নিয়ন্ত্রিত গণমাধ্যম বনাম সাংবাদিকদের ভূমিকা

তবে রাশিয়ার চেয়ে বাংলাদেশের গণমাধ্যমের চিত্রটা ভিন্ন এইজন্য যে, বাংলাদেশের গণমাধ্যমের ৮০ শতাংশ সংবাদকর্মীই আওয়ামী ঘারানার।

তবে রাশিয়ার চেয়ে বাংলাদেশের গণমাধ্যমের চিত্রটা ভিন্ন এইজন্য যে, বাংলাদেশের গণমাধ্যমের ৮০ শতাংশ সংবাদকর্মীই আওয়ামী ঘারানার।ইমরান আনসারী

স্বাধীনতা শব্দটির সাথে একনায়কতন্ত্র কিংবা কর্তৃত্ববাদী শাসনের সম্পর্ক সম্পূর্ণ বিপরীতমূখী। এ বিষয়টি মূর্ত হয়ে উঠে রাশিয়া, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, ভেনেজুয়েলা, মিশর এবং অতিসম্প্রতি বাংলাদেশের গণমাধ্যমের সাথে সরকারের আচরণাবলী বিশ্লেষণের মাধ্যমে।

রাষ্ট্রবিজ্ঞানে কর্তৃত্ববাদী রাষ্ট্রের সংজ্ঞায় বলা হয়েছে, একজন যদি সীমাহীন ক্ষমতা নিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনা করেন সেই রাষ্ট্রই কর্তৃত্ববাদী রাষ্ট্র।

সেই হিসেবে উল্লেখিত রাষ্ট্রসমূহে কর্তৃত্ববাদী চেহারা স্পষ্ট তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।

এখন আসা যাক মূল আলোচনায়। গণমাধ্যমের স্বাধীনতার সাথে উৎপ্রোতভাবে সম্পর্ক রয়েছে গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থার। একনায়কতন্ত্র, স্বৈরতন্ত্র কিংবা ফ্যাসিবাদ যাই বলি না কেন গণমাধ্যমের স্বাধীনতার সাথে এর কোনো সম্পর্ক নেই এবং সম্পর্ক থাকতেও পারে না। কিন্তু আসার কথা হচ্ছে সাম্প্রতিক সময়ে টেকনোলোজির বিকাশের কারণে একনায়কতান্ত্রিক কিংবা কর্তৃত্ববাদী রাষ্ট্রে দেশপ্রেমিক গণমাধ্যম কর্মীরদের পাশাপাশি স্বাধীনতাকামী মানুষ বর্তমান সরকারের রক্ত চক্ষুকে উপেক্ষা করে কাজ করে যাচ্ছে। কিন্তু কিভাবে?

তবে রাশিয়ার চেয়ে বাংলাদেশের গণমাধ্যমের চিত্রটা ভিন্ন এইজন্য যে, বাংলাদেশের গণমাধ্যমের ৮০ শতাংশ সংবাদকর্মীই আওয়ামী ঘারানার। সুতরাং গণমাধ্যমকে নিয়ন্ত্রণে আনতে সরকারের চেয়ে সাংবাদিকদের উদ্যোগই বেশি পরিলক্ষিত হয়। কয়েকটি টেলিভিশনের প্রতিবেদন সম্প্রচারের ধরন ও টকশো’তে প্রেজেন্টারদের দলদাসসুলভ আচরণ তারই প্রকৃষ্ট উদাহরণ।

এ বিষয়ে প্রখ্যাত সাংবাদিক ও গবেষক মাইকেল হেম (২০১৪)এর সম্প্রতি প্রকাশিত ‘ইভাডিং দ্যা সেন্সরস: ক্রিটিক্যাল জার্নালিজম ইন দ্যা অথরটারিয়ান স্টেটস’ শীর্ষক গবেষণা পত্রটির কিছু দিক উল্লেখ করা যেতে পারে। গবেষণার শিরোনামটির সারমর্ম হচ্ছে- কর্তৃত্ববাদী রাষ্ট্রে সংকটাপূর্ণ সাংবাদিকতা বনাম সেন্সরশিপ এড়িয়ে যাওয়া। গবেষণাটি অঙফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট ফর দ্যা স্টাডি অব জার্নালিজমের অধীনে সম্পাদন করা হয়।

এতে গণমাধ্যম বিশেষজ্ঞ মাইকেল হেম অত্যন্ত যুক্তিপূর্ণ প্রমাণাধির মাধ্যমে দেখান যে, কর্তৃত্ববাদী রাষ্ট্রে সরকার গণমাধ্যমকে কমবেশি ৫টি পদ্ধতিতে নিয়ন্ত্রণ করে থাকে।
প্রথমত. আইনের মাধ্যমে,
দ্বিতীয়ত. লাইসেন্সের মাধ্যমে,
তৃতীয়ত. সরকারের সরাসরি হস্তক্ষেপের মাধ্যমে,
চতুর্থত. অর্থের যোগান ও ইকোয়িপমেন্ট আমদানি নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে,
পঞ্চমত. সাইবার স্পেইস নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে।

উপরের পাঁচটি পদ্ধতির বাইরে বাংলাদেশে আরো চারটি পদ্ধতির ব্যবহার আমরা দেখতে পাই। প্রথমত. হত্যা, নির্যাতন, হুমকির মাধ্যমে,
দ্বিতীয়ত. সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অজুহাতে মামলা দিয়ে জেলে ঢুকানোর মাধ্যমে, তৃতীয়ত. চূড়ান্তভাবে গণমাধ্যম বন্ধের মাধ্যমে এবং
চতুর্থত. সাংবাদিকদের চাকরিচ্যুতির মাধ্যমে।

রাশিয়া, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, ভেনেজুয়েলা এবং বাংলাদেশের ঘটনাবলীর দিকে তাকালে আমরা এর সত্যতা নিরুপন করতে সচেষ্ট হব। বাংলাদেশের ঘটনাপ্রবাহের দিকে তাকালে মনে হবে অনেকটা পরিকল্পিতভাবেই বর্তমান সরকার গণমাধ্যমকে নিয়ন্ত্রণে সার্বিক ব্যবস্থাগ্রহণ করেছে। কারণ, লক্ষ্য করলেই দেখা যাবে বাংলাদেশে আইনের মারপ্যাচে বন্ধ করা হয়েছে চ্যানেল ওয়ান, দিগন্ত টেলিভিশন, ইসলামিক টেলিভিশন ও জনপ্রিয় দৈনিক আমার দেশ। এছাড়া গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রণে জাতীয় সম্প্রচার নীতিমালা প্রণয়ন করা হয়েছে, করা হয়েছে অনলাইন নীতিমালা। এছাড়াও বিশেষ ক্ষমতা আইনতো রয়েছেই। রাশিয়াতে সেই সিজার্স-এর শাসন আমল থেকে মিডিয়া সেন্সরশিপ চলে আসছে। সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর কিছুটা সেন্সরশিপে শৈথল্য পরিলক্ষিত হয় দেশটিতে। কিন্তু প্রায় ১ যুগ ধরে ভ্লাদিমির পুতিন আইনের মারপ্যাচে গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রণ করে যাচ্ছেন। ভ্লাদিমির পুতিন ক্ষমতায় এসেই যে কাজটি প্রথমেই করেন সেটি হচ্ছে- তিনটি বড় গণমাধ্যমের প্রতিষ্ঠানকে সরকারি প্রতিষ্ঠানে পরিণত করা। দ্বিতীয়ত. গণমাধ্যমের লাইসেন্স নিজের ঘনিষ্ট সহযোগী জোটের সদস্যদেরকে প্রদানের মাধ্যমে গণমাধ্যমকে নিয়ন্ত্রনের ব্যবস্থা করা।

এক্ষেত্রে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভ্লাদিমির পুতিনের চেয়ে অনেকটা সিদ্ধ হস্ত। তিনি বিরোধী মতের মালিকদের টেলিভিশনগুলোকে নিজেদের দখলে না নিয়ে সরাসরি বন্ধ করে দিয়েছেন। আর পাশাপাশি ভ্লাদিমির পুতিনের আদলে প্রায় ৩০ এর অধিক টেলিভিশন চ্যানেল ও ২০ এর অধিক কমিউনিটি রেডিওর অনুমোদন দিয়েছেন। আর এর প্রত্যেকটি দিয়েছেন আওয়ামী লীগের নির্বাচিত কোনো সংসদ সদস্যকে বা তাদের নিকটাত্মীয়দের কিংবা আওয়ামী ঘারানার সাংবাদিকদের। তবে রাশিয়ার চেয়ে বাংলাদেশের গণমাধ্যমের চিত্রটা ভিন্ন এইজন্য যে, বাংলাদেশের গণমাধ্যমের ৮০ শতাংশ সংবাদকর্মীই আওয়ামী ঘারানার। সুতরাং গণমাধ্যমকে নিয়ন্ত্রণে আনতে সরকারের চেয়ে সাংবাদিকদের উদ্যোগই বেশি পরিলক্ষিত হয়। কয়েকটি টেলিভিশনের প্রতিবেদন সম্প্রচারের ধরন ও টকশো’তে প্রেজেন্টারদের দলদাসসুলভ আচরণ তারই প্রকৃষ্ট উদাহরণ।

এছাড়া সাম্প্রতিক সময়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উপদেষ্টা সাংবাদিক নেতা ইকবাল সোবহান চৌধুরীর নেতৃত্বে দুই দফা প্রেসক্লাবে হামলা এবং সরকারের ঊর্ধতন মন্ত্রীদের সাথে বৈঠকে একাত্তর, বৈশাখী ও মাছরাঙা টেলিভিশনের ঊর্ধতন কর্তাদের দেয়া কমিটমেন্ট সাংবাদিকদের স্বপ্রণোদিত দায়িত্বের বহিঃপ্রকাশ ছাড়া আর কি বলা যাবে। এই তিনটি গণমাধ্যমের কর্তাব্যাক্তিরা গণতান্ত্রিক আন্দোলনের বিরুদ্ধে সরাসরি অবস্থান নিয়ে সরকারের পক্ষাবলম্বন করার যে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিয়েছেন, তা পৃথিবীর ইতিহাসে নজিরবিহীন ঘটনা। তবে একটা জিনিষ ভাল হয়েছে সরকারের প্রতি আনুগত্য প্রকাশে তারা কোনো ধরনের রাগ ঢাক করেননি।

মালয়েশিয়ার ক্ষেত্রেও প্রায় কাছাকাছি চিত্র দেখা গেছে। দেশটি স্বাধীন হওয়ার পর থেকেই বারিসান ন্যাশনাল পার্টি মালয়েশিয়াকে শাসন করে যাচ্ছে। গণমাধ্যমের স্বাধীনতা সংবিধানে স্বীকৃত হলেও বড় বড় মিডিয়া হাউজগুলো সরকারের মালিকানাধীন কিংবা সরকারের সাথে সংশ্লিষ্ট কোনো ব্যাক্তির মালিকানাধীন। এছাড়া সম্প্রচার মাধ্যম নিয়ন্ত্রণে রয়েছে কঠোরতা। এমনকি বিদেশি সংবাদমাধ্যমকে সরকার যেকোনো সময় ব্লাক আউট করে দিতে পারে। ২০১১ সালের এপ্রিলে কুয়ালালামপুরে বড় ধরনের বিক্ষোভ শুরু হলে সরকার মালয়েশিয়ায় আল জাজিরা ও বিবিসির সম্প্রচার কার্যক্রম বন্ধ করে দেয়। আর সিঙ্গাপুরে প্রাইভেট সেক্টরে মিডিয়া চালানোর কোনো বৈধতাই নেই। এছাড়া কঠিন সেন্সরশিপ তো রয়েছেই।

ভেনেজুয়েলার ক্ষেত্রে দেখা যায়, দেশের ৭০ শতাংশ মিডিয়া ব্যাক্তিমালিকানাধীন মাত্র ৩০ শতাংশ সরকারি মালিকানাধীন। হুগো স্যাভেজ ক্ষমতায় আসার পর ব্যাক্তিমালিকানাধীন গণমাধ্যমগুলো তার সমাজতান্ত্রিক চিন্তা-চেতনার তীব্র সমালোচনা শুরু করে। এরপর থেকে হুগো সেভেজ ধীরে ধীরে গণমাধ্যমগুলোকে সেন্সরশিপ আরোপ করে নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা চালায়। বর্তমানে গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রণে নিকোলাস মাদুরোও তার উত্তরসূরী স্যাভেজের পথই বেছে নিয়েছেন।

আগেই বলেছি, কর্তৃত্ববাদী সরকারগুলো আইনের মাধ্যমে গণমাধ্যমকে নিয়ন্ত্রণ করে। কখনো নতুন আইন প্রণয়ন করে, আবার কখনো বা পুরণো আইনের মারপ্যাঁচে নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা চালায়।

২০১১ সালে ‘রাশিয়া এসকোয়ার’ পত্রিকায় রাশিয়ান এডিশনে পাশাপাশি দু’টি প্রতিবেদন ছাপানো হয়। প্রথমটি ছিল রাশিয়ার বিরোধী দলীয় নেতা আলেঙি নাভালনি এর ছবি সম্বলিত একটি প্রতিবেদন। তার পাশাপাশি রাস্তায় অবৈধ ড্রাগস বিক্রি সংক্রান্ত ছবি দিয়ে আরেকটি প্রতিবেদন করা হয়। এই ছোট্ট বিষয়টিও সরকারের হস্তক্ষেপের বাইরে যেতে পারেনি। পত্রিকাটির বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয় যে, ওই প্রতিবেদনে অবৈধ ড্রাগের ক্রয় বিক্রয়ে উৎসাহ প্রদান করা হয়েছে। ফেডারেল ড্রাগ কন্ট্রোল সার্ভিস অব রাশিয়ার পক্ষ থেকে পত্রিকাটিকে সতর্ক করা হয়। আর রাশিয়ায় কোনো গণমাধ্যমকে বছরে দুবার সতর্ক করার প্রয়োজন হলেই ওই প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স এমনিতেই বাতিল হবার বিধান রয়েছে।

আর মালয়েশিয়ায় আইনের মারপ্যাঁচে গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রণে রয়েছে ‘সেডিসন এ্যাক্ট’- এর ব্যাবহার। আর এই সেডিশন এ্যাক্টের ব্যাপ্তি এতো বেশি যে, বিরোধী যেকোন বক্তব্য প্রচার এবং প্রকাশের বিরুদ্ধে সরকার ব্যবস্থা নিতে পারে। এই সেডিসন এ্যাক্টের মাধ্যমেই ২০১৩ সালে জনপ্রিয় অনলাইন ‘মিলিসিয়াংকিনিকে’ সাময়িক সময়ের জন্য বন্ধ করে দেয়া হয়।

সিঙ্গাপুরেও গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রণে রয়েছে সেডিসন এ্যাক্ট, নিউজ পেপার এন্ড প্রিন্টিং প্রেস এ্যাক্ট, দ্যা ইন্টারন্যাল সিকিউরিটি এ্যাক্ট। ভেনেজুয়েলায় গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রণকে আরো সিদ্ধ হস্ত করতে ২০১০ সালে নতুন করে দু’টি আইন করা হয় ‘দ্যা ভেনেজুয়েলা অর্গানিক ল অন টেলিকমিউনিকেশনশ’, ‘সোস্যাল রেসপনসিভিলিটি ইন দ্যা রেডিও, টিভি এন্ড ইলেকট্রনিক মিডিয়া ল’। দেশটিতে কোনো সংবাদ প্রচারের কারণে বিক্ষোভ প্রদর্শিত হলে টাকার অংকে মাশুল গুনতে হয় সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে। এছাড়া বিদেশি কোনো ইনভেস্টমেন্ট গণমাধ্যমের ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে ভেনেজুয়েলার বিভিন্ন আইনে।

কর্র্র্তৃত্ববাদী এসমস্ত দেশে লাইসেন্স প্রদানের মাধ্যমে গণমাধ্যমকে নিয়ন্ত্রণ করা হয়। লাইসেন্স প্রদান করা হয় সরকারের সংশ্লিষ্ট ব্যাক্তিবর্গকে। সিঙ্গাপুরের ক্ষেত্রে প্রতিবছর রেডিও টেলিভিশনকে লাইসেন্স নবায়ন করতে হয়। সরকারের ইচ্ছা হলে কোনো প্রতিষ্ঠানকে নবায়নের সুযোগ দেয়া হয়। আবার ইচ্ছা না হলে নবায়ন করা হয় না।

বাংলাদেশেও লাইসেন্স প্রদানের ক্ষেত্রে দলীয় আনুগত্যের বিষয়টি নিবীড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হয়। শুধু তাই নয়, পুরানো টেলিভিশন চ্যানেলগুলোকে নিয়ন্ত্রণে আনতে প্রতিবছর লাইসেন্স নবায়নের বিধান করেছে সরকার। এই ব্যবস্থার মাধ্যমে ইলেকট্রনিক মিডিয়াগুলোকে চূড়ান্তভাবে নিয়ন্ত্রণের সুযোগ পেল সরকার। সম্প্রতি ঘোষিত সম্প্রচার নীতিমালায় এ্যাডভার্টাইজম্যান্ট নিয়ন্ত্রণে বিভিন্ন ধরণের নীতিমালা আরোপ করেছে সরকার। বিশ্বের কর্তৃত্ববাদী দেশগুলো গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রণে যতগুলো পদক্ষেপ নিয়েছে মনে হচ্ছে তার থেকে শিক্ষা নিয়েই সরকার তার নীতিমালা সাজাচ্ছে।

অতি সম্প্রতি বিএনপির সিনিয়র ভাইস-চেয়ারম্যান তারেক রহমানের বক্তব্য যাতে মিডিয়াতে না আসে, সেজন্য আদালতের মাধ্যমে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে। একটি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় যা কখনো চিন্তাই করা যায় না। শুধু তাই নয়, তারেক রহমানের বক্তব্য প্রচারের কারণে দেশের প্রথম প্রতিষ্ঠিত বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল ‘একুশে টেলিভিশন’ ক্যাবল অপারেটরদের মাধ্যমে সম্প্রচার কার্যক্রম বন্ধ করে রাখা হয়েছে। এখনও বাংলাদেশের প্রায় ৬০ শতাংশ এলাকায় চ্যানেলটি দেখা যাচ্ছে না। চ্যানেলটির চেয়ারম্যান আবদুস সালামকে সন্ত্রাসী কায়দায় গ্রেফতার করে জেলে ঢুকানো হয়েছে। শুধু তাই নয়, তার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহ মামলা হয়েছে। এর কিছু দিন পরই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গণমাধ্যমকে বললেন মিডিয়ার অনুমতি তো আমি দিয়েছি। সুতরাং বিএনপির প্রচার প্রচারণা না করলেও চলবে। এটি ছিল প্রধানমন্ত্রীর ঠান্ডা মাথায় গণমাধ্যমের প্রতি সতর্ক বাণী। প্রধানমন্ত্রীর এ বক্তব্যের গুরুত্ব আশা করি গণমাধ্যম কর্মীরা উপলব্ধি করতে পেরেছেন। আর প্রধানমন্ত্রী একাজ করেছেন অনেক সুচারুরূপে। বিরোধী দলের আন্দোলনকারীদের সন্ত্রাসী আখ্যা দিয়ে। গণমাধ্যমের প্রতি সরকারের এই বৈরী আচরণ প্রথমত মনে করা হচ্ছিল খামখেয়ালি। কিন্তু না, দিনের পর দিন যেভাবে গণমাধ্যমের কর্মীদের সাথে আচরণ করা হচ্ছে -তাতে এটি সরকারের পরিকল্পিত এজেন্ডা ছাড়া আর কি বলা যেতে পারে। স্বাধীনতার পর গণমাধ্যমের স্বাধীনতার এমন করুণ হাল দেখা গিয়েছিল কিনা সেটি এখন গবেষণার বিষয়।

কর্তৃত্ববাদী রাষ্ট্রে সম্প্রতি মানুষের কণ্ঠকে স্তব্ধ করে দিতে নিয়ন্ত্রণ আনা হচ্ছে ‘সাইভার স্পেইস’-কে। এর কারণ হচ্ছে অনলাইন মাধ্যমে প্রচারিত কন্টেন্ট ব্যাপক হারে ছড়িয়ে পড়ছে জনমানুষের কাছে। আর এজন্য দেখা যায় রাশিয়ায় বেশ কয়েকটি সাইটকে কালো তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। শুধু তাই নয়, রাশিয়ায় কেউ ব্লগ চালাতে হলে তাকে অবশ্যই সরকারকে অবহিত করতে হবে। ভেনেজুয়েলায় কয়েকদফা টুইটার বন্ধ করে দেয়া হয়েছিল। শুধু মাত্র সরকারের বিরুদ্ধে সমালোচনামূলক তথ্য প্রচারের জন্য। আর বাংলাদেশে এসব অনলাইন কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণে আইন করা হয়েছে। প্রয়োজন হলে বন্ধ করে দেয়া হচ্ছে সরকারের সমালোচনাকারী সাইটগুলো। এর প্রথম স্বীকার সোনার বাংলাদেশ ব্লগ। শুধু তাই নয় এর মালিক আমিনুল মোহাইমেনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। কিন্তু মিডিয়াতে এবিষয়গুলো তেমন আসেনি। বিডি টুডে নামক জার্মানি থেকে প্রচারিত একটি ওয়েব পোর্টালকে কয়েক দফা বাংলাদেশে ব্লক করে দেয়া হয়েছে। কিন্তু এর উদ্যোক্তা নাছোড় বান্দা। যত বারই বন্ধ করা হচ্ছে ততবারই টেকনিক্যাল মেধা খাটিয়ে সাইটটি চালু রেখেছেন সাইটটির মালিক। সম্প্রতি জাতিসংঘে জাস্ট নিউজ বিডির সম্পাদক বাংলাদেশ বিষয়ে প্রশ্ন করায় সাইটটি বাংলাদেশে ব্লক করে দেয়া হয়।

কর্তৃত্ববাদী রাষ্ট্রে সরকার কিভাবে গণমাধ্যমকে নিয়ন্ত্রণ করছে তার একটি ধারণা লাভের পাশাপাশি আরেকটি বিষয় এখন আলোচিত হচ্ছে যে, সরকারের এতসব বৈরী আচরণের পরও গণতন্ত্রকামী সাংবাদিক ও নাগরিক সমাজ এক মুহূর্তেও জন্যও বসে নেই। কর্তৃত্ববাদী রাষ্ট্রে সাংবাদিকরা সরকারের নির্যাতন ও নাজেহাল থেকে রক্ষা পেতে যেসব কৌশল নিতে দেখা যাচ্ছে। তা হচ্ছে- সংবেদনশীল কন্টেট লুকানোর চেষ্টা করা, সংবাদ সম্মেলনে সরকারকে জটিল প্রশ্ন করা, রাজনীতির সাথে সংশ্লিষ্ট নয় এমন সংবেদনশীল প্রতিবেদন প্রকাশ করা, দেশের বাইরে থেকে গণমাধ্যম পরিচালনা করা, অনলাইন মিডিয়ার ব্যাবহার ইত্যাদি ইত্যাদি। কর্তৃত্ববাদী রাষ্ট্রে সাংবাদিকরা সংবেদনশীল কন্টেন্ট লুকানোর ক্ষেত্রে কয়েকটি পদ্ধতি অবলম্বন করে থাকেন। প্রথমত রিপোর্টে কোনো সংবেদনশীল কিছু থাকলে তা রিপোর্টেও শেষ প্রান্তে রাখার ব্যবস্থা করা। যাতে করে সরকারি সেন্সরশিপের রাডার এড়িয়ে যেতে পারে। দ্বিতীয়ত সংবেদনশীল বিষয়গুলো উপস্থাপনের ক্ষেত্রে এমন ধরনের শব্দ চয়ন করা যাতে করে সরকার চাইলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান এর ভিন্ন ব্যাখ্যা উপস্থাপন করতে পারে।

কর্তৃত্ববাদী কিংবা স্বৈরতান্ত্রিক রাষ্ট্রে সরকারের রক্ত চক্ষু উপেক্ষা করে জনমানুষের আকাঙক্ষার বিষয়গুলো তুলে ধরতে দ্বিতীয় যে পদ্ধতির আশ্রয় নেয় তা হচ্ছে- সরকার শীর্ষ পর্যায়ের নেতৃবৃন্দ যখন প্রেস কনফারেন্সের আয়োজন করেন তখন জটিল জটিল প্রশ্নের মাধ্যমে কাঙিক্ষত উত্তর বের করে নিয়ে আসা। অথবা প্রশ্নের মধ্যে কোনো উত্তর না থাকলেও এনিয়ে নতুন বিতর্ক তৈরি হবার সুযোগ তৈরি হয়। যা পরবর্তীতে অনুসন্ধান জরুরি হয়ে পরে। এ পদ্ধতির ব্যাবহার বাংলাদেশে প্রায়ই দেখা যায়। গণমাধ্যমে এমন কিছু প্রতিবেদন প্রকাশ করা যে বিষয়টি সরাসরি রাজনীতির সাথে সম্পর্কিত নয়। এমন ধরণের বিষয় সমাজে বিরাট ধরণের প্রভাব ফেলতে পারে। যেমন সম্প্রতি সুন্দরবনে ট্রলারডুবির ঘটনাকে কেন্দ্র করে সাংবাদিকরা সুন্দরবনের অদূরে রামপালে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র বন্ধের ক্ষতিকর দিকটি নতুনভাবে জাতীর সামনে তুলে ধরার চেষ্টা চালিয়েছেন। এত কিছুর পরও যখন কর্তৃত্ববাদী রাষ্ট্রে সাংবাদিকরা টিকতে পারেন না তখন হাল ছাড়তে নারাজ তারা। প্রয়োজনে দেশের বাইরে থেকে সংবাদমাধ্যম প্রতিষ্ঠা করে সাংবাদিকতার কাজ পরিচালনা করে থাকেন তারা।

ভেনেজুয়েলার ক্ষেত্রে দেখা গেছে, বিরোধী দল তাদের মিডিয়ার কেন্দ্র গড়ে তুলেছে লন্ডনে। সাংবাদিক আলেক বয়ড ‘ইনফোডিও’ নামে একটি ব্লগের মাধ্যমে বিরোধী দলের কথাগুলো তুলে ধরছেন। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এ নজির প্রবলভাবে হাজির হচ্ছে। সরকার একের পর এক মিডিয়া বন্ধের কারণে এখন বিদেশ থেকে মিডিয়া চালানোর বিষয়ে মনোযোগী হচ্ছে বিরোধী দল। ইউরোপ আমেরিকায় ইতোমধ্যে বেশ কয়েকটি আইপি টিভি ও রেডিও চালু হয়েছে। কমিউনিটি পত্রিকাগুলো বাংলাদেশ প্রশ্নে সংবেদনশীল প্রতিবেদনগুলো তুলে ধরার চেষ্টা করছে। কমিউনিটি পত্রিকার বরাত দিয়ে বাংলাদেশের মূলধারার পত্রিকাগুলোও অনেক সময় রিপোর্ট করতে দেখা যায়। আর ইউরোপ আমেরিকা থেকে শুধুমাত্র বাংলাদেশের বিষয় গুরুত্ব দিয়ে অন্তত ২০ এর অধিক অনলাইন মিডিয়া কাজ করে যাচ্ছে- এর মধ্যে বিডি টুডে ডট নেট, শেখ নিউজ ডট কম উল্লেখযোগ্য।

সরকারের রক্ত চক্ষুকে উপেক্ষা করতে অনলাইনকে কেন্দ্র করে বেশ কিছু নতুন নতুন উদ্যোগ লক্ষ্য করা যাচ্ছে। বিশেষ করে ফেসবুক ও টুইটার ব্যবহার করে অনেকে ব্যাক্তিগত পর্যায়ে গুরুত্বপূর্ণ সাংবাদিকতার কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন।

ভেনেজুয়েলায় হুগো স্যাভেজের অবস্থা যখন আশংকাজনক তখন এ খবরটি অনেক সংবাদমাধ্যমই জানতেন। কিন্তু কেউ ভয়ে কোনো সংবাদ মাধ্যমই তা প্রকাশ করতে পেরে উঠেনি। অবশেষে এ নিউজটি সর্বপ্রথম বেরিয়ে আসে সাংবাদিক নেলসন বোকারান্ডা টুইট বার্তার মাধ্যমে। তিনি তার টুইটে ২০১২ সালে লিখেন স্যাভেজ কিউভায় ক্যান্সোরে আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসাধীন। আর এই টুইট বার্তা থেকেই অন্যান্য সংবাদমাধ্যমগুলো প্রতিবেদন ছাপায়। একনায়কতান্ত্রিক রাষ্ট্রে রাশিয়াতেও মূলধারার বাইরে ফেসবুক ও টুইটারের ব্যবহার ব্যাপকহারে লক্ষ্যণীয়। বিষয়টি সরকারের জন্য এতই উদ্বেগের কারণ হয়ে দাড়িয়েছে যে, কারো ব্যাক্তিগত ব্লগে তিনহাজারের বেশি ভিজিটর থাকলে ওই সাইটকে সরকারের কাছে রেজিস্ট্রেশন নিতে হবে।

বাংলাদেশের ক্ষেত্রে তাকালে দেখা যাবে ফেসবুক, টুইটার আর ব্লগে পোস্টের প্রভাব অত্যধিক। শুধুমাত্র ফেসবুকে প্রধানমন্ত্রীকে নিয়ে ব্যাঙ্গাত্মক পোস্ট দেবার জন্য প্রায় ডজেনখানেক লোককে ইতোমধ্যে কারাগারে যেতে হয়েছে। ফেস বুকে বিভিন্ন পেইজ যেমন বাশের কেল্লা, চেয়ারম্যান ব্লগ, জাতীয়তাবাদী সাইবার দল বিভিন্ন নামে দেশে মানবাধিকার হরণের নিত্য নতুন তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। এসব সাইটগুলোকে নিয়ন্ত্রণে সরকার মরিয়া হয়ে উঠেছে। শুধু তাই নয়, ফেসবুক নির্ভর একটি ব্যাঙ্গাত্মক টিভি চালু হয়েছে। যার নাম ‘কইয়া দিমু টেলিভিশন’। বাংলাদেশের বেশি সংখ্যক লোক মোবাইল ব্যবহার করে বিদায় আইনশৃংখলা বাহিনীর অনেক মানবাধিকার বিবর্জিত কর্মকান্ড জাতির সামনে উঠে আসছে এই মিডিয়ার কল্যাণে।

হেফাজতের নিরীহ মানুষদের হত্যাযজ্ঞ, বন্ধুক যুুদ্ধেও নামে নির্বিচারে ট্রাকের নিচে ফেলে হত্যা এসব কিছু জাতি দেখতে পেরেছে মোবাইল ও সোস্যাল মিডিয়ার মাধ্যমেই। বাংলাদেশের বর্তমান নাজুক পরিস্থিতিতে এসব কাজগুলো বেশির ভাগই করছেন সচেতন নাগরিক ও যুব সমাজ। যাদের মূলধারার সংবাদমাধ্যমের সাথে কোনো যোগাযোগ নেই। এসব বিষয়গুলো মাথায় রেখে সরকার কয়েক দফা ফেসবুক, ইউটিউব ব্লক করে রাখে।

সম্প্রতি যোগাযোগ এপ্লিকেশন ব্রাইভার ও টেনগু এর উপর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করে সরকার। পরে অবশ্য তা খুলে দেয়া হয়।

কর্তৃত্ববাদী রাষ্ট্র নায়কদের শত বাধা বিপত্তির পরেও বিশ্বজুড়ে মানুষ তার অধিকার আদায়ে সোচ্চার। জনমানুষের এই সংগ্রাম কিছুতেই বৃথা যেতে পারে না।

লেখক: অফিস সেক্রেটারি, বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়ন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *