বিচারপতিদের অবসরের পর রায় লেখা প্রসঙ্গে
মতামত

বিচারপতিদের অবসরের পর রায় লেখা প্রসঙ্গে

বিচারপতিদের অবসরের পর রায় লেখা প্রসঙ্গেকাজী এম এ আনোয়ার
কুলদীপ নায়ারের মতো ভারতের একজন স্বনামধন্য সংবাদিকের মতে নীতি বা পথ হারিয়ে অজানা গন্তব্যে বাংলাদেশ। তিনি হয়ত আজ ঢাকায় পৌঁছে বুঝতে পেরেছেন কিন্তু এই সত্যটা যুগ যুগ ধরে বাংলার আনাচে কানাচে নিভৃতে কেঁদে-কেটে বেড়াচ্ছে। মুক্তিযুদ্ধের বৈপ্লবিক চেতনাকে পুঁজি করে দেশীয় স্বার্থান্বেষী বামপন্থিরা অদৃশ্যপটে থেকে শেখ হাসিনাকে সামনে রেখে দেশের জাতীয় অস্তিত্ব ধ্বংস করে যাচ্ছে। বাংলাদেশ নামে মাত্র স্বাধীন। কার্যত কিছুই স্বাধীন না।

তৃতীয় বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতই বাংলাদেশের বিচার ব্যবস্থা এখনো স্বাধীনতার আস্বাদন নিতে পারে নি। তেমনি গণমাধ্যমও নামে মাত্র স্বাধীন। আমাদের সামন্ত প্রভুরা যতটুকু অনুমোদন করেন সম্পাদকরা বা সাংবাদিকরা শুধু ততটুকু স্বাধীনভাবে সামনে অগ্রসর হতে পারেন। বিচারের ক্ষেত্রেও বিচারপতিরাও নিরপেক্ষ হতে পারেন নি। অন্যদিকে সশস্ত্র বাহিনী ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সমালোচনার ব্যাপারে বা তাদের ব্যাপারে কোন রুল দিতে আদালত অত্যন্ত সতর্ক থাকে। তেমনি ভাবে সামরিক বাহিনীদের ব্যাপারে কোন তথ্য প্রকাশে হুঁশিয়ার থাকে গণমাধ্যমগুলোও। সরকার বা সামরিক বাহিনীর সমালোচনাকে স্বদেশহিতৈষী হিসেবে দেখা হয় না। বরং যারা দেশের সরকার বা সামরিক বাহিনীর সমালোচনা করে তাদেরকে জাতীয় পর্যায় নানাভাবে হেনস্থা করা হয়।

উদাহরণ হিসেবে বলা যাবে মাহমুদুর রহমান, মাহফুজ আনামসহ আরো অনেকের কথা যারা আজ রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার। বাংলাদেশের বিচার-ব্যবস্থা দীর্ঘ সময় ধরেই রাজনৈতিক ব্যক্তিদের হাতে জিম্মি। ফলে রাজনৈতিক নিয়োগ প্রাপ্ত বিচারক বা বিচারপতিদের দৌরাত্ম্য এতটাই বেড়েগেছে যে লেখক, সংবাদিক, ছাত্র, শিক্ষক, শিক্ষাবিদ, প্রশাসকসহ সকল স্তরের জনগণ আর স্বাধীনভাবে কথা বলতে পারছে না। বিচার-ব্যবস্থায় রাজনৈতিক প্রভাব এতটাই শক্তিশালী যে বিচারপতি কিংবা প্রধান বিচারপতি হতে হলে বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রী থাকার প্রয়োজন হয় না।

তেমনি একজন রাজনৈতিকভাবে নিয়োগপ্রাপ্ত সাবেক বিচারপতি শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক একের পর এক সংবিধানপরিপন্থি কাজ করে বাংলাদেশের বিচার ব্যবস্থাকে হেয় প্রতিপন্ন করে যাচ্ছেন। তিনি বিচারপতি থাকা অবস্থায় নিজের সত্তাকেই মুখ্য বিবেচনা করে আত্মজাহিরে সদা মশগুল ছিলেন। এখন অবসরে গিয়েও তিনি প্রধান বিচারপতিকেও অন্য একটা দলের এজেন্ট বলতে দ্বিধা করেননি। এ ব্যাপারে সাবেক প্রধান বিচারপতি মাহমুদুল আমিন চৌধুরী বলেন, “বিচারপতি মানিক তার আচরণে প্রমাণ করেছেন যে তিনি হতাশাগ্রস্ত, উন্মাদ।” মানিকরা যুগে যুগে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে উৎকোচের বিনিময়ে সরকার বা প্রতিবেশী রাষ্ট্রের দালালিতে লিপ্ত হয় এবং রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা ও অস্থিরিতা সুযোগে এরা ব্যক্তিগত স্বার্থে সরকার বা প্রতিবেশী রাষ্ট্রের দালালি করে জাতীয় স্বার্থে অধিকতর ক্ষতি সাধন করতে সমর্থ হয়। দেশের উচ্চ আদালত তথা সুপ্রীম কোর্ট বাংলাদেশের সাধারণ জনগণের জাস্টিস বা ন্যায় বিচার পাওয়ার শেষ ভরসাস্থল। কিন্তু আজ তা মানিকদের মত কিছু দালাল অথবা এজেন্ট প্রোভোকেটরদের জন্য নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের এজেন্ডা বাস্তবায়নের কেন্দ্রে পরিনত হয়েছে। আদালতের মতো পবিত্র অঙ্গন আজ কলুষিত হয়ে গেছে কিন্তু এর প্রতিবিধান কে করবে? সুতরাং বর্তমান সরকার অটোক্রেটিকই হোক আর ডেমোক্রেটিকই হোক মানিকদের মত স্বেচ্ছাচারী বিচারপতিদেরকে বিচার বিভাগে থাকতে দেওয়া উচিৎ না। কারণ এরা উচ্চ আদালতের পবিত্রতা নষ্ঠ করে দিয়েছে।

সম্প্রতি অবসরে গিয়ে বিচারপতিদের রায় লেখা নিয়ে একটি সাংবিধানিক বিতর্ক তৈরি হয়েছে যাতে জাতীয় সংসদের সাথে সাথে বর্তমান এবং সাবেক বিচারপতিরা জড়িয়ে পড়েছেন। বিতর্কের গতি আরো ত্বরাণ্বিত হয়েছে যখন প্রধান বিচারপতি এসকে সিনহা বলেছেন, অবসরের পর রায় লেখা সংবিধানসম্মত নয়। যদিও মানিক ও প্রধান বিচারপতির মাঝে পূর্ব থেকেই প্রধান বিচারপতি হওয়ার ব্যাপারে একটা চাপা প্রতিযোগিতা বিরাজমান ছিল। তাদের সেই অভ্যন্তরীণ সঙ্ঘাতের বহিঃপ্রকাশ রূপ নিয়েছে বিভিন্ন ইস্যুতে। তার মধ্যে অবসরে গিয়ে রায় লেখা অন্যতম।

এখন আসা যাক অবসরে রায় লেখার ব্যাপারে আইন কী বলে? ১৯৬৪ সালে দেয়া পাকিস্তানের সুপ্রীম কোর্টের রায় বর্তমান বাংলাদেশে মান্য করা বাধ্যতামূলক কিনা তা নিয়ে সংবিধান বিশেষজ্ঞদের মধ্যে দ্বিমত থাকলেও আমার মতে দ্বিমত থাকার কোন অবকাশ নেই। ডকট্রীন অব প্রিসিডেন্ট অনুযায়ী উচ্চ আদালত কর্তৃক ঘোষিত আইন, আদেশ ও নির্দেশ, রায়, ডিক্রি রুল নিম্ন আদালতের জন্য মান্য করা বাধ্যতামূলক যদি পরবর্তী কোন সিদ্ধান্ত দ্বারা ওভাররুলড না হয়। তাই ১৯৬৪ সালে দেয়া পাকিস্তানের সুপ্রীম কোর্টের রায় নিয়ে সংশয় থাকার কোন সুযোগ নাই। কারণ পরবর্তীতে এমন কোন রায় আসে নি যা পাকিস্তান আমলের সেই রায়কে ওভাররুলড করেছে। এই ডক্ট্রিন অব প্রিসিডেন্স বাংলাদেশের সংবিধানের ১১১ অনুচ্ছেদে বর্ণনা করা হয়েছে। আশ্চর্য্যের ব্যাপার হল বিচারপতি মানিক হয়ত জানতেনই না যে অবসরের পর বিচারপতিরা রায় লিখতে পারবেন না। বরং তিনি দাবী করেন যে বেগম খালেদা জিয়াই বহু আগে নাকি বলেছিলেন যে অবসরের পর বিচারপতিরা রায় লিখতে পারবেন না। অবসরে যাওয়ার পর বিচারপতিদের রায় লেখার নজীর থাকলেও তা কতটুকু গ্রহণযোগ্য ছিল তা আলোচনার বিষয়। কিন্তু বিচারাধীন রায়গুলো লেখা শেষ না করে একজন সদ্য অবসরে যাওয়া বিচারপতির একটি রাজনৈতিক দলের মিটিং-মিছিলে যাওয়ার বা রাষ্ট্রের সাবেক প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন ঘেরাও করার নজীর কোথাও আছে কিনা তা আমার জানা নেই।

১৯৬৪ সালে সর্বোচ্চ আদালত সুপ্রিম কোর্টের রায় ও নির্দেশনা অনুযায়ী বিচারপতিদের অবসরের পর রায় লেখা বা অবসরে গিয়ে একজন বিচারপতির লিখিত ও স্বাক্ষরকৃত রায় কোন রায় নয়। ১৯৬৪ সালে দেয়া এই রায় বর্তমান বাংলাদেশে মান্য করা বাধ্যতামূলক কিনা এ ব্যাপারে সংবিধান বিশেষজ্ঞদের মধ্যে দ্বিমত থাকলেও এই রায়ের নৈতিক ভিত্তিটাকে এড়িয়ে যাওয়া যাবে না। অর্থাৎ ১৯৬৪ সালের রায়ের বিরুদ্ধে এখনো পর্যন্ত কোন রায় আসে নি তাই এটা মান্য করা বাধ্যতামূলক। আন্যদিকে নৈতিকতার ভিত্তিতেও ১৯৬৪ সালের রায়ের গুরুত্ব ও অপরিসীম।

কেউ কেউ সংবিধানের উদ্ধৃতি দিয়ে যুক্তি দিয়েছেন যে, অবসরের পর রায় লিখতে সাংবিধানিক কোন প্রতিবন্ধকতা নেই বা সংবিধানে অবসরে বিচারপতিরা রায় লিখতে পারবেন কি পারবেন না তা কোথাও লেখা নেই। তাদের এহেন যুক্তি মোটেও গ্রহণ যোগ্য নয় কারণ যেখানে সুপ্রীমকোর্টের রায় বলবৎ আছে সেখানে সংবিধানে না থাকলেও সুপ্রীমকোর্টের রায়ের একটা পার্সুয়েসিভ অথোরিটি আছে। এছাড়া আইনে “অনুমিতি” বা “ইনফারেন্স” বলে একটা চর্চা আছে। বিচারপতিগণ সাংবিধানিক পদাধিকারী এবং এঁদের নিয়োগ কার্যকর হয় শপথ গ্রহণের মধ্য দিয়ে এবং নিয়োগের অবসান ঘটে পদত্যাগ ও অবসরের মধ্য দিয়ে। তাহলে এথেকে স্পষ্টত এটাই কি অনুমান করা যায় না যে, অবসরের পর রায় লেখা সংবিধানের ১৪৮ অনুচ্ছেদের পরিপন্থী। কেননা অবসরের পর বিচারপতির শপথ বহাল থাকে না এবং ফলে অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি একজন সাধারণ নাগরিক হিসেবে বিবেচ্য। একজন সাধারণ নাগরিক রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আদালতের রায় লিখবেন তাও আবার একটা রাজনৈতিক দলের এজেন্ডা বাস্তবায়নে রাজপথের লড়াকু সৈনিক হিসেবে। আদালতে “পক্ষপাত” হলে সেই আদালতের রায় কার্যকর হয় না। তাহলে মানিকের সমস্ত রায়ই বে-আইনী নয় কি? আর অবসরের পর লেখা রায় তো রাষ্ট্রদ্রোহিতার সামিল।

১৯৬৪ সালে পাকিস্তান আমলে কাজী মেহারদিন বনাম মুরাদ বেগম মামলায় হাইকোর্টের একজন অবসরপ্রাপ্ত বিচারক অবসরের পর একটি রায় লিখে তাতে স্বাক্ষর করেন। এর বৈধতা চ্যালেঞ্জ করলে, সুপ্রিম কোর্টের তত্কালীন প্রধান বিচারপতি এআর কর্নেলিয়াসের নেতৃত্বে পাঁচজন বিচারক একটি রায় দেন। তখন রুল জারি করা হয় যে, অবসরে গিয়ে একজন বিচারপতির লিখিত ও স্বাক্ষরকৃত রায় কোন রায় নয়। সেই রুল যেহেতু ওভাররুল করে নতুন কোন রুল আসে নি, তাই এআর কর্নেলিয়াসের রুল এখনো বলবৎ রয়েছে বা নজির হিসেবে ধরে নেয়া উচিৎ।

এটা অবশ্য সত্য যে, আমাদের দেশে অবসরের পর রায় লেখার বিষয়টি আপিল বিভাগের ক্ষেত্রেই প্রচলন ছিলো। তারও একটা বিশেষ কারণ ছিল, কেননা আপিল বিভাগে একটি বেঞ্চকেই দীর্ঘকাল যাবত বিচার কার্য প্রচালন করতে হয়। কিন্তু হাইকোর্টে প্রথা ছিলো প্রকাশ্য আদালতে রায় ঘোষণা করতে হবে। আশ্চর্য্যের বিষয় হল ইদানীং হাইকোর্টে অনেক বিচারক প্রকাশ্য আদালতে পূর্ণাঙ্গ রায় ঘোষণা না করে সংক্ষিপ্ত আদেশের অংশবিশেষ পড়ে শোনাতে দেখা যাচ্ছে যার কোন নিয়ম বা প্রচলন নেই। তাহলে কি সাবেক প্রধান বিচারপতি মাহমুদুল আমিন চৌধুরীর কথাই ঠিক? তাঁর মতে জজ সাহেব রায় লিখতে পারেন না বলেই প্রকাশ্যে রায় বা আদেশ দেন না। সাধারণ মানুষ হিসেবে বিবেচ্য একজন অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি, একজন কর্তব্যরত বিচারকের ন্যায় সংবিধানের ৯৬(৪)(এ) অনুচ্ছেদ দ্বারা বাধ্য নয় বলেই যেকোন ভাবে কারো দ্বারা তিনি বায়াসড হতে পারেন। তাহলে এই পরিস্থিতিতে অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতির কাছ থেকে কি নিরপেক্ষ রায় আশা করা যায়? এই প্রশ্নের কোন সদুত্তর বর্তমান সময়ে আশা করাও যেন অন্যায়।

অন্যদিকে যথাসময়ে রায় লিখে পাবলিশ করতে না পারায় বিচারপ্রার্থীরা অহেতুক কষ্টভোগের শিকার হয়। তারপর যদি বিচারকের পক্ষপাতদুষ্ট হওয়ার সম্ভাবনা থাকে, তাহলে তো ভোগান্তির আর শেষ নেই। সাবেক প্রধান বিচারপতি মাহমুদুল আমিন চৌধুরী মনে করেন, অবসরের পর লেখা রায়ে যদি কোনভাবেই আদেশের অংশ পরিবর্তন করা হয়, তবে সেটি হবে ফৌজদারি অপরাধ।

সরকারের উচিৎ কালবিলম্ব না করে সংবিধানের সংশোধনের মাধ্যমে কঠোর নীতিমালা প্রণয়ন করা। তাহলে মানিকসহ অবসরে যাওয়া সকল বিচারপতিদের অবসরের পর লেখার প্রবনতা বন্ধ হবে। পাশাপাশি এযাবৎ কালের অবসরের পর লেখার সমস্ত রায়ের জন্য ফৌজদারি অপরাধে অপরাধীদেরকে আদালতে তলব করে শাস্তির ব্যবস্থা করা। যাতে অদূর ভবিষ্যতে অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতিরা অবসরে রায় লিখে বিচারপ্রার্থীদের অহেতুক কষ্ট না দিতে পারেন।

লেখক প্রাক্তন প্রভাষক, রিগাল কলেজ, লন্ডন; আইন উপদেষ্টা এসইবি সলিসিটর, লন্ডন

শিরোনাম ডট কম পোর্টালে প্রকাশিত মতামত লেখকের ব্যক্তিগত, যা আমাদের সম্পাদকীয় নীতির আওতাভুক্ত নাও হতে পারে।

শিরোনাম ডট কম
শিরোনাম ডট কম । অনলাইন নিউজ পোর্টাল Shironaam Dot Com । An Online News Portal
http://www.shironaam.com/

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *