Bangladesh-flood-situation-remain-unchanged

বন্যা পরিস্থিতি অপরিবর্তিত, পানিবন্দি ৩৩ লাখ মানুষ

দেশের সার্বিক বন্যা পরিস্থিতি অপরিবর্তিত রয়েছে। দেশের উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন স্থানের (কুড়িগ্রাম, জামালপুর, গাইবান্ধা, বগুড়ার) বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হতে শুরু করেছে। অপর দিকে মধ্যাঞ্চল (মানিকগঞ্জ, ফরিদপুর, রাজবাড়ী, মুঞ্জিগঞ্জ, শরীয়তপুর) বন্যা পরিস্থিতি অবনতিশীল রয়েছে। সিরাজগঞ্জের বন্যা পরিস্থিতি কিছুটা স্থিতিশীল রয়েছে।

গঙ্গা অববাহিকার পানি বৃদ্ধি পেলেও তা বিপদসীমার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।

এ ছাড়া মধ্যাঞ্চলে ঢাকার চতুর্দিকের ৫টি নদীর পানি বিপদসীমার ২৮ সেন্টিমিটার হতে ১২৫ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।

বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়েছে।

বিজ্ঞপ্তিতে বৃহস্পতিবার (১৭ আগস্ট) সকাল ১১টা পর্যন্ত সর্বশেষ বন্যা পরিস্থিতির কথা উল্লেখ করে বলা হয়েছে, দেশের উত্তরাঞ্চলের ব্রহ্মপুত্র-যমুনার পানি কমতে শুরু করায় বন্যা পরিস্থিতি উন্নতির দিকে যাবে।

তিস্তা-ধরলা-দুধকুমার অববাহিকায় নদীর পানি হ্রাস অব্যাহত রয়েছে, এই অঞ্চলের বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি অব্যাহত থাকবে।

এ ছাড়া গঙ্গা-পদ্মা নদীর পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকলেও তা বর্তমানে বিপদসীমার প্রায় ৬৭ থেকে ১৩৪ সেন্টিমিটারম নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। মেঘনা অববাহিকায় বন্যা পরিস্থিতি আগামী ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টায় উন্নতি অব্যাহত থাকবে।

বিজ্ঞপ্তিতে বন্যার পূর্বাভাসে আরও বলা হয়েছে, ব্রহ্মপুত্র-যমুনার ভারতীয় অংশে আগামী ২৪ থেকে ৩৬ ঘণ্টায় গড়ে ৩০ সেন্টিমিটার পানি হ্রাস পেতে পারে। বাংলাদেশ অংশের ব্রহ্মপুত্র-যমুনার বিভিন্ন পয়েন্টে আগামী ৭২ ঘণ্টায় হ্রাস অব্যাহত থাকবে। গঙ্গা-পদ্মা নদীর পানি সমতল বৃদ্ধি আগামী ৪৮ ঘণ্টায় অব্যাহত থাকবে, তবে এই নদীর পানি বৃদ্ধির হার আগের তুলনায় কমে আসছে এবং বিপদসীমার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হবে।

মেঘনা অববাহিকার নদীর পানি আগামী ৪৮ ঘন্টায় হ্রাস অব্যাহত থাকবে।

এতে আরো বলা হয়েছে, গঙ্গা- ব্রহ্মপুত্র-মেঘনা এই তিন অববাহিকার মধ্যে গঙ্গায় পানি বৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে, ব্রহ্মপুত্রের উজানের ভারতীয় অংশে এবং মেঘনা অববাহিকার ভারতীয় ও বাংলাদেশ অংশে পানি হ্রাস অব্যাহত আছে। বিগত ২৪ ঘণ্টায় ব্রহ্মপুত্র-যমুনা নদীর ভারতীয় অংশের গোহাটিতে (বাংলাদেশ সীমান্ত হতে ১৮০ কিলোমিটার উজানে) ৪৩ সেন্টিমিটার পান্ডুতে (বাংলাদেশ সীমান্ত হতে ১৬০ কিলোমিটার উজানে) ৩৪ সেন্টিমিটার, গোয়ালপাড়া (বাংলাদেশ সীমান্ত হতে ৯০ কিলোমিটার উজানে) ২৬ সেন্টিমিটার এবং ধুবরী (বাংলাদেশ সীমান্ত হতে ২৫ কিলোমিটার উজানে) ১৪ সেন্টিমিটার পানি সমতলে হ্রাস পেয়েছে ।

বাংলাদেশের অভ্যান্তরে ব্রহ্মপুত্র-যমুনার পানি সমতল নুনখাওয়া, চিলমারী, বাহাদুরাবাদ এবং সারিয়াকান্দি পয়েন্টে হ্রাস পেয়েছে। অপরদিকে সিরাজগঞ্জ পয়েন্টে ৪ সেন্টিমিটার বৃদ্ধি পেয়েছে, তবে বুধবার সন্ধ্যা থেকে তা স্থিতিশীল রয়েছে বলে বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়েছে।

উজানের ঢল ও প্রবল বৃষ্টিতে তলিয়ে গেছে উত্তরাঞ্চলসহ ২২ জেলার ৯৬টি উপজেলা। পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন প্রায় ৩৩ লাখ মানুষ। এরই মধ্যে বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে আড়াই হাজার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান।

এছাড়া বন্যা আক্রান্ত এলাকায় রেল ও সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ায় ব্যাহত হচ্ছে পণ্যের আমদানি ও রফতানি কার্যক্রম। এর বিরূপ প্রভাব পড়ছে শিল্পের উৎপাদনেও। এর নেতিবাচক প্রভাব আগস্ট-সেপ্টেম্বরে রফতানি আয়ের ওপর পড়তে পারে বলে আশঙ্কা বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্টদের।

চলমান বন্যায় প্রায় তিন লাখ হেক্টর ফসলি জমি তলিয়ে যাওয়ায় ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়েছে কৃষি খাত, যা পুরো খাদ্য ব্যবস্থাপনার হিসাব পাল্টে দিয়েছে। আর কোরবানির আগেই ১১ লাখ গবাদি পশুসহ ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে পড়েছে ৪৩ লাখ প্রাণী। এতে কোরবানির ঈদকে সামনে রেখে খামারিরা অর্থনৈতিকভাবে মারাত্মক ক্ষতির সম্মুখীন হতে পারেন বলে আশঙ্কা সংশ্লিষ্টদের।

বন্যাপ্লাবিত জেলার মধ্যে অধিকাংশই উত্তরাঞ্চলে। তবে এসব এলাকার শিল্পকারখানার অবকাঠামো উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড বন্ধ হয়ে পড়েছে। নতুন শিল্পকারখানা সম্প্রসারণ করা যাচ্ছে না। কারণ দিনের পর দিন টানা বৃষ্টিতে কোনো ধরনের কাজ করা যাচ্ছে না। পাশাপাশি সরকারের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডও স্থবির হয়ে পড়েছে। ফলে নির্ধারিত সময়ে ১ লাখ ৫৩ হাজার কোটি টাকার বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) পুরোপুরি বাস্তবায়ন করা সম্ভব না-ও হতে পারে বলে আশঙ্কা সংশ্লিষ্টদের।

দুর্যোগ ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের সূত্রমতে, দিনাজপুর, নীলফামারী, লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম, ঠাকুরগাঁও, পঞ্চগড়, গাইবান্ধা, বগুড়া, সিরাজগঞ্জ, জামালপুর, সুনামগঞ্জ, নেত্রকোনা, রাঙ্গামাটি, বি-বাড়িয়া, চাঁদপুর, শরীয়তপুর, মাদারীপুর, ফরিদপুর, রাজবাড়ী, গোপালগঞ্জ ও যশোরে বিভিন্ন এলাকা বন্যাপ্লাবিত হয়। এসব এলাকার জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। সেখানের কাজকর্ম প্রায় বন্ধ। অধিকাংশ মানুষ নির্ভরশীল হয়ে পড়েছেন ত্রাণের ওপর। অনেকে বসতভিটা ছেড়ে ওঠেছেন আশ্রয়কেন্দ্রে। আয়-রোজগার বন্ধ থাকায় চরম দুর্ভোগে পড়েছেন এসব অঞ্চলের মানুষ। সরকারি হিসাবে বন্যাকবিলত অঞ্চলে ৭ লাখ ৫২ হাজার ৩৪৯ পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এছাড়া ১ লাখ ৬০ হাজার ৫৪৫টি বাড়িঘর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে পুরোপুরি নষ্ট হয়েছে ২৩ হাজার ৭৪৫টি এবং আংশিক হয়েছে ১ লাখ ৩৬ হাজার ৮০০টি।

কৃষি মন্ত্রণালয়ের হিসাবে ৪ লাখ হেক্টর ফসলি জমি নষ্ট হওয়ার কথা বলা হলেও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের হিসাবে এ পর্যন্ত ২ লাখ ৯৩ হাজার ৩৮৭ হেক্টর ফসলি জমি নষ্ট হয়েছে। এর মধ্যে আংশিক নষ্ট হওয়া জমির পরিমাণ ১ লাখ ৭২ হাজার ২১৭ হেক্টর এবং পুরোপুরি নষ্ট হওয়া জমি হচ্ছে ১ লাখ ২১ হাজার ১৭০ হেক্টর। ফসলি জমি তলিয়ে যাওয়ায় বড় ধরনের খাদ্য সংকট সৃষ্টির আশঙ্কা করা হচ্ছে।

ভয়াবহ এ বন্যায় বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে আসন্ন কোরবানির পশুর বাণিজ্যে। কারণ বন্যায় অনেক পশু মারা গেছে। প্রাণিসম্পদ সেবা বিভাগের হিসাব মতে, এ সময় প্রায় ৮ লাখ গরু, ৫৩ হজার মহিষ, ২ লাখ ৩৭ হাজার ছাগল, ১ লাখ ৯ হাজার ভেড়া ও ২৪ লাখ মুরগি এবং প্রায় সাড়ে ৬ লাখ হাস ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পাশাপাশি কোরবানির ঈদের কেনাকাটা ও ব্যবসা-বাণিজ্য ২১ জেলায় প্রায় থেমে গেছে। সবমিলে এবার কোরবানির ঈদের অর্থনীতিতে বিরূপ প্রভাব ফেলবে।

বন্যায় প্লাবিত এলাকাগুলোর অনেক রাস্তাঘাট তলিয়ে গেছে। নষ্ট হয়েছে ব্রিজ ও কালভার্ট। এসব অঞ্চলে ১১২৩ কিলোমিটার রাস্তা নষ্ট হয়েছে। ব্রিজ ও কালভার্ট নষ্ট হয়েছে ৪৭টি। বেড়িবাঁধ ক্ষতি হয়েছে ১৫৩ কিলোমিটার। এসব রাস্তাঘাট ও কালভার্ট নষ্ট হওয়ায় স্থানীয় অর্থনীতিতে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

এদিকে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদফতর (ডিপিই) এবং মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদফতর (মাউশি) সূত্রে জানা গেছে, দ্বিতীয় দফার বন্যায় ২৩ জেলার প্রায় আড়াই হাজার শিক্ষা প্রতিষ্ঠান আক্রান্ত হয়েছে। এর মধ্যে মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এক হাজার ও বাকিগুলো প্রাথমিক স্কুল। আর্থিক মূল্যে এসব প্রতিষ্ঠানের প্রায় ২০ কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।

শিরোনাম ডট কম
শিরোনাম ডট কম । অনলাইন নিউজ পোর্টাল Shironaam Dot Com । An Online News Portal
http://www.shironaam.com/

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *