পাহাড়ে মৃত্যুর মিছিল, নিহত ১৩৫

পাহাড়ে মৃত্যুর মিছিল, নিহত ১৩৫

পাহাড়ে মৃত্যুর মিছিল, নিহত ১০৯টানা বর্ষণে পাহাড়ে মৃত্যুর মিছিল, বাড়ছে লাশের সংখ্যা। পাহাড় ধসে এখন পর্যন্ত ১৩৫ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। এর মধ্যে রাঙ্গামাটিতে ১০০ জন, চট্টগ্রামে ২৮ জন ও বান্দরবানে ৭ জনের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে।

পাহাড়ি ঢলের পানিতে ডুবে রাঙ্গুনিয়া উপজেলায় পাঁচজন ও রাউজান উপজেলায় একজন এবং রাঙামাটির কাপ্তাই উপজেলায় একজন মারা গেছেন। এ ছাড়া চট্টগ্রাম মহানগরের হালিশহর এলাকায় ঝড়ের সময় দেয়াল চাপা পড়ে একজন এবং রাঙামাটির কাপ্তাই উপজেলায় গাছচাপা পড়ে একজন নিহতের খবর পাওয়া গেছে।

মঙ্গলবার ভোররাত থেকে অভিযান চালিয়ে এসব লাশ উদ্ধার করা হয়। অভিযান এখনো চলছে। এসব ঘটনায় আহতের সংখ্যা অর্ধশতাধিক।

রাঙামাটিতে সেনা কর্মকর্তা ও সদস্যসহ ১০০ জন নিহত হয়েছেন। জেলা প্রশাসনে স্থাপিত কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ কক্ষ আজ রাত ৯টায় এই তথ্য সাংবাদিকদের জানিয়েছে। এ ছাড়া কাপ্তাইয়ে পাহাড়ি ঢলের পানিতে ডুবে একজন ও গাছচাপায় একজন নিহত হয়েছে।

মঙ্গলবার সকাল থেকে জেলা শহরের বিভিন্ন স্থান থেকে বেশ কিছু লাশ উদ্ধার করে রাঙামাটি সদর হাসপাতালে নিয়ে আসা হয়। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে লাশের সংখ্যাও বাড়তে থাকে।

জেলার সিভিল সার্জন ডা. শহীদ তালুকদার জানান, শহরের প্রবেশপথ মানিকছড়ি এলাকায় মারা গেছেন চার সেনা সদস্য। এর মধ্যে সেনা কর্মকর্তা ক্যাপ্টেন তানভীরের লাশ রাঙামাটি জেনারেল হাসপাতালে এসেছে। এ ছাড়া আরো তিন সেনাসদস্য এখানে ভর্তি হয়েছেন।

আন্ত:বাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর)-এর অফিসিয়াল ওয়েবসাইটে ৪ সেনা সদস্য নিহত হওয়ার বিষয়ে বলা হয়েছে, রাঙ্গামাটিতে পাহাড় ধসে উদ্ধার কার্যক্রম চালানোর সময় মঙ্গলবার (১৩-৬-২০১৭) ২ জন সেনা কর্মকর্তাসহ ৪ জন সেনাসদস্য নিহত হয়। ভোরে রাঙ্গামাটির মানিকছড়িতে একটি পাহাড় ধসে মাটি ও গাছ পড়ে চট্টগ্রাম-রাঙ্গামাটি মহাসড়ক বন্ধ হয়ে গেলে তাৎক্ষণিকভাবে রাঙ্গামাটি জোন সদরের নির্দেশে মানিকছড়ি আর্মি ক্যাম্প থেকে সেনাবাহিনীর একটি দল উক্ত সড়কে যান চলাচল স্বাভাবিক করতে উদ্ধার কার্যক্রম শুরু করে। উদ্ধার কার্যক্রম চলাকালীন আনুমানিক সকাল ১১টায় উদ্ধার কার্যস্থল সংলগ্ন পাহাড়ের একটি বড় অংশ উদ্ধারকারীদলের উপর ধসে পড়লে তারা মূল সড়ক হতে ৩০ ফিট নিচে পড়ে যান। পরবর্তীতে একই ক্যাম্প থেকে আরও একটি উদ্ধারকারী দল ঘটনাস্থলে পৌঁছে ২ জন সেনা কর্মকর্তাসহ ৪ জন সেনাসদস্যকে নিহত এবং ১০ জন সেনাসদস্যকে আহত অবস্থায় উদ্ধার করে।

নিহতরা হলেন- মেজর মোহাম্মদ মাহফুজুল হক (জন্মঃ ১৬ মার্চ ১৯৮১; বাড়ী- সিংড়াইল, মানিকগঞ্জ; তিনি ১৯৯৯ সালে বাংলাদেশ মিলিটারি একাডেমিতে যোগদান করেন এবং ৪৪ বিএমএ লং কোর্সের সাথে কমিশন প্রাপ্ত হন; তিনি বিবাহিত এবং পাঁচ বছর বয়সী এক ছেলের জনক), ক্যাপ্টেন মোঃ তানভীর সালাম শান্ত (জন্মঃ ৩০ মার্চ ১৯৯০; বাড়ী-বাউফল, পটুয়াখালী; তিনি ২০০৯ সালে বাংলাদেশ মিলিটারি একাডেমিতে যোগদান করেন এবং ৬৪ বিএমএ লং কোর্সের সাথে কমিশন প্রাপ্ত হন; তিনি সদ্য বিবাহিত), কর্পোরাল মোহাম্মদ আজিজুল হক (জন্মঃ ০১ মে ১৯৭৬; বাড়ী-ঈশ্বরগঞ্জ, ময়মনসিংহ; তিনি ১৯৯৫ সালে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী যোগদান করেন; তিনি বিবাহিত এবং এক ছেলে ও এক মেয়ের জনক) ও সৈনিক মোঃ শাহিন আলম (জন্মঃ ০১ আগস্ট ১৯৮৮; বাড়ী-আদমদিঘী, বগুড়া; তিনি ২০০৬ সালে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে যোগদান করেন; তিনি বিবাহিত এবং এক ছেলের জনক)।

চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়া, চন্দনাইশ ও বাঁশখালী উপজেলায় পাহাড় ধসে আজ মঙ্গলবার রাত পর্যন্ত ২৮ জন নিহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। এর মধ্যে রাঙ্গুনিয়ার জঙ্গল বগাবিল এলাকায় ২৩ জন, চন্দনাইশের ধোপাছড়ি এলাকায় চারজন ও বাঁশখালীতে একজন নিহত হয়েছে। রাঙ্গুনিয়া ও রাউজান উপজেলায় পাহাড়ি ঢলের পানিতে ডুবে মারা গেছে ছয়জন।
এ ছাড়া আজ ভোরে চট্টগ্রামের হালিশহর এলাকায় ঝড়ের সময় দেয়াল চাপা পড়ে হানিফ নামের এক ব্যক্তির মৃত্যু হয়েছে। জেলা প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণ কক্ষ এসব তথ্য জানিয়েছে।
রাঙ্গুনিয়ার ঘটনাস্থল দুর্গম পাহাড়ি এলাকা হওয়ায়, পাহাড়ি ঢলে শঙ্খ ও সাঙ্গু নদীর পানি বাড়ায় উদ্ধারকাজ ব্যাহত হচ্ছে বলে জানিয়েছে স্থানীয় প্রশাসন। হতাহতের সংখ্যা আরো বাড়ার আশঙ্কাও করা হচ্ছে।

পাহাড়ি ঢলের কারণে রাস্তাঘাট তলিয়ে যাওয়ায় রাঙামাটি ও বান্দরবানের সঙ্গে চট্টগ্রামের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন রয়েছে।

চন্দনাইশ উপজেলার ধোপাছড়ি ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) সাবেক চেয়ারম্যান আবু ইউছুপ চৌধুরী জানিয়েছেন, গতকাল সোমবার রাতে উপজেলার ধোপাছড়ি ইউনিয়নে পাহাড়ের পাদদেশে বসবাসকারী আসগর আলীর কাঁচা ঘরের ওপর মাটি ধসে পড়ে। এ ঘটনায় আজগর আলীর শিশুকন্যা মাহিয়া মাটির নিচে চাপা পড়ে মারা যায়। এ ছাড়া ছনবুনিয়া উপজাতিপাড়ায় একটি ঘরের ওপর পাহাড় ধসে একই পরিবারের দুই শিশু কেউচা কেয়াং (১০), মেমাউ কেয়াং (১৩) এবং গৃহবধূ মোকাইং কেয়াং (৫০) নিহত হন।

এ ঘটনায় ওই পরিবারের সানুউ কেয়াং (২১) ও বেলাউ কেয়াং (২৮) নামের আরো দুজন আহত হয়েছেন। তাঁদের বান্দরবান হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে বলে জানিয়েছেন সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান আবু ইউছুপ চৌধুরী।

টানা বর্ষণে পাহাড় ধসে বান্দরবানে শিশুসহ ৭ জন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন আরো ১১ জন।

মঙ্গলবার ভোরে বান্দরবানের লেমুঝিরি ভিতরপাড়া থেকে একই পরিবারের তিন শিশু, আগাপাড়ায় মা-মেয়ের এবং কালাঘাটায় এক কলেজছাত্রের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে বলে গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের সহকারী স্টেশন অফিসার স্বপন কুমার ঘোষ।

নিহতরা হলেন লেমুঝিরির বাসিন্দা সমুন বড়ুয়ার তিন সন্তান শুভ বড়ুয়া (৮), মিতু বড়ুয়া (৬) ও লতা বড়ুয়া (৪), আগাপাড়ার কামরুন নাহার (২৭) ও তাঁর মেয়ে সুখিয়া আক্তার (৮) এবং কালাঘাটার কলেজছাত্র রেবা ত্রিপুরা (১৮)।

এ সময় আহত আরো পাঁচজনকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে বলেও জানান ফায়ার সার্ভিস কর্মকর্তা।

অব্যাহত বর্ষণে ভোররাতে বাজালিয়ায় সড়ক তলিয়ে যাওয়ায় বান্দরবান-চট্টগ্রাম সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *