কামারুজ্জামানের ফাঁসি কার্যকর

একাত্তরে মানবতাবিরোধী অপরাধে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত জামায়াতে ইসলামীর সহকারি সেক্রেটারি জেনারেল কামারুজ্জামানের ফাঁসি কার্যকর করা হয়েছে।

একাত্তরে মানবতাবিরোধী অপরাধে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত জামায়াতে ইসলামীর সহকারি সেক্রেটারি জেনারেল কামারুজ্জামানের ফাঁসি কার্যকর করা হয়েছে।একাত্তরে মানবতাবিরোধী অপরাধে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত জামায়াতে ইসলামীর সহকারি সেক্রেটারি জেনারেল কামারুজ্জামানের ফাঁসি কার্যকর করা হয়েছে।

শনিবার রাত ১০টা ৩০ মিনিটে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে কামারুজ্জামানের ফাঁসির রায় কার্যকর করেন নির্ধারিত জল্লাদরা।

কারা মহাপরিদর্শক (আইজি প্রিজন) ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সৈয়দ ইফতেখার উদ্দিন আহমেদ বলেন, রাত সাড়ে ১০ টায় ফাঁসি কার্যকর করা হয়েছে। রাত ১০টা ১৮ মিনিটে ফাঁসির মঞ্চের কাছে যান প্রতিনিধি দল। এরপর ১০টা ৩০ মিনিটে কামারুজ্জামানের ফাঁসি কার্যকর করা হয়।

ঢাকা জেল সুপারের উপস্থিতিতে ঢাকা জেলা ম্যাজিস্ট্রেট তার হাতে থাকা লাল রুমাল মাটিতে ফেলে দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে জল্লাদরা ফাঁসি কার্যকর করেন। এর আগে কামারুজ্জামানের মুখ কালো কাপড় ও মাথা কালো টুপি দিয়ে ঢেকে দেওয়া হয়। এরপর ফাঁসির দড়িটি তার গলায় জড়িয়ে দেওয়া হয়।

ফাঁসির দড়িতে দীর্ঘক্ষণ ঝুলে থাকার পর কামারুজ্জামানের মৃত্যুর বিষয়ে মোটামুটি নিশ্চিত হওয়ার পর তাকে দড়ি থেকে নামানো হয়। এরপর দায়িত্বরত সিভিল সার্জন আবদুল মালেক মৃধা তার ঘাড়, হাত ও পায়ের রগ কেটে মৃত্যু নিশ্চিত করেন।

এর আগে শনিবার সন্ধ্যা ৬টা ৫০ মিনিটে কারাগারে প্রবেশ করেন মহাপরিদর্শক (আইজি প্রিজন) ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সৈয়দ ইফতেখার উদ্দিন। সন্ধ্যা ৭টার দিকে এ্যাডিশনাল আইজি (প্রিজন) বজলুল কবির কারাগারে প্রবেশ করেন। রাত আটটার পর আসেন লালবাগ জোনের ডিসি মফিজ উদ্দিন আহমেদ। এর পর পরই প্রবেশ করেন ঢাকা মহানগর পুলিশ কমিশনারের পক্ষে উপ-পুলিশ কমিশনার শেখ নাজমুল আলম (ডিবি পশ্চিম)।

রাত নয়টার দিকে ঢাকা জেলা প্রশাসক তোফাজ্জেল হোসেন ও সিভিল সার্জন আবদুল মালেক মৃধা কারাগারে যান।

শনিবার বিকেলে স্ত্রী নূরুননাহার বেগম, বড় ছেলে হাসান ইকবাল ওয়ামীসহ পরিবারের ২১ সদস্য কেন্দ্রীয় কারাগারে কামারুজ্জামানের সঙ্গে শেষ সাক্ষাৎ করেন।

যুদ্ধাপরাধের অপরাধে এটি দ্বিতীয় ফাঁসি। এর আগে জামায়াতেরই সহকারি সেক্রেটারি জেনারেল কাদের মোল্লা ফাঁসি দেয়া হয়েছিল।

গত ৬ এপ্রিল কামারুজ্জামানের ফাঁসির দণ্ড পুনর্বিবেচনার আবেদন খারিজ করে দেয় আপিল বিভাগ। সেদিনই বিকালে কামারুজ্জামানের সাথে দেখা করেন পরিবারের সদস্যরা। পরের দিন আইনজীবীরাও তার সঙ্গে দেখা করেন।

এরপর ৮ এপ্রিল আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ রায়ে সই করেন সংশ্লিষ্ট বেঞ্চের চার বিচারপতি। সব বিচারপতির স্বাক্ষর শেষে আপিল বিভাগের সংশ্লিষ্ট শাখার মাধ্যমে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের রেজিস্ট্রারের কাছে পাঠানো হয়। সেখান থেকে রায়ের অনুলিপি কারা কর্তৃপক্ষের কাছে যায়। ওইদিনই কামারুজ্জামানকে রায়ের সংবাদ শোনানো হয়।

এরপরই প্রশ্ন আসে কামারুজ্জামান রাষ্ট্রপতির কাছে প্রাণভিক্ষা চাইবেন কি না। ৯ এপ্রিল বৃহস্পতিবার সকালে কামারুজ্জামানের আইনজীবীরা দেখা করেন। তারা বেরিয়ে আসলে সাংবাদিকরা জানতে চান কামারুজ্জামান রাষ্ট্রপতির কাছে প্রাণভিক্ষা চাইবেন কি না। এই বিষয়ে তার আইনজীবীরা গণমাধ্যমে সুস্পষ্ট কিছু বলেননি।

১০ এপ্রিল শুক্রবার গুজব ছড়িয়ে পড়ে আজ রাতেই ফাঁসি হচ্ছে। গুজব ছড়িয়ে পড়ার পেছনে কারণ ছিল শুক্রবার সকালে দুই ম্যাজিস্ট্রেট কারাগারে গিয়ে কামারুজ্জামানের কাছে জানতে চান তিনি রাষ্ট্রপতির কাছে প্রাণভিক্ষা চাইবেন কি না। কামারুজ্জামান জানিয়ে দেন তিনি প্রাণভিক্ষা চাইবেন না। প্রাণভিক্ষা না চাওয়ার বিষয়টি গণমাধ্যম সন্ধ্যার দিকে জানতে পারে। ওইদিন রাতে এক অনুষ্ঠানে স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, কামারুজ্জামানকে আর সময় দেয়া হচ্ছে না। এরপরই গুজব ছড়িয়ে পড়ে আজ রাতেই ফাঁসি দেয়া হচ্ছে। কিন্তু সেটি আর হয়নি। সেই ফাঁসি দেয়া হলো শনিবার রাত ১০টার পর।

কামারুজ্জামানের বিরুদ্ধে সাত অভিযোগ

কামারুজ্জামানের বিরুদ্ধে প্রথম অভিযোগ হলো, একাত্তরের ২৯ জুন তার নেতৃত্বে আলবদররা শেরপুরের ঝিনাইগাতী থানার রামনগর গ্রামের বদিউজ্জামানকে অপহরণ ও নির্যাতনের পর গুলি করে হত্যা করে।

দ্বিতীয় অভিযোগ অনুযায়ী, কামারুজ্জামান ও তার সহযোগীরা শেরপুর কলেজের অধ্যক্ষ সৈয়দ আবদুল হান্নানকে প্রায় নগ্ন করে শহরের রাস্তায় হাঁটাতে হাঁটাতে চাবুকপেটা করেন।

তৃতীয় অভিযোগ, ২৫ জুলাই কামারুজ্জামানের পরামর্শে পরিকল্পিতভাবে আলবদর ও রাজাকার বাহিনী পাকিস্তানি সেনাদের নিয়ে শেরপুরের নালিতাবাড়ীর সোহাগপুর গ্রামে নির্বিচারে হত্যাকাণ্ড চালায় ও নারীদের ধর্ষণ করে।

চতুর্থ অভিযোগ, কামারুজ্জামানের নির্দেশে আলবদর বাহিনীর সদস্যরা গুলি করে শেরপুরের গোলাম মোস্তফাকে হত্যা ও আবুল কাসেমকে আহত করে।

পঞ্চম অভিযোগ অনুসারে, মুক্তিযুদ্ধকালে কামারুজ্জামান ও সহযোগীরা শেরপুরের লিয়াকত আলী ও মুজিবুর রহমান পানুকে অপহরণ ও নির্যাতন করে।

ষষ্ঠ অভিযোগ, একাত্তরের নভেম্বরে কামারুজ্জামানের নির্দেশে আলবদররা টুনু ও জাহাঙ্গীরকে আটকের পর নির্যাতন করে। টুনুকে হত্যা করা হয়।

সপ্তম অভিযোগে বলা হয়েছে, কামারুজ্জামান ও আলবদরের সদস্যরা ছয়জনকে বেয়োনেট দিয়ে খুঁচিয়ে হত্যা করে।

কামারুজ্জামানের বিরুদ্ধে পঞ্চম ও ষষ্ঠ অভিযোগ ছাড়া বাকি পাঁচটি অভিযোগে অপরাধ প্রমাণিত হয়। প্রথম, তৃতীয়, চতুর্থ ও সপ্তম-এই চারটি অভিযোগে মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে হত্যায় সংশ্লিষ্টতা বা সহযোগিতার জন্য এবং দ্বিতীয় অভিযোগে মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে অমানবিক আচরণের দায়ে কামারুজ্জামানকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়।

২০১৩ সালের মে মাসে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুন্যাল-২ মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে কামারুজ্জামানের ফাঁসির আদেশ দেন৷ গত বছরের ৩ নভেম্বর ট্রাইবুন্যালের রায় বহাল রাখেন সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ ৷

শেরপুরে দাফনের প্রস্তুতি শেষ, যাচ্ছেন না স্ত্রী-ছেলে

জামায়াতে ইসলামীর সিনিয়র সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মুহাম্মদ কামারুজ্জামানকে শেরপুরের বাজিতখিলা গ্রামে তার প্রতিষ্ঠিত এতিমখানার পাশে দাফন করা হবে। দাফনের প্রস্তুতি এরইমধ্যে সম্পন্ন করা হয়েছে। ফাঁসি কার্যকরের পর তার লাশ এ্যাম্বুলেন্সে করে শেরপুরে নেওয়া হবে।

নিরাপত্তার কারণে কামারুজ্জামানের স্ত্রী ও দুই ছেলেসহ পরিবারের কেউই যাচ্ছেন না সেখানে।

কামারুজ্জামানের বড় ছেলে হাসান ইকবাল ওয়ামী শনিবার সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে বলেন, ‘বাবার ইচ্ছা অনুযায়ী তার লাশ শেরপুরের নিজ গ্রামে নেওয়া হবে। বাজিতখিলা মুদিপাড়া এলাকায় এতিমখানার পশ্চিম পাশে দাফন করা হবে। এ জন্য চাচা-জ্যাঠারাসহ অন্যান্যরা চলে গেছেন। সেখানে অন্যান্য আত্মীয়স্বজন যাবতীয় প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছেন।’

তিনি বলেন, ‘নিরাপত্তার কারণে আমরা দুই ভাই, আম্মা-বোনসহ কয়েকজন সেখানে যাচ্ছি না। আব্বাও এ ব্যাপারে মানা করেছেন। এ ছাড়া সংগঠনও (জামায়াত) বলেছে, আমরা যেন না যাই। কারণ আমরা গেলে আওয়ামী লীগ বা সরকারের লোকজন গণ্ডগোল করতে পারে।’

তিনি বলেন, ‘আমার আব্বা নেতাকর্মীদের ধৈর্য ধরার পরামর্শ দিয়েছেন। মেধার রাজনীতি করার কথা বলেছেন। তিনি ইসলামী আন্দোলনের বিজয় দেখতে চেয়েছেন।’

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *