যেকোনো পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত খালেদা জিয়া
জাতীয়

যেকোনো পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত খালেদা জিয়া

যেকোনো পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত খালেদা জিয়া, বুধবার বিকালে বিএনপি চেয়ারপারসনের গুলশান কার্যালয়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপার্সন এ কথা বলেছেন।

জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলার রায়ের আগে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া বলেছেন, যেকোনো পরিস্থিতির জন্য তিনি প্রস্তুত আছেন। তবে ন্যায়বিচার হলে বেকসুর খালাস পাবেন বলে আশা করছেন তিনি।

বুধবার বিকালে বিএনপি চেয়ারপারসনের গুলশান কার্যালয়ে তিনি বলেন, দেশবাসীর উদ্দেশ্যে সগৌরবে জানাতে চাই যে, আপনাদের খালেদা জিয়া কোনো অন্যায় করেনি, কোনো দুর্নীতি করেনি।

এই সংবাদ সম্মেলনে খালেদা জিয়া ২০৩৩ শব্দের একটি লিখিত বক্তব্য পড়ে শোনান। তবে তিনি তার পূর্বের বড় সংবাদ সম্মেলনের মতো এদিনও গণমাধ্যমকর্মীদের কোনো প্রশ্ন করার সুযোগ দেননি।

আওয়ামী লীগ দেশে স্বৈরশাসন কায়েম করলেও দলটিতে বহু গণতন্ত্রকামী রয়েছে বলে মনে করেন বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া। আর এই গণতন্ত্রকামীদেরকে জাতীয় ঐক্যে ডেকেছেন তিনি।

খালেদা জিয়ার দাবি, তিনি কোনো দুর্নীতি বা অন্যায় করেননি। ন্যায়বিচার হলে এই মামলায় তিনি খালাস পাবেন। তবে এই ন্যায়বিচার পাবেন কি না, সে আশঙ্কার কথাও সংবাদ সম্মেলনে তুলে ধরেন বিএনপি চেয়ারপারসন।

সংবাদ সম্মেলনে সরকারের বিরুদ্ধে অপশাসন, বেপরোয়া দুর্নীতি ও বিচারহীনতার অভিযোগ তুলে ধরা হয়। খালেদা জিয়া বলেন, তথাকথিত উন্নয়নের নামে শোষণ, বঞ্চনা, লুটপাট ও অত্যাচারের এক দুঃসহ দুঃশাসন আজ জনগণের বুকের ওপর চেপে বসেছে। এই স্বৈরশাসন জনগণকে ভোটের অধিকার থেকে বঞ্চিত করেছে।

অতীতে এই রকমের পরিস্থিতিতে ছাত্র-যুবক, তরুণেরা অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছে উল্লেখ করে আবারও এমন ঐক্যের আহ্বান জানান খালেদা জিয়া।

বিএনপি নেত্রী বলেন, ছাত্র-জনতার ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনেই প্রতিষ্ঠিত হয়েছে রাষ্ট্রভাষা বাংলা। সৈনিক, ছাত্র-জনতার মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত হয়েছে আমাদের প্রিয় স্বাধীনতা। এই ছাত্র-জনতা আন্দোলনেই স্বৈরাচার পরাজিত হয়েছে।

আজ গণতন্ত্রকে ফিরিয়ে আনতে স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব রক্ষার জন্য সেই ছাত্র, জনতাকে আহ্বান জানাই এগিয়ে আসতে। বিএনপি, ২০ দলসহ প্রতিটি গণতান্ত্রিক দল, কৃষক শ্রমিকসহ সকল শ্রেণী পেশার মানুষকে আমি বৃহত্তর জাতীয় ঐক্য গড়ে তোলার আহ্বান জানাচ্ছি।

খালেদা জিয়া বলেন, আওয়ামী লীগেও অনেকে আছেন যারা গণতন্ত্র ও জনগণের অধিকারে বিশ্বাস করেন এবং ভবিষ্যত পরিণতির কথা ভাবেন। তাদের প্রতিও আমার একই আহ্বান রইল।

সরকারের বিরুদ্ধে অপশাসন কায়েমের অভিযোগ করে বিএনপি নেত্রী বলেন, অন্যায়-অবিচার ও শোষণ-বঞ্চনা-লুণ্ঠনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের সকল পথ এরা বন্ধ করে দিয়েছে।’

হামলা-মামলা, গ্রেফতার ও জেল-জুলুম চালিয়ে প্রতিবাদী সব কণ্ঠকে স্তব্ধ করে দেয়া হচ্ছে। গণতন্ত্রেও লক্ষ কর্মী আজ মানবেতর জীবনযাপন করছে। অপহরণ, গুম, খুনের এক ভয়াবহ বিভীষিকায় বাংলাদেশ আজ ছেয়ে গেছে। ঘরে ঘরে আজ হাহাকার। স্বজন হারানো কান্নার রোলে বাতাস ভারী হয়ে উঠেছে।

খালেদা জিয়া দাবি করেন, তারা সন্ত্রাসে বিশ্বাস করেন না। কিন্তু সারা দেশে প্রকাশ্যে সন্ত্রাস করছে আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনের নেতা-কর্মীরা। কিন্তু তাদের বিরুদ্ধে মামলা হয় না। তাদের কোনো বিচার হয় না।

এই মামলায় ন্যায়বিচার না পাওয়ার আশঙ্কা করে নেতা-কর্মীদের বুঝেশুনে চলার পরামর্শ দেন বিএনপি নেত্রী। নেতা-কর্মীদেরেকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, আগামীতে অনেক ফাঁদ পাতা হবে, অনেক ষড়যন্ত্র হবে, সবাই সাবধান ও সতর্ক থাকবেন। বুঝে-শুনে কাজ করবেন।

বিএনপি সংঘাত, হানাহানি, নৈরাজ্য চায় না জানিয়ে খালেদা জিয়া বলেন, আমরা শান্তি চাই, একটি সুষ্ঠু নির্বাচন চাই। এখনো আমরা আশা করে বসে আছি আওয়ামী লীগের নেতৃত্বের মধ্যে শুভবুদ্ধির উদয় হবে।

সেই প্রত্যাশা রেখেই আহ্বান জানাই, হুমকি-ধামকি ও নির্যাতনের পথ ছেড়ে আসুন, আমরা আলোচনার মাধ্যমে শান্তির পথে একটি সুষ্ঠু নির্বাচনের ব্যবস্থা করি।

এই মামলায় ন্যায়বিচার হলে কিছুই হবে না মন্তব্য করে খালেদা জিয়া বলেন, ইনশাআল্লাহ আমি বেকসুর খালাস পাব। আর যদি শাসক মহলকে ‍তুষ্ট করার জন্য কোনো রায় হয়, তাহলে তা কলঙ্কের ইতিহাস হয়ে থাকবে।বাংলাদেশের মানুষ অন্যায়কারী কাউকেই ক্ষমা করে না, করবে না-এই কথাটির স্মরণ করিয়ে দেয়া হয় সংবাদ সম্মেলনে।

জিয়া অরফানেজ ট্রাস্টের নামে আসা অর্থ আত্মসাতের মামলা করার সমালোচনা করে খালেদা জিয়া বলেন, দেশে ন্যুনতম আইনের শাসন এবং বিচার বিভাগের স্বাধীনতা থাকলে এই জালিয়াতিপূর্ণ মামলা যারা দায়ের করেছে তাদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের হওয়া উচিত। যারা এই মামলা দায়েরের নির্দেশ দিয়েছে তাদেরও সাজা হওয়া উচিত।

খালেদা জিয়ার দাবি, তিনি প্রহসনের নির্বাচনের বদলে সত্যিকারের নির্বাচনে দেশবাসীর প্রত্যাশার পক্ষে আন্দোলন করছেন বলেই তার ওপর জুলুম, নির্যাতন, মিথ্যা মামলা দেয়া হচ্ছে।

নিজেকে নির্দোষ দাবি করলেও এই মামলায় সাজার আশঙ্কার কথা এই সংবাদ সম্মেলনেও তুলে ধরেন বিএনপি চেয়ারপারসন। তিনি বলেন, প্রধান বিচারপতিকে (সুরেন্দ্র কুমার সিনহা) চাপের মুখে পদত্যাগ ও দেশত্যাগে বাধ্য করার পর আদালত শাসকদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে ন্যায়বিচার ও ইনসাফ কায়েম করতে সফল হবে কি না তা নিয়ে সকলেরই সন্দেহ আছে।

আদালত রায় দেয়ার বহু আগে থেকেই শাসক মহল চিৎকার করে বলে বেড়াচ্ছে আমার জেল হবে। যেন বিচারক নন, ক্ষমতাসীনরাই রায় ঠিক করে দিচ্ছে।

আমাকে রাজনীতির ময়দান ও নির্বাচন থেকে দূরে রাখা এবং জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন করার জন্য আদালতকে ব্যবহার করার চেষ্টা চলছে। কিন্তু তাতেই একদলীয় শাসন কায়েম ও খালি মাঠে গোল দেয়ার খায়েশ পূরণ হবে বলে আমি মনে করি না।

খালেদা জিয়া বলেন, স্বৈরশাসক আইউব খান (পাকিস্তান আমলে) এক সময় মিথ্যা অভিযোগে মামলা করে এদেশের জনপ্রিয় রাজনীতিবিদের এবডো অর্থাৎ নির্বাচন ও রাজনীতিতে অংশগ্রহণের অযোগ্য ঘোষণা করেছিল। ইতিহাস সাক্ষী, সেই এবডো টেকে নাই। গণঅভ্যুত্থানে আইউবের পতন ঘটেছিল।

তবে সেই ঘটনার পর থেকে পুলিশ গ্রেফতার অভিযান শুরু করেছে। মঙ্গলবার পর্যন্ত এক হাজার ১০০ জনকে গ্রেফতার পরিসংখ্যান দিয়েছে বিএনপি। রায়ের আগের দিন ‍বুধবার সারাদেশে গ্রেফতারের সংখ্যা আরও কয়েকশ বলেও জানিয়েছে দলটি।

আবার মঙ্গলবার এক আদেশে রাজধানীতে ৮ ফেব্রুয়ারি থেকে মিছিল-সমাবেশ বা জমায়েত হওয়া নিষিদ্ধ করেছে পুলিশ। জেলা শহরেও বিএনপির নেতা-কর্মীরা যেন জমায়েত হতে না পারে সে জন্য নজর রাখার নির্দেশনা গেছে পুলিশ সদরদপ্তরের পক্ষ থেকে।

পুলিশের এই অবস্থানের সমালোচনা করে খালেদা জিয়া বলেন, এই রায়কে কেন্দ্র করে শাসন মহল আমাদের চেয়েও বেশি অস্থির ও ভীতু হয়ে জনগণের চলাচলের অধিকার প্রতিবাদের অধিকার, সভা মিছিলের সাংবিধানিক অধিকার প্রশাসনিক নির্দেশে বন্ধ করা হচ্ছে।

ভিত্তিহীন ও মিথ্যা মামলার বিরুদ্ধে জনগণের প্রতিবাদের ভয়ে ভীতু হয়ে এই হীন পথ খুঁজেছে সরকার। সারাদেশে তারা বিভীষিকা ও ত্রাসের রাজস্ব কায়েম করেছে। জনগণের প্রতিবাদের সম্ভাবনাকে তারা এতটাই ভয় পায়!

খালেদা জিয়ার অভিযোগ, সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারকে দীর্ঘদিন ক্ষমতায় টিকিয়ে থাকতে তাকে বিদেশে চলে যেতে বলা হয়েছিল। সেই কথায় রাজি না হওয়ায় তার ও তার সন্তানদের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা দেয়া হয়।

আমাকে এক বছর নয় দিন কারারুদ্ধ করে রেখেছিল। আমার দুই সন্তানকেও কারারুদ্ধ করে নির্যাতন করেছিল। সেই অবৈধ সরকার আমাদের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা দিয়েছিল।

সেই অবৈধ সরকারের সঙ্গে গোপন আঁতাত করে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসেছে অভিযোগ করে খালেদা জিয়া বলেন, ক্ষমতায় এসে আওয়ামী লীগ শেখ হাসিনাসহ তাদের দলের নেতা-কর্মীদের হাজার হাজার মামলা তুলে নিয়েছে। আর আমিসহ আমাদের নেতা-কর্মীদের সেই সব মামলায় হেনস্তা করা হচ্ছে। যোগ হয়েছে হাজারো নতুন নতুন মিথ্যা মামলা।

সংবাদ সম্মেলনে সরকারের বিরুদ্ধে উন্নয়ন প্রকল্পের ব্যয় পাঁচ-দশগুণ বাড়িয়েলুটের রাজত্ব কায়েম করার অভিযোগও আনেন খালেদা জিয়া। বলেন, কুইক রেন্টাল পাওয়ার প্লান্ট স্থাপনের নামে বিদ্যুৎ খাতকে বানিয়েছে হরিলুটের কারখানা। শেয়ার বাজার এরা লুটে খেয়েছে। অর্থ লোপাট করে ব্যাংকগুলো করে ফেলেছে দেউলিয়া। হাজার হাজার কোটি টাকার তছরুপকে এরা সামান্য ক্ষতি বলে উপহাস করছে।

বিএনপি নেত্রী বলেন, সুইস ব্যাংকে এরা পাচার করা অর্থের পাহাড় গড়েছে। যারা এই দুর্নীতি করছে তাদের বিরুদ্ধে কোনো তদন্ত হয় না, তদন্ত হলেও সেই প্রতিবেদন প্রকাশিত হয় না। দোষীদের গ্রেফতার করা হয় না। বিচার হয় না।

গত ২৫ জানুয়ারি রায়ের তারিখ ঘোষণার পরপরই রাজনৈতিক অঙ্গনে উত্তাপ ছড়িয়েছে। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যে কথার লড়াই শুরু হয় সেদিন থেকেই। খালেদা জিয়ার সাজা হলে কঠোর আন্দোলনের হুঁশিয়ারি দিয়ে রেখেছে বিএনপি। অন্যদিকে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের নেতারাও পাল্টা বক্তব্য দিচ্ছেন।

মামলার তারিখ ধার্য করার পর খালেদা জিয়া ইতোমধ্যে ২৭ জানুয়ারি স্থায়ী কমিটি, ২৮ জানুয়ারি ২০ দল, ৩ ফেব্রুয়ারি নির্বাহী কমিটি, ৪ ফেব্রুয়ারি স্থায়ী কমিটির সঙ্গে বসেছেন। ৫ ফেব্রুয়ারি গেছেন সিলেট সফরে। সবশেষ আজ আসছেন সংবাদ সম্মেলন করলেন খালেদা জিয়া।

বিএনপি প্রধানের বক্তব্য টেলিভিশনে প্রচার করা না হলেও বিএনপির অফিসিয়াল ফেসবুক পেজে প্রচার করা হয়।

বিএনপি প্রধান বলেন, ২০১৪ সালে দেশে সুষ্ঠু নির্বাচন হলে বিএনপি অবশ্যই সে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করত। তাহলে বিএনপি জনগণের সমর্থনে এখন ক্ষমতায় থেকে রাষ্ট্র পরিচালনায় দায়িত্বে থাকতো। যাদের আজ ক্ষমতায় থাকার কথা সেই দলের সঙ্গে বিনা ভোটের সরকার এমন আচরণ করছে যে বিএনপি নির্মূল করাই আজ তাদের প্রধান কাজ।

গত ২৫ জানুয়ারি রায়ের তারিখ ঘোষণার পর থেকেই রাজনৈতিক অঙ্গনে উত্তাপ ছড়িয়ে পড়ে। ৩০ জানুয়ারি বিএনপির নেতা-কর্মীরা হাইকোর্টের সামনে প্রিজন ভ্যান ভাঙচুর করে দুই জন নেতাকে ছিনিয়ে নেয়ার ঘটনায় উত্তাপ আরও বাড়ে। পরে অবশ্য দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর একে অনুপ্রবেশকারীদের কাজ বলে পিছুটান দেয়ার মাধ্যমে রক্ষণাত্মক অবস্থানে যান।

২০০৮ সালে সেনা নিয়ন্ত্রিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে জিয়া অরফানেজ ট্রাস্টের নামে কুয়েত থেকে আসা দুই কেটি ১০ লাখ ৭১ হাজার ৬৭১ টাকা আত্মসাতের অভিযোগে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে ২০০৮ সালের ৩ জুলাই খালেদা জিয়া, তার ছেলে তারেক রহমানসহ ছয় জনের বিরুদ্ধে মামলা করে দুর্নীতি দমন কমিশন।

প্রায় ১০ বছর পর ৮ ফেব্রুয়ারি বৃহস্পতিবার রায়ের দিন ঠিক হয় গত ২৫ জানুয়ারি। পুরান ঢাকার বিশেষ জজ আদালত-৫ এর বিচারক আখতারুজ্জামান এই রায় ঘোষণা করবেন। 

শিরোনাম ডট কম
শিরোনাম ডট কম । অনলাইন নিউজ পোর্টাল Shironaam Dot Com । An Online News Portal
http://www.shironaam.com/

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *