প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদের ওপর সীমাবদ্ধতার প্রস্তাব

মঙ্গলবার রাজধানীর ব্র্যাক ইন সেন্টারে ‘উদ্বিগ্ন নাগরিক সমাজ’ আয়োজিত এক গোলটেবিল বৈঠকে উপস্থিত সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা এসব মতামত দেন।

মঙ্গলবার রাজধানীর ব্র্যাক ইন সেন্টারে ‘উদ্বিগ্ন নাগরিক সমাজ’ আয়োজিত এক গোলটেবিল বৈঠকে উপস্থিত সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা এসব মতামত দেন।প্রধানমন্ত্রীর বহুবিধ ভূমিকা নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন সুশীল সমাজের প্রতিনিধিদের মতে, একই ব্যক্তি প্রধানমন্ত্রী (প্রধান নির্বাহী), সংসদ নেতা ও দলীয় প্রধান থাকলে ক্ষমতার ভারসাম্য আসে না। এ কারণে সংবিধান সংশোধনের ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন তারা।

মঙ্গলবার রাজধানীর ব্র্যাক ইন সেন্টারে ‘উদ্বিগ্ন নাগরিক সমাজ’ আয়োজিত এক গোলটেবিল বৈঠকে উপস্থিত সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা এসব মতামত দেন। এর আগে রোববার দুর্নীতি বিরোধী সংগঠন ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালও (টিআইবি) প্রধানমন্ত্রীর ভারসাম্যহীন ক্ষমতার কথা তুলে ধরে।

গত ১৩ ফেব্রুয়ারি ‘উদ্বিগ্ন নাগরিক সমাজ’ নামের এই সংগঠনটির ১৩ সদস্যের আহ্বায়ক কমিটি গঠন করা হয়। যার আহ্বায়ক করা হয়, সাবেক প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ টি এম শামসুল হুদাকে। দীর্ঘদিন চুপ থাকার পর মঙ্গলবারের গোলটেবিল বৈঠকের মাধ্যমে ফের আলোচনায় আসে এ সংগঠনটি। এদিন ‘পূর্ণ গণতন্ত্রের জন্য ক্ষমতার নিয়ন্ত্রণ ও ভারসাম্য’ শীর্ষক গোলটেবিলের আয়োজন করা হয়।

সংগঠনের আহ্বায়ক শামসুল হুদা বলেন, ‘বাংলাদেশে রাজনৈতিক সমস্যা সমাধানে সবসময় সাময়িক বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়। কখনোই স্থায়ী সমাধানে কাজ করে না। সাময়িক পদক্ষেপ নিয়ে সুশাসন কায়েম কিংবা গণতন্ত্র বজায় রাখা সম্ভব না।’

অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ব্যারিস্টার মঞ্জুর আহসান। তিনি সংবিধানের বেশ কিছু ধারার সংশোধনের প্রস্তাব তুলে ধরেন। যার মধ্যে ছিল- একই ব্যাক্তির বহুবিধ ভূমিকা, রাষ্ট্রপতি পদে নির্বাচন আয়োজন করা ও ক্ষমতা বাড়ানো, বাধা-নিষেধ সাপেক্ষে সংসদ সদস্যদের ফ্লোর ক্রসিং করতে দেয়া। এছাড়া প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদের ওপর সীমাবদ্ধতা আরোপ করার উপরও গুরুত্বারোপ করা হয়।’

এসব সংস্কার বাস্তবায়নে সংবিধান সংশোধনের জন্য প্রয়োজনে সরকারকে সংবিধান সংস্কার কমিশন গঠনের আহ্বান জানান সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা এম. হাফিজ উদ্দিন খান ও গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব মুহম্মদ জাহাঙ্গীর।

গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব মুহম্মদ জাহাঙ্গীর বলেন, ‘সংস্কারের প্রস্তাবের বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলো অদ্ভূতরকম নীরব। তারা এতে সমর্থনও করেন না, আবার বিরোধিতাও করেন না। হয়তো আমরা এইসব প্রস্তাবের ফল দেখে যেতে পারবো না। তবে আমাদের পরবর্তী প্রজন্ম এর সুফল ভোগ করবে।’

তিনি বলেন, ‘আলোচ্য সূচীতে যেসব প্রস্তাব এসেছে সেগুলো বাস্তবায়নে সরকার ইচ্ছা করলে সংবিধান সংস্কার কমিশন গঠন করতে পারেন।’

প্রথম আলোর যুগ্ম-সম্পাদক মিজানুর রহমান খান বলেন, ‘দেশে সংসদীয় গণতন্ত্রে প্রধানমন্ত্রীর শাসনের নামে কার্যত রাষ্ট্রপতির শাসন চলছে। মানুষ যেহেতু মরণশীল। আশা করি, অনেক জটিল সমস্যা আমাদের মৃত্যুর পর আপনা-আপনি শেষ হয়ে যাবে।’

ড. শাহদীন মালিক বলেন, ‘বর্তমানে প্রেসিডেন্টের পদই অপ্রয়োজনীয় হয়ে পড়েছে। ২০ বছর ধরে সকল ক্ষমতা এক ব্যক্তির হাতে। এই কেন্দ্রীভূত ক্ষমতা দেশ ও গণতন্ত্রের জন্য ভালো না।’

তিনি বলেন, ‘এই পদের (রাষ্ট্রপতি) তো কোন কাজ নেই। সমাবর্তনের বক্তব্য ছাড়া তার আর কোনো কাজই নেই। তাও আবার লিখিত বক্তব্য, যা অন্যজন লিখে দেন। ক্ষমতার ভারসাম্যের জন্য রাষ্ট্রপতির কিছু কাজ দরকার।’

সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা এম. হাফিজ উদ্দিন খান বলেন, ‘যেখানে রাষ্ট্রপতির চাকরি নির্ভর করে প্রধানমন্ত্রীর উপর, সেখানে তাকে প্রধান বিচারপতি নিয়োগের ক্ষমতা দিয়ে লাভ কী? রাষ্ট্রপতি যদি বৃহত্তর ইলেক্টোরাল পদ্ধতিতে নির্বাচিত হন, তাহলে তিনি অনেকটাই স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন।’

সুজন (সুশাসনের জন্য নাগরিক) সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, ‘রাজনৈতিক দলগুলোতে যদি গণতন্ত্র না থাকে তাহলে রাষ্ট্রে কীভাবে গণতন্ত্র থাকবে। সংবিধানে আছে কিছু লোক একত্রিত হলে রাজনৈতিক দল হয়। কিন্তু কিছু লোক একত্রিত হলে তো রাজনৈতিক দল হয় না। হয় ব্যবসা, হয় সিন্ডিকেট। অনেক সময় আবার কিছু লোক দল পাল্টিয়ে অন্য সিন্ডিকেটে যায়।’

তিনি বলেন, ‘আমাদের দেশের রাজনীতিকরা মনে করেন, তারা ছাড়া রাষ্ট্র নিয়ে আর কেউ কথা বলতে পারবে না। আর ফায়দা নেয়ার কারণে সিভিল সোসাইটিও বিভক্ত। কেউ আওয়ামী লীগ, কেউ বিএনপি।’

সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা রাশেদা কে চৌধুরী বলেন, ‘প্রকৃত সংসদীয় গণতন্ত্র কী? এটা জানাতে ভোটারদের মধ্যে সচেতনতা বাড়াতে হবে। তারা তো ত্যক্ত-বিরক্ত হয়ে কলাগাছকে ভোট দিয়ে দেন। মাঠে যারা রয়েছেন তাদের কাছেও আমাদের যেতে হবে।’

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *