স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় জাতীয় প্রতিরক্ষা-বিধ্বংসী ট্র্যাজেডি কলঙ্কময় পিলখানা বিদ্রোহের ষষ্ঠ বার্ষিকী আজ।
জাতীয়

পিলখানা ট্র্যাজেডির ৬ষ্ঠ বার্ষিকী আজ

স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় জাতীয় প্রতিরক্ষা-বিধ্বংসী ট্র্যাজেডি কলঙ্কময় পিলখানা বিদ্রোহের ষষ্ঠ বার্ষিকী আজ। স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় জাতীয় প্রতিরক্ষা-বিধ্বংসী ট্র্যাজেডি কলঙ্কময় পিলখানা বিদ্রোহের ষষ্ঠ বার্ষিকী আজ। মহাজোট সরকার ক্ষমতায় আসার মাত্র দুই মাসের মাথায় ২০০৯ সালের ২৫ ও ২৬ ফেব্রুয়ারি দেশের সূর্যসন্তান মেধাবী সেনা কর্মকর্তাদের হত্যা, নির্যাতন ও লাশগুমের লোমহর্ষক উত্সবে মেতে উঠেছিল কিছু নরঘাতক। এ ঘটনায় বিদ্রোহের বিচার হয়েছে। হত্যা মামলায় ১৫৪ আসামির মৃত্যুদণ্ড ও ১৫৯ জনকে যাবজ্জীবনসহ মোট ৫৭৫ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দেয়া হয়েছে। বিস্ফোরক মামলার বিচার চলছে।

বিচারিক আদালতের দেয়া রায়ের বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ১৫২ আসামির করা আপিলের শুনানির জন্য হাইকোর্টে বিশেষ বেঞ্চ গঠন করা হয়েছে। বিচারপতি মো: শওকত হোসেন, বিচারপতি আবু জাফর সিদ্দিকী ও বিচারপতি মোস্তফা কামাল ইসলামের শিগগিরই শুনানি শুরু হবে।

কিন্তু কেন এই বর্বর হত্যাযজ্ঞ, এর নেপথ্যে কারা ছিল সেই প্রশ্নের জবাব ও ট্র্যাজেডির নেপথ্যরহস্য আজও উন্মোচিত হয়নি। বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব ঝুঁকিতে ফেলা এবং জাতি হিসেবে বাংলাদেশিদের ধ্বংসের এমন ভয়াবহ ঘটনার ষড়যন্ত্রকারীরাও চিহ্নিত হয়নি।

দুই শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে ঐতিহ্যের ধারক ও বাংলার সীমান্তের অতন্ত্র প্রহরী ছিল বিডিআর। একাত্তরের স্বাধীনতা যুদ্ধে তাদের ভূমিকা ছিল অসামান্য। দেশের সীমান্ত রক্ষা, বিদেশি আগ্রাসন ও চোরাচালান প্রতিরোধে এক সাহসী নাম ছিল ‘বাংলাদেশ রাইফেলস’ সংক্ষেপে বিডিআর।

আইন অনুযায়ী সর্বদা বিডিআরের মূল নেতৃত্ব থাকে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর হাতে। সেনাবাহিনী থেকে প্রেষণে আসা সাহসী কর্মকর্তাদের দিয়ে পরিচালিত হয় বিডিআর। সেই বিডিআরকে সেনাবাহিনীর থেকে বিচ্ছিন্ন করার দেশি-বিদেশি ঘৃণ্য চক্রান্তের মাধ্যমে ঘটানো হয়েছিল বিডিআর বিদ্রোহ।

এর মাধ্যমে বাংলাদেশের সীমান্তকে করা হয়েছে নিরাপত্তাহীন। দেশপ্রেমিক সেনা কর্মকর্তাদের টার্গেট করে করে হত্যা করা হয়েছিল সেদিন। সেদিন সিপাহী মইন, সেলিম রেজা, ইকরাম, কাজল আলী, বাছেদ, জুয়েলসহ বিডিআরের কিছু ঘাতকের হিংস্র তাণ্ডবে লণ্ডভণ্ড হয়ে গিয়েছিল সেনা কর্মকর্তাদের পরিবারগুলো।

বিদ্রোহের পর ঐতিহ্যবাহী সংগঠনটির নাম পরিবর্তন করে করা হয়েছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)। আইনের সংশোধন এনে পরিবর্তন করা হয়েছে মনোগ্রাম ও পোশাকেরও। এরই মধ্যে বিদ্রোহের মামলার ৫৭টি ইউনিটের বিচারের সম্পন্ন হওয়ার পর হত্যা মামলারও বিচার সম্পন্ন হয়েছে। এখন চলছে বিস্ফোরক মামলার বিচার। বিডিআররের নাম পরিবর্তন করে করা হয়েছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ বিজিবি।

প্রাপ্ত তথ্যে দেখা গেছে, ১৯৭১ সালে দীর্ঘ ৯ মাসের স্বাধীনতা যুদ্ধে তিন বাহিনীর ৫১ জন সামরিক কর্মকর্তা শহীদ হয়েছিলেন। আর ২০০৯ সালে ২৫ ও ২৬ ফেব্রুয়ারি মাত্র দু’দিনের বিদ্রোহে পিলখানায় ৫৭ জন কর্মরত সেনা কর্মকর্তা, একজন অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা, দুজন সেনা কর্মকর্তার স্ত্রী, ৯ বিডিআর জওয়ান, পিলখানার বাইরে সেনাবাহিনীর এক সিপাহী, এক পুলিশ কনস্টেবল ও তিন পথচারী নিহত হয়েছিলেন।

বিদ্রোহের প্রথমদিনেই ২৫ ফেব্রুয়ারিই পিলখানার স্যুয়ারেজ লাইন দিয়ে বুড়িগঙ্গায় গিয়ে পড়েছিল ৩ সেনা কর্মকর্তার লাশ। ২৬ ফেব্রুয়ারি রাতে বিদ্রোহীরা অস্ত্র সমর্পণের পর ২৭ ফেব্রুয়ারি মাটিচাপা অবস্থায় পাওয়া গেছে লাশের স্তূপ। অর্ধশত সাহসী নির্ভীক নিরস্ত্র সেনা কর্মকর্তার সারি সারি লাশ দেখে স্তম্ভিত হয়ে পড়েছিল গোটা দেশের মানুষ।

বর্বর ওই হত্যাকাণ্ড কারা ঘটিয়েছে, কারা এর অর্থের জোগান দিয়েছে, কারা পরিকল্পনা করেছে, কী তাদের উদ্দেশ্য ছিল, এসব বিষয় আজও রহস্যাবৃত। বিডিআর হত্যা মামলার রায়েও বিষয়গুলো পরিষ্কার করা হয়নি। ঘটনার পর সেনাবাহিনী থেকে একটি ও সরকারের পক্ষ থেকে একটি তদন্ত কমিটি করা হয়েছিল। কিন্তু ওইসব তদন্ত কমিটির দেয়া প্রতিবেদনগুলো আজও প্রকাশ করেনি সরকার।

বিডিআরের নিজস্ব আইনে বিদ্রোহের বিচার ও ফৌজদারি আইনে হত্যা মামলার বিচার। দেশের ৫৭টি ইউনিটের ৬ হাজার ৪১ জন আসামির বিরুদ্ধে বিডিআর বিদ্রোহ মামলায় বিচার চলে। তাদের মধ্যে পাঁচ হাজার ৯২৬ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে শাস্তি দেয়া হয়েছে।

গত ৫ নভেম্বর দেশের ইতিহাসে আলোচিত পিলখানা হত্যা মামলার রায় দেয়া হয়। বিশেষ আদালতের বিচারক মো. আখতারুজ্জামান ওই রায়ে মামলায় ৮৪৬ জন জীবিত আসামির মধ্যে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়েছে ডিএডি তৌহিদসহ ১৫৪ জনকে। যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয়া হয়েছে বিএনপি নেতা নাসির উদ্দিন পিন্টু ও আওয়ামী লীগ নেতা তোরাব আলীসহ ১৫৯ জনকে।

সর্বনিম্ন ৩ থেকে সর্বোচ্চ ১০ বছর সাজা দেয়া হয়েছে ২৬২ জনকে। এই ২৬২ জনের মধ্যে ২০৭ জনকে সর্বোচ্চ ১০ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড ও পাঁচ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে। একই সঙ্গে তাদের আরেকটি অভিযোগে আরও তিন বছরের সাজা দেয়া হয়। সবমিলিয়ে তাদের মোট কারাদণ্ড দেয়া হয়েছে ১৩ বছর। অপর ৫৫ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ডাদেশ দেয়া হয়।

অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় বেকসুর খালাস দেয়া হয়েছে ২৭১ জনকে। মামলার মোট ৮৫০ জন আসামির মধ্যে বিচারকার্য চলাকালে ৪ জন আসামি জেলহাজতে মারা গেছেন।

পিলখানা হত্যাকাণ্ডে শহীদদের তালিকা

পদমর্যাদা এবং পরে বর্ণমালার ক্রমানুসারে তালিকা নিচে দেয়া হল-

শহীদ

০১. মেঃজেঃ শাকিল আহমেদ – বিডিআর এর ডিরেক্টর জেনারেল
০২. বেগম নাজনীন শাকিল
০৩. ব্রিঃজেঃ মোঃ আবদুল বারী – বিডিআর এর ডেপুটি ডিরেক্টর জেনারেল
০৪. ব্রিঃজেঃ মোঃ জাকির হোসেন, সিসিআর-এর মেডিক্যাল অফিসার ছিলেন।
০৫. কর্নেল মুজিবুল হক
০৬. কর্নেল মোঃ আনিসুজ্জামান
০৭. কর্নেল মোহাম্মদ মসীউর রহমান – জেসিসি, ১১তম ব্যাচ
০৮. কর্নেল কুদরত ইলাহী রহমান শফিক – জেসিসি, ১১তম ব্যাচ
০৯. কর্নেল মোহাম্মদ আখতার হোসেন – আরসিসি, ১২/৬৬১/কাসিম হাউস
১০. কর্নেল মোঃ রেজাউল কবীর
১১. কর্নেল নাফিজ উদ্দীন আহমেদ
১২. কর্নেল কাজী এমদাদুল হক
১৩. কর্নেল সামছুল আরেফিন আহাম্মেদ
১৪. কর্নেল মোহাম্মদ নকিবুর রহমান
১৫. কর্নেল কাজী মোয়াজ্জেম হোসেন
১৬. কর্নেল মোঃ শওকত ইমাম
১৭. কর্নেল মোহাম্মদ এমদাদুল ইসলাম
১৮. কর্নেল মোঃ আফতাবুল ইসলাম – আরসিসি (৭৭-৮৩), ১৪/৭৮৮
১৯. লেঃকঃ এনশাদ ইব্‌ন আমিন, আর্টিলারি – এফসিসি, ১৮তম ব্যাচ
২০. লেঃকঃ এনায়েতুল হক
২১. লেঃকঃ গোলাম কিবরিয়া এম নিয়ামতউল্লাহ – এমসিসি, ১২তম ব্যাচ/৬৫৪
২২. লেঃকঃ শামসুল আজম, ইএমই
২৩. লেঃকঃ মোঃ বদরুল হুদা, পদাতিক
২৪. লেঃকঃ মোঃ সাইফুল ইসলাম, এসি
২৫. লেঃকঃ মোঃ লুৎফর রহমান, আর্টিলারি
২৬. লেঃকঃ মোহাম্মদ সাজ্জাদুর রহমান, অর্ডন্যান্স
২৭. লেঃকঃ কাজী রবি রহমান, এডিসি
২৮. লেঃকঃ লুৎফর রহমান খান
২৯. মেজর মিজানুর রহমান
৩০. মেজর মাহবুবুর রহমান, আর্টিলারি
৩১. মেজর মোঃ মকবুল হোসেন, পদাতিক
৩২. মেজর মোঃ আব্দুস সালাম খান
৩৩. মেজর হোসেন সোহেল শাহনেওয়াজ, পদাতিক – সিসিআর, ১ম ব্যাচ
৩৪. মেজর কাজী মোসাদ্দেক হোসেন, আর্টিলারি
৩৫. মেজর মোহাম্মদ সালেহ, পদাতিক
৩৬. মেজর মাহমুদ হাসান অপু, পদাতিক – এফসিসি, ২৬তম ব্যাচ
৩৭. মেজর মুস্তাক মাহমুদ, আর্টিলারি
৩৮. মেজর মাহমুদুল হাসান, আর্টিলারি
৩৯. মেজর হুমায়ুন হায়দার, আর্টিলারি – এমসিসি, ১৭তম ব্যাচ/৯২১
৪০. মেজর মোঃ আজহারুল ইসলাম, আর্টিলারি
৪১. মেজর মোঃ হুমায়ুন কবীর সরকার, পদাতিক
৪২. মেজর মোঃ খালিদ হোসেন, আর্টিলারি
৪৩. মেজর মোহাম্মদ মাকসুম-উল-হাকিম, আর্টিলারি – আরসিসি, ২০/১১২৫/খালিদ হাউস
৪৪. মেজর সৈয়দ মোঃ ইদ্রিস ইকবাল, ইঞ্জিনিয়ার্স – জেসিসি, ২২তম ব্যাচ
৪৫. মেজর মোঃ রফিকুল ইসলাম, এইসি
৪৬. মেজর মুহাম্মদ মোশারফ হোসেন, অর্ডন্যান্স
৪৭. মেজর মোহাম্মদ মমিনুল ইসলাম সরকার, এসি
৪৮. মেজর মোস্তফা আসাদুজ্জামান, এসি – বিএমএ ৩৬ লং কোর্স
৪৯. মেজর এস এম মামুনুর রহমান
৫০. সৈনিক মোঃ জহুরুল ইসলাম

৫৭ জন সেনা কর্মকর্তার মধ্যে ৪৮ জনের নামই উপরে উল্লেখ করা হয়েছে। বাকি ৯ জন

১. কর্নেল গুলজার উদ্দীন আহমেদ – র‌্যাব এর ইন্টেলিজেন্স উইং এর প্রতিষ্ঠাতা ডিরেক্টর
২. মেজর আজিজ – আরসিসি, সিসিআর ও এমসিসি-র অ্যাডজুট্যান্ট ছিলেন
৩. মেজর মাহবুব – বিসিসি (৮১-৮৭)
৪. মেজর মোবাশ্বের – সিসিআর, ৭ম ব্যাচ; ৯৯-০০ এ কক্সবাজারে ডিজিএফআই-এ কর্মরত ছিলেন
৫. ক্যাপ্টেন মাজহারুল হায়দার – সিসিসি (৯২-৯৮), নুসরাত জাহান বাঁধনের সঙ্গে তার বিয়ের তিন মাসও হয়নি
৬. মেজর কাজী আশরাফ হোসেন
৭. লেঃকঃ আবু মূসা আইয়ুব কায়সার আহমেদ – এফসিসি, ২২তম ব্যাচ
৮. লেঃকঃ মঞ্জুর এলাহী
৯. মেজর আহমেদ আজিজুল হাকিম পলাশ – আরসিসি, ১৪/৭৬৩/তারিক হাউস

অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা ও তার স্ত্রী

১. লেঃকঃ (অবঃ) দেলোয়ার হোসেন
২. লাভলী বেগম
(উনারা দুজন চিকিৎসার জন্য ঢাকায় এসে ডিজির বাসায় উঠেছিলেন।)

বিডিআর এর নন-কমিশন অফিসার ও সৈনিক

১. সুবেদার আবুল কাশেম
২. নায়েক সুবেদার বছির উদ্দিন
৩. ল্যান্স নায়েক মানিক
৪. সহকারী পরিচালক (এডি) খন্দকার আব্দুল আওয়াল
৫. সুবেদার মেজর নুরুল ইসলাম

সিভিলিয়ান

১. তারেক আজিজ – মোহাম্মদপুরের পিপপলস ইউনিভার্সিটির ছাত্র। ডেসটিনি গ্রুপে কাজ করে নোয়াখালীতে তার পরিবারের জন্য টাকা পাঠাতো।
২. আমজাদ আলী – বিডিআর হাসপাতালে ঔষধ আনতে যাওয়ার সময় গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান। তার স্ত্রী রাশেদা অন্যের বাসায় রান্নার কাজ করে মাসে মাত্র ১,৮০০ টাকা উপার্জন করে
৩. হৃদয় হোসেন – মাত্র ১৩ বছর বয়সের এক সব্জি ফেরিওয়ালা। রাজা মিয়া ব্যাপারীর ৬ সন্তানের মধ্যে দ্বিতীয়। হৃদয়ের জন্য ইতিমধ্যে তাদের ৫০,০০০ টাকা খরচ হয়ে গেছে।
৪. কল্পনা – ১২ বছর বয়সের মেয়ে। কর্নেল মুজিবুল হকের বাসায় কাজ করতো।
৫. ফিরোজ

নিখোঁজ

১. মেজর আবু সৈয়দ গাজ্জালী দস্তগীর
২. ক্যাপ্টেন তানভির হায়দার নূর – সিসিসি (৯১-৯৭)

শিরোনাম ডট কম
শিরোনাম ডট কম । অনলাইন নিউজ পোর্টাল Shironaam Dot Com । An Online News Portal
http://www.shironaam.com/

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *