ফিরে আসুক নিখোঁজ মানুষগুলো
সাময়িকী

ফিরে আসুক নিখোঁজ মানুষগুলো

ফিরে আসুক নিখোঁজ মানুষগুলো তাহসিন আহমেদ
কারও কারও অপেক্ষার প্রহর ফুরায় না। স্বামীর জন্য অপেক্ষা শেষ হয়না স্ত্রীর। বাবার অপেক্ষায় থাকে সন্তান। কিংবা ছেলের অপেক্ষায় মা নির্ঘুম রাত পার করে। পরিবারের কর্তা, অথবা সন্তানের আশায় দরজার ওপাশে অস্থির সময় পার করে মানুষগুলো। এই মানুষগুলোর সন্তান অথবা বাবা বাসা থেকে বের হয়ে ফেরত আসে না নিখোঁজ অথবা হারিয়ে যায়। কেউ কেউ ফেরত আসে কিন্তু জানা যায়না কিভাবে সে হারিয়ে গিয়েছিল অথবা নিখোঁজ হয়ে কোথায় ছিল। যারা ফিরেনা তাদের বাসায় মধ্য রাতে কলিং বেলের আওয়াজ আশা জাগায়, মনে হয় এই বুঝি তাদের সন্তান বাবা হয়ত ফিরে আসেছে। অথচ আসে না একদিন, এক সপ্তাহ করে মাস, বছর পার হয়ে গেলে এক সময় আশা ছেড়ে দেয় পরিবারগুলো। বাবার জন্য কন্যার অপেক্ষা, কিংবা অবুঝ শিশু সন্তানটি চেয়ে থাকে কখন বাবা চকোলেট নিয়ে আসবে। কখন ছুটে গিয়ে বাবাকে জড়িয়ে ধরবে এমন অপেক্ষা অনেক পরিবারের সন্তানের। অনেক পরিবারের নিখোঁজ সন্তান, স্বামী অথবা পিতার ছবিটিই দিকে চেয়ে অসীম শূন্যতায় অশ্রুপাত করে একসময় সব মেনে আবার ঘুরে দাঁড়ানোর স্বপ্ন দেখা।

হারিয়ে যাওয়া মানুষগুলোর পরিবারের জীবনের মর্মন্তুদ অভিজ্ঞতার বয়ান উঠে এসেছিল হিউম্যান রাইটস ওয়াচ’র এশিয়া বিষয়ক পরিচালক মীনাক্ষী গাঙ্গুলির এক লেখায়। তিনি লিখেছিলেন, ‘সরকারের অস্বীকার করাই হচ্ছে বলপূর্বক গুমের সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি। প্রিয়জন হয়তো বহু বছর ধরে এক অনিশ্চয়তা নিয়ে বাঁচে, আশা আর নিরাশার দোলাচলে। মায়েরা চিন্তিত থাকেন, তাদের সন্তান যদি কখনও ফেরেও, তাহলে তাকে চেনা যাবে কিনা। ভারতের জম্মু ও কাশ্মীরে যেসব নারী তাদের হারিয়ে যাওয়া স্বামীর খোঁজে এখনও অপেক্ষায় আছেন তাদের বলা হয় ‘অর্ধ-বিধবা’। গুমের শিকার ব্যক্তিদের পরিবার জানিয়েছে, তারা শোকও প্রকাশ করতে পারেন না ঠিকঠাকভাবে। তারা অস্থির থাকেন এই ভেবে যে, তাদের প্রিয়জন কি এখন নির্যাতন ভোগ করছে, নাকি তাকে মেরে ফেলা হয়েছে, কবরে শায়িত হওয়ার মর্যাদা কি সে পেয়েছে? আজকের বাংলাদেশে, বহু পরিবার এমন প্রশ্ন নিয়ে বেঁচে রয়েছে।’

বিচারবহির্ভূত হত্যার শিকার এক ব্যক্তির কন্যা বলেছিলেন, আমরা সৌভাগ্যবান। আমরা তো অন্তত আমাদের পিতার লাশ পেয়েছি। কিন্তু গুম হয়ে যাওয়া ব্যক্তিদের পরিবারের সদস্যরা তো তাও পাননি।

বাংলাদেশের অন্যতম সেরা একজন ঔপন্যাসিক কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদ ১৯৯৭ সালের তাঁর প্রকাশিত ‘অপেক্ষা’ উপন্যাসে এমন এক পরিবারের গল্প বলেছিলেন যেখানে স্ত্রী সুরাইয়া হটাত হারিয়ে যাওয়া স্বামী হাসানুজ্জামানের অপেক্ষায় জীবনের বড় একটি অংশ পার করার পর ছেলে ইমনের বিয়ের রাতে কলিংবেলের আওয়াজ শুনে ভাবেন তাঁর স্বামী বুঝি ফেরত এসেছে। এই উপন্যাসে স্বামীর নিখোঁজের পর সুরাইয়ার জায়গা হয় ভাইয়ের বাসায়। শেষ পর্যন্ত ফুফাতো ভাই ইমনের সাথে সুরাইয়ার আশ্রয় নেয়া সেই ভাইয়ের মেয়ে মিতুর বিয়ে হয়। স্বামীর আশায় জীবনের গোধূলি লগ্নে এসে সুরাইয়ার ধারনা হয় ছেলে ইমনের বিয়ের রাতে হুট করে চলে আসবেন হাসানুজ্জামান।

‘অপেক্ষা’ উপন্যাসেরই একটি চরিত্র ইমনের ছোট বোন সুপ্রভা। ক্লাস সেভেনে সে পাশ করতে পারেনি বলে জীবনের কাছে পরাজিত মনে করে সে নিজেকে। প্রধান শিক্ষিকার অপমান সহ্য করতে পারেনি বলে অভিমান করে সে আত্মহত্যা করে। তাকে নিয়ে হুমায়ূন লিখেছিলেন, ‘ছোট্ট সুপ্রভা। তোমার প্রসঙ্গ অপেক্ষা উপন্যাসে আর আসবে না। কারণ, তোমার জন্য কেউ অপেক্ষা করে থাকবে না। মৃত মানুষদের জন্য আমরা অপেক্ষা করি না। আমাদের সমস্ত অপেক্ষা জীবিতদের জন্য। এই চরম সত্যটি না জেনেই তুমি হারিয়ে গেলে।’

জীবিতদের জন্য আমাদের অপেক্ষা অনিবার্য। কিন্তু যারা জীবিত নয়, আবার মৃতও নয় তাদের জন্য? অপেক্ষা না আশা ছেড়ে দেয়া? সন্তান জানে না তার পিতা বেঁচে আছেন, না মারা গেছেন, সে তাঁর বাবার পরিচয় কেউ জিজ্ঞেস করলে কি বলবে জীবিত নাকি মৃত? নাকি জীবিত থেকেও মৃত? স্ত্রী জানে না তার স্বামী মৃত না জীবিত, তিনি? যে পিতামাতা জানেন না তাদের সন্তানের খোঁজ, তারা কি করবেন? অর্ধএতিম, অর্ধবিধবা এবং অর্ধ মা-বাবাদের প্রশ্নের জবাব দেয়ার ক্ষমতা রাষ্ট্রের নেই।

বাংলাদেশ ভালো থাকুক, নিখোঁজ মানুষগুলো ফিরে আসুক। হারিয়ে যাওয়া মানুষগুলোর পরিবারের অপেক্ষার প্রহর শেষ হয়ে নতুন ভোর ফিরে আসুক। কলিংবেলের ওপারে থাকা মানুষটি যেন তাদের পরিবারের হারিয়ে যাওয়া ভাই, আত্মীয়, সন্তান অথবা বাবা হয়। দরজার ওপাশে নিরন্তর অপেক্ষায় আশা ছেড়ে দেয়া মানুষগুলোরর সুখের কান্না যেন মধ্যরাতে পিতার জন্য সন্তানের, স্বামীর জন্য স্ত্রীর অথবা ভাইয়ের জন্য বোনের কষ্টের প্রহর শেষ করে আনন্দঅশ্রুতে পরিণত হয়।

শিরোনাম ডট কম
শিরোনাম ডট কম । অনলাইন নিউজ পোর্টাল Shironaam Dot Com । An Online News Portal
http://www.shironaam.com/

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *