা থেকে শুরু করে শেষদিনের শেষমুহুর্ত পর্যন্ত মেলায়ই ছিলাম। এই প্রাণের মেলা ছেড়ে কি করে ঘরে বসে থাকি? আমরা যখন মঙ্গল শোভাযাত্রা নিয়ে জ্যাকসন হাইটস প্রদক্ষিণ করছিলাম তখন অনেক উৎসুক বিদেশি/বিদেশিনী এগিয়ে এসে জানতে চাইছিলেন, এটা কিসের শোভাযাত্রা। যখন জানতে পারছিলেন যে এটি আমাদের ভাষা দিবসের শোভাযাত্রা এবং এই শোভাযাত্রাটি যেখানে শেষ হবে সেখানে তিনদিনের একটি বাংলা বইয়ের মেলা হবে তখন সবাই খুব অবাক হচ্ছিলেন এর অভিনবত্ব দেখে। কারণ এর আগে ওরা কেবল বিভিন্ন জাতির স্বাধীনতা দিবসের শোভাযাত্রা দেখেছে, কেউ ভাষা দিবসের শোভাযাত্রা দেখেনি।

আজ থেকে ২৫ বছর আগে ১৯৯২ সালে এই মেলাটির যাত্রা শুরু করে মুক্তধারা এবং অবধারিতভাবেই এর মূল আয়োজক ছিলেন বিশ্বজিৎ সাহা। বিশ্ববরেণ্য বাঙালীরা প্রতি বছর এই মেলার উদ্বোধন করেন, এই তালিকায় আছেন শহীদ কাদরী, অধ্যাপক আব্দুল্লাহ আবু সায়ীদ, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, হুমায়ূন আহমেদ, জ্যোতিপ্রকাশ দত্ত, মুহাম্মদ জাফর ইকবাল, আব্দুল গাফফার চৌধুরী, পূরবী বসু, সৈয়দ মোহাম্মদ উল্লাহ, ভাষা সৈনিক আব্দুল মতিন, সমরেশ মজুমদার, ইমদাদুল হক মিলন, জয় গোস্বামী, শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়, রাবেয়া খাতুন, ড. আনিসুজ্জামান, রফিক আজাদ, হাসান আজিজুল হক, হুমায়ূন আজাদ, নির্মলেন্দু গুণ, মহাদেব সাহা প্রমূখ। এইসব আলোকিত মানুষের মঙ্গলস্পর্শে উত্তর আমেরিকায় বসবাসরত বাঙ্গালীদের প্রাণের মেলায় পরিণত হয়েছে নিউ ইয়র্কের বইমেলা। ঢাকা এবং কোলকাতার বাইরে আজ এটিই সবচেয়ে বড় বাংলা বইয়ের মেলা। মুক্তধারা নামের একটি বইয়ের দোকান আজ থেকে ২৫ বছর আগে নিউ ইয়র্কে শুরু করেছিল এই বইমেলা। আজ এর দায়িত্বে রয়েছে একটি সমৃদ্ধ সংগঠন, মুক্তধারা ফাউন্ডেশন। সেদিনের সেই তরুণ বিশ্বজিৎ সাহা আজ এক পরিণত পুরুষ, তিনিই এই ফাইন্ডেশনের সুযোগ্য চেয়ারম্যান। এই প্রতিষ্ঠানের সাথে আজ জড়িত আছেন উত্তর আমেরিকার শিল্প-সাহিত্যের অনেক পুরোধা ব্যক্তিত্ব।

বইমেলার পাশাপাশি মুক্তধারা এবং কালক্রমে মুক্তধারা ফাউন্ডেশন প্রতি বছর একুশে ফেব্রুয়ারীতে ম্যানহাটনের ৪৭ স্ট্রিট এবং ২য় এভেনিউতে স্থাপন করে অস্থায়ী শহীদ মিনার। নিউ ইয়র্কে বসবাসরত বাঙালীরা এই শহীদ মিনারে সমবেত হয়ে আমাদের ভাষা আন্দোলনের বীর শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করার সুযোগ পান। গত ২৫ বছর ধরে ফেব্রুয়ারীর কনকনে ঠান্ডায় দুহাতে বরফ সাফ করে মধ্যরাতে শহীদ মিনার নির্মাণ করছেন বিশ্বজিৎ সাহা, আমরা জানি কোন উষ্ণতার ওম তাকে টেনে নিয়ে আসে শীতরাত্রীর অন্ধকারে আলো জ্বালাতে প্রতি বছর এই জায়গাটিতে। যে ভাষায় আমি কবিতা লিখি, সেই ভাষার স্থপতিদের সম্মান জানাতে যে মানুষটি ছুটে আসেন তুষারাচ্ছাদিত শীতের রাতে, অবিরাম ২৫ বছর ধরে যিনি নির্মাণ করছেন বাংলা ভাষার মিনার, আমার হৃদয় মিনারে তার নাম লেখা হয়ে গেছে অনেক আগেই।

২০১৬ তে নিউ ইয়র্ক বইমেলা ২৫ বছরে পা রাখবে। এটি বাঙালী জাতির জন্য একটি মাইলফলক। বাংলাভাষার সমৃদ্ধির মাইলফলক। শহীদ মিনার নির্মাণ করে ভাষা শহীদদের শ্রদ্ধা জানানো, প্রতি বছর বইমেলার আয়োজন করা, প্রবাসে, বিশেষ করে নিউ ইয়র্কে, যেখানে অবস্থিত জাতিসংঘের সদর দফতর, এইসব কর্মকাণ্ড অব্যহত আছে বলেই আজ বাংলা ভাষা লাভ করেছে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষার মর্যাদা, নিউ ইয়র্ক স্টেট ২১শে ফেব্রুয়ারীকে অফিশিয়ালি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে দিয়েছে স্বীকৃতি। এই জাতীয় অর্জনগুলোর পেছনে রয়েছে মুক্তধারার নিরলস প্রচেষ্টা, আর এই প্রতিষ্ঠানটিকে ঘিরে প্রবাসী বাংলাদেশীদের নিরন্তর ভালবাসা। আজ ২৫তম বইমেলার প্রাক্কালে মুক্তধারা ফাইন্ডেশনের সকল সদস্য/কর্মীকে জানাই আমার প্রাণঢালা ভালবাসা ও অভিনন্দন। আমাদের প্রাণের বইমেলা, এই নিউ ইয়র্কে, বেঁচে থাক অনন্তকাল।

______________________________________________________
কাজী জহিরুল ইসলাম, নিউ ইয়র্ক থেকে

শিরোনাম ডট কম
শিরোনাম ডট কম । অনলাইন নিউজ পোর্টাল Shironaam Dot Com । An Online News Portal
http://www.shironaam.com/

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *