নিঃশব্দ বক্সিং সম্রাট মুহাম্মদ আলি

নিঃশব্দ বক্সিং সম্রাট মুহাম্মদ আলি

585
0
SHARE

মুহাম্মদ আলি। যার হুঙ্কারে শিউরে উঠত ব্রহ্মাণ্ড, আজ তিনি প্রায় নির্বাক। পৃথিবী-শ্রেষ্ঠ শিরোপা জয়ের পঞ্চাশ বছরে, জন্মদিনের একুশ দিন আগে তাকে ফিরে দেখা।মুহাম্মদ আলি। যার হুঙ্কারে শিউরে উঠত ব্রহ্মাণ্ড, আজ তিনি প্রায় নির্বাক। পৃথিবী-শ্রেষ্ঠ শিরোপা জয়ের পঞ্চাশ বছরে, জন্মদিনের একুশ দিন আগে তাকে ফিরে দেখা।

বিশ্ব হেভিওয়েট বক্সিং-এর সব চেয়ে বড় খবরটা এখন এ নয় যে, চ্যাম্পিয়ন ভ্লাদিমির ক্লিচকো তার খেতাব ধরে রাখার লড়াইয়ে আর নামতে চাইছেন না।

বড় খবরটা এও নয় যে, মাইক টাইসনের পর আর সে-অর্থে আইকনিক হেভিওয়েট কেউ আর উঠে আসেননি, যার নামে ও জেল্লায় উপচে পড়া গেট মানি (পড়ুন টিকিট বিক্রি) আসে। টাইসনের পরের চ্যাম্পিয়নদের মধ্যে এভান্ডার হোলিফিল্ড, লেনক্স লুইস বা ক্লিচকোও চমৎকার বক্সার, কিন্তু ওই ত্রাস, বিস্ময় ও মোহ সৃষ্টি করেন না। বক্সিং দুনিয়ায় যা থেকে ক্যারিশমা উৎপন্ন হয়।

বড় খবর আপাতত এই যে, সর্বকালের শ্রেষ্ঠ বক্সার, গত শতাব্দীর সর্বশ্রেষ্ঠ অ্যাথলিট বলে জগৎ জুড়ে নির্বাচিত, তিন দফায় বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন মুহাম্মদ আলি আর প্রায় কথাই বলছেন না।
যিনি মুখে মুখে পদ্য ফেলে বলে দিতেন তার কোন প্রতিদ্বন্দ্বী কোন রাউন্ডে গড়াগড়ি যাবেন, যার হাতের স্পিডেই ছুটত মুখ। যিনি ১৯৬৪-এ বিশ্ব খেতাব জেতার অনেক আগে থেকেই নিজেকে ‘দ্য গ্রেটেস্ট’ আখ্যা দেওয়া শুরু করেছিলেন, এবং সতেরো বছর বিশ্ব হেভিওয়েট দাপিয়ে এবং অভূতপূর্ব সব স্টাইল, ফাটাফাটি, রক্তারক্তির লড়াই লড়ে অবসর নেওয়ার পরও থেকে গেলেন দ্য গ্রেটেস্ট, তিনি পার্কিনসন্সে স্থবির হয়ে গেছেন অনেক দিন।

আটলান্টা অলিম্পিক্সের উদ্বোধন করেছিলেন কাঁপা কাঁপা হাতে। কুণ্ডের আগুন জ্বেলে। তাকে নিয়ে সদ্য তোলা এক নিপুণ তথ্যচিত্রের উদ্বোধনেও যেতে পারেননি লস অ্যাঞ্জেলিসে। এখনকার নিবাস আর্কানস্-য় প্রায় সারাটা ক্ষণ তিনি নিজের ঘরে, নিজের মধ্যে। দিন কতক আগে নাতির খেলা দেখতে গিয়েছিলেন বটে, কিন্তু এ লেখা যন্ত্রস্থ হওয়ার সময় আবার তিনি হাসপাতালে।

এখন এক মহা নিস্তব্ধতার নাম মুহাম্মদ আলি।

তবে আলির মহানিস্তব্ধতা নিছক নৈঃশব্দ্য নয়, দুনিয়াজোড়া বক্সিংপ্রেমীদের কাছে এই নীরবতা এক বিগ ব্যাং বা মহা বিস্ফোরণের মতো। আলি টুঁ শব্দটিও করছেন না, কিন্তু মানুষ ওরই মধ্যে বক্সিং শিল্পটারই নক ডাউন কাউন্ট শুনতে পাচ্ছে।

গত শতকের ষাট এবং সত্তর দশকের সেই স্বর্ণযুগে ফিরতে বক্সিং-এর প্রয়োজন আরেক মুহাম্মদ আলির। যা গায়ে গায়ে দুটো আইনস্টাইন। দুটো চে গোয়েভারা বা দুটো ব্র্যাডম্যান পাওয়ার মতো। অর্থাৎ অসম্ভব।

এই আলি আসলে কী, কেন এত বড়, কী জন্য খেল্ জগতের এক সেরা অবতার তা বোঝার দরকার আছে। সে-প্রসঙ্গে অচিরে আসছি, তার আগে ঠিক কী পরিবেশ-পরিস্থিতিতে তার বক্সিং-এর ত্রাতা হয়ে ওঠা সেই বৃত্তান্তটা ছোট্ট করে শুনিয়ে নিই।

১৯৬০-এ অলিম্পিক চ্যাম্পিয়ন হয়ে পেশাদার হেভিওয়েট হলেন ক্যাসিয়াস ক্লে (মুসলমান হয়ে মুহাম্মদ আলি নাম নিলেন তো অনেক পরে), প্রথম লড়াইয়ে টানি হানসেকারকে ছ’রাউন্ডে নক আউট করে পেলেন কত? না, ২০০০ ডলার। দু-মাস পরেই হার্ব সাইলারকে চার রাউন্ডে নক আউট করে প্রাপ্তি? ২০০ ডলার! বিশ্বাস করুন মোটে দু’শো ডলার।

কিন্তু পার্সের চিন্তাও ক্লে-র মগজে সে-সময়ে নেই। তার ধ্যানজ্ঞান দিবারাত্রির একটাই স্বপ্ন-বিশ্ব হেভিওয়েট মুকুট। যেটা তখন প্যাটার্সনের দখলে। যাকে লড়তে দেখে তার মনে হয়- জো লুই, জার্সি জো ওয়ালকট আর রকি মার্সিয়ানোর পর হেভিওয়েট চ্যাম্পিয়নের এই দশা!

প্যাটার্সন তখনও চ্যাম্পিয়ন, অথচ বক্সিং মহল গাইতে শুরু করেছে, দূর দূর, আসল চ্যাম্পিয়ন তো সনি লিস্টন! ওই এলো বলে।

লিস্টন এলেনও। পর পর দুটো লড়াইয়ে প্রথম রাউন্ড নক আউট করলেন প্যাটার্সনকে।  মোষের মতো শক্তি গায়ে, হিংস্র ভাল্লুকের মতো মেজাজ। দুনিয়া ধরে নিয়েছিল লিস্টন নিজে থেকে রিং না ছাড়লে তাকে ছাড়াবার মতো লোক কেউ নেই।

শুধু একটি মানুষ অন্যরকম ভেবেছিলেন। ক্যাসিয়াস ক্লে।

বিশ্ব  মুকুটের চ্যালেঞ্জার হবার জন্য ১৯৬২-র ১৫ নভেম্বর ক্লে রিঙ্গে নামলেন কমপক্ষে দু’শ লড়াইয়ের কাল পরীক্ষিত বক্সার আর্চি মোরের বিপক্ষে। দীর্ঘদিন মিডল ওয়েটে এবং লাইট হেভিওয়েটে লড়ে আর্চি নতুন করে চেষ্টায় ছিলেন হেভিওয়েট দখল নেবার। প্রথম চেষ্টা মাঠে মারা গেছিল রকি মার্সিয়ানোর সামনে পড়ে। নক আউট।

অলিম্পিকে জিতে এই আর্চি মোর-এর কাছেই স্টাইল এবং ডিফেন্স শিখতে গিয়েছিলেন ক্লে।

আর সেই আর্চির মুখোমুখি হবার আগে থেকেই ক্লে ছড়া কাটতে শুরু করলেন ‘আর্চি মোর উইল ফল ইন ফোর’। রাউন্ড চার, আর্চি ধপাস।

বলা বাহুল্য, ওই চার রাউন্ডেই বিদায় হলেন আর্চি মোর এবং ক্লে’র হাতে পুরস্কারমূল্য এল ৪৫, ৩০০ ডলার। কিন্তু তার তখন নজরে শুধু সনি লিস্টনের কোমরের ওই হেভিওয়েট চ্যাম্পিয়নের বেল্ট।

বার বার এই টাকার কথাটা তুলতে হচ্ছে কারণ হাজার-লাখের খেলাটাকে এই ক্লে-ই (ততদিনে মুহাম্মদ আলি) বছর দশেকের মধ্যে পাঁচ মিলিয়ন ডলারের খেলায় তুলে নিয়ে গিয়েছিলেন জর্জ ফোরমানের সঙ্গে খেতাবি লড়াইয়ে। যা লড়া হলো আফ্রিকার জাইর-এ। নামকরণ হল ‘রাম্বল ইন দ্য জঙ্গল’। জঙ্গলে দঙ্গল। যা নিয়ে এক অপূর্ব বই লিখলেন মার্কিন লেখক নর্মান মেলার- ‘দ্য ফাইট’। লিস্টনের সঙ্গে প্রথম লড়াইয়ে ক্লে পেলেন ৪৬৪,৫৯৫ ডলার!

১৯৭৫-এ প্রকাশিত তার অতি সুলিখিত (সহলেখক রিচার্ড ডারহাম) এবং অসাধারণ আত্মজীবনী ‘দ্য গ্রেটেস্ট: মাই ওন স্টোরি’ (আর কোনো ক্রীড়াবিদের আত্মজীবনী এর পাশে রাখার জো নেই) খুব সরল মেজাজে ওই ক্লে-লিস্টন লড়াই ঘটিয়ে তোলার গল্প দিয়েছে।

আলি বলছেন, “আমি দেখেছি যে প্যাটার্সনের খেতাব কাড়ার আগে থেকেই বিশালদেহী, গোরিলাচক্ষু, খুনে মেজাজের সনি লিস্টনকে বক্সিং মহল ‘মুকুটহীন চ্যাম্পিয়ন’ তকমা দিয়ে ফেলেছিল। লিস্টনের সঙ্গে একটা লড়াই পেতে আমি তেমনই একটা আবহাওয়া তৈরির চেষ্টা চালালাম। লিস্টনকে ভয় পাওয়া দূরস্থান, আমি ওর মধ্যেই ভয় ঢোকানোর কল করলাম। ‘আমিই সেরা, আমাকে দাবানোর কেউ নেই’- চিল চিৎকারে এটাই ঘ্যানঘেনিয়ে বক্সিং ফ্যানদের ঘুম কেড়ে নিচ্ছিলাম। অনেকের চোখ গোল হলো- ছোকরা বলে কী!

এই বলার মধ্যে একটা ছকও ছিল। ভেতরে ভেতরে লিস্টনকে টলিয়ে দেওয়া। এমনিতে তো তাকে ‘দ্য বিগ আগলি বেয়ার’ (দামড়া কুচ্ছিত ভল্লুক) নামই দিয়েছিলেন ক্লে, তার ওপর নিজের শক্তি আর গতির কথা বলে কিছু প্রশ্নও ঢুকিয়ে দিচ্ছিলেন মনের কোণে। লিস্টন তো ঠাউরে উঠতে পাচ্ছিলেন না, লম্বাচওড়া হলেও ক্লে’র মধ্যে এত শক্তি কি সত্যিই আছে?

কিন্তু তাকে আরও বেশি ভাবাচ্ছিল ক্লে’র ক্ষিপ্রতা, একই সঙ্গে দু’হাত ও দু’পায়ের। মারকুট্টে, কিন্তু শ্লথ এবং ভারী শরীরের লিস্টনের কাছে আসল সমস্যাটা ছিল এখানেই। তিন রাউন্ডের বেশি কাউকে বাড়তে দেন না, খেলা চুকিয়ে দেন নক আউট পাঞ্চে। কিন্তু এই নেচে নেচে লড়ে বেড়ানো ছোকরাকে বাগে আনবেন কী ফন্দিতে? সব চেয়ে বিশ্রী হলো বখাটেটা তাকে ভয়ও পায় না!

এরই মধ্যে ক্লে লিস্টনের জিম-এ গিয়ে তার ট্রেনিং প্র্যাকটিস দেখা শুরু করলেন। লিস্টনকে রিঙে লড়তে দেখার বিস্ময় ও ভীতি এই ট্রেনিং দেখতে দেখতে উবে গেল এবং তার কিছু কিছু দুর্বলতাও চোখে পড়ল, যেগুলোর সুযোগ আগে কেউ কখনও নেয়নি। প্রতিদ্বন্দ্বীর ট্রেনিং দেখতে যাওয়া বক্সিং-এ কোনো নতুন ব্যাপার নয়, তবে ক্যাসিয়াস ক্লে’র আগে বা পরে কোনো বক্সার এই কাজটাকে ল্যাবরেটরিতে গবেষণার পর্যায়ে তুলে নিয়ে যেতে পারেননি।

লিস্টনের ট্রেনিং দেখতে দেখতে ক্লে বুঝে যান একে ছিটকে ফেলা কোনো ব্যাপার না। শুধু নিজের লড়াইটা নিপুণ ভাবে খেলে যাওয়া দরকার। ক্লে’র সেই নিজের, নিপুণ স্টাইলটা কী?

ক্লে বলছেন, স্টাইলটা হলো রিঙের মধ্যে সারাক্ষণ চলন্ত থাকা, এবং ঘুরে ঘুরে, প্রায় বৃত্তাকারে চলন্ত থাকা। ঠিক সময়ে ব্যাকস্টেপিং-এ পিছিয়ে আসা। তার পাশাপাশি আরেকটা বড় কায়দা রপ্ত করা-উল্টো দিকের মার এড়িয়ে মার লাগাতে পারা। জিম-এ প্র্যাকটিসের সময় একটা কাজ ক্লে ঘণ্টা ধরে করে যেতে পারেন। তা হলো স্পারিং পার্টনারের ছোড়া ঘুসির থেকে ঠিক মুহূর্তে পিছিয়ে আসা।

এই পিছিয়ে আসা শুধু পায়ের কাজ নয়। দ্রুত একটা জ্যাব বা খোঁচা মার দিয়ে নিজের মুখ পিছনে এবং ধারে হেলিয়ে বিপক্ষের ঘুসিকে পাশ কাটিয়ে যাওয়া।

ঘুসির রেঞ্জের মধ্যে থেকেও ক্লে কী করে শুধু মাথা হেলিয়ে মার এড়ান সেটা তখনকার পেশাদারদের মাথায় ঢুকত না।

তারা বলতেন, “এ ছোকরার মুণ্ডুটা একদিন ধড় থেকে আলাদা হবে।” তাদের চোখের সামনে ভাসত তখন লিস্টনের মস্ত মুঠোর কোদাল কোপ। ক্লে নিজের একটা বিল্ট-ইন রেডার তৈরি করে ফেলেছিলেন। উনি টের পেতেন কতখানি পিছানো যাবে। কখন ডাক করে ব্লো এড়াতে হবে। তারপর কখন জ্যাব করে করে বিপক্ষেকে ভুল পায়ে ফেলে ফাঁসাতে হবে। উনি শিখে ফেলেছিলেন প্রতিদ্বন্দ্বীকে ক্রমে ক্রমে ক্লান্ত করে হতাশ করার বিজ্ঞানটা।

ক্লে’র এই স্টাইলের মোকাবিলায় লিস্টন কোনো স্ট্র্যাটেজি কষে ছিলেন বলে জানা যায় না। ওর টিটকিরি আর চ্যালেঞ্জ শুনে শুনে তিতিবিরক্ত লিস্টন শেষে বাজার গরম করার জন্য বলা ধরলেন, “আমার একটাই চিন্তা, ওর বকবক থামাতে যে ঘুসিটা মারব, তাতে মুঠোটা ওর চোয়াল ভেঙে গলা অবধি ঢুকে যাবে। সে-মুঠো অপারেশন করে বার করতে এক হপ্তা চলে যাবে। আর তারপর ও যেন সেরে উঠে খাড়া হতে পারে।”

১৯৬৪-র ২৫ ফেব্রুয়ারি ক্লের মুখোমুখি রিঙে নেমে লিস্টন বুঝে গিয়েছিলেন এ এক অন্য খেলায় পড়েছেন তিনি। শুধু গতি নয়, অদ্ভুত গতি আর নানা ছলচাতুরীর মুখে পড়েছেন।

ফ্লয়েড প্যাটারসনকে যেমন ষাঁড়ের মতো তেড়ে গিয়ে গিয়ে ঘুসিয়েছেন, তার কিছুই কাজে দিচ্ছে না। ক্লে মাথা পেছনে হেলিয়ে, পাঞ্চ এড়িয়ে, বোঁ করে পাশে চলে বাঁ হাতে পরের পর জ্যাব ঠুকছেন। সঙ্গে ডান হাতে ক্রস ঝাড়ছেন মাথায়। একটার পর একটা। লিস্টন বুঝতে পারছিলেন না কী ঘটছে। ক্লে টের পাচ্ছিলেন লিস্টনকে পেড়ে ফেলছেন।

তৃতীয় রাউন্ডে বেশ ক’বার ক্লিঞ্চ হলো, অর্থাৎ দু’জন দুজনকে গায়ে গায়ে জড়িয়ে ফেললেন। তখনই লিস্টনের বড় বড় শ্বাস প্রশ্বাসে ক্লে বুঝলেন লিস্টনের দমছুট হচ্ছে লড়াইয়ের স্পিড ধরে রাখতে। দেখলেন ওর মুখ ফুলে ফেঁপে উঠছে জ্যাবের ধাক্কায়। আর তার পর পরই আরও কয়েকটা জ্যাবে লিস্টনের বাঁ চোখের নীচে ফাটল ধরিয়ে দিলেন। সারা জীবনে লিস্টনের মুখে কেউ কাটাছেঁড়া, রক্তারক্তি করতে পারেননি। এটা ঘটে যেতে উনি হঠাৎ করে ঘাবড়ে গেলেন।

তার নিজের রক্ত রিঙের জমিতে ঝরতে দেখে চমকালেন এবং একটা আহত জন্তুর মতো ক্লের শরীর লক্ষ করে এম্তার ব্লো ছড়াতে শুরু করলেন। ক্লে সেই সব জোরালো ঘা-গুলো কনুইয়ের ওপর নিলেন। আর এর পরের রাউন্ডের শুরু থেকেই ঘুরে ঘুরে জ্যাব আর ক্রসে লিস্টনকে ব্যতিব্যস্ত করলেন। পঞ্চম রাউন্ডের শুরুতে ক্লে ভেতরে ভেতরে দিব্য আশ্বস্ত হয়ে গিয়েছেন যে, যে ছড়া দিয়ে অ্যাদ্দিন লোক খেপাচ্ছিলেন- “কিং লিস্টন উইল স্টে/ অনলি আনটিল হি মিটস ক্যাসিয়াস ক্লে/ মোর ফেল ইন ফোর/ লিস্টন ইন এইট।’ লিস্টন রাজা তদ্দিন/ ক্লের মুখোমুখি নন যদ্দিন/ মোর পড়েছেন চারে/ লিস্টন যাবেন আটে।’ সেই ছড়াই অক্ষরে অক্ষরে মিলতে চলেছে।

রাউন্ড কিছুটা এগোতে ক্লে হঠাৎ একটা চিনচিনে ব্যাপার বোধ করলেন দু’চোখে। লিস্টন ঘুসির চোটে কাঁধে ব্যথা পাচ্ছিলেন দেখে ওর কর্নারের লোকেরা কাঁধে-হাতে কী সব মলম ডলেছিলেন। লড়াইয়ের মধ্যে সেই মলম কিছুটা ক্লের শরীরে এসে পড়ে।

চতুর্থ রাউন্ডের শেষে ট্রেনার অ্যাঞ্জেলো ডান্ডি ক্লে’র শরীর-মাথা তোয়ালে দিয়ে রগড়ে তাজা করার সময় সেই মলম কিছুটা ওর চোখে চলে যায়। তাতেই পঞ্চম রাউন্ডে চোখে জ্বালা ধরে, প্রায় অন্ধ হওয়ার উপক্রম। ক্লে চেঁচাতে থাকেন লিস্টনের গ্লাভসের ভেতর ধারালো কিছু আছে, চেক করা হোক।

রাউন্ড শেষেও চোখের জ্বালা যায় না। কী সাঙ্ঘাতিক মনের অবস্থা তখন। প্রথম রাউন্ড থেকেই ঠ্যাঙানি দিয়ে রক্তারক্তি করে দিয়েছেন লিস্টনকে। তার পর কথা নেই, বার্তা নেই রিং ছাড়বেন! লোকে বলবে কী? ভয়ে পালালেন?

কিন্তু চোখের জ্বালা যে কাটে না। ঝাপসা চোখে কী লড়াই হবে? ক্লে বুঝে পাচ্ছিলেন না কী করণীয়।

ও দিকে ষষ্ঠ রাউন্ডের বেল পড়ল, পেছন থেকে কথা ভেসে এলো অ্যাঞ্জোলোর, “এটাই সেই বড় লড়াই, টাইটেল ফাইট। তোমার ফেরা নেই, ক্যাস। তুমি জিতছ, যাও ঢোকো।”

ষষ্ঠ রাউন্ডে মত্ত ষাঁড়ের মতো লিস্টন এসপার ওসপার করতে দফায় দফায় তেড়ে এলেন। ক্লে তার লম্বা রিচ-এ তাকে নাগাল পেতে দিলেন না। তার পর ক্রমশ দৃষ্টি স্বচ্ছ হতে ঘুরে ঘুরে, তাকে প্রায় দিগ্ভ্রান্ত করে জ্যাব করা শুরু করলেন। লিস্টন বুঝতে পারছিলেন ক্লে’র কম্বিনেশনের থেকে তার বেরনো বন্ধ।

সপ্তম রাউন্ডের বেল পড়ল। কিন্তু ক্লে দেখলেন লিস্টন স্টুলে থুম হয়ে বসে। চোখে ভ্যাবাচ্যাকা শূন্য চাহনি। লড়াইয়ের অবস্থায় নেই। ক্লে-র কানে তখন তার কর্নারের উল্লাসধ্বনি, “ইউ দ্য চ্যাম্পিয়ন! ইউ দ্য চ্যাম্পিয়ন!”

লুই ভিল-এর সেই অবিশ্বাস্য, প্রায় অবাস্তব স্বপ্ন দেখা কালো ছেলেটাই এখন মায়ামি বিচের এই হাজার হাজার বিস্মিত দর্শকের সামনে বিশ্বের নবতম হেভিওয়েট চ্যাম্পিয়ন।

খেল্ খতম, পয়সা হজম- এতটা সহজে নয় ক্লের কাছে। আরও এক রাউন্ড খেলা বাকি ছিল ওঁর। সাংবাদিকদের সঙ্গে। যারা অ্যাদ্দিন টানা গেয়ে গেছেন যে ক্লে তুবড়ে যাবে লিস্টনের ঘুসির মুখে পড়ে, মারের চোটে ভাঙচুর হবেন।

প্রেস কনফারেন্সে বসেই ক্লে হাঁক দিলেন, “আপনাদের প্রশ্ন পরে শুনব। আগে আমার কথাটা শুনে নিন। অ্যাদ্দিন তো যা বাজে বকার বকে নিয়েছেন। বলেছেন সনি লিস্টন আমায় জানে মেরে ফেলবে। বলেছেন, ও নাকি জ্যাক জনসন বা জ্যাক ডেমসির চেয়েও বড়। এমনকী জো লুইয়ের চেয়েও। আপনারাই ওকে সর্বকালের বড় বানিয়ে বসে আছেন। কেউ কানেই তোলেননি আমার সেই একটা কথা- আই’ম দ্য গ্রেটেস্ট। তা হলে এখন বলুন সবার সেরা কে?”

সবাই নোটপ্যাড আর মাইক হাতে বসে। হল জুড়ে একটা নীরবতা। ক্লে ফের প্রশ্ন তুললেন, “বলুন কে সেরা?” হল ভরতি সাংবাদিক বোবা মেরে চুপ।

ক্লে ফের হুঙ্কার ছাড়লেন, “শেষবারের মতো প্রশ্ন রাখছি, হু ইজ দ্য গ্রেটেস্ট।”

প্রথমে একটু ইতস্তত করলেন সবাই। তারপর সমস্বরে ঘোষণা করলেন, “আপনিই-ই।”

Comments

comments