গণমানুষের নেতা মহিউদ্দিন চৌধুরীর ইন্তেকাল
জাতীয়

গণমানুষের নেতা মহিউদ্দিন চৌধুরীর ইন্তেকাল

গণমানুষের নেতা মহিউদ্দিন চৌধুরীর ইন্তেকাল চট্টলার বীর, গণমানুষের নেতা মহিউদ্দিন চৌধুরী ইন্তেকাল করেছেন। ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন। বৃহস্পতিবার দিবাগত রাত সাড়ে ৩টার দিকে চট্টগ্রামের ম্যাক্স হাসপাতালে তিনি ইন্তেকাল করেন। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৭৪ বছর।

বড় ছেলে ব্যারিস্টার মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল সাবেক মেয়রের মৃত্যুর খবরটি গণমাধ্যমকে নিশ্চিত করেন। এর আগে ম্যাক্স হাসপাতাল এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক ডা. লিয়াকত আলী খান রাত সাড়ে ৯টায় বলেন, মহিউদ্দিন চৌধুরীর অবস্থা খুবই সংকটাপন্ন তাকে লাইফ সাপোর্টে রাখা হয়েছে। ওখানে ভর্তি করার পর মহিউদ্দিন চৌধুরীর বড় ছেলে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক ব্যারিস্টার মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়ে পিতার সুস্থতার জন্য সবার কাছে দোয়া চান।

শুক্রবার বাদ আসর চট্টগ্রামের লালদিঘি ময়দানে তার জানাজা অনুষ্ঠিত হবে। পরে চশমা হিলের পারিবারিক কবরস্থানে তাকে দাফন করা হবে। মহিউদ্দিন চৌধুরীর বড় ছেলে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল এসব তথ্য গণমাধ্যমকে নিশ্চিত করেন।

১১ নভেম্বর রাতে বুকে ব্যথা অনুভব করায় মহিউদ্দিন চৌধুরীকে চট্টগ্রামের মেহেদিবাগ ম্যাক্স হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। আইসিইউতে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে একরাত রাখার পর ১২ নভেম্বর দুপুরে তাকে হেলিকপ্টারযোগে ঢাকায় স্কয়ার হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।

১৬ নভেম্বর উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে সিঙ্গাপুরে নেয়া হয়। সিঙ্গাপুরের অ্যাপোলো গি্লনিগ্যালস হসপিটালে মহিউদ্দিন চৌধুরীর এনজিওগ্রাম ও হার্টের দুটি ব্লকে রিং বসানো হয়।

১১ দিন চিকিৎসা শেষে ২৬ নভেম্বর তিনি ঢাকায় ফিরে কিডনি ডায়ালাইসিসের জন্য স্কয়ার হাসপাতালে ভর্তি হন। সিঙ্গাপুর ও ঢাকায় এক মাস চিকিৎসা শেষে ১২ ডিসেম্বর তিনি চট্টগ্রাম ফিরে আসেন।

চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাবেক সিটি মেয়র এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরী তিনবার বন্দরনগরী চট্টগ্রামের মেয়র নির্বাচিত হন। সবশেষ চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন মহিউদ্দিন চৌধুরী।

মহিউদ্দিন চৌধুরী ১৯৪৪ সালে ১ ডিসেম্বর চট্টগ্রামের রাউজানের গহিরায় জন্মগ্রহণ করেন। বাবার নাম মরহুম হোসেন আহমদ চৌধুরী, আর মাতা মরহুম বেদৌরা বেগম। আট ভাইবোনের মাঝে মহিউদ্দিন মেঝ।

পিতা চাকরি করতেন আসাম বেঙ্গল রেলওয়েতে। বাবার চাকরির সুবাদে মহিউদ্দিন পড়াশোনা করেছেন মাইজদি জেলা স্কুল, কাজেম আলি ইংলিশ হাই, আর প্রবর্তক সংঘে। স্কুল জীবনেই জড়িয়ে পড়েন ছাত্রলীগের রাজনীতিতে। মাধ্যমিকের শেষে বাবার আদেশে ভর্তি হয়ে ছিলেন ডিপ্লোমা ইন্জিনিয়ারিংয়ের কোর্সে। সেখানের পাঠ না চুকিয়ে ভর্তি হন চট্টগ্রামের অন্যতম বিদ্যাপিঠ চট্টগ্রাম কলেজে। বছর না ঘুরতেই কমার্স কলেজ, পরে সিটি কলেজ। সিটি কলেজেই তার বিপ্লবী রাজনৈতীক জীবনের হাতেখড়ি। পরবর্তীতে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক এবং স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন।

মানুষের সেবায় সারাজীবন কাজ করে যাওয়া মহিউদ্দিন চৌধুরী ছাত্রজীবনেই রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন। রাজনৈতিক জীবনের শুরতেই সান্নিধ্যে আসেন জননেতা জহুর আহমদ চৌধুরীর। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ডাকে আন্দোলন-সংগ্রামে অংশ নিতে গিয়ে পাক বাহিনীর কাছে গ্রেফতার হন অসংখ্যবার।

মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিতে গিয়ে পাকিস্তানি নৌবাহিনীর চট্টগ্রাম নেভাল একাডেমি সদর দফতরের কাছে গ্রফতার হয়ে অমানুষিক নির্যাতনের শিকার হন দীর্ঘ চার মাস। তার গ্রেফতারের খবরে ততদিনে ভারতের একটি মুক্তিযোদ্ধা শিবিরে শহিদ মহিউদ্দীন ক্যাম্প খোলা হয়েছিল। বেঁচে থাকার কথা ছিল না তার। শহীদ ভেবে বাবা ছেলের নামে দিয়েছিল ফাতেহা। এরি মাঝে একদিন মানসিক রোগীর নাটক করে চট্টগ্রাম কারাগার থেকে পালিয়ে বের হন মহিউদ্দিন। পাড়ি জমান ভারতে। সেখানে সশস্ত্র প্রশিক্ষণ শেষে সক্রিয়ভাবে সম্মুখসমরে অংশ নেন। ছিলেন ভারত-বাংলা যৌথবাহিনীর মাউন্টেন ডিভিশনের অধীনে।

দেশ স্বাধীনের পর বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে জহুর আহমদ চৌধুরীর নেতৃত্বে ঝাপিয়ে পড়েন নতুন সংগ্রামে। জীবনের একটি বড় সময় কেটেছে তার শ্রমিক আন্দোলনে। পরবর্তীতে নিজেকে দাঁড় করান রাজনীতির বৃহত্তর আঙিনায়। সিক্ত হয়েছেন বঙ্গবন্ধুর স্নেহ ও ভালোবাসায়। কিন্তু তৎকালীন সময়ে প্রবল ক্ষমতাশালী হয়েও ক্ষমতার মোহ একচুলও স্পর্শ করেনি তাকে।

পঁচাত্তরে জাতির পিতার হত্যার পর অসীম সাহসে রাজপথ কাঁপিয়ে দেন মহিউদ্দিন। জেলজুলুম সহ্য করেই লড়ে গেছেন। কয়েকবছর ভারতে নির্বাসনে থাকার পর আবারও সরব হন রাজনীতিতে।

চট্টগ্রামের মেয়র হিসেবে অবিসংবাদিত নাম মহিউদ্দিন চৌধুরী। প্রথম নির্বাচিত হন ১৯৯৪ সালে। সেবা আর আস্থার প্রতিদান হিসেবে টানা তিনবার তাকে মেয়র নির্বাচিত করেন বন্দরনগরীর বাসিন্দারা। উন্নয়ন ও সংস্কারের ছোঁয়ায় বন্দরনগরীকে বদলে দেয়া এই মানুষটি চট্টগ্রামের প্রশ্নে ছিলেন আপোসহীন। আমৃত্যু ছিলেন চট্টলবাসীর পাশেই। মানুষের দুঃসময়ে আর অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে মহিউদ্দিন চৌধুরীর কন্ঠ ছিল সোচ্চার।

১৯৯১ সালে প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড়ের পর যত্রতত্র ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিলো অগণিত বেওয়ারিশ মরদেহ। ওইসব লাশ নিয়ে যখন ভাবার সময় নেই কারও, তখন একের পর এক তুলে নেন নিজের কাঁধে। কবরস্থ করার ব্যবস্থাও করেন।

সেই থেকে মানুষ চিনতে থাকে তাঁদের আসল নেতাকে। নির্যাতিত, নিপীড়িত পরাজিত গণমানুষের কাছে এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরী হয়ে ওঠেন ভরসার প্রতীক। সেই গণমানুষেরাই নেমে এসেছিলেন রাজপথে। মানুষের মণিকোঠায় মহিউদ্দিন চৌধুরী যেভাবে গেঁথে গেছেন, তা আর কখনও ধূলোয় মিশে যায়নি।

সেনাশাসিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় তাঁর মেয়ে ফৌজিয়া সুলতানা টুম্পা ক্যান্সারে আক্রান্ত। চিকিৎসকেরাও হাল ছেড়ে দিয়েছিলেন। কারাভ্যন্তরে থাকা মহিউদ্দিন চৌধুরীর প্যারোলে মুক্তি চেয়েছিলেন তাঁর স্ত্রী। তৎকালীন সরকারের এক উপদেষ্টা হাসিনা মহিউদ্দিনকে সোজা জানিয়ে দিয়েছিলেন, জীবনে আর রাজনীতি করবেন না— এমন বন্ডে সই করলেই কেবল মুক্তি মিলবে মহিউদ্দিন চৌধুরীর। ২০০৮ সালের ১৭ অক্টোবর প্রিমিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের ছাত্রী টুম্পা ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। মেয়ের মৃত্যুর সময় পিতা হিসেবে তার শিয়রে থাকতে না পারার মানসিক যন্ত্রণার কথা সবসময় বলেন মহিউদ্দিন।

চট্টগ্রামের কিংবদন্তি আওয়ামী লীগ নেতা এমএ আজিজ ও জহুর আহমদ চৌধুরী। তারা দুজনই ছিলেন বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ঠ সহচর। কেবল চট্টগ্রাম নয়, তারা বাংলাদেশের ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ। তাদের মৃত্যুর পর চট্টগ্রামের গণমানুষের নেতা হিসেবে আর কোন রাজনৈতিক নেতা গড়ে উঠেনি।

তবে এমএ আজিজ ও জহুর আহমদ চৌধুরীর পদাঙ্ক অনুসরণ করে যিনি চট্টল বীর উপাধীর পাশাপাশি চট্টগ্রামের সকল শ্রেণি পেশার মানুষের অভিভাবকে পরিণত হয়েছেন তিনি হলেন এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরী।

৭৪ বছর বয়সী মহিউদ্দিন চৌধুরী রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন ৫০ বছরের অধিক সময় ধরে।

আওয়ামী লীগ সরকারের বিভিন্ন সময়ে তিনি চট্টগ্রাম বন্দরসহ বিভিন্ন ইস্যু নিয়ে একাধিকবার আন্দোলনের ডাক দিয়েছেন। ২০১০ সালে তিনি বিএনপির প্রার্থী এম মঞ্জুরুল আলমের সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে মেয়র নির্বাচনে পরাজয় বরণ করলেও জনগণ থেকে কখনো বিচ্যুত হননি। শরীরের নানা রোগ-ব্যাধিকে উপেক্ষা করে অসীম সাহস, তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত আর জনগণের সুখ-দুঃখে পাশে থাকার মাধ্যমে তিনি সকল শ্রেণি পেশার মানুষের আপনজনে পরিণত হয়েছেন। বর্তমান চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দিন চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্বেও রয়েছেন। তারপরও নগরবাসীর স্বার্থবিরোধী যে কোন কর্মকাণ্ডের ক্ষেত্রে মহিউদ্দিন চৌধুরী মেয়রের কঠোর সমালোচনাসহ বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করে যাচ্ছেন। চট্টগ্রামে গৃহকর বৃদ্ধি নিয়ে তিনি সম্প্রতি সিটি করপোরেশনের বিরুদ্ধে আন্দোলনের ডাক দিয়েছেন। যে আন্দোলন এখনো অব্যাহত রয়েছে। এভাবে এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরী চট্টগ্রামের অভিভাবকের আসনে অধিষ্ঠিত হন।

Comments

comments

শিরোনাম ডট কম
শিরোনাম ডট কম । অনলাইন নিউজ পোর্টাল Shironaam Dot Com । An Online News Portal
http://www.shironaam.com/

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *