কারাবন্দী বিএনপি নেতা পিন্টুর ইন্তেকাল

কারাবন্দী বিএনপি নেতা নাসিরউদ্দীন আহমেদ পিন্টু মারা গেছেন। ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন।

কারাবন্দী বিএনপি নেতা নাসিরউদ্দীন আহমেদ পিন্টু মারা গেছেন। ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন।কারাবন্দী বিএনপি নেতা নাসিরউদ্দীন আহমেদ পিন্টু মারা গেছেন। ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন।

রোববার দুপুরের দিকে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়।

রোববার সকালে বুকে ব্যথা অনুভব করলে পিন্টুকে রাজশাহী কারাগার থেকে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। হাসপাতালের ৩২ নম্বর ওয়ার্ডে রবিবার দুপুর ১২টা ২০ মিনিটে পিন্টু হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান।

রাজশাহী মেডিকেলের পরিচালক এ কে এম নাসির উদ্দীন এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।

রাজশাহী ও রংপুর বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত ডিআইজি (প্রিজন) বজলুর রশিদও বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

পিন্টু ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি ছিলেন। বিডিআর বিদ্রোহ মামলায় তার যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হয়।

নাসিরউদ্দীন আহমেদ পিন্টু গত ৬ বছরের বেশি সময় ধরে বিডিআর বিদ্রোহ মামলার যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত আসামি হিসেবে কারাগারে আটক ছিলেন।

২০০৯ সালের ২৫ ও ২৬ ফেব্রুয়ারি বিডিআর হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় বিডিআর জওয়ানদের পালিয়ে যেতে সহযোগিতা করার মামলায় তার যাবজ্জীবন সাজা হয়। তবে বিএনপি এই মামলাকে প্রত্যাখ্যান করে। পিন্টুও এ ঘটনায় জড়িত থাকার কথা অস্বীকার করেন।

সর্বশেষ ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে মেয়র পদের জন্য মনোনয়নপত্র নিয়েছিলেন পিন্টু। তবে তার মনোনয়ন বাতিল করে নির্বাচন কমিশন।

ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি পিন্টু পুরনো ঢাকার আজিমপুর-লালবাগ এলাকার সংসদ সদস্য ছিলেন। গত ১০ এপ্রিল তাকে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে রাজশাহীতে পাঠানো হয়।

প্রসঙ্গত, গত বছরের ৫ নভেম্বর বহুল আলোচিত পিলখানা হত্যা মামলায় বিএনপি নেতা নাসিরউদ্দিন আহমেদ পিন্টুকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের আদেশ দেয় বকশিবাজারে স্থাপিত অস্থায়ী বিশেষ জজ আদালত। এ রায়ে তাকে পাঁচ লাখ টাকা জরিমানাও করা হয়। অনাদায়ে আরও ৫ বছর বিনাশ্রম কারাদণ্ড ভোগ করতে হবে বলেও রায়ে উল্লেখ করে আদালত।

পিন্টুর রাজনীতিতে আগমন

১৯৯১ সালে বিএনপি ক্ষমতাসীন থাকাকালে লালবাগ এলাকার সংসদ সদস্য ছিলেন প্রয়াত বিএনপি নেতা কর্নেল মীর শওকত আলি। তার আশীর্বাদপুষ্ট হয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে ১৯৯৪ সালে তৎকালীন ঢাকা সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে ওই এলাকার ৬৫ ও ৬৬ নং ওয়ার্ডের কমিশনার নির্বাচিত হন হাজি মোহাম্মদ সেলিম। তিনি যোগদান করেন বিএনপির রাজনীতিতে। ওই সময় একই এলাকার জাতীয়তাবাদি ছাত্রদলের ওয়ার্ড পর্যায়ের নেতা নাসির উদ্দিন পিন্টুও মীর শওকত আলির আশীর্বাদপুষ্ট হন। মীর শওকতের আশীর্বাদে হাজি সেলিম তার পৈতৃক ছোট পরিসরের ব্যবসা থেকে অল্প সময়ের ব্যবধানে কয়েক হাজার কোটি টাকার মালিক হন, আর নাসির উদ্দিন আহমেদ পিন্টু হয়ে যান ছাত্র দলের কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি।

কিন্তু ১৯৯৬ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রাককালে হাজি সেলিম এবং পিন্টু দু’জনেই লালবাগ এলাকার সংসদ সদস্য পদে প্রার্থিতার জন্য বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়ার দ্বারস্থ হন। কিন্তু এই প্রতিযোগিতায় এগিয়ে যান পিন্টু। হাজি সেলিম যখন বুঝতে পারলেন তাকে বিএনপি হতে মনোনয়ন দেয়া হচ্ছে না, তিনি তখন তৎকালীন ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি ও ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের মেয়র মোহাম্মদ হানিফের মাধ্যমে আওয়ামী লীগে যোগদান করেন এবং লালবাগ এলাকার সংসদ নির্বাচনে মনোনয়ন পেয়ে যান। আর রাতারাতি বনে যান আওয়ামী লীগের নেতা।

হাজি সেলিম এবং পিন্টু তখন থেকেই সতীর্থ এবং রাজনৈতিক সহকর্মী থেকে পরিণত হলেন রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে। ১৯৯৬ সালের নির্বাচনে পিন্টু বিজয়ী হন, পরাজিত হন সেলিম। ২০০১ সালের নির্বাচনে ঠিক তার উল্টো। এসময় পিন্টু নির্বাচিত হন, পরাজিত হন সেলিম। তবে ২০০৮ সালের নির্বাচনে পলাতক থাকার কারণে হাজি সেলিমের পরিবর্তে আওয়ামী লীগ থেকে মনোনয়ন দেয়া হয় মোস্তফা জালাল মহিউদ্দিনকে। তিনি বিজয়ীও হন। সর্বশেষ ২০১৩ সালের নির্বাচনেও মোস্তফা জালাল মহিউদ্দিনকে পুনরায় মনোনয়ন দেয় আওয়ামী লীগ। বিএনপি এ নির্বাচনে অংশ নেয়নি। এসময় পিন্টু ছিলেন কারাবন্দী। তবে হাজি সেলিম বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে অংশ নিয়ে আওয়ামী লীগ প্রার্থীকে পরাজিত করে নির্বাচিত হয়ে যান।

হাজি সেলিম আর পিন্টুর পারস্পরিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও প্রতিযোগিতার ক্ষেত্রেও সামঞ্জস্য দেখা যায় নানা ক্ষেত্রে। এই দুই নেতার মধ্যে হাজি সেলিম ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে অংশ নেয়ার জন্য মনোনয়নপত্র কিনেও জমা দিতে পারেননি দলীয় বাধার কারণে, আর নাসির উদ্দিন পিন্টু একই পদের জন্য মনোনয়নপত্র জমা দিলেও সাজাপ্রাপ্ত হওয়ায় তা বাতিল হয়ে যায়।
একই ‘গুরুর’ শিষ্য হাজি মোহাম্মদ সেলিম এবং নাসির উদ্দিন আহমেদ পিন্টু। এক সময়ের রাজনৈতিক সহকর্মী এই দুই নেতা বর্তমানে ভিন্ন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত । দলীয় পরিচয় ভিন্ন হলেও এই দুই নেতা তাদের স্ব স্ব দলীয় সরকারের কাছ থেকে সর্বোচ্চ ক্ষমা এবং আশীর্বাদ প্রাপ্তির মাধ্যমে ঐতিহাসিক নজির তৈরি করেছেন। বিগত বিএনপি নেতৃত্বাধীন চার দলীয় জোট আমলে ২০০১-২০০৬, সর্বোচ্চ সরকারি আনুকূল্য পান নাসির উদ্দিন আহমেদ পিন্টু। তার বিরুদ্ধে দায়ের করা সর্বোচ্চ ৭৬টি মামলা প্রত্যাহার করে যাবতীয় অপরাধের অভিযোগ হতে তাকে অব্যাহতি দেয়া হয়। ঠিক একই পদাঙ্ক অনুসরণ করে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন ১৪ দলীয় জোট সরকার ২০০৯-২০১৩ সালে হাজি সেলিমের বিরুদ্ধে দায়ের করা সর্বোচ্চ সংখ্যক ১৩৭ মামলা প্রত্যাহার করে যাবতীয় অপরাধের অভিযোগ হতে তাকে অব্যাহতি দেয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *