পবিত্র কাবা শরিফ নিয়ে জানা-অজানা তথ্য

পবিত্র কাবা শরিফ নিয়ে জানা-অজানা তথ্য

766
0
SHARE

পবিত্র কাবা শরিফ নিয়ে জানা-অজানা তথ্যপবিত্র কাবা শরিফ নিয়ে জানা-অজানা তথ্য নিয়ে লেখাটি। সমগ্র বিশ্বের মুসলমানদের জন্য কাবা শরিফ হলো পবিত্র তীর্থস্থান। এটা সৌদি আরবের পবিত্র মক্কা নগরীর মসজিদে হারামের অন্তর্গত। সারাবিশ্বের মুসলমানগণ সদা-সর্বদা নামাজের সময় কাবা শরিফকে ক্বিবলা হিসেবে মেনে এর দিকে মুখ করে ইবাদাত করে থাকে।

মুসলমানদের ক্বিবলা কাবা শরিফ সম্পর্কে জানার জন্য আশ্চর্যজনক ১৮টি বিষয় রয়েছে। অনেকেই এ সম্পর্কে অবহিত নয়।

পবিত্র কাবা শরিফ নিয়ে আশ্চর্যজনক ১৮টি বিষয়

১. পবিত্র কাবা শরিফ বেশ কয়েকবার প্রাকৃতিক বিপর্যয় বন্যা এবং আক্রমণের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অতএব কারণে পবিত্র কাবা বেশ কয়েকবার ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় তা পুনঃনির্মাণ করা হয়েছে। সর্বাধিক ঐতিহাসিক তথ্য হলো কাবা শরিফ এ পর্যন্ত ১২ বার পুনঃর্নির্মিত হয়েছে। বিভিন্ন বিপর্যয়ের হাত থেকে সংরক্ষণ করতে কাবা শরিফকে সর্বশেষ ১৯৯৬ সালের আধুনিক ও শক্তিশালী প্রযুক্তির ব্যবহারে সংস্কার করা হয়।

২. পবিত্র কাবা শরিফ হজরত আদম আলাইহিস সালাম, ইবরাহিম আলাইহিস সালাম, ইসমাইল আলাইহিস সালাম এবং হজরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যুগে যুগে কাবা নির্মাণে অংশ গ্রহণ করেছিলেন।

৩. কিসওয়া হলো কালো রংয়ের কাপড়। যা দ্বারা কাবা শরিফ ঢেকে দেয়া হয়। কিন্তু আপনি জানেন কি? এ কিসওয়া সব সময় কালো ছিল না। জরহাম গোত্রের শাসনামলে তাদের নিয়মানুযায়ী কিসওয়া দ্বারা কাবা শরিফের আচ্ছাদন সর্বপ্রথম শুরু হয়।

৪. পরবর্তীতে প্রিয়নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইয়েমেনি সাদা কাপড় দিয়ে পবিত্র কাবাকে ঢেকে দেন। বিভিন্ন খলিফাদের আমলে লাল, সবুজ এবং সাদা রংয়ের কিসওয়াও ব্যবহার করা হতো। আব্বাসীয় খলিফাদের আমলে পবিত্র কাবার কিসওয়া হিসেবে বিভিন্ন রংয়ের ব্যবহার বন্ধ করে কালো রংয়ের কিসওয়া ব্যবহারের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। তখন থেকেই কিসওয়ার জন্য কালো রংটি ব্যবহৃত হয়ে আসছে।

৫. হজরত ইবরাহিম আলাইহিস সালামের আমল থেকেই মূলত পবিত্র কাবা শরিফ আয়তক্ষেত্র আকৃতির ছিল। ইসলামের আগমনের পূর্বে কুরাইশরা যখন পবিত্র কাবাকে পুনঃর্নির্মাণ করেন।

৬. তখন তহবিলের অভাবে পবিত্র কাবা শরিফের পুরো কাজ সম্পন্ন করতে পারেননি। যে স্থানটি তখন নির্মাণ করতে পারেনি সেই স্থানটিকে বলা হয় হাতিমে কাবা। এটি কাবারই অংশ। এ কারণে হাতিমে কাবাকে তাওয়াফে অন্তর্ভূক্ত করতে হয়। যা একটি ছোট্ট গোলাকার প্রাচীর দ্বারা চিহ্নিত।

৭. মূল কাবা শরিফে দুটি দরজা অন্তর্ভূক্ত ছিল। একটি দরজা ছিল প্রবেশের জন্য অন্যটি ছিল বাহির হওয়ার জন্য। এছাড়াও পবিত্র কাবা শরিফের দেয়ালে একটি জানালাও ছিল। বর্তমানে পবিত্র কাবা শরিফে রয়েছে একটি মাত্র দরজা এবং কোনো জানালা নেই যদিও কাবা শরিফের ছাদে ওঠার জন্য ভিতরে একটি দরজা রয়েছে।

৮. পবিত্র কাবা শরিফের ভিতরে ভিত্তি মজবুতে তিনটি পিলার রয়েছে; যেগুলোর প্রত্যেকটি লিন্টারের সঙ্গে সংযুক্ত রয়েছে। পারফিউম ব্যবহারের জন্য পিলারের মধ্যে একটি ছোট বাক্স আকৃতির টেবিল রয়েছে। তিনটি খুটি বা স্তম্ভে ঝুলে আছে বিভিন্ন ডিজাইনের প্রদীপমালা।

৯. কুরআনের আয়াতের কারুকার্যখচিত সবুজ কাপড় কাবা শরিফের দেয়ালের উপরের অংশে জুড়ে রয়েছে। যান পাশের দেয়ালে একটি স্বর্ণ নির্মিত দরজা রয়েছে যেটাকে বাব আল তাওবা বলে ডাকা হয়। যেটি ছাদের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষায় ব্যবহৃত হয়।

১০. পবিত্র কাবা শরিফে কোনে সংযুক্ত ‘হাজরে আসওয়াদ’ কালো পাথরটি বড় ছিল। বর্তমানে এ পাথরটি ভেঙে ৮ টুকরায় বিভিন্ন সাইজে বিভক্ত। যা একটি সিলভার রংয়ের ফ্রেমে একত্র করে কাবা শরিফের পূর্ব-দক্ষিণ কোনে লাগানো।

১১. এ পাথরটি প্রাকৃতিক দুর্যোগ তথা বন্যায়সহ অনেকবার চুরি ও জালিয়তির চেষ্টার কারণে অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। হাজরে আসওয়াদের প্রথম সিলভার ফ্রেমটি তৈরি করেছিলেন আবদুল্লাহ বিন জুবাইর।

১২. এটা আশ্চর্যজনক নয় যে, প্রাক ইসলামি যুগ থেকে এখন পর্যন্ত কাবা শরিফের চাবি একটি পরিবারের কাছেই রয়েছে।

১৩. এ সম্মানিত পরিবার হলো বনু তালহা গোত্র। এ গোত্র গত ১৫শ’ শতাব্দী ধরে এ দায়িত্ব পালন করছেন। এটি ঐ পরিবারের জ্যৈষ্ঠ সদস্যরা উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত হন।

১৪. বছরে দুই বার এ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজ করা হয়। প্রথমবার করা হয় শাবান মাসের আর দ্বিতীয় বার করা হয় জিলকদ মাসে। এ পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম বনু তালহা তথা আলশিবি পরিবারের লোকেরাই করে থাকেন।

১৫. পবিত্র জমজমের পানি, তায়েফ গোলাপ জল এবং বহু মূল্যবান ঊড তৈল দিয়ে একটি পরিষ্কার মিশ্রণ তৈরি করে তা দিয়েই পবিত্র কাবা শরিফ পরিষ্কার করা হয়। পবিত্র নগরী মক্কার গভর্ণর এ কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করতে গণ্যমান্য ব্যক্তিদেরকে আমন্ত্রণ জানান।

১৬. পবিত্র কাবা শরিফের দরজা সবার জন্য উন্মুক্ত ছিল। মানুষ এ পবিত্র ঘরে প্রবেশ করে ইবাদাত-বন্দেগি করতো। হজের সময় তীর্থযাত্রীরা ইচ্ছা করলে এতে প্রবেশ করতে পারতো।

১৭. কিন্তু হাজিদের সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়া এ ঘরের নিরাপত্তার জন্যই এখন কেউ ইচ্ছা করলেও অভ্যন্তরে যেতে পারে না। এটা এখন মাঝে মাঝে বিশেষ বিশেষ মেহমানদের জন্য খোলা হয়।

১৮. পবিত্র কাবা শরিফ সম্পর্কে অবিশ্বাস্য হলেও চিরন্তন সত্য যে, কাবা শরিফের চারদিকে তাওয়াফ কখনো বন্ধ হয় না। তবে হ্যাঁ, নামাজের সময় যখন মুয়াজ্জিন জামাআতের জন্য ইক্বামাত দেন ঠিক নামাজের সময় তাওয়াফকালীন অবস্থায় যে যেখানে থাকে সেখানে দাড়িয়েই নামাজে অংশ গ্রহণ করে। নামাজের সালাম ফিরানোর সঙ্গে সঙ্গে আবার তাওয়াফ শুরু হয়ে যায়।শুধু তাই নয়, যখন পবিত্র কাবা শরিফ বন্যার কারণে পানিতে তাওয়াফ চত্ত্বর তলিয়ে গিয়েছিল তখনো মানুষ সাতার কেটে পবিত্র কাবা শরিফ তাওয়াফ করতেন। যা আল্লাহ তাআলার এক অনন্য কুদরতের নিদর্শন।

ইসলামের অনেক গুরুত্বপূর্ণ ইবাদতের বিধান দেওয়া হয়েছে কাবাকে কেন্দ্র করেই। নামাজ, হজ, কোরবানি, পশু জবাই ও মৃতের দাফন- সব কিছু আদায় করতে হয় কাবার দিকে ফিরেই। হাদিসের ভাষ্য মতে, কাবাগৃহে এক রাকাত নামাজ আদায় করলে এক লাখ রাকাতের সওয়াব পাওয়া যায়। কাবা শরিফের এ বিশেষ মর্যাদা ও মাহাত্ম্যের কথা বিবেচনা করে ইসলাম কাবার দিকে মুখ বা পিঠ দিয়ে প্রাকৃতিক প্রয়োজন পূরণের ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘যখন তোমাদের মধ্য থেকে কেউ প্রাকৃতিক প্রয়োজন পূরণের লক্ষ্যে বসবে সে যেন কেবলাকে সামনে বা পেছনে না রাখে। ‘ (মুসলিম)।

কাবার ভিত্তিপ্রস্তর হয়েছে শিরকমুক্ত নির্ভেজাল একত্ববাদের ওপর। আল্লাহ বলেন, ‘স্মরণ করুন সে সময়কে যখন আমি ইব্রাহিমকে বাইতুল্লাহর স্থান নির্ধারণ করে বলেছিলাম যে আমার সঙ্গে কাউকে শরিক করো না। ‘ (সুরা হজ, ২৬) এখলাস ও একনিষ্ঠতা এ নির্মাণের অন্যতম উপকরণ ছিল। আল্লাহ বলেন, ‘স্মরণ করো, যখন ইব্রাহিম ও ইসমাইল কাবাগৃহের ভিত্তি স্থাপন করছিল। তারা দোয়া করেছিল : হে আমাদের রব! (এ কাজ) আপনি আমাদের পক্ষ থেকে কবুল করুন। ‘ (সুরা বাকারা, ১২৭) কাবা শরিফ পৃথিবীর পবিত্রতম স্থান। আর অপবিত্র কারো সেখানে প্রবেশ করার অধিকার নেই। আল্লাহ বলেন, ‘আমি ইব্রাহিম ও ইসমাইলকে আদেশ করলাম, তোমরা আমার গৃহকে তওয়াফকারী, অবস্থানকারী ও রুকু-সেজদাকারীদের জন্য পবিত্র রাখো। ‘ (সুরা বাকারা, ১২৫) কাবাগৃহের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো- তা পৃথিবীর সর্বপ্রথম ও সুপ্রাচীন ঘর। কোরআনের ভাষায়, ‘নিঃসন্দেহে সর্বপ্রথম ঘর যা মানুষের জন্য নির্ধারিত হয়েছে, সেটাই হচ্ছে এ ঘর, যা বাক্কায় অবস্থিত। ‘ (সুরা আলে ইমরান, ৯৬) কাবা শরিফ সমগ্র বিশ্বের স্তম্ভস্বরূপ, বিশ্বের ব্যবস্থাপনা ও বাইতুল্লাহর মধ্যে একটি নিবিড় যোগসূত্র রয়েছে। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘আল্লাহ সম্মানিত গৃহ কাবাকে মানুষের স্থিতিশীলতা ও স্থায়িত্বের কারণ হিসেবে সৃষ্টি করেছেন। ‘ (সুরা মায়েদা, ৯৭)

কাবা শরিফের অবকাঠামো ও সংক্ষিপ্ত ইতিহাস

সৌদি গেজেট মতে, কাবাগৃহের উচ্চতা পূর্ব দিক থেকে ১৪ মিটার। (অন্য একটি সূত্র মতে ১২.৮৪ মিটার)। পশ্চিম দিক থেকে ১২.১১ মিটার। উত্তর দিক থেকে ১১.২৮ মিটার। দক্ষিণ দিক থেকেও ১২.১১ মিটার। (সূত্র : সৌদি গেজেট, ৩ জানুয়ারি, ২০১০ ইং)
ভূমি থেকে কাবার দরজার উচ্চতা ২.৫ মিটার। দরজার দৈর্ঘ্য ৩.০৬ ও প্রস্থ ১.৬৮ মিটার। বর্তমান দরজা বাদশা খালেদের উপহার, যা নির্মাণে প্রায় ২৮০ কিলোগ্রাম স্বর্ণ ব্যবহার করা হয়েছে। এর সিলিংকে তিনটি কাঠের পিলার ধরে রেখেছে। প্রতিটি পিলারের ব্যাস ৪৪ সে.মি.। কাবা শরিফের ভেতরের দেয়ালগুলো সবুজ ভেলভেটের পর্দা দিয়ে আবৃত। এই পর্দাগুলো প্রতি তিন বছর অন্তর অন্তর পরিবর্তন করা হয়। এর ছাদে ১২৭ সে.মি. লম্বা ও ১০৪ সে.মি. প্রস্থের একটি ভেন্টিলেটর রয়েছে, যা দিয়ে ভেতরে সূর্যের আলো প্রবেশ করে। এটি একটি কাচ দিয়ে ঢাকা থাকে। প্রতিবছর দুবার কাবা শরিফের ভেতরটা ধৌত করার সময় এ কাচ খোলা হয়। কাবার প্রথম ছাদ নির্মাতা- কুসাই, অতঃপর কোরাইশ। প্রথম গিলাফ পরিয়েছেন- তুব্বা আবুল আসাদ। প্রথম মূর্তি স্থাপন করেছেন- আমর বিন লুহাই। প্রথম গোসল দিয়েছেন- মুহাম্মদ (সা.), মক্কা বিজয়ের দিন। প্রথম আজান দিয়েছেন- বেলাল বিন রাবাহ। প্রথম মিনজানিক দিয়ে হামলা করেছেন হুসাইন, ইয়াজিদের নির্দেশে।

ফেরেশতাদের নির্মাণ
কাবা শরিফের ঠিক ওপরে ঊর্ধ্ব আকাশে ‘বায়তুল মামুরে’ ফেরেশতারা অনেক আগে থেকে তওয়াফ করে আসছিলেন। আল্লাহ তায়ালা জমিনের ফেরেশতাদের বললেন, ‘তোমরা বাইতুল মামুরের আদলে একটি ঘর নির্মাণ করো। ‘ তখন তাঁরা কাবা শরিফ নির্মাণ করেন। অতঃপর আল্লাহ তায়ালা তাঁদের কাবাগৃহ তওয়াফ করার নির্দেশ দিলেন।

আদম (আ.)-এর নির্মাণ
হজরত আবদুল্লাহ বিন আমর বিন আস (রা.) বলেন, আল্লাহ তায়ালা হজরত আদম ও হাওয়াকে পৃথিবীতে পাঠিয়ে বলেন, ‘আমার জন্য একটি ঘর নির্মাণ করো। ‘ অতঃপর হজরত আদম (আ.) জিব্রাইল (আ.)-এর অঙ্কিত স্থানে খননকাজ শুরু করে দেন। আর হজরত হাওয়া (আ.) সেই মাটি বহন করে নিয়ে যেতেন। একপর্যায়ে সেখানে পানির দেখা মিলল। হঠাৎ কে যেন ডাক দিয়ে বলল, ‘হে আদম! যথেষ্ট হয়েছে। ‘ যখন তাঁরা এ ঘর নির্মাণ করেন তখন আল্লাহ তায়ালা তাঁদের এ ঘর তওয়াফ করার নির্দেশ দিলেন। (দালায়েলুন্নবুয়্যাহ ও বেদায়া নেহায়া, দুর্বল সূত্র মতে)

বর্ণিত আছে, হজরত আদম (আ.) পাঁচটি পাহাড়ের পাথর দিয়ে কাবাগৃহ নির্মাণ করেছেন। জাবালে হেরা, জুদি, লুবনান, সিনাই ও জাইতুন। আরো বর্ণিত আছে, ফেরেশতারা এ পাথরগুলো সঞ্চয় করে দিতেন।

ইব্রাহিম ও ইসমাইল (আ.)-এর নির্মাণ
হজরত নূহ (আ.)-এর যুগে মহাপ্লাবনে কাবাগৃহ ধ্বংস হয়ে যাওয়ার পর আল্লাহর আদেশে (সুরা বাকারা, ১২৭) হজরত ইব্রাহিম ও ইসমাইল (আ.) কাবাগৃহ পুনর্নির্মাণ করেন। ইসমাইল (আ.) পাথর নিয়ে আসতেন এবং ইব্রাহিম (আ.) নির্মাণকাজ সম্পন্ন করতেন। একপর্যায়ে কাবার দেয়াল যখন উঁচু হয়ে গেল তখন আল্লাহর কুদরতি ‘লিফট’ পাথর- ‘মাকামে ইব্রাহিমে’র মাধ্যমে তিনি নির্মাণকাজ সম্পন্ন করেন। তখন কাবার কোনো ছাদ নির্মাণ করা হয়নি। তখন কাবার উচ্চতা ৯ হাত, দৈর্ঘ্য ৩০ হাত ও প্রস্থ ২২ হাত ছিল। ইতিহাস থেকে জানা যায়, সে নির্মাণের স্থায়িত্ব ছিল প্রায় চার হাজার বছর।

কুরাইশদের কাবাগৃহ নির্মাণ
খোজায়া গোত্রের পতনের পর মক্কার শাসনভার গ্রহণ করেন কুরাইশ বংশের প্রতিষ্ঠাতা কুসাই বিন কিলাব। কুরাইশরা ৫০০ খ্রিস্টাব্দ থেকে ৬৩১ খ্রিস্টাব্দে মক্কা বিজয় পর্যন্ত মক্কার শাসন ও কাবার রক্ষণাবেক্ষণ করে। তিনি তওয়াফের জন্য কাবার আঙিনা চিত্রিত করেন, যা আজও বিদ্যমান। তিনিই কাবার ছায়ায় ‘দারুন নদওয়া’ বা পরামর্শ সভা প্রতিষ্ঠা করেন। তাঁর শাসনামলে কাবায় চূড়ান্তরূপে মূর্তি পূজা শুরু হয়।

৫৭০ খ্রিস্টাব্দে মক্কার শাসক হলেন আবদুল মুত্তালিব। তিনিই প্রথম কাবায় স্বর্ণখচিত লৌহদরজা নির্মাণ করেন। তাঁর শাসনামলে ইয়েমেনের বাদশাহ আবরাহা ‘সানা’য় প্রতিষ্ঠিত ‘কুলাইস গির্জা’কে শ্রেষ্ঠ প্রমাণের জন্য কাবা থেকে হজ স্থানান্তরের উদ্দেশ্যে কাবা ধ্বংস করার পরিকল্পনা করে বিরাট হস্তীবাহিনী পাঠায়। আল্লাহ তায়ালা তার সমুচিত জবাব দিয়ে দেন। যা পবিত্র কোরআনে সুরা ফিলে বিবৃত হয়েছে। রাসুল (সা.)-এর বয়স যখন ৩৫ বছর, তখন এক মহিলা কাবাগৃহে আগুন লাগিয়ে দেয়। এরপর বন্যার কারণে কাবার গিলাফ ও দেয়াল ধ্বংস হয়ে যায়।

তখন সবার সম্মতিক্রমে কাবাগৃহ পুনর্নির্মাণের সিদ্ধান্ত হয়। এ নির্মাণের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো, কুরাইশরা কাবার উচ্চতা আরো ৯ হাত বৃদ্ধি করে মোট ১৮ হাত (৪৩২ সে.) নির্মাণ করেন এবং তাঁরাই প্রথম কাবার পূর্ণ ছাদ নির্মাণ করেন। আর কাবার পশ্চিম দরজা একেবারেই বন্ধ করে দেওয়া হয় এবং পূর্ব দিকের দরজাটি একটু উঁচু করে দেওয়া হয়, যাতে অন্য কেউ প্রবেশ করতে না পারে। পুরো নির্মাণকাজ বৈধ অর্থে পরিচালিত হলেও অর্থকষ্টে তাঁরা উত্তর দিকে চিহ্ন রেখে ৭ হাত (৩ মিটার) বাদ দিয়ে দেন। এ ছাড়া তারা পানি নির্গমনের জন্য ‘মিজাব’ বা নালা তৈরি করেন।

আবদুল্লাহ বিন জুবাইর (রা.)-এর নির্মাণ
ইয়াজিদ বিন মুয়াবিয়া (রা.)-এর শাসনামলে হুসাইন নামক এক ব্যক্তির মিনজানিক ব্যবহারের দরুন মতান্তরে হাজ্জাজ বিন ইউসুফের মিনজানিক হামলার কারণে কাবা শরিফ পুড়ে বিধ্বস্ত হয়ে যায়। ফলে তা পুনর্নির্মাণের তীব্র প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। কুরাইশদের বাদ দেওয়া ‘হাতিম’কে তিনি কাবার সঙ্গে সংযুক্ত করে দেন। কাবাকে তিনি পুরো ইব্রাহিমি কাঠামোতে ফিরিয়ে নিয়ে যান। গমন-বহির্গমনের সুবিধার্থে তিনি ‘মাতাফে’র সঙ্গে মিশিয়ে দুটি দরজা নির্মাণ করে সর্বসাধারণের জন্য অবমুক্ত করে দেন। ছাদের ভারসাম্য রক্ষার্থে তিনি কাবার অভ্যন্তরে তিনটি কাঠের স্তম্ভ স্থাপন করেন এবং কাবার উচ্চতা আরো ১০ হাত বৃদ্ধি করে দেন। ইবনে আসিরের বর্ণনা মতে, এ ঘটনা ছিল ৬৫ হিজরিতে।

হাজ্জাজ বিন ইউসুফের নির্মাণ
৭৪ হিজরিতে আবদুল মালিক বিন মারওয়ানের শাসনামলে হাজ্জাজ বিন ইউসুফ এক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে আবদুল্লাহ বিন জুবাইর (রা.)-কে শহীদ করেন। ইবনে জুবাইরের কাবা নির্মাণকে হাজ্জাজ আত্মচিন্তাপ্রসূত জ্ঞান করে কাবাকে কুরাইশি কাঠামোতে ফিরিয়ে নিতে উৎসাহী হন। ইবনে মারওয়ানের সম্মতিক্রমে তিনি ইবনে জুবাইরের স্মৃতিচিহ্নকে ধুলায় ধূসরিত করে দেন। তিনি ইব্রাহিমি কাঠামো পরিবর্তন করে কাবাকে কুরাইশি ফ্রেমে বন্দি করেন। পরবর্তী সময়ে হজরত আয়েশা (রা.)-এর হাদিস শুনে ইবনে মারওয়ান খুবই অনুতপ্ত হয়েছেন বলে জানা যায়। এরপর বাদশাহ হারুনুর রশিদ কাবাকে ইবনে জুবাইরের আদলে নির্মাণ করতে চাইলে ফেতনার আশঙ্কায় তৎকালীন আলেম সমাজ বিশেষত ইমাম মালেক (রহ.) তা নিষিদ্ধ ঘোষণা করেন।
এর পর থেকে নির্মাণের পরিবর্তে কাবা শরিফের সংস্কারকাজ অদ্যাবধি অব্যাহত রয়েছে। ৯১ হিজরিতে উমাইয়া খলিফা ওয়ালিদ বিন আবদুল মালিক কাবাগৃহে ব্যাপক সংস্কার করেন।

উসমানি খেলাফতকালে সংস্কার
১০১৯ হিজরিতে কাবার দেয়াল বিদীর্ণ হয়ে গেলে বাদশাহ আহমদ খান তা সংস্কার করেন।
১০৩৯/১০৪০ হিজরি ও ১৬৩০ খ্রিস্টাব্দ মোতাবেক এক ভয়াবহ বন্যায় কাবার পশ্চিম দিকের দরজাটি ভেঙে পড়ে। এ ছাড়া কাবার দেয়ালে ব্যাপক ক্ষতি সাধিত হয়। বাদশাহ মুরাদ খান পাশার অর্থায়নে কাবাগৃহে ব্যাপক সংস্কার আনা হয়।

১২৭৬ হিজরিতে বাদশাহ আবদুল মজিদ একটি ‘মিজাব’ (নালা) হাদিয়া দেন, যাতে ২৩ কেজি (প্রায়) স্বর্ণ ব্যবহার করা হয়েছিল।

সৌদি রাজবংশের সংস্কারকাজ
১৩৬৩ হিজরিতে বাদশাহ আবদুল আজিজ কাবার দরজা পরিবর্তন করেন। ১৩৭৭ হিজরিতে বাদশাহ সৌদ কাবার ওপরের ছাদ ভেঙে পুনর্নির্মাণ ও নিচের ছাদ নবায়ন করেন। এমনকি দেয়ালগুলো নতুন করে মেরামত করেন। ১৩৯১ হিজরিতে বাদশাহ ফয়সাল কাবার দরজায় সংস্কার আনেন। ১৩৯৯ হিজরিতে বাদশাহ খালেদ প্রায় ২৮০ কিলোগ্রাম স্বর্ণ ব্যবহার করে নতুন দরজা প্রতিস্থাপন করেন।

১৪১৬ হিজরিতে বাদশাহ ফাহদ কাবার বাইরের দেয়াল সংস্কার করেন। ১৪১৭ হিজরিতে তিনি কাবাগৃহের ছাদ, খুঁটি, দেয়ালসহ সব কিছু সংস্কার করে নতুন ধাঁচে ঢেলে সাজান।

১১-০১-১৪১৭ থেকে শুরু হয়ে ০২-০৭-১৪১৭ হিজরি মঙ্গলবার এ পবিত্র কাজের সমাপ্তি ঘটে। তাঁর এ নির্মাণকাজকে কাবার সর্বশেষ নির্মাণ বা সর্বশেষ সংস্কার হিসেবে অভিহিত করা হয়।

কাবা শরিফের গিলাফের ইতিহাস
কাবা শরিফের গিলাফের ইতিহাস স্বয়ং কাবার ইতিহাস থেকে আলাদা নয়। কাবার গিলাফের গুরুত্ব,মুসলিমদের নিকট তার পবিত্রতা ও উচ্চ মর্যাদা প্রকাশিত।

কাবার গিলাফ
এক ধরনের বিশেষ কাপড়ে পবিত্র কাবা শরিফকে আবৃত করে রাখা হয়। একে আমরা বলি গিলাফ এবং আরবরা বলে কিসওয়া। হজের কয়েকদিন আগে কাবার নিচের অংশ থেকে গিলাফ কিছুটা উপরে তুলে দেয়া হয় যাতে কাবা শরিফের বাইরের অংশ দেখা বা ধরা যায়। গিলাফের ইতিহাস কাবা শরিফের ইতিহাস থেকে শুরু হয়েছে। জানা যায়, তুব্বা আল হোমায়রি প্রথমে মোটা কাপড় দিয়ে গিলাফ তৈরির প্রচলন শুরু করেন। ইসলাম পূর্ব সময়ে অনেকে কাবা শরিফের গায়ে গিলাফ পরিয়েছেন, কারণ তারা এটিকে ওয়াজিব মনে করতেন। তখন একটার উপর আরেকটা গিলাফ পরানো হত। গিলাফগুলো ভারী বা পুরাতন হয়ে গেলে সরিয়ে ফেলা হত।

গিলাফের উপর গিলাফ পরানোর ফলে ওজন বেড়ে কাবা শরিফের দেয়াল ভেঙে যাওয়ার আশংকা সৃষ্টি হলে ১৬০ হিজরিতে খলিফা আল মাহদী কাবা শরিফের গায়ে একই সময়ে একটার বেশি গিলাফ পরানো নিষিদ্ধ ঘোষণা করেন। আব্বাসী খলিফা আল মামুনের সময়ে কাবা শরিফের গায়ে তিনবার গিলাফ পরানো হত। প্রথমবার ৮ জিলহজ লাল সিল্কের গিলাফ, দ্বিতীয়বার ১ রজব মিসরীয় সাদা কাবাতি কাপড়ের গিলাফ এবং তৃতীয়বার ২৯ রমজান সিল্কের তৈরি গিলাফ লাগানো হত। আব্বাসীয় খলিফ আল নাসির প্রথমে কাবা শরিফে সবুজ ও পরে কালো রঙের গিলাফ পরান। সেখান থেকে আজ পর্যন্ত কাবা শরিফে কালো রঙের গিলাফ লাগানো হচ্ছে। ৭৫১ হিজরিতে মিসরের বাদশাহ ইসমাইল বিন নাসের বিন কলাউন কাবা শরিফের গিলাফ তৈরির জন্য একটি বিশেষ ওয়াকফ ঘোষণা করেন। এই ওয়াকফ থেকে প্রতি বছর খানায়ে কাবার জন্য বাইরের একটি কালো গিলাফ এবং একটি অভ্যন্তরীণ লাল গিলাফ তৈরি করা হত। এখন কাবা শরিফের দরজা ও বাইরের গিলাফ দুটোই মজবুত রেশমি কাপড় দিয়ে তৈরি করা হয়। গিলাফের মোট ৫টি টুকরো তৈরি করা হয়। চারটি টুকরো চারদিকে এবং বাকি টুকরোটি দরজায় লাগানো হয়। টুকরোগুলো পরস্পর সেলাই করা থাকে। বর্তমানে প্রতি বছর ৯ জিলহজ কাবা শরিফের গায়ে পরানো হয় নতুন গিলাফ। নতুন গিলাফ পরানোর সময়ে পুরাতন গিলাফটি সরিয়ে ফেলা হয়। পরে পুরাতন গিলাফটি কেটে মুসলিম দেশের রাষ্ট্র প্রধানদের উপহার দেয়া হয়।

প্রাকৃতিকভাবে উৎপন্ন রেশম দিয়ে তৈরি করা হয় কাবার গিলাফ। রেশমকে রং দিয়ে কালো করা হয়। পরে গিলাফে বিভিন্ন দোয়ার নকশা আঁকা হয়। গিলাফের উচ্চতা ১৪ মিটার। উপরের তৃতীয়াংশে ৯৫ সেন্টিমিটার চওড়া বন্ধনীতে কোরআনের আয়াত লেখা। বন্ধনীতে ইসলামি করুকার্যখচিত একটি ফ্রেম থাকে। বন্ধনীটি সোনার প্রলেপ দেয়া রুপালি তারের মাধ্যমে এমব্রয়ডারি করা হয়। এই বন্ধনীটি কাবা শরিফের চারধারে পরিবেষ্টিত থাকে। ৪৭ মিটার লম্বা বন্ধনীটি ১৬ টুকরায় বিভক্ত থাকে। বন্ধনীটির নিচে প্রতি কোনায় সূরা ইখলাস, নিচে পৃথক পৃথক ফ্রেমে লেখা হয় কোরআনের ছয়টি আয়াত। এতে এমব্র্রডারি করে উপরে সোনা ও রুপার চিকন তার লাগানো হয়। এছাড়া গিলাফে ১১টি নকশা করা মোমবাতির প্রতিকৃতি বসানো হয়। এগুলো কাবা শরিফের চার কোণে লাগানো হয়। খানায়ে কাবার দরজার পর্দাটিকে বলা হয় বোরকা। এটাও কালো রেশম কাপড় দিয়ে তৈরি। এর উচ্চতা সাড়ে সাত মিটার ও প্রস্থ চার মিটার। এতে ইসলামি নকশা ও কোরআনের আয়াত লেখা থাকে।এ লেখাগুলোও সোনা ও রুপার চিকন তার দিয়ে এমব্রয়ডারি করা হয়। কাবার গিলাফের প্রতিটি কাপড়ের জন্য প্রয়োজন হয় ৬৭০ কেজি রেশম, ১৫০ কেজি সোনা ও রুপার চিকন তার। ৪৭ থান সিল্কের কাপড় দিয়ে তৈরি করা হয় এই গিলাফ। যার মোট আয়তন ৬৫৮ বর্গ মিটার। প্রতিটি থান এক মিটার লম্বা ও ৯৫ সেন্টিমিটার চওড়া। একটা আরেকটার সাথে সেলাই করা থাকে। প্রতিবছর দুটি করে গিলাফ তৈরি করা হয়। একটি মূল এবং অপরটি সতর্কতার জন্য তৈরি করে রাখা হয়। একটি গিলাফ হাতে তৈরি করা হয়, যেটা তৈরিতে সময় লাগে আট-নয় মাস। অন্যটি মেশিনে মাত্র এক মাসে তৈরি করা হয়। গিলাফ তৈরি করার পর তা কাবা শরিফের চাবির রক্ষক বনি শাইবা গোত্রের মনোনীত সেবকের কাছে হস্তান্তর করা হয়। পরে সবার সহযোগিতায় গিলাফ কাবা শরিফের গায়ে চড়ানো হয়। কাবা শরিফের গিলাফ তৈরির কারখানাটি মক্কার উম্মুল জুদে অবস্থিত। এই কারখানাটি ৬টি অংশে বিভক্ত, যথা : বেল্ট, হস্তশিল্প, যান্ত্রিক, ছাপা, রং এবং অভ্যন্তরীণ পর্দা বিভাগ। এই কারখানায় বর্তমানে ২৫০ জনের বেশি কর্মচারী নিয়োজিত আছেন।

রাসুল (সা.)এর পূর্বে কাবার গিলাফ
ইমাম মুহাম্মাদ বিন ইসহাক বলেন,‘একাধিক আলেমের কথা থেকে জানতে পারি যে সর্বপ্রথম “তুব্বা” আসাদ আল-হেমইয়ারি কাবার গিলাফ লাগান। তিনি স্বপ্নে দেখেন যে তিনি কাবা ঘরের গিলাফ লাগাচ্ছেন।সেই জন্য তিনি চামড়ার গিলাফ চড়ান। এর পরও তাকে স্বপ্নে আরও গিলাফ লাগানোর কথা বলা হচ্ছে। তাই তিনি ইয়েমেনের তৈরি লাল কাপড়ের গিলাফ লাগান’[আখবারে মক্কা-আযরুকী]।

এরপর জাহেলি যুগে অনেকে নিজ নিজ যুগে গিলাফ লাগিয়েছেন। কারণ এটিকে তারা দ্বীনের অপরিহার্য কর্ম মনে করত; যে যখন ইচ্ছা করত তখন যে কোন প্রকারের গিলাফ লাগাতে পারত। (তৎকালীন সমহ ও প্রকারের কোন শর্ত ছিল না)। কাবায় হরেক রকম গিলাফ লাগান হত। যেমনঃ চামড়ার, মাআফির (ইয়েমেনের হামদান গ্রামের তৈরি কৃত কাপড়ের গিলাফ), ইয়েমেনের তৈরি লাল পাড়ের গিলাফ, পাতলা ও হালকা কাপড়ের গিলাফ এবং ইয়েমেনের কারুকাজ করা কাপড়ের গিলাফ।তখন কাবায় গেলাফের উপর গিলাফ লাগান হত। যখন বেশী ভারী হয়ে যেত অথবা কোন গিলাফ পুরাতন হয়ে যেত তখন সেটিকে তুলে নিয়ে বরকত হাসিলের জন্য বণ্টন করা হত অথবা মাটিতে দাফন করা হত। জাহেলি যুগে কুরাইশরা আপোষে সহযোগিতার মাধ্যমে গিলাফ তৈরি করত। আর্থিক অবস্থার প্রেক্ষিতে প্রতি গোত্রের টাকার পরিমান নির্ধারণ করা হত। ‘কুসসীর’ যুগেও এই পদ্ধতি চালু ছিল। তবে যখন রাবীআ ‘মুগীরা বিন মাখযুমীর যুগ আসে তখন তিনি ব্যবসার উদ্দেশ্যে ইয়েমেন যাওয়া আসা করতেন। তিনি অতি ধনী ছিলেন। তিনি ঘোষণা করেন আমি এক বছর একাই গিলাফ দিব। আর এক বছর কুরাইশরা সকলে মিলে দিবে। তার মৃত্যুকাল পর্যন্ত একাই এই কাজ করতে থাকেন। তিনি ইয়েমেনের জানাদ শহর থেকে সুন্দর সুন্দর কাপড় আনতেন এবং গিলাফ তৈরি করে লাগাতেন। কুরাইশরা তার উপাধি দেয় ‘আদল’ কারণ তিনি একাই সমস্ত কুরাইশদের সমান কাজ করেছেন। তার সন্তানদের উপাধি দেয় ‘বানু আদল’। আরবী ভাষায় ‘আদল’ এর অরথ সমতুল্য। কাবায় সর্বপ্রথম রেশমের গিলাফ লাগান একজন আরব মহিলা, যিনি ছিলেন আব্বাস (রাঃ) এর মা ‘নুতাইলা বিনতে জানাব’।

ইসলামী যুগে কাবার গিলাফ
রাসুল (সা.) ও তাঁর সাহাবাগন মক্কা বিজয়ের পূর্বে কাবায় গিলাফ চড়াননি। কেননা কুফফাররা এ কাজে অনুমতি দিত না। মক্কা বিজয়ের পরও রাসুল (সা.) কাবার গিলাফ পরিবর্তন করেননি। তবে জনৈক মহিলা কাবায় ধুপ দিতে গেলে তাতে (গেলাফে) আগুন লেগে যায় এবং পুড়ে যায়। তারপর রাসুল (সা.) ইয়েমেনী কাপড়ের গিলাফ চড়ান। এরপর আবু বকর (রাঃ), উমর (রাঃ), এবং উসমান (রাঃ) “কিবাতী” কাপড়ের গিলাফ চড়ান।একথা প্রমানিত আছে যে, মুআবিয়া বিন আবী সুফিয়ান বছরে দু’বার কাবায় গিলাফ চড়াতেন। আশুরার দিনে রেশমের এবং রমজানের শেষে কিবতী কাপড়ের গিলাফ লাগাতেন। এরপর ইয়াযীদ বিন মু’আবিয়া, ইবনে যুবায়ের আব্দুল্ল মালেক বিন মারওয়ান রেশমের গিলাফ চড়িয়েছেন।কাবায় প্রতি বছর দুটি গিলাফ চড়ানো হতঃ একটি রেশমের অপরতি কিবাতী কাপড়ের। রেশমি গেলাফের উপরের অংশ (যাকে কাসীস বলা হয়)জুলহিজ্জা মাসের ৮ তারিখে চড়ানো হত হাজীদের ফিরে যাওয়ার পর। যাতে তাদের হাত লেগে তা নষ্ট না হয়।

রেশমের গিলাফ রামাদানের ২৭ তারিখ পর্যন্ত থাকতো এবং ঈদুল ফিতরের জন্য কিবাতী কাপড়ের গিলাফ চড়ানো হত। বাদশাহ মামুনের যুগে কাবাকে তিনটি গিলাফ পড়ানো হত। জুলহিজ্জার ৮ তারিখে লাল রেশমি গিলাফ, রজবের প্রথম তারিখে কিবাতী এবং রামাদানের ২৭ তারিখে শ্বেত রেশমি গিলাফ। বাদশাহ মামুন যখন জানতে পারেন যে, সাদা রেশমি গেলাম হজ্জ্বের মৌসুমে নষ্ট হয়ে যাবে তখন আরও একটি সাদা গেলাফের ব্যবস্থা করেন। এরপর নাসের আব্বাসী সবুজ রঙের গিলাফ তারপর কালো রঙের গিলাফ চড়ান। সেই সময় থেকে আজও কালো গিলাফ চড়ানো হচ্ছে। আব্বাসী খেলাফত পতনের পর ৬৫৯ হিজরিতে সর্বপ্রথম ইয়েমেনী বাদশাহ ‘মুজাফফর’ কাবা ঘরের গিলাফ লাগান। তিনি বেশ কয়েক বছর মিশরি বাদশাহর সঙ্গে পালাক্রমে গিলাফ চড়ানোর কাজ চালু রাখেন। ৬৬১ হিজরিতে আব্বাসীদের পর যে মিশরি শাসক সর্বপ্রথম গিলাফ চড়ানোর চেষ্টা করেন তিনি হচ্ছেন বাদশাহ যাহের বাইবেরাস বন্দুকধারী। ৭৫১ হিজরিতে মিশরের বাদশাহ ইসমাইল বিন নাসের বিন মুহাম্মাদ বিন কালাউন কাবার গেলাফের জন্য বিশেষ ওয়াকফের ব্যবস্থা করেন। তিনি কাবার জন্য প্রতি বছর কালো গিলাফ ও প্রতি পাঁচ বছর পর মদীনায় রাসুল (সা.) এর রওজার জন্য সবুজ রঙের গিলাফ পাঠাতেন। কিন্তু ‘আল-খাদীউবী মুহাম্মাদ আলী’ হিজরির ১৩ শতাব্দীতে ওয়াকফ বন্ধ করেন এব্বং সরকারী খরচে গিলাফ তৈরি হতে আরম্ভ করে।

তুর্কির উসমানী খলীফাগণ কাবার ভিতরের গিলাফ নিজেদের জন্য খাস করে নেন। ৮১০ হিজরিতে কাবার দরজার জন্য নকশাদার চাদর তৈরি করা হয়; যাকে ‘বুরকা’ বলা হয়। অতঃপর ৮১৬ – ৮১৮ হিজরি পর্যন্ত স্থগিত হয়ে যায় এবং পুনরায় ৮১৯ হিজরিতে আরম্ভ হয় যা আজও গেলাফের সাথে তৈরি করা হচ্ছে।

সৌদি যুগের গিলাফ
বাদশাহ আব্দুল আযীয বিন আব্দুর রহমান আলে সউদ মক্কা মদীনায় অবস্থিত দু’হারামের খেদমতের খুব গুরুত্ব দেন। এই গুরুত্বের ভিত্তিতে বাদশাহ সউদ বিন আব্দুল আযীয পবিত্র মক্কায় কাবার গিলাফ তৈরি করার জন্য বিশেষ এক কারখানা তৈরি করার আদেশ দেন এবং তাতে গিলাফ তৈরির যাবতীয় সরঞ্জাম মওজুদ করা হয়। ১৩৮২ হিজরিতে বাদশাহ ফয়সাল নতুন করে কারখানা তৈরি করার আদেশ দেন, যাতে উত্তম ও মজবুত গিলাফ প্রস্তুত করা সম্ভব হয় এবং কাবা যেমন শানদার ঘর, তাঁর শানের উপযোগী হয়।

১৩৯৭ হিজরিতে মক্কায় ‘উম্মুল জুদ’ নামক স্থানে নতুন বিল্ডিং এর উদ্ভোধন করা হয়। তাতে গিলাফ তৈরির জন্য আধুনিক সরঞ্জাম সংযোজিত হয়। সেখানে মেশিনের সাহায্যে গিলাফ তৈরির ব্যবস্থার সাথে সাথে হাতের কাজের যে কারুকার্য তা বজায় রাখা হয়েছে। কারণ শিল্প জগতে তার উচ্চ মূল্য রয়েছে। এই কারখানা ধারাবাহিক ভাবে উন্নতি শাধনের পথে রয়েছে এবিং হাতের কারুকার্য বহাল রেখেছে,যাতে কাবাকে অতি আকর্ষণীও গিলাফ উপহার দেওয়া সম্ভব হয়।

Comments

comments