বাসায় ঢুকে ব্লগার নিলয়কে কুপিয়ে খুন

গত ২৯ মাসে প্রকাশ্যে ও গোপনে ১০ জন ব্লগারকে হত্যা করা হয়েছে। হত্যাকাণ্ডের পর ফেসবুক বা টুইটারে হত্যাকারীরা হত্যার দায় স্বীকার করে স্ট্যাটাসও দিয়েছে।

গত ২৯ মাসে প্রকাশ্যে ও গোপনে ১০ জন ব্লগারকে হত্যা করা হয়েছে। হত্যাকাণ্ডের পর  ফেসবুক বা টুইটারে হত্যাকারীরা হত্যার দায় স্বীকার করে স্ট্যাটাসও দিয়েছে।গত ২৯ মাসে প্রকাশ্যে ও গোপনে ১০ জন ব্লগারকে হত্যা করা হয়েছে। হত্যাকাণ্ডের পর সামাজিক মাধ্যম ফেসবুক বা টুইটারে হত্যাকারীরা হত্যার দায় স্বীকার করে স্ট্যাটাসও দিয়েছে। এসব স্ট্যাটাসে প্রত্যেকটি হত্যাকাণ্ডের কারণ হিসেবে ইসলাম ধর্মকে নিয়ে কটূক্তি অথবা ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত আনার অভিযোগ দেখানো হয়েছে।

রাজধানী খিলগাঁওয়ে বাসায় ঢুকে নীলাদ্রি চট্টোপাধ্যায় (৪০) নামে এক ব্লগারকে দিনেদুপুরে চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে খুন করেছে দুর্বৃত্তরা। তিনি নিলয় নীল নামে ব্লগে লেখালেখি করতেন।

শুক্রবার জুমার নামাজের পর দুপুর পৌনে ২টার দিকে দক্ষিণ গোড়ানের ৮ নম্বর রোডের পানির পাম্পের গলিতে ১৬৭ নম্বর বাসার পাঁচ তলায় এ ঘটনা ঘটে। নিলয় চৌধুরী স্ত্রী-সন্তান নিয়ে ওই বাসায় থাকতেন। ওই বাড়িটি টেনু পাগলার বলে স্থানীয়রা জানায়।

খিলগাঁও থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জিয়া মো. মোস্তাফিজ জানান, জুমার নামাজের পরপর কয়েজন ওই বাসায় ঢুকে নিলয়কে খুন করে চলে যায়। স্থানীয়রা জানিয়েছে নিহত নিলয় একজন ব্লগার। তিনি একটি এনজিওতে চাকরি করতেন।

সেই সঙ্গে গণজাগরণমঞ্চের একজন সক্রিয় কর্মী ছিলেন বলেও জানান ওসি।

এদিকে নিলয় তাদের সক্রিয় কর্মী ছিলেন বলে দাবি করেছেন গণজাগরণ মঞ্চের মুখপাত্র ইমরান এইচ সরকার। তিনি আরো জানান, নিলয় নিয়মিত ব্লগে লিখতেন। জুমার নামাজের পর বাসা দেখার নাম করে কয়েকজন ঢুকে তাকে খুন করে।

খিলগাঁও থানার পরিদর্শক (তদন্ত) আনোয়ার সংবাদমাধ্যমকে জানান, নিহত ব্যক্তির নাম নিলয়। তার বয়স আনুমানিক ৪০ বছর। দুপুরে জুমার নামাজ চলাকালে বাসায় ঢুকে তাকে হত্যা করে অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিরা।

খিলগাঁও গোড়ানের ১৬৭ নম্বর বাড়ির পঞ্চম তলার বাসায় স্ত্রী ও বোনকে নিয়ে থাকতেন নিলয়। দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে কয়েকজন যুবক বাসা ভাড়া নেওয়ার কথা বলে ওই বাড়িতে ঢুকে পড়েন। তারা ধারালো অস্ত্র দিয়ে নিলয়কে আঘাত করতে থাকেন। ঘটনাস্থলেই নিলয় মারা যান। পরে যুবকেরা পালিয়ে যান। খবর পেয়ে পুলিশ গিয়ে লাশ উদ্ধার করে।

ঘটনার পরপরই ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন ঢাকা মহানগর পুলিশের যুগ্ম-কমিশনার কৃষ্ণপদ রায় (ক্রাইম)। তিনি বলেন, ‘আগে যেভাবে ব্লগার হত্যা করা হয়েছে। এ হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে অন্যান্য হত্যাকাণ্ডের ধরনে মিল রয়েছে। নীলয়কেও ঘাড়ে ও মাথায় কোপ দিয়ে হত্যা করা হয়েছে।’

স্ত্রীর বরাত দিয়ে তিনি জানান, ৪-৫ জন এসেছিলেন। আগে একজন প্রবেশ করেন। পরবর্তী সময়ে অন্যদের ডেকে এনে তারা নীলয়কে খুন করে পালিয়ে যায়।

ঘটনাস্থলে উপস্থিত শাম্মী হক নামে গণজাগরণ মঞ্চের এক কর্মী বলেন, ‘নিলয় গণজাগরণ মঞ্চের কর্মী ছিলেন। গণজাগরণ মঞ্চের ১৪ জুন যৌন নিপীড়নবিরোধী যে কনসার্ট হয়েছিল সেখানেও নীলয়ের অংশগ্রহণ ছিল।

ছাত্রমৈত্রীর সাবেক সভাপতি ও গণজাগরণ মঞ্চের সংগঠক বাপ্পাদিত্য বসু বলেন, ‘নিলয় গণজাগরণ মঞ্চের একনিষ্ঠ কর্মী। যুদ্ধাপরাধের বিচার দাবিতে শাহবাগে গণজাগরণ মঞ্চের যে আন্দোলন শুরু হয়েছিল, সেখানেও নিলয়ের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ ছিল।’

নিলয়ের গ্রামের বাড়ি পিরোজপুরে। তিনি ঢাকার একটি বেসরকারি এনজিওতে গবেষণা কর্মকর্তা হিসেবে চাকরি করতেন। বাংলাদেশ বিজ্ঞান ও যুক্তিবাদী সংগঠনেরও সদস্য ছিলেন নীলয়।

২০১৩ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি গণজাগরণ মঞ্চের উদ্যোক্তা ব্লগার রাজীব হায়দার শোভনকে বাসায় ফেরার পথে রাজধানীর পল্লবীর কালশীর পলাশনগরে কুপিয়ে হত্যা করা হয়।

২০১৩ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি ব্লগার মামুন হোসেন, ২ মার্চ ব্লগার জগৎজ্যোতি তালুকদার ও ব্লগার জিয়াউদ্দিন জাকারিয়া বাবুকে হত্যা করা হয়।

২০১৩ সালের ৯ এপ্রিল প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) কবি নজরুল ইসলাম হলে কুপিয়ে হত্যা করা হয় ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও ব্লগার আরিফ রায়হান দ্বীপকে।

২০১৩ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি অগ্রণী ব্যাংকের কর্মী ও ব্লগার জাফর মুন্সিকে প্রকাশ্য দিবালোকে কুপিয়ে এবং পিটিয়ে হত্যা করা হয়।

বই মেলা থেকে ফেরার পথে ২০১৫ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি রাতে টিএসসি পাশে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান সংলগ্ন সড়কে চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করা হয় মার্কিন প্রবাসী অভিজিৎ রায়কে।

চলতি বছরের ৩০ মার্চ সকালে রাজধানীর তেজগাঁও শিল্পাঞ্চলের বেগুনবাড়ীতে নিজ বাসার একটু দূরে খুন হন আরেক ব্লগার ওয়াশিকুর রহমান। এ ঘটনায় দু’জনকে ধরে পুলিশে দেয় স্থানীয়রা।

গত ১২ মে সকালে সিলেটের সুবিদবাজার এলাকায় অনন্ত বিজয় দাশ নামে আরেক ব্লগারকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়।

তবে এসব ঘটনার আগে ২০১৩ সালের ১৪ জানুয়ারি রাতে উত্তরার ১১ নম্বর সেক্টরে নিজ কর্মস্থলের সামনে ব্লগার আসিফ মহিউদ্দিনের ওপর ধারালো অস্ত্র নিয়ে হামলা চালানো হয়। গুরুতর জখম হলেও তিনি ওই যাত্রায় বেঁচে যান।

একই বছরের ৬ সেপ্টেম্বর রাতে গণজাগরণ মঞ্চের অন্যতম সংগঠক আরিফ নূরকে কুপিয়ে জখম করে দুর্বৃত্তরা। রাত ১১টার দিকে রাজধানীর পরীবাগ ওভারব্রিজের নিচে তার উপর হামলা চালানো হয়েছিল।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *