নূর হোসেনকে জেলহাজতে পাঠানোর নির্দেশ

নূর হোসেনকে জেলহাজতে পাঠানোর নির্দেশ

নূর হোসেনকে জেলহাজতে পাঠানোর নির্দেশ

নারায়ণগঞ্জের আলোচিত সাত খুন মামলার প্রধান আসামি নূর হোসেনকে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছে আদালত।

শুক্রবার নারায়ণগঞ্জের আদালতে হাজির করা হলে চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট শহীদুল ইসলাম এ আদেশ দেন।

এর আগে দুপুর আড়াইটায় নারায়ণগঞ্জ চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট সহিদুল ইসলামের আদালতে নূর হোসেনকে হাজির করানো হয়। এর মধ্যে বণ্যপ্রাণী সংরক্ষণ আইনের মামলায় দণ্ডপ্রাপ্ত নূর হোসেনকে ১১টি মামলায় শ্যোন অ্যারেস্ট দেখানো হয়। শুনানী শেষে বিচারক নূর হোসেনকে জেলহাজাতে পাঠানোর নির্দেশ দেন। পরে কঠোর প্রহরায় তাকে নারায়ণগঞ্জ কারাগারে নিয়ে যায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।

ওই সময় নূর হোসেনের পরনে ছিল খাকি রঙয়ের প্যান্ট ও সাদা-কালো স্ট্রাইপের গেঞ্জি। বাম হাতে ছিল নীল রঙয়ের একটি ঘড়ি।

এদিকে নূর হোসেনকে জেলহাজতে পাঠানোর নির্দেশে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন নিহত কাউন্সিলর নজরুল ইসলামের স্ত্রী সেলিনা ইসলাম বিউটি।

তিনি বলেন, ‘আমাদের দাবি ছিল নূর হোসেনকে আবারও নতুন করে জিজ্ঞাসাবাদ করে চার্জশিট দেয়া হউক। তাহলে অনেক কিছু পরিস্কার হয়ে যাবে। কিন্তু নূরের চেহারা দেখে আমাদের কিছু ভয় কাজ করছে। কারণ নূরকে আদালতে নেয়া-আনার সময়ও হাসতে দেখা গেছে।’

শুক্রবার সকাল সাড়ে ১০টায় নারায়ণগঞ্জ আদালতপাড়ায় সাংবাদিকদের পুলিশ সুপার বলেন, ‘নূর হোসেনের বিরুদ্ধে ১৩টি মামলা পেন্ডিং রয়েছে। যার মধ্যে ১১টি মামলা সিদ্ধিরগঞ্জ থানায় ও ২টি ফতুল্লা মডেল থানায়। এ ছাড়া ১৩টি মধ্যে ১০টি জিআর মামলা, ২টি সিআর মামলা ও একটি কনভিকশন হয়েছে। ওই ১৩টি মামলাতেই নূর হোসেনের বিরুদ্ধে আদালতে গ্রেফতারি পরোয়ানা রয়েছে এবং ওই ১৩টি মামলাতেই নূর হোসেনকে গ্রেফতার দেখিয়ে আজ আদালতে হাজির করা হয়।’

পুলিশ সুপার আরো বলেন, ‘আলোচিত সাত খুনের দুটি মামলাতেই গ্রেফতারকৃত ২১ আসামিই আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। ১৪ জন সাক্ষী স্বীকারোক্তি দিয়েছেন। সাত খুনের মামলার তদন্ত প্রতিবেদনটি একটি ওয়েল কমপাইলড তদন্ত প্রতিবেদন। এর মধ্যে একজন বাদী সন্তোষ প্রকাশ করেছেন। তার দায়েরকৃত মামলাটি বর্তমানে বিচারিক আদালতে রয়েছে।’

এসব মামলার সবগুলোতেই অভিযোগপত্র হওয়ায় তাকে রিমান্ডে নেওয়ার সুযোগ ছিল না। নূর হোসেনের জামিনের জন্যও কোনো আবেদন করেননি কোনো আইনজীবী।

জুমার নামাজের পর বেলা ২টা ৩৩ মিনিটে তাকে আদালতে হাজির করা হয়। নারায়ণগঞ্জ পুলিশ লাইন থেকে তাকে সরাসরি আদালতে নিয়ে আসা হয়।

সিদ্ধিরগঞ্জ থানা আওয়ামী লীগের সাবেক সহ সভাপতি নূর হোসেনকে যখন মাসদাইর পুলিশ লাইন থেকে কড়া নিরাপত্তার মধ্যে আদালতে নিয়ে আসা হয়, সে সময় তার ফাঁসির দাবিতে বাইরে বিক্ষোভ করছিলেন নিহতদের স্বজনসহ কয়েক হাজার মানুষ।

সকাল ৭টা ২০ মিনিটে রাজধানীর উত্তরার র‌্যাব-১ কার্যালয় থেকে তাকে নারায়ণগঞ্জ পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়। এর এক ঘণ্টা পর সকাল সোয়া ৮টায় নূর হোসেনকে নিয়ে গাড়িবহরটি নারায়ণগঞ্জ পুলিশ লাইনে পৌঁছায়। দুপুরে পুলিশ লাইন থেকে তাকে আদালতে নেওয়া হয়।

এর আগে বৃহস্পতিবার রাত ১১টা ৩৩ মিনিটে যশোরের বেনাপোল সীমান্তে বাংলাদেশের আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে নূর হোসেনকে হস্তান্তর করে ভারত।

পরে সেখান থেকে র‌্যাব হেফাজতে তাকে শুক্রবার সকাল পৌনে ৭টার দিকে নিয়ে আসা হয় ঢাকার উত্তরায় র‌্যাব সদরদফতরে। সেখানে সাত খুনের মামলার তদন্ত কর্মকর্তার কাছে নূর হোসেনকে হস্তান্তর করে র‌্যাব।

গত বছরের ২৭ এপ্রিল নারায়ণগঞ্জে প্যানেল মেয়র নজরুল ইসলাম, আইনজীবী চন্দন কুমার সরকারসহ সাতজনকে অপহরণ করা হয়। তিন দিন পর শীতলক্ষ্যা নদীতে ছয়জনের এবং পরদিন আরেকজনের লাশ পাওয়া যায়। চাঞ্চল্যকর এই ঘটনার পরপরই ভারতে পালিয়ে যান প্রধান আসামি নূর হোসেন। চলতি বছরের ৮ এপ্রিল সাত খুনের মামলায় র‌্যাব-১১-এর তৎকালীন অধিনায়ক লে. কর্নেল তারেক সাঈদ, মেজর আরিফ ও লে. কমান্ডার এমএম রানা, নূর হোসেনসহ ৩৫ জনকে আসামি করে চার্জশিট দেয় নারায়ণগঞ্জ জেলা পুলিশ।

চার্জশিটভুক্ত আসামিদের মধ্যে নূর হোসেনসহ ১৩ জনকে পলাতক দেখানো হয়। ২০১৪ সালের ১৪ জুন কলকাতা বিমানবন্দর সংলগ্ন কৈখালী এলাকা থেকে নূর হোসেন তার দুই সহযোগী সেলিম, সুমনসহ গ্রেফতার হন।

২০১৪ সালের ২৭ এপ্রিল নারায়ণগঞ্জ-ঢাকা লিংক রোড থেকে নাসিক কাউন্সিলর নজরুল ইসলাম, আইনজীবী চন্দন সরকারসহ সাতজনকে অপহরণ করে র‌্যাব-১১ এর একটি দল। এর তিন দিন পর ৩০ এপ্রিল ৬ জন ও ১ মে একজনের লাশ শীতলক্ষ্যা নদী থেকে উদ্ধার করে পুলিশ।

শামীম ওসমান বলেছিলেন, ‘তুমি অপরাধ করো নাই’

নারায়ণগঞ্জে অপহৃত সাতজনের লাশ উদ্ধারের আগের দিন ২৯ এপ্রিল রাত সাড়ে ৯টার দিকে এয়ারটেল নম্বর থেকে শামীম ওসমানের গ্রামীণফোনের নম্বরে ফোন করেন নূর হোসেন। গত বছর ২৩ মে প্রকাশিত সেই মোবাইল ফোনের কথোপকথন থেকে ধারণা করা হয়, নূর হোসেনকে ভারতে যাওয়ার ব্যাপারে সাহায্য করেছেন নারায়ণগঞ্জের সংসদ সদস্য শামীম ওসমান।

নূর হোসেন ও শামীম ওসমানের কথোপকথনের বিস্তারিত তুলে ধরা হল
শামীম : হ্যালো।
নূর হোসেন : ভাই, স্লামালাইকুম ভাই।
শামীম : কে?
নূর হোসেন : ভাই ভাই ভাই, আমার বহুত প্রবলেম ভাই। ভাই আমি লেখাপড়া করি নাই, আমার অনেক ভুল আছে ভাই। ভাই, আমি লেখাপড়া করি নাই, আমার অনেক ভুল আছে ভাই। আপনে আমার বাপ লাগেন ভাই। আপনেরে আমি অনেক ভালোবাসি ভাই।
শামীম : খবরটা পৌঁছে দিলাম না, পাইছিলা?
নূর হোসেন : হ, আপনেরে আমি অনেক ভালোবাসি ভাই। আমার পোলাডা ছোট, মইরা যাইব ভাই। আমার কান্দে বন্দুক ভাই।
শামীম : সময় দাও একটু…
নূর হোসেন : ভাই, আপনি আমার বাপ লাগেন ভাই। ভাই, জীবনটা আপনেরে আমি দিয়া দিমু ভাই। আপনারে আমি অনেক ভালোবাসি ভাই।
শামীম : আরে তুমি এত চিন্তা করো না, সময় দাও।
নূর হোসেন : ভাই, আমি লেহাপড়া করি নাই, আমার অনেক ভুল আছে ভাই। আমারে মাফ করেন ভাই।
শামীম : তুমি এত চিন্তা করো না, সময় দাও। আর তুমি একটু গৌরদা’র লগে দেখা করে আসো না…
নূর হোসেন : ভাই, আমারে দিল্লি যাওয়ার ব্যবস্থা করে দেবেন?
শামীম : এখনো কোনো সমস্যা হবে না। কোনো জায়গার ইয়া নাই? সিল নাই?
নূর হোসেন : না না, আছে আছে ই আছে। সিল আছে, কিন্তু যামু ক্যামনে সব জায়গায় বলে অ্যালার্ট?
শামীম : না, কিচ্ছু নেই। হ্যাঁ? মনে হয় না।
নূর হোসেন : ভাই, তাইলে একটু খবর নেন না, আমি কালকে ফোন দিই।
শামীম : আগাইতে থাকো।
নূর হোসেন : ভাই, আমি লেখাপড়া করি নাই। ভাই, আমার অনেক ভুল আছে।
শামীম : তুমি যদি ওই জায়গাটাতে যাও…
নূর হোসেন : ভাই, আমি বাসে…মাইক্রোবাসে উঠব।
শামীম : কিচ্ছু হবে না, চিন্তা করো না, তুমি অপরাধ করো নাই…
নূর হোসেন : ভাই…
শামীম : তুমি চিন্তা করো না।
নূর হোসেন : আমার জীবনের কোনো গতি হইব না ভাই? আমার মনে অনেক জোর ভাই।
শামীম : আমি জানি, আমি জানি। ঘটনাটা অন্য ঘটাইয়া এক ঢিলে দুই পাখি মারছে।
নূর হোসেন : ভাই, আমার অনেক ভুল আছে, আপনে আমারে মাফ করেন ভাই।
শামীম : ঠিক আছে, তুমি ইয়ে করো। ও ও ও…আমার একটা ফোন নম্বর দিমু যোগাযোগ করুম, ঠিক আছে? এই নম্বরটা নতুন?
নূর হোসেন : জি ভাই।
শামীম : আচ্ছা। রাখলাম।
নূর হোসেন : জি ভাই, স্লামাইকুম ভাই।
এই ফোনালাপের আধা ঘণ্টা পর থেকে বন্ধ পাওয়া যায় নূর হোসেনের ফোন নম্বরটি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *