‘পরী’ গানটির পেছনের গল্প

গীতিকার শেখ রানা

ফজলে এলাহী পাপ্পু

আজ তোমার মন খারাপ মেয়ে,

তুমি আনমনে বসে আছো

আকাশ পানে দৃষ্টি উদাস

আমি তোমার জন্য এনে দেবো

মেঘ থেকে বৃষ্টির ঝিরিঝিরি হাওয়া

সে হাওয়ায় ভেসে যাবে তুমি………

উপরের লাইনগুলো নিশ্চয়ই বাংলা গানের শ্রোতাদের মনে আছে যা খুব জনপ্রিয় একটি গানের কিছু কলি। জনপ্রিয় ‘দলছুট’ ব্যান্ড এর প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ও কণ্ঠশিল্পী বাপ্পা মজুমদার এর ‘পরী’ গানটি শুনেনি ও পছন্দ করেনা এমন মানুষ বাংলা গানে খুঁজে পাওয়া মুশকিল। বাপ্পা মজুমদার এর সংগীত জীবনের যদি সেরা ১০ টি গানের তালিকা করা হয় সেখানে বাপ্পার একক অ্যালবাম ‘ধুলো পড়া চিঠি’র ‘পরী’ গানটি স্থান পাবে সেই ব্যাপারে কারো কোন সন্দেহ নেই বরং গানটি ঠাই না পেলে সবাই আশ্চর্য হবে। বাপ্পা মজুমদারকে নিয়ে আজ কোন কথা বলবো না ও বলার প্রয়োজনও নেই। কারন আমার সমবয়সী থেকে শুরু করে বর্তমান প্রজন্মের বাংলা গানের সব শ্রোতার কাছে ‘বাপ্পা’ একজন জনপ্রিয় শিল্পীর নাম। আজ সবাইকে ‘পরী’ গানটির পেছনের মানুষটির কথা বলবো যিনি সবার প্রিয় গানটি সৃষ্টি করেও রয়ে গেছেন পর্দার আড়ালে।

গীতিকার শেখ রানা ‘নস্টালজিক’ নামে চমৎকার সুন্দর সব লিখার একজন ব্লগারের সাথে আমার পরিচয় হয় গত ২০১১ এর মে মাসে। আমার গানের পোষ্টে ‘নস্টালজিক’ নামের একজন ব্লগারের সাথে তখন মাত্র পরিচয়। যিনি দেখতাম পুরনো ব্যান্ড এর গানগুলো দিলেই খুব চমৎকার মন্তব্য করে চলে যেতেন। বুঝলাম যে এই মানুষটি নিশ্চয়ই সেই ৯০ এর প্রজন্ম । যিনি সেই প্রিয় গানগুলো শুনেই বড় হয়েছেন। তাই সময় সুযোগ মতো একদিন ‘নস্টালজিক’ নামের মানুষটির সাথে ফেসবুকে বন্ধু হওয়ার আহবান জানালাম। উনিও চমৎকার ভাবে সেই আহবানে সাড়া দিলেন। উনার প্রোফাইলে গিয়ে আমি তো পুরাই ‘থ’ বনে গেলাম। সাথে সাথে চুপচাপ উনার ব্লগের পুরনো পোস্টগুলো পড়তে লাগলাম । যত পুরনো পোষ্টে যাচ্ছি ততই অবাক হচ্ছি তখন। মনে ভাবতে ভাবতে লাগলাম একজন জনপ্রিয় গীতিকার আমার সাথে প্রতিদিন ব্লগে কথা বলছেন অথচ আমি এতো দেরীতে জানলাম এই সেই ‘পরী’ গানটির গীতিকার শেখ রানা ভাই ! নিজেই নিজের কাছে লজ্জিত হলাম। এরপর আমার ফ্রেন্ডলিস্টে থাকা গানপাগল হাসান মাহবুব ভাইয়ের সাথে রানা ভাইয়ের কথা বললাম। হাসান ভাইয়ের কথা শুনে আরও লজ্জিত হলাম , হাসান ভাই রানা ভাইয়ের কাজিন এবং উনি যে ব্যান্ড, আধুনিক গানের জনপ্রিয় একাধিক গান লিখেছেন সেটা আরও ভালোভাবে জানতে পারলাম। ধীরে ধীরে রানা ভাইয়ের সাথে যোগাযোগ রাখা শুরু করলাম। মানুষটা প্রথম থেকে আমাকে মুগ্ধ করে ফেলেছে উনার কথাবার্তা ও ব্যবহারের কারনে। উনি খুবই নিভৃতচারিণী ,খুব আন্তরিক ও সুন্দর মনের একজন মানুষ। তখন বুঝতে পারলাম ঠিক মানুষটিই ‘পরী’ গানটি লিখেছে। যার ভেতর ‘পরী’ গানটির অসাধারন কথাগুলোর মতো অসাধারন সুন্দর একটা মন আছে। যিনি ‘পরী’র মতো সাদা শুভ্র জীবনের একজন মানুষ।

 

‘পরী’ গানটি লিখার ঘটনা

২০০০- ২০০১ এর দিকে রানা ভাই তখন ‘বিআইটি’(বর্তমানে রাজশাহী প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়- রুয়েট)তে পড়েন সেই সুত্রে বিআইটি’র হোস্টেলে থাকতেন। ‘বিআইটি’তে পড়ার সময় অনেকের সাথে পরিচিত হয়েছেন। তাঁদের মধ্য থেকে একজন মানুষ রানা ভাইয়ের পরিচিত থেকে কাছের একজন হয়ে গিয়েছিল। সেই মানুষটিকে রানা ভাই ‘লিটল এঞ্জেল’ নামে ডাকতেন। ‘লিটল এঞ্জেল’ তাকে বড়দের মতো কখনও শাসন করতো, কখনও অধিকার খাটাতো ভালোবাসার অধিকার নিয়ে। রানা ভাইয়ের ভাষায় –

লিটিল এঞ্জেল…..

:আশ্চর্য ভাত সবটুকু খেতে হবে।

:আরে,সারাদিন ঘুম! দিলাম,পানি ঢেলে।

:এত সিগারেট খেলে সিগারেটের প্যাকেট ফেলে দেবো।

লিটিল এঞ্জেল।।আমি এ নামেই ডাকতাম।আমাকে বড় মানুষের মত শাষন করতো।আমি কপট বিরক্ত হবার ভান করলেও উপভোগ করতাম লিটিল এঞ্জেল এর শাষন।

 

‘সুইট লিটিল এঞ্জেল’

সেই হোস্টেল জীবনের এক আবেশ দুপুরে রানা ভাই হঠাৎ ব্যাগ গুছিয়ে অজানা উদ্দেশ্য বের হয়েছিলেন। উনার সাথে উনার ব্যগ আর রুপম নামের এক ছোট ভাই। রুপম রানা ভাইয়ের ব্যগপ্যাক দেখে বুঝে নিলো উদ্দেশ্যবিহীন কোন অজানা গন্তব্য ছুট দিবেন রানা ভাই। সেদিনই রিক্সা দিয়ে যাওয়ার সময় হঠাৎ ট্রেন যেতে দেখলেন। সাথে সাথে রিক্সা থেকে নেমে দৌড়ে ট্রেনে উঠলেন। সঙ্গী রুপম জানালা দিয়ে ছুঁড়ে ব্যাগ, সিগারেট সব দিয়ে দিলেন। তখন রানা ভাই জানে না ট্রেনটি কোথায় যাবে!

সেই অজানা গন্তব্যটি সেবারের মতো নাটোরের লালপুরে গিয়ে শেষ হলো। নাটোরের লালপুরের একরাতে বসে নিজের মনে জয় গোস্বামী’র কবিতার বই পড়ছিলেন । এই জয় গোস্বামী’র বই পড়ার আগ্রহটা রানা ভিয়ের মাঝে তৈরি করেছিলেন ‘দলছুট’ ব্যান্ড এর বাপ্পাদা। বাপ্পাদা’র কথায় জয় গোস্বামীর বই পড়া শুরু করলেন। লালপুরে সেই রাতে জয় গোস্বামী’র বই পড়তে পড়তে হঠাৎ করে বইয়রে ভেতরে থাকা সাদা পাতায় হুট করে লিখে ফেলেন-

আজ তোমার মন খারাপ মেয়ে,

তুমি আনমনে বসে আছো

আকাশ পানে দৃষ্টি উদাস

আমি তোমার জন্য এনে দেবো

মেঘ থেকে বৃষ্টির ঝিরিঝিরি হাওয়া

সে হাওয়ায় ভেসে যাবে তুমি।

 

আজ তোমার চোখের কোনে জল

বৃষ্টিও অবিরাম কাঁদে

তোমার সাথে

আমার পথে,

আমি তোমার জন্য এনে দেবো

রুপালী রোদ্দুরের ক্ষন

পাখি কে করে দেবো তোমার আপনজন

পরী,তুমি ভাসবে মেঘের ভাঁজে…..

 

কথাগুলো লিখেই আবার সেই সাদা পাতাটা বইয়ের মাঝে ভাজ করে গুজে রাখলেন।

উদ্দেশ্যবিহীন অজানায় ঘুরা শেষ করে ঢাকায় ফিরলেন। তখন বাপ্পাদার একক অ্যালবাম ‘ধুলো পড়া চিঠি’র কাজ প্রায় শেষ পথে। বেইলি রোডে রানা ভাই ও বাপ্পা দা একসাথে বসে অ্যালবাম এর কভার ডিজাইন দেখছেন। তখনই বাপ্পা দা রানা ভাইকে বললেন, ‘অ্যালবাম এর জন্য আরও ২ টা গান দরকার যা খুব তাড়াতাড়ি দরকার।’ বাপ্পাদার কথা শুনে রানা ভাই জয় গোস্বামীর বইয়ের ভেতরের সাদা পাতায় লিখাটা পকেট থেকে বের করে দিলেন। যতটুকু লিখাছিল ততটুকুই ঐ সময়ে কাভারে দিয়ে দেন কিন্তু তখনও গানটির কোন টিউন হয়নি। এক সপ্তাহ পর বাপ্পাদার ফোন পেলেন। ফোনের অপাশ থেকে বাপ্পা দা রানা ভাইকে বলছেন, ‘গানটা শোনো,আর এক অন্তরা লাগবে।’

গানটা শুনেই রানা ভাইয়ের ভেতরে এক অপার্থিব অনুভূতি এলো। খুব অল্প সময়ে লিখে ফেলেন আরেক অন্তরা যা বাপ্পাদা কে টেক্সট করে সাথে সাথে পাঠিয়ে দেন-

আজ তোমার জোছনা হারায় আলো

প্রজাপতির ডানায় বিষাদ করে ভর

যখন তখন,

আমি তোমার জন্য এনে দেবো

অঝোর শ্রাবন,

আকাশছোঁয়া জলজোছনা

পরী,তুমি ভাসবে মেঘের ভাঁজে…..

 

উৎকণ্ঠায় কাটে দুদিন। ঠিক মতো লিখা হলো কিনা? মাত্রা ঠিক আছে কিনা এসব। ২ দিন পর বাপ্পাদার বাসায় গিয়ে পুরো গানটা শুনে নিজেই অবাক বিস্ময়ে তাকিয়ে থাকেন। মনের ভেতরে তখন ‘লিটল এঞ্জেল এর ছবি আর অদ্ভুত জোছনা বৃষ্টির অনুভূতি অনুভব করলেন।

এইভাবে তৈরি হয়ে যায় ‘পরী’ গানটি। যা ‘ধুলো পড়া অ্যালবাম’ এর সবচেয়ে জনপ্রিয় গান হিসেবে শ্রোতা মহলে দারুন সাড়া ফেলে । আজো অনেকে গুনগুন করে ‘আজ তোমার মন খারাপ মেয়ে’।

রানা ভাইকে অনেক অনেক ধন্যবাদ ও ভালোলাগা জানাই এমন সুন্দর একটি গান আমাদের উপহার দেয়ার জন্য। আরও বেশি চাই এমন গান যেন বাংলা গানের আজকের আধার যুগকে ভাসিয়ে নিয়ে যায় দূরে বহু দূরে।

 

ফজলে এলাহী পাপ্পুব্লগার, বাংলা চলচ্চিত্র ও দেশীয় গান সংগ্রাহক। ব্যক্তিগত উদ্যোগে পরিচালিত রেডিও বিজি ২৪ নামক দেশের সবচেয়ে বড় গানের সংগ্রহশালার কর্ণধার। বর্তমানে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত।

 

১ thought on “‘পরী’ গানটির পেছনের গল্প

  1. ২০০০- ২০০১ এর দিকে রানা ভাই তখন ‘বিআইটি’(বর্তমানে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়-বুয়েট)তে পড়েন সেই সুত্রে বিআইটি’র হোস্টেলে থাকতেন –

    ভাই বি আই টি মানে বরতমানে বুয়েট না, একটু ঠিক ঠাক কতাহ লেখেন। ১৯৭১ এর পর থেকেই তৎকালীন ইপুয়েট বুয়েট নামে পরিচিত। আর তখন যেগুলা বি আই টি ছিল ওইগুলা এখন রুয়েট (রাজশাহী), চুয়েট (চট্টগ্রাম) আর কুয়েট (খুলনা) নামে পরিছিত।

    আমাদের প্রিয় রানা ভাই রাজশাহী বি আই টি তে পরতেন, অর্থাৎ বরতমান রুয়েটে।

    ধন্যবাদ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *