মায়ের সম্ভ্রমহানী, রাষ্ট্রযন্ত্র ও আমাদের বিবেক
মতামত

মায়ের সম্ভ্রমহানী, রাষ্ট্রযন্ত্র ও আমাদের বিবেক

মায়ের সম্ভ্রমহানী, রাষ্ট্রযন্ত্র ও আমাদের বিবেক ফজলে এলাহী
পত্রিকা, টেলিভিশন চ্যানেল আর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের কল্যাণে আপনারা সবাই অবগত আছেন যে টাঙ্গাইলের কালিহাতিতে পুলিশের গুলিতে তিনজন গ্রামবাসী মারা গেছেন । তাঁদের অপরাধ ছিল আল আমিন নামের এক কিশোরের সামনে তাঁর মাকে ধর্ষণ করে দুজনকে হত্যার প্রতিবাদ করা।

ভাবতে পারেন কি নৃশংস হয়ে উঠেছে এই দেশের শাসকশ্রেণী যারা জনগণকে ভয় পায় এবং বন্দুকের নলের মধ্য দিয়ে নিজেদের রক্ষা করে চলেছে! আমার চোখে শুধু সেই হতভাগ্য আল আমিনের মুখটি ভেসে উঠছে যে তাঁর মাকে ধর্ষিত হতে দেখেছে ।

গুলি খাওয়া রাস্তায় পরে থাকা নিথর মানুষগুলো যেন রক্ষা পেলো এমন একটি বর্বর দেশে বেঁচে থাকার নামে তিলে তিলে মৃত্যুবরণ করার যন্ত্রণা থেকে । তারও দুদিন আগে জানলাম এই পুলিশ বাহিনী একটি অভিযোগের ভিত্তিতে কয়েকজন যুবকদের গ্রেফতার করেছে মানবপাচারকারী বা শিশু পাচারকারি হিসেবে অথচ ঐ যুবকরা ছিন্নমুল পথশিশুদের একটু আশ্রয়, একটু শিক্ষার আলো দিতে চেয়েছিল । সেই যুবকদের ‘মজার ইশকুল’ নামে একটি ফেসবুক পেজও আছে , ভাবতে ভালোই লাগছে যে শিশু পচারকারিরা ফেসবুক পেইজে আপডেট দিয়ে শিশু পাচারের কথা বলতো! কি অদ্ভুত আমাদের রাষ্ট্রশক্তি ও তার বাহিনীরা যেখানে মানুষের জানমালের নিরাপত্তা ও অপরাধীদের ধরার কথা সেখানে উল্টো রাষ্ট্রীয় বাহিনী দিনের পর দিন অন্যায় ,অপরাধ করেই যাচ্ছে ।

লাখো শহীদের রক্তে পাওয়া প্রিয় স্বাধীন বাংলাদেশকে আমরা কি কাপুরুষের মতো ধ্বংস হয়ে যেতে দেখবো নাকি সত্যি সত্যি মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বাংলাদেশি হিসেবে বুকের তাজা রক্ত দিয়ে এই দেশটাকে রক্ষা করবো সেটা নিয়ে আজ আমাদের ভাবতে হবে।

লক্ষ শহীদের অভিশাপে রক্তাক্ত আজ টাঙ্গাইলসহ পুরো বাংলাদেশ। সিরিয়ার আইএস এর মতো নিকৃষ্ট হয়ে উঠেছে বর্তমান শাসকশ্রেণি । ১৯৪৭ থেকে মুক্তিযুদ্ধের আগ পর্যন্ত আন্দোলন সংগ্রামেও পাকিস্থানী হায়েনারা গুলি করে এতো মানুষ মারেনি যা গত সাড়ে ৬ বছরে শোষক শ্রেণির গুলিতে মানুষ মরেছে । আর না হয় এবার গুলি খেয়ে মরবো নাহয় জালিমের বিরুদ্ধে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়বো । কিন্তু যুদ্ধটা করবো কাদের নিয়ে? একা একা তো যুদ্ধ করা যায়না, এই দেশে আজ সবাই কাপুরুষ। কাপুরুষদের নিয়ে যুদ্ধ করবো কি করে সেটাই ভাবছি ।

এবার একটু পেছন ফিরে দেখি তো এই রাষ্ট্র কবে থেকে এতো ‘বর্বররাষ্ট্র’ পরিণত হয়েছে । স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাস যদি লক্ষ্য করেন তাহলে দেখবেন স্বাধীনতা যুদ্ধের আগ পর্যন্ত বর্বর পাকিস্থানিরা মাতৃভাষা ও স্বাধীনতার বিভিন্ন আন্দোলন সংগ্রাম দমাতে গুলি করে এতো মানুষ মারেনি যা গত ৬ বছরে এই স্বাধীন ও তথাকথিত গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় বাহিনী মেরেছে । খোদ রাষ্ট্রশক্তি যেখানে দেখা মাত্র গুলির নির্দেশ দিতে পারে সেখানে রাষ্ট্রীয় বাহিনী গুলি করতে দ্বিধা করবে না সেটাই স্বাভাবিক । আর যেদিন থেকে রাষ্ট্রশক্তি সাধারন জনতার উপর দেখা মাত্র গুলির নির্দেশ দিয়েছে সেদিন থেকে এই দেশ আর ‘গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র’ হিসেবে নিজেকে দাবী করতে পারেনা । ২০১৩ সালে যুদ্ধঅপরাধের বিচারে ফাঁসির আদেশ প্রাপ্ত মাওলানা দেলোয়ার হোসেন সাঈদীর ফাঁসির রায়ের প্রতিবাদে ফুঁসে উঠা বিক্ষুব্ধ ৬০ জন কে পুলিশ গুলি করে হত্যা করে । তাঁদের অপরাধ ছিল একজন মাওলানার ফাঁসির রায়ের প্রতিবাদ করা এবং যারা সকলেই সেদিন মিডিয়া ও শোষকের গোষ্ঠীর প্রচার প্রচারনায় দেশ বিরোধী ধর্মীয় মৌলবাদী অপশক্তি ও জামায়াত ইসলামের পক্ষের মানুষ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয় যার ফলে ঐ ৬০ জন মানুষকে গুলি করে মেরে ফেলা জায়েজ হয়ে যায় এবং সাধারন জনগণও এই নিয়ে আর মাথা ঘামায়নি ।ধর্মীয় মৌলবাদী গোষ্ঠী সেদিন মাওলানা সাঈদিকে চাঁদে দেখা গেছে বলে যে অপ্রচার চালিয়ে সাধারন ধর্মপ্রাণ মানুষকে রাস্তায় নামিয়ে এনেছিলেন সেটা যেমন দণ্ডনীয় অপরাধ তেমনি পুলিশ প্রতিবাদী ৬০ জন মানুষকে গুলি করে মেরেছে সেটাও অপরাধ। দুটো পক্ষকেই সেদিন আসামির কাঠগড়ায় হাজির করা উচিৎ ছিল যা সেদিন আমরা করিনি বরং মিডিয়া ও শোষক শ্রেণীর নতুন খেলা ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা’য় আমরা বুঁদ হয়ে ছিলাম । চেতনায় বুঁদ হয়ে থাকা একটি ঘটনা আমরা সবাই এড়িয়ে গেছি যা হলো পরবর্তীতে যুদ্ধঅপরাধের বিচারে দণ্ডপ্রাপ্ত ফাঁসির আসামী মাওলানা দেলোয়ার হোসেন সাঈদী’র ফাঁসির রায় কার্যকর না রেখে আপিল বিভাগ সেটাকে আমৃত্যু কারাগারে রাখার নির্দেশ দেন যা নিয়ে চেতনার পূজারী নামের মুক্তিযুদ্ধের ব্যবসায়ীপক্ষ, শোষক শ্রেণি কেউই বড় ধরণের কোন প্রতিবাদে নামেনি এবং রায়টিকে ফাঁসিতে বহাল রাখতে পারেনি । কারণ শোষক শ্রেণী ও মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের ব্যবসায়ী শ্রেণীর মাঝেই সাঈদী রাজাকার কিনা সেটা নিয়েও বিভেদ আছে আর তাই ফাঁসির রায় বহাল রেখে নিজেদের বিপদ নিজেরা ডেকে আনতে চায়নি ।

মাওলানা দেলোয়ার হোসেন সাঈদী মুক্তিযুদ্ধের সময় রাজাকার ছিলেন কি ছিলেন না সেটা নিয়ে বিতর্ক আছে কিন্তু এই মাওলানা দেলোয়ার হোসেন সাঈদির যে ধর্মপ্রান সব দল মতের মানুষের মাঝে ব্যাপক জনপ্রিয়তা আছে সেটা নিয়ে কোন সন্দেহ নাই , কোন বিতর্ক নাই। আমি আমার নিজের চোখে (১৯৯৬-২০০০) সালে একাধিকবার দেখেছি সিলেটের আলিয়া মাদ্রাসা ময়দানে মাওলানা দেলোয়ার হোসেন সাঈদির ওয়াজ মাহফিলে স্থানীয় আওয়ামীলীগের একাধিক নেতাকে , তবে কি ধরে নিবো সাঈদী সেদিন পর্যন্ত ‘রাজাকার’ ছিলেন না ? একই বছরে ৫ই মে রাতে মতিঝিল শাপলা চত্বরে হেফাজত ইসলামের হাজার হাজার বিক্ষুব্ধ কর্মীদের সরাতে আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী রাতের আঁধারে কতজনকে গুলি করে মেরেছে তার কোন সঠিক হিসাব আমরা আজো জানিনা । তবে এইটুকু বুঝতে পারি যে এতোজন বিক্ষুব্ধ কর্মীদের দখলে থাকা মতিঝিলের শাপলা চত্বরটি আইন শৃঙ্খলার রক্ষাকারী বাহিনী যে আদর করে করে হঠিয়ে নিজেদের দখলে নেয়নি। সেই এলাকার খুব কাছেই আমার বড় চাচার বাসা । সেই রাতের ঘটনা তাঁদের মুখে শুনেছিলাম যে অনবরত বৃষ্টির মতো গুলি ও আকাশে হেলিকাপ্তারের শব্দে সেই রাতে উনারা ঘুটঘুটে অন্ধকারে বিভীষিকাময় , আতংকের এক রাত্রি পার করেছিলেন । সেই ঘটনাও সফলতার সাথে ধামাচাপা দেয়া হয়ে গেলো যা শোষক শ্রেণীর বিরাট এক সাফল্যও বটে।

এই যে এতোগুলো মানুষকে হত্যা করা হয়েছিল সেই হত্যার কি কোন বিচার আমরা করতে পেরেছিলাম ? না করতে পারিনি বরং সেই হত্যার জন্য শোষক শ্রেণীকে বাহবা দিয়েছিলাম যার ফলে শোষক শ্রেণী বিরোধী দলের আন্দোলনে এবার আরও সাহসী ভূমিকায় ঘোষণা করেছিলেন ‘দেখা মাত্র গুলি করা হবে’ যা আজো চলছে এবং চলবে ততদিন যতদিন এই রাষ্ট্রের মানুষগুলো কাপুরুষ হয়ে থাকবে ।

যে রাষ্ট্র ক্ষমতায় জনগণের ভোট না পাওয়া শক্তি অধিষ্ঠিত থাকে সেইদেশের ‘শাসক’ রাষ্ট্র ও সাধারন জনগণের পক্ষে নয় এটা প্রমাণ করার জন্য আপনাকে পণ্ডিত হওয়ার প্রয়োজন নেই । এটা ধ্রুব সত্য যারা জনগণের রায় ছাড়া জোরজবরদস্তি করে ক্ষমতায় আসে তাঁরা জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠা ও জানমালের নিরাপত্তা নিয়ে চিন্তিত নয় । তাঁরা যে কোন উপায়েই ক্ষমতায় থাকাটা নিয়ে সর্বদা চিন্তিত থাকে এতে যদি হাজার জনতার লাশ ফেলে দাবী আদায়ের আন্দোলন স্তব্ধ করা যায়, জনগণকে রাজপথে নামানো থেকে বিরত রাখা যায় তাতেই ওরা সন্তুষ্ট এবং সেটাকেই ওরা সাফল্য হিসেবে প্রচার করে ।

এই অনির্বাচিত শাসকের সাথে যুক্ত হয়েছে আমাদের চাটুকার , দালাল মিডিয়া বা গণমাধ্যম যারা শোষকের কাছ থেকে অন্যায় সুবিধা নিয়ে শোষকের পক্ষে কথা বলছে, যারা শোষকের অন্যায় অবিচারগুলোর বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ার চেয়ে শোষকের চাটুকারিতায় ব্যস্ত যার ফলে সাধারন মানুষ আজ বিভ্রান্ত, দ্বিধাবিভক্ত এবং এই দ্বিধাবিভক্তিটা গত কয়েক বছরে সুকৌশলে শোষকশ্রেণী ও চাটুকার মিডিয়া প্রতিষ্ঠিত করে ফেলেছে । নির্বিচারে মানুষ হত্যা করা যদি ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা’ হয় তাহলে লক্ষ শহীদ যারা রক্ত দিয়ে আমাদের এই স্বাধীন দেশ দিয়েছিলেন তাঁদের অভিশাপে আমরা অভিশপ্ত জাতি হিসেবে আজ ধ্বংসের দিকে এগিয়ে যাচ্ছি তা নিয়ে কোন সন্দেহ নাই ।

টাঙ্গাইলের ঘটনাটা লক্ষ শহীদের সেই অভিশাপের ফসল। লক্ষ শহীদের কান্না আজ আকাশে বাতাসে ধ্বনিত হচ্ছে যে এই দেশটাতে আজ আর কোন সাহসী মানুষ নাই যারা দিনের পর দিন চলতে থাকা এতো অন্যায়ের প্রতিবাদ করার সাহস পায়না । যারা ১৫ কোটি মানুষের পক্ষে কথা বলতে সাহস পায়না। যারা স্বাধীন রাষ্ট্রটিকে তিলে ধ্বংস করে দিচ্ছে সেই দেশবিরোধী মানুষদের বিরুদ্ধে গর্জে উঠার সাহস পায়না। এমন কাপুরুষদের জন্য শহীদেরা নিশ্চয়ই সেদিন রক্ত দেয়নি?

সবশেষে এইটুকু বলবো যে আজ শোষক শ্রেণী ও তাঁদের চাটুকার ছাড়া প্রতিটি মানুষের জীবন বন্দুকের নলের মধ্যে গিয়ে ঠেকেছে । বন্দুকের নল দিয়েই এই রাষ্ট্র আজ পরিচালিত হচ্ছে সেখানে আমি আপনি কেউই নিরাপদ নয় । আমার এই লিখাটি পড়ে যদি ভালো বা খারাপ যাই লাগে আপনাদের কাছে বিনীত অনুরোধ আপনারা এই লিখাটি নিয়ে কোন উচ্চবাচ্য করবেন না বা লাইক শেয়ার দিবেন না। কারণ এতে আপনাদের কিছু হবে না বরং আমি শোষকের চক্ষুশিল হয়ে নির্যাতিত হতে পারি । হতে পারি সন্ত্রাসী হিসেবে ক্রস্ফায়ারের শিকার যার কোন মূল্য আপনাদের কাছে নেই। বরং আমার দুখিনী মা বাবা তাঁদের এক সন্তান হারাবে আর কারো কিছু যায় আসবে না। কেউ প্রতিবাদ করে শোষকের মসনদ কাঁপিয়ে দিবে না । কারণ এই দেশটা আজ কাপুরুষ ,ভীরু মানুষদের দেশে পরিণত হয়েছে যাদের জন্য প্রান দিয়ে কোন লাভ নেই ।আমি জননী জন্মভুমির জন্য রক্ত দিতে চাই কিন্তু কাপুরুষদের জন্য রক্ত দিতে চাইনা। বন্দুকের নলের মুখে কাপুরুষের মতো অনেকদিন বেঁচে থেকে জননী জন্মভূমি বাংলাদেশকে বারবার ধর্ষিত হতে দেখার চেয়ে মায়ের জন্য রক্ত দিয়ে মৃত্যু বরণ করাটা অনেক গর্বের যা কাপুরুষ, ভীরু, অন্ধ চাটুকারেরা কোনদিন বুঝবে না আর আমাদের মুক্তিও মিলবে না । একটা অনির্বাচিত শোষকের পাহাড়সম অন্যায়ের বিরুদ্ধে যারা গর্জে উঠতে জানেনা সেই ভীরু কাপুরুষদের দেশে টাঙ্গাইলের মতো ঘটনা ঘটবে ,আরও একাধিকবার ঘটবে যা ভীরু কাপুরুষদের দেশে এমনই বরাবর হয়ে থাকে ।

লাখো শহীদের রক্তে পাওয়া প্রিয় স্বাধীন বাংলাদেশকে আমরা কি কাপুরুষের মতো ধ্বংস হয়ে যেতে দেখবো নাকি সত্যি সত্যি মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বাংলাদেশি হিসেবে বুকের তাজা রক্ত দিয়ে এই দেশটাকে রক্ষা করবো সেটা নিয়ে আজ আমাদের ভাবতে হবে।

২০ সেপ্টেম্বর ২০১৫
শিরোনাম ডট কম পোর্টালে প্রকাশিত মতামত লেখকের ব্যক্তিগত যা সম্পাদকীয় নীতির আওতাভুক্ত নাও হতে পারে।

শিরোনাম ডট কম
শিরোনাম ডট কম । অনলাইন নিউজ পোর্টাল Shironaam Dot Com । An Online News Portal
http://www.shironaam.com/

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *