মতামত

৫ জানুয়ারির বাধ্যবাধকতার নির্বাচন ও বাস্তবতা

abdul_awal_thakurআবদুল আউয়াল ঠাকুর

অগ্রহণযোগ্য ৫ জানুয়ারির নির্বচন প্রসঙ্গে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন,সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতার জন্যই এ নির্বাচন হয়েছিল এবং সে নির্বাচনে  বিএনপিকে অংশ নেয়ার জন্য সব চেষ্টাই করা হয়।বাধ্যবাধকতার ব্যখ্যা দিয়ে তিনি আরো বলেছেন, একটি নির্বাচনের পর আরেকটি নির্বাচন হবে এটাই তো সাধারণ কথা।জনগণ সরকারকে পাঁচ বছরের জন্য নির্বাচিত করে। সাংবাদিকরা প্রধানমন্ত্রীকে প্রশ্ন করেছিলেন ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের আগে সরকার প্রধান হিসেবে আপনি  বলেছিলেন সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা রক্ষার জন্য নির্বাচন  হচ্ছে। প্রশ্নের জবাব এবং পরবর্তী নির্বচন সম্পর্কে তিনি যে বক্তব্য দিয়েছেন তার প্রেক্ষিত ও বাস্তবতা কোনো বিবেচনাতেই এক নয়।

সাংবিধানিকভাবে গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে নির্বচনের মাধ্যমেই সরকার পরিবর্তিত হয় ।একে কার্যত বাধ্যবাধকতা মনে করার কোনো যুক্তি নেই।গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাপনায় নির্বচন অপরিহার্য অনুসঙ্গ মাত্র।অবধারিত এই আনুষ্ঠানিকতা বর্জিত হলে  তাকে কোনো বিবেচনাতেই গণতান্ত্রিক সরকার বলা যাবে না।কোনো না কোনোভাবে অথবা বৈধভাবে নির্বাচিত হবার পরেও ক্ষমতা কুক্ষিগত করে রাখার যারা চেষ্টা করেছে তাদের করুণ পরিনতির অজস্র উদাহরণ রয়েছে।সর্বশেষ উদাহরণ হিসেবে চোখের সামনে রয়েছে বুরকিনা ফাসোর সাবেক প্রেসিডেন্ট ব্লেইজ কমপাওর ও পরবর্তী অবস্থা।নিজের ক্ষমতা দীর্ঘয়িত  করতে গিয়ে গণঅভ্যুত্থানে প্রেসিডেন্টের  পতন হলে সামরিকজান্তা ক্ষমতা ধরে রাখতে চাইলে অব্যাহত চাপের মুখে অন্তর্বর্তীকালীন  সরকার গঠনের ঘোষণা দিয়েছে সেখানকার  সেনাবাহিনী। সবদলের অংশগ্রহণ ভিত্তিক একটি মতৈক্যের বেসামরিক সরকার গঠনের ঘোষণায় দেশটিতে চলমান অস্থিরতার আপাতত অবসান হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে।একটি গ্রহণযোগ্য সরকারের অধীনে সকল দলের অংশগ্রহণ ভিত্তিক নির্বাচন অনুষ্ঠানের দাবিতে ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের আগে যে পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছিল সেই প্যান্ডোরাবক্সই ওপেন করেছেন প্রধানমন্ত্রী বাধ্যবাধকতার প্রসঙ্গ তুলে।

পাঁচ জনুয়ারির নির্বাচনের আগে পরিস্থিতি এতটাই গুরুতর আকার ধারণ করেছিলো যে, গ্রহণযোগ্য সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবিদারদের নাগরিক অধিকার পর্যন্ত স্বীকার করেনি সরকার। দেখা মাত্র গুলির হুকুম দেয়া থেকে শুরু করে গুম হত্যা অপহরণের মধ্য দিয়ে এক সন্ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করা হয়েছিল । নাগরিকদের মধ্যে বিভাজন সৃষ্টি করা হয়েছে। কারণে অকারণে যৌক্তিক অযৌক্তিকভাবে শত শত নাগরিককে গ্রেফতার করা হয়েছে, মামলা দায়ের করা হয়েছে, গণতন্ত্র রক্ষার আন্দোলন করতে গিয়ে অগণিত মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন, পঙ্গু হয়েছেন। তারপরেও মুল দাবি আদায়ে কার্যকর কোন অগ্রগতি পরিলক্ষিত হচ্ছে না। বর্তমান সময়ে সরকারের দৃষ্টিভঙ্গিতে অনঢ় বাস্তবতাই লক্ষনীয়।
সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতার কথা বলে তিনি মূল বিষয় এড়িয়ে যাবার চেষ্টা করলেও তা যে সম্ভব নয়, সে কথাই কার্যত স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন সাংবাদিকরা। কেন বিগত নির্বাচন প্রাক্কালে গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে জাতীয়-আন্তর্জাতিক অংগনে বিশেষ বাস্তবতার উদ্ভব হয়েছিল সে আলোচনায় নতুনত্ব না থাকলেও একথা সবারই জানা রাজনৈতিক ঐকমত্যের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত নির্বচনী ব্যবস্থা তত্ত্বাবধায়ক তুলে দেয়া সূত্র ধরেই নির্বচন প্রক্রিয়াকে প্রশ্নবিদ্ধ করা হয়। স্বাধীনতা পরবর্তীকাল থেকে নির্বাচনের নিরপেক্ষতা যে গুরুতর বিবেচনায় নেয়া হয়েছিল ‘৯০-এর গণতান্ত্রিক আন্দোলনের মাঠে তার সন্তোষজনক গ্রহণযোগ্য সমাধান হয়েছিল।গ্রহণযোগ্য সরকারের ব্যপারে পুনরায় সমঝোতা না করে ঐকমত্যকে বর্জন করার মধ্য দিয়েই উদ্দেশ্য প্রণদিততা সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়েছে। পঞ্চদশ সংশোধনী পাস হবার পর থেকেই বিএনপি ও তার মিত্ররা বলতে গেলে প্রধান রাজনৈতিক শক্তিসমূহ নির্বাচন কালীন গ্রহণযোগ্য সরকারের দাবি করে আসছিল। এজন্য সংলাপের প্রয়োজনীয়তার কথা  তারা বার বার বলেছে বলছে।সরকার এ দাবিকে অগ্রাহ্য করে দমন-পীড়নের পথ বেছে নিয়ে নির্বচনের দিকে গেলে গণতন্ত্ররক্ষার আন্দোলনকারীদের কর্মসূচির মুখে দেশ অচল হয়ে পরে।
রাজধানী সারাদেশ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পরে।আন্দোলনের মুখে নির্বচনে নিজেদের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতার সাহসও হারিয়ে ফেলে।এক ধরনের মনোনয়নের ব্যবস্থা করে।নির্বাচন প্রতিহতকরণে  মার্চ ফর ডেমোক্রেসির ঘোষণায় দেশ কার্যত অচল হয়ে পড়েছিল। এই বাস্তবতায় আন্তর্জতিক মহল গ্রহণযোগ্য সরকারের  যে আহবান জানিয়েছিল সে প্রেক্ষিতেই সে সময়ের এবং বর্তমান প্রধানমন্ত্রী সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতার কথা বলে মূলত একটি গ্রহণযোগ্য সরকার গঠনে সময় চেয়েছিলেন। প্রধানমন্ত্রীর এই বার্তা আন্তর্জাতিক মহল মার্চ ফর ডেমোক্রেসির অধিনায়ক বেগম খালেদা জিয়াকেও পোঁছে দিয়েছিল।সে কারণেই হয়ত বেগম জিয়া অনিবার্য সংঘাত এড়াতে ঘোষিত কর্মসূচি স্থগিত করেছিলেন।এখন প্রধানমন্ত্রী যে ব্যাখ্যা দিচ্ছেন বা দেয়ার চেষ্টা করছেন তা কার্যত চেতনাগত দিক থেকে এক কিনা তার প্রকৃত ফয়সালা করতে পারবে আন্তর্জাতিক মহল।বাস্তবে যা দেখা যাচ্ছে তা হোল,জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক মহল এখনপর্যন্ত একটি গ্রহণযোগ্য সরকারের  অধীনে সকলদলের অংশগ্রহণভিত্তিক নির্বাচনঅনুষ্ঠানের আহবানে অনঢ় রয়েছে।সুতরাং বাধ্যবাধকতার ব্যাখ্যাকে সময়ের দাবির সাথে সংগতিপূর্ণ করাই যৌক্তিক।

প্রধানমন্ত্রী ৫ জানুয়ারির নির্বাচন নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে ১/১১-এর প্রসঙ্গ উত্থাপন করেছেন।কোন বাস্তবতায় সেদিন ওই গুরুতব পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছিল তা কারো অজানা নয়।লগি-বৈঠার মিছিল সহ সে সময়ের রক্তক্ষয়ী রাজনৈতিক বাস্তবতা প্রকৃতঅর্থে কাদের স্বার্থ রক্ষা করেছিল এবং কী এর উদ্দেশ্য ছিল সে আলোচনা এখনো চলছে।অতিসম্প্রতি একটি দৈনিকে সেদিনের এক কুশিলবের উদ্ধৃতি দিয়ে বলা হয়েছে, ওই সরকার স্থায়ী সামরিক শাসন দিতে চেয়েছিল যা রাজনৈতিক শক্তির কারণে সম্ভব হয়নি।ওই আলোচনায় উল্লেখ করা না হলেও এটা সকলেরই জানা সেদিন বেগম খালেদা জিয়া অনঢ় ভ’মিকা গ্রহণ না করলে বিরাজনীতিকরণে কোনো সমস্যা হয়তো হতো না। অর্থাৎ স্থায়ী সামরিক শাসনে কোনো অন্তরায় থাকত না। বাস্তবতা হলো, ওই সরকারের ধারাবাহিকতায় আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় এসে বেগম খালেদা জিয়া বিএনপি এবং তাদের মিত্রদের প্রতি প্রতিহিংসা মূলক রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করেছে।

পাঁচ জনুয়ারির নির্বাচনের আগে পরিস্থিতি এতটাই গুরুতর আকার ধারণ করেছিলো যে, গ্রহণযোগ্য সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবিদারদের নাগরিক অধিকার পর্যন্ত স্বীকার করেনি সরকার। দেখা মাত্র গুলির হুকুম দেয়া থেকে শুরু করে গুম হত্যা অপহরণের মধ্য দিয়ে এক সন্ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করা হয়েছিল । নাগরিকদের মধ্যে বিভাজন সৃষ্টি করা হয়েছে। কারণে অকারণে যৌক্তিক অযৌক্তিকভাবে শত শত নাগরিককে গ্রেফতার করা হয়েছে, মামলা দায়ের করা হয়েছে, গণতন্ত্র রক্ষার আন্দোলন করতে গিয়ে অগণিত মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন, পঙ্গু হয়েছেন। তারপরেও মুল দাবি আদায়ে কার্যকর কোন অগ্রগতি পরিলক্ষিত হচ্ছে না। বর্তমান সময়ে সরকারের দৃষ্টিভঙ্গিতে অনঢ় বাস্তবতাই লক্ষনীয়। রাজনৈতিক বিশ্লেষণে এ কথা পরিষ্কার যে, সরকারের দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন না  হওয়ার কারণে অধিকাংশ জনগণের সাথে সরকারের যে ব্যবধান তৈরি হয়েছে তারও কোনো পরিবর্তন হয়নি। হামলা মামলা আক্রমণ করে রাজনৈতিক শক্তিকে যে দমন করা যায় না সে কথাই পুনরায় উচ্চারণ করেছেন নাটরের জনসভায় বেগম খালেদা জিয়া। বেগম জিয়া যেখানেই যাচ্ছেন সেখানেই মানুষ উপচে পড়ছে, তার মুখ থেকে আন্দোলনের কথা শুনতে, গণতান্ত্রিক অর্জনের লড়াই করতে। এই যে লাখ লাখ মানুষ এরা কোনো সন্ত্রাসী নয় বরং গণতান্ত্রিক শক্তি। সরকারের দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে পার্থক্য থাকলেও স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব রক্ষা মূল্যবোধের চর্চাভিত্তিক গণতান্ত্রিক বোধ-বিশ্বাস নিয়েই এরা সমবেত হচ্ছেন। জনতার উপস্থিতির পরিসংখ্যান থেকেও একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের বিকল্প অন্য কিছু ভাবা বা একে পাশ কাটিয়ে যাওয়া রাজনৈতিক বিবেচনায় গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। ৫ জানুয়ারীর নির্বাচনের আগে প্রধানমন্ত্রী সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা বলে প্রকৃতপক্ষে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাপনা রক্ষার প্রতি যদি কোন দরদ প্রকাশ করে থাকেন তাহলে অবশ্যই তা বাস্তবায়নে সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ গ্রহণ করা প্রয়োজন।

হীরক রাজার দেশের পরিচিত একটি উক্তি হচ্ছে, ‘রশি ধরে দেব টান, রাজা হবে খান খান’। রশি যারা টানতে চান তাদের অভিন্নতাই জরুরি। গ্রহণযোগ্য সরকারের অধীনে সকলের অংশগ্রহণ ভিত্তিক নির্বাচনের দাবিতে মৃত্যু উপত্যাকায় পরিণত এই দেশে আন্দোলন এখন শুধুমাত্র ঘোষণার বিষয়ে পরিণত হয়েছে। সে বিবেচনায়  আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিও অনুকুল বার্তা দিচ্ছে।

আন্দোলনের বাস্তবতায় জাতিসংঘের চাপে বুরকিনা ফাসোয় সেনাবাহিনী  সব দলের অংশগ্রহনে মতৈক্যের বেসামরিক সরকার গঠনের সম্মত হয়েছে। বিরোধী দলীয় নেতাদের সাথে বৈঠকে বসে সব দলের অংশগ্রহণ ভিত্তিক সরকার গঠনের ঘোষণা দিয়েছে সেনাবাহিনী। এর আগে পশ্চিম আফ্রিকার জাতিসংঘ দূত মো: ইবন চাম্বাস সেনা শাসকদের প্রতি ক্ষমতা ছেড়ে দেয়ার দাবি জানিয়েছিলেন। তার দাবি উপেক্ষিত হলে, দেশটির উপর অর্থনৈতিক অবরোধ আরোপ করার কথাও তিনি জানিয়েছিলেন। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরও জনগণের কাছে ক্ষমতা ফিরিয়ে দেবার দাবি জানিয়েছিল। বুরকিনা ফাসোয়কে জাতিসংঘের আহ্বানের মধ্য দিয়ে গণতন্ত্র রক্ষার যে অঙ্গীকার ব্যক্ত হয়েছে ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের আগে ও পরে জাতিসংঘ মহাসচিব বান-কি-মুনের আহ্বানেও তার প্রতিধ্বনি রয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের বহুদেশ সরকারের আইন শৃঙ্খলা বাহিনীকে গোলাবারুদ দিতে অস্বীকার করছে কারণ তারা মনে করছে এই সরকার মানবতা বিরোধ অবস্থান নিয়েছে। আন্তর্জাতিক মহল একটি গ্রহণযোগ্য সরকারের অধীনে নির্বাচনের যে দাবি করেছে, তা যদি গৃহীত না হয় তাহলে তার অর্থ হবে একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের জন্য আন্দোলন তীব্রতর করা।

আবদুল আউয়াল ঠাকুর: সাংবাদিক ও কলামিস্ট।

শিরোনাম ডট কম
শিরোনাম ডট কম । অনলাইন নিউজ পোর্টাল Shironaam Dot Com । An Online News Portal
http://www.shironaam.com/

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *