ব্লেইন গিবসন: রহস্য সমাধান যার নেশা

ব্লেইন গিবসন: রহস্য সমাধান যার নেশা

33
0
SHARE

ব্লেইন গিবসন: রহস্য সমাধান যার নেশা২০১৪ সালের মার্চ মাসের এক দুপুরে নিজের ঘরে হাজারো অতীত স্মৃতির ডালা খুলে বসেছিলেন ব্লেইন গিবসন (Blaine Gibson)। মা মারা যাওয়ার পর এই আট বছর ধরে একাই আছেন তিনি ক্যালিফোর্নিয়ার ছোট্টো কারমেল নামক অঞ্চলের ছোট্টো ওই ঘরটিতে। সিয়াটল থেকে মাঝে মাঝে কেউ আসলেও, খুব একটা কাছের মানুষ নেই গিবসনের। তবু আট বছর ধরে বৈচিত্র্যহীন জীবনকেই যেন একটু নাড়া দিতে হুট করেই কারমেলের ছোট্টো ঘরটি বিক্রি করার সিদ্ধান্ত নিলেন। বাক্সভর্তি ছবি, বিভিন্ন কাগজপত্র এবং একটি টিভিই রইলো শুধু তার সঙ্গী। গিবসন ওসব নিয়ে যখনই ভাবছিলেন তিনি জীবনে কি করতে পারেন সামনের দিনগুলোতে। ঠিক ওই সময়টাতেই মালয়েশিয়ার ফ্লাইট এমএইচ৩৭০ বিমানটি স্রেফ গায়েব হয়ে গেল অনেক যাত্রী নিয়ে।

‘আমার বাসায় বসে এই সংবাদ দেখে আমি মুহূর্তের মধ্যে হতভম্ব হয়ে গেলাম। বিমানটি দক্ষিণ চীন সাগরেও আছড়ে পরেনি। ওটা সরকারি মালয় পেনিনসুলা হয়ে ভারত মহাসাগরের কোথাও স্রেফ গায়েব হয়ে যায়। ওটা সত্যিই একটা রহস্যময় ঘটনা ছিল।’ বাসা বিক্রি করে দিয়ে সোজা সিয়াটলে চলে গেলেন গিবসন, কিন্তু এমএইচ৩৭০ বিমানটির রহস্য যেন তার মাথার মধ্যে রয়েই গেল। সিয়াটলে ফিরেও তিনি ওই বিমানটি সংক্রান্ত যাবতীয় তথ্য পড়তে এবং যাচাই বাছাই করতে লাগলেন। কিভাবে বিমানটি গায়েব হয়ে যেতে পারে, বিষয়টি দারুনভাবে ভাবিয়ে তোলে গিবসনকে এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে এসংক্রান্ত যত তথ্য তিনি পেলেন, তার সবই প্রায় পড়ে ফেললেন তিনি।

ভাবতে ভাবতেই একদিন গিবসন সিয়াটল বিমানবন্দরে গিয়ে সোজা মালয়েশিয়ার টিকিট কেটে বসলেন এবং ওই বিমানে থাকা যাত্রীদের পরিবারের সঙ্গে দেখা করলেন ও তাদের কথাগুলো শুনলেন। গ্রেস নামের এক মায়ের সঙ্গে তার কথা হয়েছিল, যাকে দেখে তার নিজের মায়ের কথা মনে হয়ে যায়। তিনি ভাবছিলেন, যেন তার নিজেরই মা সামনে এসে দাড়িয়ে নিখোজ সন্তানের জন্য আহাজারি করছেন। ‘অনেক পরিবারের কষ্টগাথা আমাকে সত্যিই ব্যথিত করে। আমি কোনোভাবেই চিন্তায় আনতে পারি না যে, প্রিয়জনের পরিণতি সম্পর্কে না জেনেও বছরের পর বছর তারা কি দুঃসহনীয় যন্ত্রনার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। আর তাই আমিই সিদ্ধান্ত নিলাম যে, নিজেই যাবো এর অনুসন্ধানে। কারণ আমি সবসময়ই ভাবতাম যে, যেস্থান থেকে বিমানটি নিখোঁজ হয়েছে সেখানে যদি কোনো ধ্বংসাবশেষ থেকে থাকে তবে তা স্রোতের টানে অনেকদূর পর্যন্ত চলে যেতে পারে।’

প্রায় এক বছর ধরে গিবসন মালয়েশিয়া থেকে শুরু করে মরিশাস-মালদ্বীপের সমুদ্র সৈকতগুলো খুঁজে দেখেন। তার সঙ্গে আরও অনেকেই যুক্ত হয়েছিল সেসময়। কিন্তু প্রায় হঠাতই একদিন মোজাম্বিকের সমুদ্র সৈকতে গিবসন এমন কিছু পদার্থ দেখতে পেলেন যা সেখানে থাকার কথা নয়। বালু থেকে জিনিসটি যখন তুললেন তখন দেখতে পেলেন ওটা তিনকোনো বিশিষ্ট একটি ধাতব পাত মাত্র। কিন্তু স্বাভাবিকভাবে ওই আকৃতির একটি ধাতব পদার্থের যে ওজন হবার কথা সেটা তারচেয়েও অনেক হালকা ছিল। পরবর্তীতে অবশ্য গবেষকরা জানালেন যে, সত্যিই ওটা এমএইচ৩৭০ বিমানের ধ্বংসাবশেষের খন্ডাংশ।

ওই ঘটনার তিনমাস পর আবারও সংবাদের শিরোনাম হলেন গিবসন। মাদাগাস্কারের সৈকতে তিনি খুঁজে পেলেন বিমানে থাকা টেলিভিশনের সম্মুখের অংশ। গিবসন যে সময়টায় ওই খন্ডাংশগুলো খুঁজে পাচ্ছিলেন তখন কিন্তু বেশ কয়েকটি দেশের সমন্বয়ে গঠিত অনুসন্ধানী দল সাগরে অভিযান চালিয়ে যাচ্ছিল বিমানটির সন্ধানে। অবশ্য গিবসন যে শুধু এই বিমানটির ব্যাপারেই আগ্রহী হয়ে এমন দেশ থেকে দেশে গুরে বেড়াচ্ছেন তা কিন্তু নয়। এর আগেও তিনি এমন কাজ করেছিলেন। ১৯৯৬ সালে তিনি তুংগুস্কা স্থানটি দেখার জন্য
রাশিয়াতে পর্যন্ত গিয়েছিলেন।

১৯০৮ সালে উল্কার কারণে সাইবেরিয়া অঞ্চলের ওই অংশে বিপুল বিস্ফোরণ হয়েছিল। সেই ঘটনা নিজের চোখে দেখেও আসতে গিয়েছিলেন তিনি।

এছাড়াও লস্ট আর্কের খোঁজে তিনি ইথিওপিয়াতেও গিয়েছিলেন। সেখান থেকে তিনি চলে গিয়েছিলেন মায়ান সভ্যতার খোঁজে। ‘আমি ইথিওপিয়াতে আর্ক খুঁজতে গিয়েছিলাম এবং তুংগুস্কায় গিয়েছিলাম ওই উল্কার সন্ধানে। কিন্তু আমি ওই দুই স্থানে কিছু না পেলেও, আমি অনেকটাই কাছাকাছি পৌছে গিয়েছিলাম। আমি ঘুরতে এবং রহস্যের সমাধান করতে ভালোবাসি। পাশাপাশি মানুষের জন্য ভালো কিছু করতেও আমার ভালোলাগে। এই ভালোলাগার জন্য আমাকে সমুদ্রবিজ্ঞান থেকে শুরু করে রাজনীর জ্ঞান পর্যন্ত নিতে হয়েছে।’

Comments

comments