রাজউকের উচ্ছেদ: মামলা করলেন মওদুদ
জাতীয়

রাজউকের উচ্ছেদ: মামলা করলেন মওদুদ

রাজউকের উচ্ছেদ: মামলা করলেন মওদুদতিন দশক ধরে থাকা বাড়ির দখল অবৈধ ঘোষণার পর গুলশানের বাড়ি থেকে বিএনপি নেতা মওদুদ আহমদকে উচ্ছেদ করেছে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ রাজউক। বাড়ির সমস্ত মালামাল ট্রাকে করে সরিয়ে নেয় রাজউক।

পেশায় আইনজীবী বিএনপির এই নেতা তখন ছিলেন আদালতে। খবর পেয়ে ছুটে যান গুলশানের ১৫৯ নম্বর বাড়িতে।

বাড়িতে ঢুকতে গিয়ে পুলিশ ও রাজউক কর্মকর্তাদের বাধার মুখে পড়েন তিনি। বাধার মুখে ঢুকতে না পেরে কয়েক মিনিট এদিক-ওদিক করে ফুটপাতে রাখা বেতের সোফায় বসে পড়েন মওদুদ। অনেকটা মলিন ও হতাশ চেহারায় ওই চেয়ারে বসেই সাংবাদিক,পুলিশ ও রাজউক কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলেন। প্রায় পৌনে দুই ঘণ্টা পর বিকাল সোয়া চারটায় পুলিশের সঙ্গে শেষবারের মতো বাড়িতে ঢোকেন মওদুদ। কয়েক মিনিট পর আবার বেরিয়ে আসেন।

এসময় সেখানে উপস্থিত সাংবাদিকদের কাছে তিনি ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করেন। হতাশ ও ক্ষুব্ধ কণ্ঠে মওদুদ আহমদ বলেন, বর্তমানে দেশে যে বিচার বলে কিছু নাই এটা তার বাস্তব উদাহরণ।

এখন কি করবেন- সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, আমার মতো নাগরিকের আর কি করার আছে। এখন রাতে ফুটপাতে ঘুমাবো।

উল্লেখ্য, আদালতের রায়ের পর বুধবার (৭ জুন) দুপুর ২ টায় ওই বাড়িটিতে অভিযান শুরু করে রাজউক। মওদুদ আহমদের আপত্তি সত্ত্বেও তার বাড়ির মালপত্র সেখান থেকে বের করে আনা হয়।

নিজেকে ভাড়াটিয়া দাবি করে মামলা
রাজধানীর গুলশানের বাড়িটিতে নিজেকে ভাড়াটিয়া দাবি করে ঢাকার আদালতে মামলা করেছেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ।

বুধবার ঢাকার প্রথম যুগ্ম জেলা জজ উৎপল ভট্টাচার্যের আদালতে বাড়ি ভাড়া নিয়ন্ত্রণ আইনে মওদুদ এই মামলা করেন।

মামলায় এহসান-ইনজি দম্পতির ছেলে করিম ফারনাজ সোলাইমান, রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক), গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সচিব ও ঢাকা জেলার প্রশাসককে বিবাদী করা হয়।

এ বিষয়ে বিএনপির আইনজীবী সৈয়দ জয়নুল আবেদিন মেজবাহ বলেন, বিচারক মামলাটি আমলে নিয়ে বিবাদীদের বিরুদ্ধে সমন জারি করেছেন।

মামলার আরজি থেকে জানা যায়, ১৯৮১ সালে তিনি ভাড়াটিয়া হিসেবে চুক্তিবদ্ধ হন। তখন থেকেই বাড়িটি তাঁর দখলে আছে। বাড়িটি ভাড়া নেওয়ার পর প্রায় দুই কোটি টাকার বেশি টাকা ব্যয়ে উন্নয়নকাজ করেছেন তিনি। রাজউক, গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়, ঢাকা জেলা প্রশাসন যাতে বাড়িটি দখল করতে না পারে, এ জন্য ওই বাড়ির ভাড়াটে হিসেবে স্থায়ী নিষেধাজ্ঞার আবেদন করেন তিনি।

আরজিতে আরে বলা হয়, পাকিস্তানি নাগরিক মো. এহসান তৎকালীন ডিআইটিতে (বর্তমান রাজউক) অ্যালটমেন্ট বা বরাদ্দ চেয়ে আবেদন করেন। ডিআইটি মো. এহসানের স্ত্রী জার্মান নাগরিক ইনজি স্লাজের নামে বাড়িটি বরাদ্দ দেন। ১৯৮১ সালে গুলশানের ওই বাড়ির মালিক ইনজি স্লাজ প্রয়াত প্রধান বিচারপতি মাইনুর রেজা চৌধুরীকে আমমোক্তারনামা করে দেন। আমমোক্তারামার ক্ষমতা ১৯৮৪ পর্যন্ত বহাল ছিল।

মওদুদের বাসার সামনে খালেদা জিয়া

রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) নিয়ন্ত্রণে নেয়া ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদের গুলশানের বাসার সামনে হাজির হয়েছেন বিএনপি চ্যারপার্সন বেগম খালেদা জিয়া।

বুধবার সন্ধ্যা ৮টার দিকে তিনি সেখানরে হাজির হন।

খালেদা জিয়া বলেন, ‘আজকে যাকে-তাকে বাড়ি থেকে বের করে দেয়া হচ্ছে। মওদুদের সঙ্গে কী আচরণই না করছে? অথচ তাদের (আওয়ামী লীগ) নেতাকর্মীরা যার-তার বাড়ি দখল করছে, কিন্তু যাদের বাড়ি তাদেরকে ফিরেয়ে দিচ্ছে না।’

তিনি বলেন, ‘মওদুদ আহমদ ৩০ বছর ওই বাড়িতে আছেন। আজকে তাকে রাস্তায় বের করেছে। আমিও যে বাড়ি ৪০ বছর বসবাস করেছি, সে বাড়ি থেকে আমাকেও এক কাপড়ে বের করে দিয়েছে। তারা যে বাড়ি ঘর দখল করছে তা জনগণ দেখেছে। তাদেরকেও জনগণ এক কাপড়ে বিদায় করে দেবে। এরাও ভালো ভাবে থাকতে পারেব না।’

খালেদা জিয়া বলেন, ‘দেশে কি অবস্থা সবাই জানেন। দেশের অবস্থা মোটেও ভালো নয়। যারা ক্ষমতায় বসে আছে তারা জোর করে গায়ের জোরে আছে। পুলিশ ও বিভিন্ন সংস্থা ব্যবহার করে তারা ক্ষমতায় বসে আছেন। মানুষের দুরাবস্থার দিকে নজর নেই তাদের। দেশের মানুষ ভালো খেতে পারে না। দেশের বেশিভাগ মানুষ বেকার, তারপরও এরা (আওয়ামী লীগ) বড় বড় কথা বলে। তারা মিথ্যা কথা বলে টিকে আছে।’

আসবাবপত্র নেওয়া হচ্ছে স্ত্রীর মালিকানাধীন বাড়িতে
উচ্ছেদের পর বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদের আসবাবপত্র নেওয়া হচ্ছে স্ত্রীর মালিকানাধীন বাড়িতে।

ব্যারিস্টার মওদুদ বলেন, ‘আমি এ মুহূর্তে বেশি কথা বলতে পারছি না। জিনিসপত্র আপাতত আমার স্ত্রীর গুলশানের ২-এর ৮৪ নম্বর বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে।’ স্ত্রী হাসনা জে আহমদের বাড়িটি উচ্ছেদ হওয়া বাড়িটির পাশে।

বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে এ বিষয়ে গুলশান থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবু বকর সিদ্দিক জানান, ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদের গুলশানের বাসায় উচ্ছেদ অভিযান এখনো চলছে। তাঁর বাসার বিদ্যুৎ, পানি ও গ্যাস সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে। বাসার আসবাবপত্র দুটি বাড়িতে সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে। এর মধ্যে তাঁর একটি হচ্ছে শ্বশুড়বাড়ি এবং অপর বাড়িটির কথা জানা নেই বলে জানান ওসি।

গত ৪ জুন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদের গুলশানের বাড়ির মালিকানা বিষয়ে করা রিভিউ খারিজ করে দেন আপিল বিভাগ।

গত বছর ২ আগস্ট মওদুদ আহমদের ভাই মনজুর আহমদের নামে ওই বাড়ির নামজারির নির্দেশ দিয়ে হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে রাজউকের আপিল গ্রহণ করেন আপিল বিভাগ।

গত ৩০ আগস্ট এ মামলার ৮০ পৃষ্ঠার পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশিত হয়। সেই রায়ের বিরুদ্ধে পরে রিভিউ করেন মওদুদ।

এক আবেদনের শুনানি নিয়ে ২০১০ সালের ১২ আগস্ট ওই বাড়ি মনজুর আহমদের নামে মিউটেশন করার জন্য হাইকোর্ট রায় দেন। রাজউক এ রায়ের বিরুদ্ধে ‘লিভ টু আপিল’ দায়ের করে ২০১১ সালের ৩ ফেব্রুয়ারি। ২০১৪ সালের ৯ মার্চ আপিল বিভাগ রাজউককে আপিলের অনুমতি দেন। এরপর চলতি বছর এ মামলার শুনানি শেষে রায়ের জন্য অপেক্ষমাণ রাখেন।

২০১৩ সালের ১৭ ডিসেম্বর বাড়িটি নিয়ে দুদকের উপপরিচালক হারুনুর রশীদ রাজধানীর গুলশান থানায় মওদুদ আহমদ ও তাঁর ভাই মনজুর আহমদের বিরুদ্ধে মামলা করেন।
২০১৪ সালের ১৪ জুন এ মামলায় অভিযোগ আমলে নেন বিচারিক আদালত। এর বিরুদ্ধে তাঁদের আবেদন গত বছরের ২৩ জুন খারিজ করে দেন হাইকোর্ট।

পরে হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে ‘লিভ টু আপিল’ করেন মওদুদ আহমদ। এ আবেদনের শুনানি শেষ হওয়ার পর রায়ের জন্য অপেক্ষমাণ রাখেন আপিল বিভাগ। মঙ্গলবার দুটি বিষয়ে রায় দেন আপিল বিভাগ।

দুদকের করা মামলার অভিযোগে বলা হয়, বাড়িটির প্রকৃত মালিক ছিলেন পাকিস্তানি নাগরিক মো. এহসান। ১৯৬০ সালে তৎকালীন ডিআইটির (রাজউক) কাছ থেকে এক বিঘা ১৩ কাঠার এ বাড়ির মালিকানা পান এহসান। ১৯৬৫ সালে বাড়ির মালিকানার কাগজপত্রে এহসানের পাশাপাশি তাঁর স্ত্রী অস্ট্রীয় নাগরিক ইনজে মারিয়া প্লাজের নামও অন্তর্ভুক্ত হয়।

১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে স্ত্রীসহ ঢাকা ত্যাগ করেন এহসান। তাঁরা আর ফিরে না আসায় ১৯৭২ সালে এটি পরিত্যক্ত সম্পত্তির তালিকাভুক্ত হয়।

১৯৭৩ সালের ২ আগস্ট মওদুদ তাঁর ইংল্যান্ডপ্রবাসী ভাই মনজুরের নামে একটি ভুয়া আমমোক্তারনামা তৈরি করে বাড়িটি সরকারের কাছ থেকে বরাদ্দ নেন বলে মামলায় অভিযোগ করে দুদক।

শিরোনাম ডট কম
শিরোনাম ডট কম । অনলাইন নিউজ পোর্টাল Shironaam Dot Com । An Online News Portal
http://www.shironaam.com/

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *