পাকিস্তান যুদ্ধাপরাধের ক্ষমা চেয়েছিল, গণহত্যার নয়
মতামত

পাকিস্তান যুদ্ধাপরাধের ক্ষমা চেয়েছিল, গণহত্যার নয়

পাকিস্তান যুদ্ধাপরাধের ক্ষমা চেয়েছিল, গণহত্যার নয়বিএনপির নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকারের আমলে পাকিস্তান ১৯৭১ সালে যুদ্ধাপরাধের কারণে ক্ষমা চেয়েছিল; তবে ২৫শে মার্চ ১৯৭১ সালে বর্বর গণহত্যার জন্য তাঁরা দায় শিকার করেনি কোনদিন। শিরোনাম ডট কম অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে এমন তথ্য। প্রখ্যাত সাংবাদিক শফিক রেহমান সম্পাদিত সাপ্তাহিক যায়যায়দিন’র ২০০২ সালের ৬ আগস্ট সংখ্যা থেকে ঘটনার সত্যতা পাওয়া যায়।

পাকিস্তানের সাবেক সামরিক শাসক জেনারেল পারভেজ মোশাররফ ২০০২ সালের জুলাই মাসে ঢাকায় সরকারি সফরে এসে মোশাররফ সাভার জাতীয় স্মৃতিসৌধের মন্তব্য খাতায় লিখেছিলেন, ‘আপনাদের পাকিস্তানি ভাই ও বোনেরা একাত্তরের ঘটনাবলির জন্য আপনাদের বেদনার সাথে একাত্মতা বোধ করে। সেই দুর্ভাগ্যজনক সময়ে যে মাত্রাতিরিক্ত ঘটনা ঘটে, তা দুঃখজনক।’ পরে রাষ্ট্রীয় ভোজে ভাষণ দিতে গিয়ে মোশাররফ তাঁর দুঃখের কথা পুনর্ব্যক্ত করেন, সঙ্গে এই কথা যোগ করেন যে, ‘এই ট্র্যাজেডি, যা আমাদের দুই দেশের ওপর ক্ষতচিহ্ন রেখে গেছে, তার জন্য আমরা দুঃখিত।’

মোশাররফের এই দুঃখ প্রকাশকে সে সময় বাংলাদেশের অনেকেই একাত্তরের গণহত্যার জন্য পাকিস্তানের ক্ষমা প্রার্থনা বলেছিলেন। সে সময় বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন খালেদা জিয়া।

সেই রাষ্ট্রীয় ভোজসভায় মোশাররফের ভাষণের জবাবে খালেদা জিয়া বললেন, ‘একাত্তরের ঘটনাবলির জন্য এমন খোলামেলা বক্তব্যের জন্য আপনাকে ধন্যবাদ। এই বক্তব্য, কোনো সন্দেহ নেই, পুরোনো ক্ষত মিটাতে সাহায্য করবে। আমরা ভবিষ্যতের দিকে তাকাতে চাই এবং ভাইয়ের মতো একযোগে কাজ করতে চাই।’

২০০২ সালে পাকিস্তানের ভেতরেই অনেকে মোশাররফের দুঃখ প্রকাশ যথেষ্ট নয় বলে তাঁর সমালোচনা করেছিলেন। পাকিস্তানের বেসরকারি মানবাধিকার কমিশন সে সময় পত্রিকার পাতায় পূর্ণ পাতা বিজ্ঞাপন দিয়ে জানিয়েছিল, মোশাররফ দুঃখ প্রকাশ করে ঠিক করেছেন, কিন্তু শুধু দুঃখ প্রকাশই যথেষ্ট নয়। পাকিস্তানের ৫১টি সুশীল সমাজভুক্ত প্রতিষ্ঠান সে সময় এক যৌথ বিবৃতিতে জানায়, একাত্তরে বাংলাদেশে যা ঘটেছে তা গণহত্যা। মোশাররফের দুঃখ প্রকাশের ভেতর দিয়ে সেই গণহত্যার জন্য ক্ষমা প্রার্থনার অনুভূতি প্রকাশিত হলেও তা যথেষ্ট নয়। পাকিস্তান এখনো পুরোপুরি ক্ষমা প্রার্থনা করেনি।

১০ বছর পর ঢাকায় এসে পাকিস্তানের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিনা রাব্বানি একাত্তরের ঘটনাবলির জন্য কোন ক্ষমাপ্রার্থনা করেননি।

ঢাকায় ২০১১ সালের বিশ্বকাপ ক্রিকেট চলার সময় সাবেক পাকিস্তানি ক্রিকেটার, বর্তমানে রাজনীতিবিদ ইমরান খানও বলেছিলেন, ১৯৭১ সালে সামরিক অভিযানের জন্য বাংলাদেশের কাছে পাকিস্তানের ক্ষমা প্রার্থনা করা উচিত।

পাকিস্তানী সাংবাদিক আকিল খান, করাচির ডন পত্রিকায় লিখেছিলেন, ‘সবাই বলছে, সময় এসেছে ক্ষমা করার ও পুরোনো ঘটনা ভুলে যাওয়ার। আমাদের ক্ষমা করা হবে কি না, সে সিদ্ধান্ত নিতে পারে শুধু বাংলাদেশের মানুষ। কিন্তু ভুলে যাওয়ার যে কথা বলা হচ্ছে, তার জবাবে বলা যায়, বাংলাদেশ সে ঘটনা কখনোই ভুলবে না, আর আমাদের (পাকিস্তানিদের) তা কখনোই ভুলে যাওয়া উচিত হবে না। ১৯৭১-এর ঘটনাবলির পেছনে যে সত্য নিহিত, তা এখনো আমাদের চৈতন্যে প্রবেশ করেনি, অথবা তা আমাদের সম্মিলিত স্মৃতিসত্তার অন্তর্ভুক্ত হতে দেওয়া হয়নি। আর সে জন্য প্রয়োজন সে সময় কী ঘটেছিল এবং কেন ঘটেছিল, তা উপলব্ধি করা। যাতে এ ঘটনা আর কখনো না ঘটে, তা নিশ্চিত করতেই দরকার এই উপলব্ধির।’

১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের পর বঙ্গবন্ধু বারবার তাদের বিচারের কথা বলেছিলেন। বিচারের জন্যই ১৯৭৩ সালের ২০ জুলাই ঘোষণা করা হয় ‘আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনাল) আইন ১৯৭৩’। এই আইনে স্থানীয় ও পাকিস্তানি উভয় ধরনের মানবতাবিরোধী অপরাধীদের বিচারের সুযোগ ছিল। ভারতে আটক পাকিস্তানি সৈন্যদের মধ্যে প্রথমে ১৫০ ও পরে আরও ৪৫ জন মোট ১৯৫ জনের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ আনে বাংলাদেশ। ১৯৭২ সালে ভারত তার হাতে বন্দী যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে অভিযুক্ত ১৯৫ পাকিস্তানি সৈন্যকে বাংলাদেশের কাছে হস্তান্তরে সম্মত হয়।

তখন প্রায় ৪ লাখ বাঙালি পাকিস্তানে আটকা পড়ে ছিল। ভুট্টো তার দেশের যুদ্ধাপরাধীদের বাঁচাতে আটকেপড়া বাঙালিদের জিম্মি করে। হুমকিও দেয় ,বাংলাদেশ যদি পাকিস্তানিদের বিচার করে, তাহলে পাকিস্তানও আটকেপড়া বাঙালিদের বিচার করবে। ১৯৫ জনের পাল্টা হিসেবে ভুট্টো আটকেপড়া বাঙালিদের মধ্য থেকে ২০৩ জন শীর্ষ কর্মকর্তাকে গ্রেফতার করে। তাদের বিরুদ্ধে ‘তথ্য পাচার’-এর অভিযোগ আনা হয়। তবে ভুট্টো প্রয়োজনে পাকিস্তানি যুদ্ধবন্দীদের পাকিস্তানের মাটিতে বিচার করার কথা বলে ছিলেন। যদিও ঘটনা যেখানে ঘটেছে বিচার সেখানেই হওয়ার কথা। কিন্তু কূটতর্কে ভুট্টো বলেছিল, ঘটনার সময় পূর্ব পাকিস্তানও পাকিস্তানেরই অংশ ছিল। তাই প্রয়োজনে বিচার পাকিস্তানের মাটিতেও হতে পারে।

১৯৫ যুদ্ধবন্দীর বিচার ঠেকাতে ভুট্টো বাংলাদেশের ওপর নানামুখী আন্তর্জাতিক চাপ অব্যাহত রাখে। পাকিস্তানের পরামর্শে জাতিসংঘে বাংলাদেশের সদস্যপদ প্রশ্নে ভেটো দেয় চীন। মুসলিম বিশ্বও তখন সমস্যা সমাধানে চাপ দেয়। তাছাড়া পাকিস্তানে আটকেপড়া বাঙালিদের স্বজনরাও তাদের স্বজনদের ফিরিয়ে আনতে চাপ প্রয়োগ করে। সবচেয়ে বড় চাপটা আসে ভারত থেকে। কারণ ৯৩ হাজার যুদ্ধবন্দীকে দিনের পর দিন থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা করতে বিব্রতকর অবস্থায় পড়ে ভারত। এখানে পাকিস্তান কিছুটা সুবিধাজনক অবস্থায় ছিল। কারণ ভারতে আটক পাকিস্তানিরা ছিল যুদ্ধবন্দী। তাই জেনেভা কনভেনশন অনুযায়ী তাদের খাদ্য-বাসস্থান-নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব ছিল ভারতের। কিন্তু পাকিস্তানে আটকেপড়া প্রায় চার লাখ বাঙালি সেখানে অমানবিক জীবন-যাপন করছিল।
পাকিস্তান যুদ্ধাপরাধের ক্ষমা চেয়েছিল, গণহত্যার নয়
জাতীয়-আন্তর্জাতিক নানা চাপের মুখে শিশু রাষ্ট্র বাংলাদেশকে তখন এই ১৯৫ যুদ্ধবন্দীর বাংলাদেশের মাটিতে বিচারের দাবি থেকে সাময়িকভাবে সরে আসতে হয়। ১৯৭৪ সালের ৯ এপ্রিল নয়াদিলি¬তে সে চুক্তিতে সই করেছিলেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. কামাল হোসেন, ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর শরন সিং এবং পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আজিজ আহমেদ। তবে সে চুক্তিতেই বলা হয়েছে ‘পাকিস্তানের ওইসব বন্দী যে মাত্রাতিরিক্ত ও বহুমাত্রিক অপরাধ করেছে, তা জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সংশ্লিষ্ট প্রস্তাবনা এবং আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী যুদ্ধাপরাধ, মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ এবং গণহত্যা হিসেবে চিহ্নিত। এই ১৯৫ জন পাকিস্তানি বন্দী যে ধরনের অপরাধ করেছে সে ধরনের অপরাধের অপরাধীদের দায়ী করে আইনের মুখোমুখি করার ব্যাপারে সার্বজনীন ঐকমত্য রয়েছে।’ চুক্তি অনুযায়ী বাংলাদেশের জনগণের কাছে পাকিস্তানের ক্ষমা প্রার্থনা এবং অতীতের ত্র“টি ভুলে যাওয়ার আহ্বানের পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশ ‘ক্ষমাসুলভ দৃষ্টিকোণ’ থেকে এই ১৯৫ জনকে প্রত্যাবাসনে সম্মত হয়।

১৯৭৪ সালের ২৮ জুন ভুট্টোর বাংলাদেশ সফরের সময়ও বঙ্গবন্ধু তার হাতে যুদ্ধাপরাধের বেশ কিছু প্রমাণ তুলে দিয়েছিলেন। এ ছাড়া একাত্তরের ঘটনা তদন্তে পাকিস্তান হামুদুর রহমানের নেতৃত্বে যে কমিশন গঠন করেছিল, তাতেও গণহত্যার প্রমাণ সরবরাহ করেছিল বাংলাদেশ। হামুদুর রহমান কমিশনের রিপোর্টেও পাকিস্তানি সৈন্য ও তাদের এদেশীয় দোসরদের যুদ্ধাপরাধের বিস্তারিত বিবরণ উলে¬খ করা হয় এবং কয়েকজন সামরিক কর্তার শাস্তির সুপারিশ করে। কমিশন পাকিস্তানি সৈন্যদের নৃশংসতা, অবাধ নিষ্ঠুরতা ও অনৈতিকতা তদন্তে একটি উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন আদালত বা কমিশন গঠনেরও সুপারিশ করেছিল। কিন্তু পাকিস্তান কিছুই করেনি। বিশ্বের সবচেয়ে বড় গণহত্যার একটি হয়েছিল বাংলাদেশে, সেটি বরাবরই পাকিস্তান আড়াল করে রেখেছে, অস্বীকার করেছে। ১৯৭৪ সালে নয়াদিলি¬ চুক্তিতে পাকিস্তান কোনো রকমে নিজেদের বন্দীদের ছাড়িয়ে নিতে ক্ষমা চাইলেও পরে বারবার প্রমাণ করেছে একাত্তরের জন্য তারা অনুতপ্ত নয়।

১৯৭৪ সালের ৯ এপ্রিল ত্রিদেশীয় চুক্তি স্বাক্ষরের পর যে যৌথ বিবৃতি গৃহীত হয়, তাতে পাকিস্তানি প্রতিনিধিদলের প্রধান আজিজ আহমদের বরাতে বলা হয়, পাকিস্তান সরকার একাত্তরে যে অপরাধ ‘হয়তো সংঘটিত হয়েছে’ তার প্রতি নিন্দা ও দুঃখ প্রকাশ করে (হিজ গভর্নমেন্ট কনডেমন্ড ডিপলি এনি ক্রাইম দ্যাট মে হ্যাভ বিন কমিটেড)। অর্থাৎ ‘অপরাধ’ হলেও হয়ে থাকতে পারে। হয়ে থাকলে পাকিস্তান তার জন্য দুঃখিত, আর না হলে তো কথাই নেই। সোজা কথায়, ‘ধরি মাছ না ছুঁই পানি’ জাতীয় কথার মারপ্যাঁচে পাকিস্তান ক্ষমা প্রার্থনার ব্যাপারটি ইতি টানার চেষ্টা করে।

তারপর আরও দুবার পাকিস্তান সরকারি পর্যায়ে একাত্তরের গণহত্যার জন্য ‘দুঃখ প্রকাশ’ করে, উভয়বারই তারা গণহত্যা শব্দটি এড়িয়ে যায়। ১৯৭৪ সালে জুনের শেষ সপ্তাহে ঢাকায় সরকারি সফরে আসেন পাকিস্তানি প্রেসিডেন্ট জুলফিকার আলী ভুট্টো। সে সময় তাঁর সম্মানে প্রদত্ত এক নাগরিক সংবর্ধনায় ভুট্টো বলেছিলেন, ‘একাত্তরে বাংলাদেশের মানুষের যে ক্ষতি হয়েছে, তার জন্য আমি শোক প্রকাশ করছি।’ একই সভায় তিনি ‘মহানবীর নামে আপনাদের কাছে তওবা করছি’ বলে বিলাপও করেন।

নিউইয়র্ক টাইমস তাঁর সেই কুম্ভীরাশ্রুকে ‘ভুট্টোর ক্ষমা প্রার্থনা’ শিরোনামে প্রথম পাতায় এক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিল। কিন্তু ভুট্টো তাঁর ভাষণের কোথাও একবারের জন্য গণহত্যা শব্দটি ব্যবহার করেননি, এমনকি ক্ষমা প্রার্থনার কথাও উল্লেখ করেননি।

শিরোনাম ডট কম
শিরোনাম ডট কম । অনলাইন নিউজ পোর্টাল Shironaam Dot Com । An Online News Portal
http://www.shironaam.com/

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *