মিতু হত্যার পরিকল্পনাকারী স্বেচ্ছাসেবক লীগ নেতা

মিতু হত্যার পরিকল্পনাকারী স্বেচ্ছাসেবক লীগ নেতা

মিতু হত্যার পরিকল্পনাকারী স্বেচ্ছাসেবক লীগ নেতাপুলিশ সুপার বাবুল আক্তারের স্ত্রী মাহমুদা খাতুন মিতু হত্যাকাণ্ডে সরাসরি অংশগ্রহণকারী মো. মোতালেব ওরফে ওয়াসিম (২৭) ও আনোয়ার হোসেন (২৮) নামে দুজনকে গ্রেফতারের পর মূল পরিকল্পনাকারী হিসেবে শনাক্ত হয়েছেন চট্টগ্রামের স্বেচ্ছাসেবক লীগের প্রভাবশালী নেতা আবু মুসা (৪৫) ও এহতেশামুল হক ভোলা(৩৮)।

হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় গত শনিবার রাতে ওয়াসিম ও মো. আনোয়ারকে গ্রেফতার করা হয়। গতকাল তারা আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে। গতকাল দুজন স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে অনেক তথ্য দিয়েছে। খুনে সাত থেকে আটজন অংশ নিয়েছে। বাকিদের ধরতে অভিযান চলছে।

তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, মিতু হত্যায় সরাসরি অংশ নেওয়া তিনজনসহ মোট ৯ জনকে সন্দেহজনক হিসেবে আটক করা হয়েছে। এর সঙ্গে জড়িত পরিকল্পনাকারীকেও চিহ্নিত করা হয়েছে। তবে সেই পরিকল্পনাকারী এখনও ধরাছোঁয়ার বাইরে।

আটককৃতদের কাছ থেকে প্রাপ্ত তথ্য বিশ্লেষণ করে জানা গেছে, তাদের সমন্বয়কারী ছিল আবু মুসা নামে এক ব্যক্তি। তার সহযোগী ছিল নবী ও ওয়াসিম। ছেলে নিয়ে হেঁটে জিইসি মোড়ে যাওয়ার সময়ই মোটরসাইকেলে করে আসা নবী প্রথমে এলোপাতাড়ি ছুরিকাঘাত করে মিতুকে। সর্বশেষ ওয়াসিম গুলি করে মৃত্যু নিশ্চিত করে মোটরসাইকেলে করে দ্রুত পালিয়ে যায়। ‘কন্ট্রাক্ট কিলিংয়ে’র জন্য মুসা দুই লাখ টাকা পেয়েছে। তিনজন এসপি বাবুলের সোর্স হিসেবে কাজ করতেন। মূল পরিকল্পনার পেছনে স্বেচ্ছাসেবক লীগের প্রভাবশালী নেতা ও তার এক আত্মীয়ের অংশগ্রহণও রয়েছে।

তদন্ত সংশ্লিষ্টরা আরও জানান, মিতু হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে পারিবারিক কোনো দ্বন্দ্ব রয়েছে কি না তাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এছাড়াও এসপি বাবুলের সঙ্গে সন্ত্রাসীদের পুরনো কোনো দ্বন্দ্ব থাকতে পারে। বিভিন্ন বিষয় যাচাই করা হচ্ছে।

এর আগে স্ত্রী হত্যায় জিজ্ঞাসাবাদের জন্য শুক্রবার গভীর রাতে ডিবি কার্যালয়ে নিয়ে ১৫ ঘণ্টা জিজ্ঞাসাবাদ করা হয় বাবুলকে। পরে শনিবার বিকেল সাড়ে ৪টায় খিলগাঁওয়ের ভূঁইয়াপাড়ার শ্বশুরবাড়ি পৌঁছে দেওয়া হয় তাকে।

পুলিশ কিছু গোপন করতে চাইছে?

ওয়াসিম একজন পেশাদার খুনি। আদালতে নেওয়ার আগে পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে ওয়াসিম জানিয়েছে সে-ই মিতুকে গুলি করেছে। আর তার ‘ব্যাকআপ ফোর্স’ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছে আনোয়ার। তবে খুনের মূল নির্দেশদাতা কে—সে বিষয়ে সংবাদ সম্মেলনে কিছু বলেননি সিএমপি কমিশনার। তার দাবি, এটা এখনো বলার সময় আসেনি। এ ঘটনায় জড়িত অন্যরা ধরা পড়লে এবং অস্ত্র উদ্ধারের পর এটা বলা যাবে।

পুলিশ কমিশনারের এই ব্রিফিংয়ের পর সাধারণ মানুষের মধ্যে সন্দেহ দানা বেঁধেছে যে, পুলিশ কিছু গোপন করতে চাইছে কি-না। কারণ খুনিরা খুন করার কথা স্বীকার করল, অথচ খুনের মূল নির্দেশদাতার কথা জানায়নি,তা হতে পারে না। অনেকেই বলছেন, অবশ্যই খুনিরা নির্দেশদাতার নাম বলেছে। পুলিশ সেটা গোপন করে কাউকে বাঁচাতে চাইছে। কারণ নির্দেশদাতা কোন অপরাধী বা উগ্রবাদি গোষ্ঠী হলে ঢাক-ঢোল পিটিয়ে উচ্চ:স্বরে বলে দিত। নিশ্চয় এমন কারো নাম এসেছে যেটা বলতে পুলিশও বিব্রত। অথবা পুলিশ নিজেদের স্বার্থে তাকে বাঁচাতে চাইছে। এই ঘটনার সঙ্গে খোদ পুলিশের কারো সম্পৃক্ততা পাওয়া গেলে পুলিশের মনোবলে চিড় ধরতে পারে। অথবা তিনি এতটাই প্রভাবশালী যে, তাকে বাঁচিয়ে দেয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে সবাই মিলে।

আবু মূসা নামে এক ব্যক্তি এই হত্যাকাণ্ড ঘটাতে ওয়াসিম ও আনোয়ারকে ভাড়া করেছিলেন। হত্যা সংঘটনের সময় ঘটনাস্থলের কাছাকাছি এলাকাতেই মূসা অবস্থান করছিলেন। হত্যাকাণ্ড শেষে ওয়াসিম ও আনোয়ারের হাতে তিন-চার হাজার টাকা করে দিয়ে মূসা বলেছিলেন, ‘তোরা এখন পালা। লেনদেন পরে হবে।’

সিএমপি কমিশনার ব্রিফিংয়ে জানান, শনিবার চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়া থেকে ওয়াসিমকে এবং নগরীর বাকলিয়া এলাকা থেকে আনোয়ারকে গ্রেফতার করা হয়। পুলিশ কমিশনার বলেন, এই হত্যাকাণ্ডে ৭ থেকে ৮ জনের একটি সংঘবদ্ধ চক্র অংশ নিয়েছিল।

সরাসরি জড়িত সন্দেহে দুই ব্যক্তিকে আটক

চট্টগ্রামে পুলিশ সুপার (এসপি) বাবুল আক্তারের স্ত্রী মাহমুদা খানম মিতু হত্যায় সরাসরি জড়িত সন্দেহে আবু মুসা (৪৫) ও এহতেশামুল হক ভোলা (৩৮) নামে দুই ব্যক্তিকে আটক করেছে পুলিশের একটি ইউনিট। মুছাকে মঙ্গলবার সকালে চকবাজার এলাকা থেকে ও একইদিন বিকাল সাড়ে ৫টার দিকে রাজাখালী গুলবাহার কমিউনিটি সেন্টারের সামনে থেকে পুলিশ তুলে নিয়ে যায় বলে দাবি করেছে এদের পরিবার। পুলিশের বিশ্বস্ত সূত্র জানিয়েছে, এরা দু’জনই এসপি বাবুল আক্তারের সোর্স হিসেবে কাজ করতেন। বাবুল আক্তারের বসবাস ও পরিবার সম্পর্কে তাদের ভালো ধারণা রয়েছে। বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত ও প্রমাণের ভিত্তিতে পুলিশ মনে করছে, তৃতীয় কোনো পক্ষের কাছ থেকে টাকা নিয়ে অর্থাৎ ভাড়াটে খুনি হিসেবে তারা মিতুকে হত্যা করেছে। এজন্যই তাদের আটক করা হয়। শিগগিরই তাদেও গ্রেফতার দেখিয়ে আদালতে তোলা হবে। তবে পুলিশ কর্মকর্তারা ভোলা ও মুছাকে আটকের বিষয়টি অস্বীকার করেছেন। এদের হত্যায় যুক্ত থাকার বিষয়ে সরাসরি কোনো কিছু না বললেও কর্মকর্তারা বলছেন, মিতু হত্যা তদন্ত নিয়ে শিগগিরই তারা ‘সুসংবাদ’দেবেন।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ভোলা একজন সন্ত্রাসী ছিলেন। এখন তিনি ৩৫ নম্বর বকশিরহাট ওয়ার্ড স্বেচ্ছাসেবক লীগের সহসভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন। তার বিরুদ্ধে রয়েছে একাধিক মামলা। আবু মুসা দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসী। অনেক সময় ভাড়াটে খুনি হিসেবে কাজ করেন। তার বাড়ি রাঙ্গুনিয়ার রানীহাট এলাকায়। এসপি বাবুল আক্তারের হাতে একবার গ্রেফতারও হয়েছিলেন তিনি। বেশ কিছুদিন ধরে দু’জনই বাবুল আক্তারের সোর্স হিসেবে কাজ করছেন। পুলিশের ওই বিশ্বস্ত সূত্র আরও জানিয়েছে, ভোলা ও মুসাকে নগরীর বন্দর থানায় রাখা হয়েছে।

সূত্র জানায়, মিতুকে যে স্থানে হত্যা করা হয় সেই জিইসি মোড়ে বসানো টাওয়ারের অধীনে যেসব মোবাইল ফোন থেকে কল ইনকামিং-আউটিগোয়িং হয়েছে তা ঘেঁটেও মুসা ও ভোলার ফোন ব্যবহারের তথ্য পাওয়া গেছে। পারিপার্শ্বিক বিভিন্ন ঘটনার সঙ্গে মুসা ও ভোলার যোগসাজশ এবং ঘটনার সঙ্গে নানা কারণে তাদের সংশ্লিষ্টতা বিবেচনায় নিচ্ছে পুলিশ। এর মধ্যে মুছাকেই এ ঘটনার মূল হোতা হিসেবে দাবি করছে পুলিশের একাধিক সূত্র। তবে তাদের জিজ্ঞাসাবাদের মাধ্যমে জড়িত অন্যদেরও ধরার জন্য পুলিশ আটক দু’জনের ব্যাপারে মুখ খুলছে না।

ভোলার পরিবারের সদস্যরা জানান, মঙ্গলবার বিকাল ৩টা ১৫ মিনিটের দিকে ভোলার মোবাইলে ফোন আসে। ওই প্রান্তে কি বলছেন তা না শুনলেও এ প্রান্ত থেকে ভোলা বলছিলেন, আজকে আমার তারাবিহ শেষ হবে (খতম তারাবিহ), আমি রাতে কোথাও যেতে পারব না। এরপর সে রাজাখালীর বাসা থেকে বের হয়। বাসা থেকে বের হয়ে শাহ আমানত সেতু সংলগ্ন গুলবাহার কমিউনিটি সেন্টারের পাশে গেলে তাকে আটক করা হয়। আটকের পর রাতে বাকলিয়া থানায় সাধারণ ডায়েরি করতে গেলেও তা নেয়নি পুলিশ। পরে তারা সিএমপি সদর দফতর লালদীঘির পাড়ে ডিবি অফিসে যান। ভোলার স্ত্রী ও ভোলার বড় বোন রাবেয়া বসরী বকুল সারারাত ডিবি অফিসে কাটিয়ে দেন। বুধবার সকালে সিএমপি পুলিশ কমিশনার ইকবাল বাহারের সঙ্গে সাক্ষাতের অনুমতি চেয়ে না পেয়ে তারা ফিরে যান। পরিবারের সদস্যরা জানতে পারে ভোলাকে বন্দর থানায় রাখা হয়েছে। বুধবার বেলা ১২টার দিকে তারা বন্দর থানায় খোঁজ নিতে গেলেও ভোলার সঙ্গে দেখা করতে ব্যর্থ হন।

মিতু হত্যার দুই আসামি কারাগারে

চট্টগ্রামে এসপি বাবুল আক্তারের স্ত্রী মাহমুদা খানম মিতু হত্যায় জড়িত গ্রেফতার দুই আসামিকে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। আসামিরা হলেন-ওয়াসিম ও মো. আনোয়ার। তাদের বাড়ি রাঙ্গুনিয়া উপজেলায়।

রোববার বিকাল ৪টা থেকে রাত সোয়া ৯টা পর্যন্ত চট্টগ্রাম মহানগর হাকিম মোহাম্মদ হারুন অর রশিদের খাস কামরায় পৃথকভাবে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন মোতালেব মিয়া ওয়াসিম ও মো. আনোয়ার।

জবানবন্দি শেষে তাদের দুজনকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন বিচারক। পরে তাদের চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারে প্রেরণ করা হয়।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা নগর গোয়েন্দা পুলিশের সহকারী কমিশনার মো. কামরুজ্জামান রাতে বলেন, জবানবন্দিতে তারা হত্যায় অংশ নেয়ার কথা স্বীকার করেছেন। জড়িত বাকিদেরও নাম বলেছে। তবে তদন্তের স্বার্থে তা বলা যাচ্ছে না।

উল্লেখ্য, গত ৫ জুন চট্টগ্রাম মহানগরীর জিইসি মোড় এলাকায় ছুরিকাঘাত ও গুলি করে এসপি বাবুল আক্তারের স্ত্রী মাহমুদা খাতুন মিতুকে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। পরে এসপি বাবুল আক্তার বাদী হয়ে নগরীর পাঁচলাইশ থানায় একটি মামলা করেন। ঘটনাটিতে সারাদেশে ব্যাপক তোলপাড় সৃষ্টি হয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *