তারুণ্য ও প্রযুক্তির ছোঁয়ায় বদলে যাচ্ছে বিএনপি

বিএনপি চেয়ারপারসনের রাজনৈতিক সচিব পদ সৃষ্টিকরাসহ প্রস্তাবিত খসড়ায় ওই রাজনৈতিক কার্যালয়কে অন্তত সাত ভাগে ভাগ করার কথা বলা হয়েছে।

বিএনপি চেয়ারপারসনের রাজনৈতিক সচিব পদ সৃষ্টিকরাসহ প্রস্তাবিত খসড়ায় ওই রাজনৈতিক কার্যালয়কে অন্তত সাত ভাগে ভাগ করার কথা বলা হয়েছে। লন্ডন থেকে চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া দেশের ফেরার পর গুলশানে চেয়ারপারসনের অফিসের কাঠামোতে আসছে পরিবর্তন। যেসব নেতা বয়সের ভারে ন্যুব্জ হয়ে গেছেন, তাদের মূল দায়িত্বে না রেখে তাদের অভিজ্ঞতাকে কীভাবে কাজে লাগানো যায় তা ভাবা হচ্ছে।

শিগগিরই প্রযুক্তিনির্ভর করপোরেট ধাঁচে সাজানো হচ্ছে গুলশানে অবস্থিত বিএনপি চেয়ারপারসনের রাজনৈতিক কার্যালয়। এ লক্ষ্যে একটি খসড়া প্রায় চূড়ান্ত করা হয়েছে। বিএনপি সমর্থক বুদ্ধিজীবী এবং দলের সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমানের পরিকল্পনায় এসব করা হচ্ছে বলে জানা গেছে। বিএনপি চেয়ারপারসনের রাজনৈতিক সচিব পদ সৃষ্টিকরাসহ প্রস্তাবিত খসড়ায় ওই রাজনৈতিক কার্যালয়কে অন্তত সাত ভাগে ভাগ করার কথা বলা হয়েছে। এগুলো হচ্ছে-নিরাপত্তা ও প্রশাসন, মিডিয়া, সিভিল সোসাইটি, জনসংযোগ, আন্তর্জাতিক, তথ্য ও গবেষণা এবং আইটি বিভাগ। প্রত্যেক বিভাগে একজন করে পরিচালক থাকবেন। কিছু বিভাগ মূল ভবনের বাইরে রাখা হতে পারে। যুক্তরাজ্যসহ উন্নত বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক দল ও সরকার প্রধানের কার্যালয়ের অর্গানোগ্রামের আলোকে এ খসড়াটি তৈরি করা হয়েছে। একইসঙ্গে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে বিশেষ বলয়মুক্ত করে নেতাকর্মীসহ বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার প্রতিনিধিদের আরও কাছাকাছি নেওয়ার জন্য একটি কৌশলও তৈরি করা হয়েছে।

২০০৭ সালে সেনা সমর্থিত জরুরি সরকার ক্ষমতা নেয়ার পর থেকেই বিএনপির ওপর বিপর্যয় নেমে আসে। ওয়ান-ইলেভেন শাসনের অবসানের পর ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতা এসে বিএনপির ওপর দমনপীড়নের মাত্রা বহু গুণ বাড়িয়ে দেয়। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির ভোটারবিহীন নির্বাচনে ক্ষমতায় থেকে সরকার প্রতিপক্ষ বিএনপির চড়াও হতে থাকে। এর ফলে বিএনপি কোন রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডই চালাতে পারছে না। হামলা-মামলার ব্যাপকতায় নেতাকর্মীরা ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে পড়েছেন।

চলতি বছরের ২ আগস্ট পর্যন্ত কেন্দ্রীয়সহ সারা দেশে বিএনপির নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে ২১ হাজার ৬৮০টি মামলা হয়েছে। এতে আসামির সংখ্যা ৪ লাখ ৩ হাজার ৮৭৮ জন। এর মধ্যে খালেদা জিয়াসহ কেন্দ্রীয় ১৫৮ জন নেতার বিরুদ্ধে আছে ৪ হাজার ৩৩১ মামলা। আর দলের স্থায়ী কমিটির ১২ জন সদস্যের বিরুদ্ধেই আছে ২৮৮টি মামলা। এছাড়া সারা দেশে গ্রেফতার হয়ে বর্তমানে জেলে আছেন ১৭ হাজার ৮৮৫ জন নেতা-কর্মী।

বিএনপির মুখপাত্র আসাদুজ্জামান রিপন জানিয়েছেন, কেন্দ্রীয় নেতাদের বিরুদ্ধে দেড় থেকে দুই শ মামলা ২০০৭ সালের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলের। বাকিগুলো আওয়ামী লীগ সরকারের বিগত এবং বর্তমান আমলে করা। এগুলোর বেশির ভাগই ২০১৩, ২০১৪ ও চলতি বছরের।

জেলা কমিটি পুনর্গঠন প্রসঙ্গে মোহাম্মদ শাহজাহান জানান, বিএনপির ৭৫টি সাংগঠনিক জেলা রয়েছে। এর মধ্যে ঢাকা মহাগনর বাদে বাকী ৭৪টি জেলায় পুনর্গঠন কাজ চলছে। ইতোমধ্যে রাঙ্গামাটি, সৈয়দপুর, নীলফামারী, নেত্রকোণা, ব্রাহ্মণবাড়িয়াসহ আরও বেশ কয়েকটি জেলায় পুনর্গঠন কাজ সম্পন্ন হয়েছে। এছাড়া সিলেট জেলা, সিলেট মহানগর, কুড়িগ্রাম, মেহেরপুর, খাগড়াছড়ি, বান্দরবন ইত্যাদি জেলায় পুনর্গঠন কাজ চলছে। দলের একটি সূত্র জানায়, ৪৫টি সাংগঠনিক জেলায় দলের পুনর্গঠন কাজ পুরোদমে চলছে।

বিএনপি পুনর্গঠনের অংশ হিসেবে ১৯ সদস্যের জাতীয় স্থায়ী কমিটিতে পরিবর্তন আনা হবে। এ ক্ষেত্রে অন্তত ৯ জন সদস্য এই কমিটি থেকে বাদ পড়তে পারেন। ড. আর এ গণি, এম শামসুল ইসলাম বার্ধক্যজনিত কারণে স্থায়ী কমিটির বৈঠকে আসতে পারেন না। বেগম সারওয়ারি রহমানকেও স্থায়ী কমিটির বৈঠকে দেখা যায় না। সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর ফাঁসির রায় হয়ে গেছে। তাদের স্থলে নতুন মুখ দেখা যেতে পারে। তবে নুতন এই মুখ কারা, তাদের ব্যাপারে এখনই নিশ্চিত করে দলের দায়িত্বশীল কেউ বলতে নারাজ।

দল পুনর্গঠনের অংশ হিসেবে বিএনপির মহাসচিব পদটি ভারমুক্ত হতে যাচ্ছে। কাউন্সিলের মাধ্যমে কিংবা তা করা না গেলে চেয়ারপারসনের গঠনতান্ত্রিক ক্ষমতাবলে পুর্নাঙ্গ মহাসচিব হতে যাচ্ছেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। লন্ডনে অবস্থানরত দলীয় চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার একটি ঘনিষ্ঠ সূত্রে এ মতের সমর্থন পাওয়া গেছে। সূত্রটি জানায়, দলের প্রভাবশালী নেতা দলের সহসভাপতি সাবেক মেয়র সাদেক হোসেন খোকা লন্ডনে গেছেন। সেখানে দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া ও সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে দলের পুনর্গঠন নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হয়েছে। চেয়ারপারসন এবং সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান উভয়েই পুর্নাঙ্গ মহাসচিব নির্বাচনের ব্যাপারে ইতিবাচক মনোভাব দেখান বলে জানা গেছে। সূত্রটি জানায়, ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব হিসেবে ফখরুলের ‘পারফরমেন্স’ আশানুরূপ এবং তার একটি পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তি রয়েছে। আন্দোলন-সংগ্রামেও তিনি অগ্রভাগেই ছিলেন। শারীরিক অসুস্থতা নিয়েও তিনি আন্দোলনসংগ্রামে অংশ নিয়েছেন এবং কারাভোগ করেছেন। সার্বিক বিবেচনায় মির্জা ফখরুলই যে মহাসচিব হতে চলেছেন।

২০০৯ সালে অনুষ্ঠিত পঞ্চম জাতীয় কাউন্সিলে দলের এই গুরুত্বপুর্ণ সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব পদটি সৃষ্টি করা হয়। এতে নির্বাচিত করা হয় দলের বর্তমান ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীকে। গঠনতন্ত্রে না থাকলেও এর আগে এ পদে ছিলেন দলের বর্তমান সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমান। তিনি ২০০২ সালের জুলাই মাসে এ পদে নিয়োগ পান। বিএনপি প্রতিষ্ঠাতা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও দলের বর্তমান চেয়ারম্যান বেগম খালেদা জিয়ার ছেলে তারেক রহমান এ পদে থাকায় পদটি গুরুত্বপুর্ণ হয়ে ওঠে। বর্তমানে এ পদটিতে আর কাউকে নির্বাচিত করা হবে না বলে জানা গেছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *