paliye-biyer-age-ja-jana-proyojon

পালিয়ে বিয়ে করার আগে যা জানা প্রয়োজন

পালিয়ে বিয়ে করতে গিয়ে অনেক জটিলতা সৃষ্টি হতে পারে। যেমনঃ মেয়ের পরিবার অপহরণ মামলা, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে নারী নির্যাতন মামলা, মেয়ের বয়স যদি ১৬ বৎসরের কম হয় তাহলে অপহরণ করে ধর্ষণসহ আরও অসংখ্য মামলা। যার পরিণতি হতে পারে জীবনের সকল আশার সমাধি।

যারা ভালবাসার মানুষটিকে কোনভাবেই হাতছাড়া (অবশ্যই প্রাপ্তবয়স্ক নারী ও পুরুষের স্বাধীন সম্মতি ক্রমে) করতে চান না তারা নতুন জীবন শুরু করার আগে আইনি বিষয় জেনে অগ্রসর হওয়া উচিৎ। নতুবা নতুন সংসার শুরু করার আগে ভাগ্যে জুটবে জেল ও জরিমানার গ্লানি।

আইনে কোর্ট ম্যারেজ বলে কোনো বিধান নেই। এটি একটি লোকমুখে প্রচলিত শব্দ। কোর্ট ম্যারেজ বলতে সাধারণত হলফনামার মাধ্যমে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বিয়ের ঘোষণা দেওয়াকেই বোঝানো হয়ে থাকে। এ হলফনামাটি ২০০ টাকার নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পে লিখে নোটারি পাবলিক কিংবা প্রথম শ্রেণির ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে সম্পন্ন করা হয়ে থাকে। এটি বিয়ের ঘোষণা মাত্র। যে ধর্মেই হোক না কেন, স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে পারিবারিক আইন অনুযায়ী প্রথমে বিয়ে সম্পন্ন করতে হবে। তারপর তাঁরা ইচ্ছা করলে এ হলফনামা করে রাখতে পারেন। মুসলিম আইনে বিয়ে নিবন্ধন করা বাধ্যতামূলক। হিন্দু আইনে বিয়ে নিবন্ধন ঐচ্ছিক করা হয়েছে। ছেলেমেয়ে মুসলমান হলে কাবিননামা সম্পন্ন করে না থাকলে স্বামী বা স্ত্রী হিসেবে দাবি করতে গিয়ে ভোগান্তিতে পড়তে হয়।

কোর্ট ম্যারেজ করতে হলে আপনাকে যেতে হবে কোনো নোটারী পাবলিকের (সরকারি রেজিস্টার্ড উকিল) কাছে। তিনি আপনাদেরকে (বর-কনে) ৩০০ টাকার স্ট্যাম্পে একটি হলফনামায় সই করাবেন যাতে লিখা থাকবে আপনারা প্রাপ্তবয়স্ক এবং সজ্ঞানে, স্বেচ্ছায় বিয়ে করেছেন। তার মানে কী দাঁড়ালো?

বিয়ে আপনাদেরকে আগেই করতে হবে। কোথায়? যথারীতি কাজী অফিসে। রেজিস্ট্রি কাবিনমুলে। কাজী অফিসে কাবিননামায় সই করতে হবে। কাজী সাহেবকে আপনাদের এসএসসি পরীক্ষার সার্টিফিকেট বা ন্যাশনাল আইডি কার্ড দেখাতে হবে বয়স প্রমাণের জন্য। বয়স অবশ্যই আঠারো (মেয়ে) ও একুশ (ছেলে) হতে হবে। আর লাগবে দুজন সাক্ষী। আর ওই কাবিননামাই আপনাদের বিয়ের প্রধান আইনি দলিল।

আর নোটারী পাবলিকের কাছে গিয়ে আপনি শুধু ওই দলিলের আরও একটা সম্পূরক আইনি দলিল করে রাখলেন ভবিষ্যতে মামলায় একটু সুবিধা পেতে। তবে জেনে রাখবেন, নোটারী পাবলিকের কাছে করা হলফনামার কোনো দাম নেই যদি আপনার কাবিননামা না থাকে। কাবিননামা থাকলে আপনার বিয়ের পক্ষে আর কোনো ডকুমেন্টই লাগবে না। কাবিননামাই সব।

এক পক্ষ হিন্দু বা মুসলিম কিংবা অন্য ধর্মের হলেও, ধর্ম পরিবর্তন না করেই বিয়ে করা সম্ভব। Special Marriage Act-III of 1872 এর আওতায়। এর জন্য কাজীর মত আলাদা ম্যারেজ রেজিস্ট্রার আছেন।

বিয়ে হয়ে গেলে অনেক সময় পরে দুই পক্ষের বাবা-মা মেনে নেন,অনেক সময় মেনে নেন না। অনেক সময় মেয়ের বাবা ক্ষেপে গিয়ে ছেলের বিরুদ্ধে মামলা করে বসেন। মামলাগুলো হয় সাধারণত অপহরণপূর্বক ধর্ষণের। এই মামলাগুলোর জামিন বা রিমান্ড শুনানি এবং বিচার হয় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে। মামলার ধারাগুলো জামিন-অযোগ্য এবং আমলযোগ্য, পুলিশ এসব ক্ষেত্রে ম্যাজিস্ট্রেট বা আদালতের অনুমতি ছাড়াই আসামিকে গ্রেফতার করতে পারে।

পুলিশ ধরে নিয়ে গেলে কিন্তু প্রথমেই জামিন হবে না। আর মানসিকভাবে শক্ত থাকুন, দুজনেই। মামলা (উক্তরূপ) হওয়ার পর তদন্ত শুরু হবে। ভিকটিমের (মেয়ের বাবার চোখে মেয়েটি এখানে ভিকটিম)জবানবন্দি দিতে হবে জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে। এটি ২২ ধারার জবানবন্দি, ম্যাজিস্ট্রেট চেম্বারে হয়। কেউ কোনো প্রভাব খাটাতে পারে না।

জবানবন্দিতে মেয়েকে বলতে হবে, ‘আমি স্বেচ্ছায় বিয়ে করেছি। আমাকে কেউ অপহরণ করেনি।’ ব্যাস, তাহলে মামলায় পুলিশ আর চার্জশিট দেবে না। আসামি (ছেলে) অব্যাহতি পাবে।

বিয়ের প্রথম শর্ত হচ্ছে ছেলেমেয়েকে প্রাপ্তবয়স্ক হতে হবে। ছেলের বয়স ২১ ও মেয়ের বয়স ১৮-এর ১ দিনের কম হলেও বয়স গোপন করে বিয়ে করলে মামলা-মোকদ্দমায় পড়ার আশঙ্কা থাকবে। বিশেষ করে মেয়ের বয়স ১৮-এর কম হলে মেয়ের অভিভাবক অপহরণের মামলা ঠুকে দিলে ছেলেটির বড় ধরনের জেল-জরিমানার সম্মুখীন হওয়ার আশঙ্কা থাকে। আবার মেয়েটি আদালতে গিয়ে স্বেচ্ছায় বিয়ে করেছে মর্মে জবানবন্দি দিলেও প্রাপ্তবয়স্ক না হওয়া পর্যন্ত নিরাপদ হেফাজতেও থাকা লাগতে পারে। তাই নিজেদের পছন্দ অনুযায়ী বিয়ে করতে গেলে আইনকানুনও মানতে হবে। তবে মেয়ে যদি প্রাপ্তবয়স্ক হন, তাহলে অপহরণের মামলা করেও কোনো লাভ হয় না। বরং মিথ্যা মামলা করার অভিযোগে মামলা দায়েরকারীকেই উল্টো সাজা পেতে হয়।

ভালোবাসার মানুষকে নিয়ে ঘর বাঁধার স্বপ্ন কে না দেখে। তাই বলে স্বপ্নে একেবারে অন্ধ হয়ে গেলে হবে না। অনেক সময় ভালোবাসার মানুষটিই হয়ে যেতে পারে প্রতারক। দু-একটি ঘটনায় দেখেছি, বিয়ের নামে ভুয়া বিয়ের দলিল তৈরি করে মেয়েটির সঙ্গে কয়েক দিন স্বামী-স্ত্রীর মতো একান্ত সময় কাটিয়ে ছেলেটি সরে পড়ে। হয়ে পড়ে নিরুদ্দেশ। তখন মেয়েটি পড়ে যায় বিপদে। অনেক সময় মেয়েটি গর্ভবতীও হয়ে পড়ে। ফলাফল, বিয়ে প্রমাণ করতে না পেরে সইতে হয় অপমান-বঞ্চনা। তাই ভালোবাসায় আস্থা থাকবে, কিন্তু তার সঙ্গে সঙ্গে হতে হবে একটু সচেতন। বিয়ে করলে কাবিননামা বা বিয়ের দলিল দুজনের কাছেই রাখতে হবে। আর শুনতে খারাপ লাগলেও ভালোবাসার মানুষটির হাত ধরে বেরিয়ে আসার আগে একটু ভালো করে খোঁজখবর নিয়েই নেন না। বিয়ে তো আর ছেলেখেলা নয়।

বলপ্রয়োগ বা প্রলুব্ধ করে বা ফুসলিয়ে বা ভুল বুঝিয়ে বা ভীতি প্রদর্শন করে কোন স্থান থেকে কোন ব্যক্তিকে অন্য কোন স্থানে যেতে বাধ্য করা হচ্ছে অপহরণ।

‘নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন’ এবং ‘দণ্ডবিধি আইন’ উভয় আইনেই অপহরণের মামলা দায়ের করা যায়। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের ৭ ধারা অনুযায়ী নারী অপহরণের শাস্তি যাবজ্জীবন কারাদণ্ড বা ১৪ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড অথবা উভয় দণ্ডের বিধান আছে। দণ্ডবিধির ৩৬৬ ধারা অনুযায়ী কোনো নারীকে বিয়েতে সম্মতিদানে বাধ্য করার অভিপ্রায়ে অপহরণ বা প্ররোচিত করলে কিংবা জোরপূর্বক সহবাসে বাধ্য করলে, তাহলে দায়ী ব্যক্তি ১০ বছর যাবৎ যে কোন মেয়াদে সশ্রম বা বিনাশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডিত হতে পারেন।

এবার বিয়ের খরচা-পাতি সম্পর্কে ধারণা নেয়া যাক। কাবিন নামার খরচ যেকোনো বিয়ের ক্ষেত্রে একই। মুসলিম বিয়ের ক্ষেত্রে একজন বিয়ে রেজিস্ট্রার দেনমোহরের পরিমাণের উপর ভিত্তি করে একটি বিয়ের রেজিস্ট্রেশনের ফি নির্ধারণ করে থাকেন। ধার্য্যকৃত দেনমোহরের প্রতি হাজার বা তার অংশবিশেষের জন্য ১০ টাকা রেজিস্ট্রেশন ফি। তবে রেজিস্ট্রেশন ফি এর পরিমাণ ১০০ টাকার কম হবে না এবং ৪০০০ টাকার উপরে হবে না। যেমনঃ কারো বিয়ের দেনমোহর ১০,০০০ টাকা হলে ফি হবে ১০০ টাকা, ১০,৫০১ টাকা হলে ১১০ টাকা (প্রতি হাজারের অংশবিশেষের জন্যও ১০ টাকা), ১১,০০০ টাকা হলেও ১১০ টাকা, দেনমোহরের পরিমাণ ৫০০,০০০ টাকা হলেও ৪০০০ টাকা (সর্বোচ্চ পরিমাণ ৪০০০ টাকা) আবার দেনমোহর ১০০০ টাকা হলেও ফি দিতে হবে ১০০ টাকা (যেহেতু সর্বনিম্ন পরিমাণ ১০০ টাকা)। উল্লেখ্য রেজিস্ট্রেশন ফি পরিশোধের দায়িত্ব বরপক্ষের। সরকার সময়ে সময়ে প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে এই ফি পরিবর্তন ও ধার্য্য করে থাকে।

সব তো জানা হল, কিন্তু কোথায় করবেন বিয়ে? হ্যা বিয়ে আপনি করতে পারেন যেকোনো কাজী অফিসে। সাধারণত যেকোনো ওয়ার্ড, পৌরসভায় কাজী অফিস থাকেই। আপনি এসব কাজী অফিসে আপনার বিয়ের জন্য প্রয়োজনীয় কাগজ পত্র এবং সাক্ষী নিয়ে গেলেই কাজী আপনার বিয়ে পড়াবে। আর হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বীরা এক্ষেত্রে নিজ নিজ ধর্ম মতে বিয়ে করতে পারবেন। এবং নোটারী পাবলিকের (সরকারী রেজিস্টার্ড উকিল) কাছে গিয়ে সার্টিফিকেট নিয়ে বিয়ের নিবন্ধন করতে পারবেন।

শিরোনাম ডট কম
শিরোনাম ডট কম । অনলাইন নিউজ পোর্টাল Shironaam Dot Com । An Online News Portal
http://www.shironaam.com/

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *