পপসম্রাট আজম খানের জন্মদিনে শ্রদ্ধাঞ্জলি
বিনোদন

পপসম্রাট আজম খানের জন্মদিনে শ্রদ্ধাঞ্জলি

পপসম্রাট আজম খানের জন্মদিনে শ্রদ্ধাঞ্জলিফজলে এলাহী
আজ ২৮শে ফেব্রুয়ারি বাংলা সঙ্গীতের মহান পপসম্রাট আজম খানের ৬৬তম জন্মবার্ষিকী, গুরু আজম খানকে জানাই জন্মদিনের বিন্রম শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা।

পপসম্রাট প্রিয় গুরু আজম খানের মৃত্যু আমাকে প্রচণ্ড ভাবে একটি মানসিক ধাক্কা দেয় যার কারনে ৬ই জুন ২০১১-তে ২টি ব্লগে গুরুকে শ্রদ্ধা জানিয়ে একটি কবিতা দিয়ে প্রকাশ করেছিলাম যেটি ছিল আমার ব্লগে প্রথম লিখা। পপগুরুর জন্মদিনে তাই কবিতাটি পুনঃপ্রকাশ করা হলো-

গুরুকে আমার শ্রদ্ধাঞ্জলি
একদিন যখন পৃথিবীর বুক
জেগেছিল এক নতুন ধারার গানে
বাংলা তখনো গাইতো না
সেই গান পুরনোদের টানে
তখনি এক দামাল ছেলে
সেই গানকেই নিলো তুলে
তাঁর মনে প্রানে।
শুনলো সেইদিন বাংলার মানুষ
এক আগুন ঝরা গান
উঠলো জেগে ঘরে ঘরে
সব বাংলার নওজোয়ান।
সেদিন থেকে সেই ছেলেকে
সবাই ‘গুরু’বলে ডাকে
আবাল-বৃদ্ধ-বনিতা সব
দেখলো অবাক চোখে
সবাইকে শুধু দিয়েই গেলো
একজীবনে না কিছুই পেলো!
নিঃস্ব হয়েও গেয়ে যেত
প্রতিদিন জীবনের জয়গান
পেলোনা তো কোনদিনও
তাঁর প্রাপ্য সম্মান।
সেই ছেলেটাই আজকে নিলো
পৃথিবী থেকে ছুটি
তাঁর কথা মনে করে
অশ্রু ভরা আমার নয়ন দুটি।
সারাজীবন বয়েই গেলো
এক নিরব অভিমান,
তিনি মোদের আর কেউ নয়
একজনই গুরু ‘আযম খান’।

১৯৫০ সালের ২৮ শে ফেব্রুয়ারী তারিখে জন্ম নেন বাংলার এই পপসম্রাট গুরু আজম খান যার পুরো নাম ছিল মাহবুবুল হক খান আজম। যিনি পরবর্তীতে আজম খান হিসেবেই সবার কাছে পরিচিত ও প্রিয় হয়ে উঠেন। যার বড় ভাই এই দেশের আরেক জীবন্ত কিংবদন্তী সুরকার আলম খান।

১৯৭১ সালে মাত্র ২০ পার করে ২১ বয়সের তরুণ আজম খান দেশকে স্বাধীন করতে ঘর থেকে বের হয়ে মুক্তিযুদ্ধে চলে যান। ভারতে প্রশিক্ষন নিয়ে ২ নং সেক্টরের সেক্টর কমান্ডার বিগ্রেডিয়ার খালেদ মোশাররফ এর নেতৃত্বে সাহসিকতার সাথে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। যেখানে তাঁর হাতের বন্দুক বেজেছিল গীটারের মতো এরপর যার জীবনের শেষদিন পর্যন্ত তাঁর জীবন যুদ্ধে গীটার বেজেছিল বন্দুকের মতো।

এরপর ৯ মাস মুক্তিযুদ্ধের পর বিজয়ীর বেশে ঘরে ফিরে আসেন। স্বাধীন দেশে ফিরেই নানা প্রতিকুলতা ও অস্থিরতার মাঝে পড়লেন। চোখের সামনে অনেক যুবকরাই তখন অনেক অপরাধে লিপ্ত হয়ে রাতারাতি ধনী হওয়ার চেষ্টা করতে লাগলো। তখনই আজম খান আরও একটি যুদ্ধ শুরু করলেন। তিনি ঐ ক্ষয়ে যাওয়া যুবকদের বিপরীত পথে হাঁটতে লাগলেন। শুরু করলেন গান দিয়ে নতুন এক জাগরণের যুদ্ধ। সাথে নিলেন বন্ধু ফিরোজ সাই, ফকির আলমগীর, ফেরদৌস ওয়াহিদ, পিলু মমতাজ ও নাজমা জামানকে। শুরু করলেন এমন একটি ধারার গান যা আগে এই বাংলার সাধারন মানুষ পরিচিত ছিল না। শুধু উচ্চ শ্রেণীর মানুষেরা সেই ধারার বিদেশী শিল্পীদের গান শুনতো ও জানতো। সেই পপ ও আধুনিক বাদ্যযন্ত্র নিয়ে গুটিকয়েক মানুষের পরিবেশনা করা ‘ব্যান্ড’ ধারার গান শুরু করলেন তরুন আজম খান। বাংলার মানুষ তখন বুঝতে পারলো আমাদের ছেলেরাও পারে বিদেশীদের মতো ‘ব্যান্ড’ ধারার গান গাইতে। সেই শুরুর সময়ে আজম খান ও তাঁর দল ‘উচ্চারণ’ ব্যান্ড ঢাকায় গান দিয়ে মাতানো শুরু করলেন।

তখনও সাধারন মানুষের মাঝে আজকের মতো ব্যান্ড গানের এতো কদর ও চাহিদা ছিল না। বহু মঞ্চে নিমন্ত্রন পেয়ে গিয়েছেন গান গাওয়ার জন্য কিন্তু পরবিবেশনা করার সুযোগ পেলো অনুষ্ঠানের শেষে তাও ১/২ টি গান। অনেক সময় প্রাপ্য টাকাও দেয়নি আয়োজকরা। তবু গুরু ও তাঁর দল হাসি মুখে চলে এসেছিল কোন অভিযোগ না করে রাস্তা দিয়ে দলবেঁধে গান গাইতে গাইতে। গান শোনাতে পেরেছেন এতেই আনন্দিত সবাই, অর্থের আর কি দরকার? এই ছিল গুরু আজম খানের সহজ সরল মনোভাব। এমনও দিন গিয়েছে যে গান পরিবেশনা করে যা পেয়েছেন বাড়ী ফেরার পথে গরীব অনাহারে কাউকে রাস্তায় পেয়েছেন তাঁর সেই ক্ষুধা মেটানোর জন্য হাসিমুখে পকেটের সব টাকা দিয়ে শুন্য পকেটে ঘরে ফিরেছেন। এই হলো সহজ সরল ব্যক্তি আজম খান, যার মাঝে উপরে উঠার জন্য কোন অসৎ ইচ্ছা বা পন্থা কোনটাই ছিল না। মানুষের মুখের হাসি দেখলে নিজের দুঃখটা সহজে ভুলে যেতেন। ছিলনা কোন অর্থের লোভ। তাঁর সেই সংগ্রামের দিনগুলোর কথা ও দিনবদলের নবজাগরণের কথা নিয়ে এই দশকে বাংলাদের মোবাইল অপারেটর কোম্পানি ‘বাংলালিংক’ তাঁদের একটি বিজ্ঞাপন তৈরি করেছিল যা আজকের বর্তমান প্রজন্মের কাছে গুরুর সেই সংগ্রামী দিনগুলোর অতি সামান্য এক দলিলও বলা যায়, যেখানে গুরুর জীবনে ঘটে যাওয়া অনেকগুলো ঘটনার একটি চিত্র মাত্র যা আজকের বর্তমান প্রজন্মের কাছে অজানা ছিল।

১৯৭২ সালে বাংলাদেশ টেলিভিশনে প্রথম গুরু আযম খান ও তাঁর ব্যান্ড উচ্চারনের গান প্রচার করে। যার মধ্য ছিল – আসি আসি বলে তুমি – আযম খান (১৯৭২), আলাল ও দুলাল -আজম খান (১৯৭২), কাঙ্গাল হইলে ভবে – আজম খান (১৯৭২)সহ আরও বেশকিছু জনপ্রিয় গান। সেদিন প্রথম সারা বাংলাদেশ জানলো যে আজম খান নামক এক লম্বা চুল ও দাঁড়িওয়ালা তরুণ বাংলাদেশের সঙ্গীতের নতুন এক ধারার গানের জনক। সেই থেকে ‘গুরু’ শব্দটি তাঁর নামের পাশে স্থান করে নিলো যা ছিল ভক্তদেরই দেয়া নাম। সেই ভালোবাসা পেয়ে গুরু আজম খান হয়ে গেলেন অপ্রতিরোধ্য, দুর্দান্ত এক ভক্ত পাগল শিল্পী। যিনি ভক্তদের ভালোবাসার বিনিময়ে নিজেকে গানের মাঝে উজার করে দিলেন। অর্থের দিকে তাকালেন না। তাঁর কাছে অর্থের চেয়ে ভক্তদের ভালবাসাই বড় হয়ে রইলো সারা জীবন। যিনি ভক্তদের ডাকে বিনে পয়সায়ও বহু জায়গায় গান গেয়েছিলেন। তাঁর এই সরলতার সুযোগে অনেকে তাকে ঠকিয়েছিল কিন্তু কোনদিন কারো নামে অভিযোগ করেননি। এমনও গেছে ক্যাসেট বের হয়ে হিট হয়েছে কিন্তু গুরু আজম খান সেই লাভের অংশ পায়নি। আবার কোন কোন দিন ক্যাসেটের বের হওয়ার পর বাকী অর্ধেক টাকাও পায়নি। তবু কোনদিন কেউ গানের জন্য গুরুর কাছে গেলে তাকে নিরাশ করে ফিরিয়ে দেননি। এভাবেই কেটে গেলো সঙ্গীতের জীবন।

এই শতকের শুরুর দিকে অর্থের প্রয়োজনে বাংলা ছায়াছবি ‘গডফাদার’ এ ভিলেন/ খলচরিত্রে অভিনয় করেন। জীবনের শেষ বছরগুলোতে গানের চাহিদা কমে যাওয়ায় ঘরমুখো হয়ে গেলেন। কখনও পাড়ার তরুণদের সাথে ক্রিকেট খেলতেন, কখনও সাঁতার কেটে পুকুরে/ সুইমিংপুলে দাপিয়ে বেড়াতেন যা ছিল তাঁর নিরহংকার , সহজ ,সরল মনেরই বহিঃপ্রকাশ। অথচ তাঁর চেয়ে অনেক অনেক জুনিয়র শিল্পী, এই প্রজন্মের শিল্পীরা আজ টাকার উপরে ঘুমায়, ভক্তদের দেখলে সুপারস্টার ভাব নিয়ে চলে, ভক্তরা যাদের ধারেকাছে যেতে পারেনা এরাই আজকের সঙ্গীতের বাহক ও ধারক হয়ে আছে যা গুরু জীবিত অবস্থায় দেখে গেছেন। সেই জন্য গান থেকে দূরে সরে ছিলেন। কখনও কখনও কেউ মনে করে গানের আমন্ত্রন জানাতে গেলে তাঁদের সেই আবেদনে অতি অল্প টাকায় গান পরিবেশনা করে এসেছেন। জীবনে যিনি শুধু নিঃস্বার্থ ভাবে দিয়ে গেছেন বিনিময়ে নিজের জীবনের শেষ রোগ ‘লিভার ক্যানসার’এর চিকিৎসার পুরো টাকাটাও সংগ্রহ করতে পারেননি। তাকে ভালোবেসে তাঁর প্রিয় কাছের শিল্পীরা, ছোট ভাইয়েরা বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে ঘুরে টাকা যোগাড় করেছেন যাদের মধ্য ছিল জীবন্ত কিংবদন্তী আইয়ুব বাচ্চু, ফকির আলমগীর, কবির বকুল, কুমার বিশ্বজিৎ, পার্থ বড়ুয়া,প্রিন্স মাহমুদ, মনি জামান সহ তাঁর কাছের ও স্নেহের শিল্পীরা। যারা অত্তান্ত পরিশ্রম করে বিভিন্ন মাধ্যম থেকে বিদেশে প্রথম পর্যায়ের চিকিৎসার জন্য ১৫ লাখ টাকার মতো যোগাড় করে দিয়েছিলেন। সেই চিকিৎসা শেষে সম্পূর্ণ চিকিৎসা শেষ না করেই একটু সুস্থ হয়ে দেশে ফিরে আসেন। দেশে ফিরে এসে বাংলাদেশ টেলিভিশন এর জনপ্রিয় ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান ‘ইত্যাদি’তে সর্বশেষ নতুন গান ” আমি বাংলাদেশের আজম খান ” পরিবেশনা করেন যার কথা,সুর ও সঙ্গীত ছিল সিম্ফনি ব্যান্ড এর মনি জামান এর । এরপর গুরু আবার ধীরে ধীরে অসুস্থ হয়ে পড়েন। যার জুন এর ২০.২০১১ তারিখের দিকে আবারো দেশের বাহিরে ২য় পর্যায়ের চিকিৎসা করানোর জন্য যাওয়ার কথাছিল। অথচ তখনও বিদেশে চিকিৎসার জন্য ১৫ লাখ টাকা যোগাড় হয়নি। কাছের মানুষগুলো হন্য হয়ে বিভিন্ন জনের কাছে টাকা যোগাড় করতে ধরনা দিয়ে যাচ্ছিল আর অন্যদিকে অসুস্থ গুরু আজম খান হাসপাতালে শুয়ে চোখ বন্ধ করে চুপচাপ পড়ে ছিলেন। কাছের মানুষগুলোর দিক্বিদিক ছুটোছুটি করতে দেখে গুরু কিছু বলতে পারছিলেন না, বলার সেই শক্তি তাঁর ছিলনা। তাই তো সবার ছুটোছুটি বন্ধ করতে আর অকৃতজ্ঞ বাংলার মানুষের কাছে পরাজিত না হয়ে চুপচাপ অভিমানে বিদায় নিলেন ৫ই জুন ২০১১ তে। শেষ হয়ে গেলো বাংলার এক সংগ্রামী শিল্পীর জীবন। যিনি সারাটা জীবন বাংলার মানুষকে সর্বোপরি বাংলার সঙ্গীত এর ভাণ্ডারে দু হাতে দান করে ভাণ্ডারকে পূর্ণ করে গেছেন। যার বিনিময়ে শুধুমাত্র কবরে শায়িত হবার আগে সরকার তথা বাংলাদেশের কাছ থেকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদা নামক ‘সেনা বাহিনীর’ বন্দুক উপরে তুলে তিনটা ফাঁকা আওয়াজ এর তোপধ্বনি , বন্দুক কাঁধের নিচে নামিয়ে জাতীয় পতাকায় মোড়ানো পুষ্প সজ্জিত কফিনের সামনে জাতীয় সঙ্গীতের সুরের ধ্বনি শুনে কবরে চিরনিদ্রায় শায়িত হলেন। এইটুকু দিয়েই আমরা পুরো জাতি আজম খানের ঋণ পরিশোধ করে দিলাম। বড় চমৎকার এক জাতি আমরা!

গুরু তোমার এই অকৃতজ্ঞ বাংলার মানুষদের তুমি ক্ষমা করে দিও। জীবনে যেমন করে সব হাসি মুখে মেনে নিয়েছিলে। নাহলে যে তোমার আত্মার কষ্টে বাংলার গানে কালো ছায়া পড়বে যা ধীরে ধীরে সবাইকে গ্রাস করে ফেলবে যা তুমি কোনদিন চাওনি। তোমাকে কষ্ট দেয়ার কারনে আজ বাংলার গান এর এক দুঃসময় চলছে। যা দেখলে তুমি কষ্ট পেতে। প্লিজ গুরু তুমি আমাদের অক্ষমতা ও ভুলগুলো ক্ষমা করে দাও.ক্ষমা করে দাও..ক্ষমা করে দাও ।

গুরু আজম খানের কণ্ঠের আমার প্রিয় কিছু গানের লিংক
বাংলাদেশ – https://app.box.com/s/h40skbtsk13zc1tgvle3
কাঙাল হইলে ভবে – https://app.box.com/s/5pgfk3z03ys6i5s2f9q4
হাইকোর্টের মাজারে – https://app.box.com/s/9r0cfvi7oehrfjo9hnf9
এতোকাছে এলে যখন – https://app.box.com/s/nhs7kn85pzmaja3ksp7l
দুঃখ আমার হলো আপন – https://app.box.com/s/mdfe2jf092a3moeqo5et
যতদূর যত পথ – https://app.box.com/s/ivb4a10axdky5ab6ed92
একটাই দুঃখ আমার – https://app.box.com/s/614b74c8c34a85204494
পাপড়ি কাঁদে এখন – https://app.box.com/s/62f93f57113aaa3966be

শিরোনাম ডট কম
শিরোনাম ডট কম । অনলাইন নিউজ পোর্টাল Shironaam Dot Com । An Online News Portal
http://www.shironaam.com/

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *