বিচারপতি মানিক বিভিন্ন সময়ে লন্ডনে গিয়ে টেলিভিশন টক শোতে অংশ নিয়ে রাজনৈতিক বক্তব্য রাখেন।শাসকদলের পক্ষে ও বিরোধী দলের বিপক্ষে বক্তব্য রাখেন এসব টক শো-তে।
জাতীয়

দুর্নীতিসহ ২৯ অভিযোগ নিয়ে মানিক অধ্যায়ের সমাপ্তি

বিচারপতি মানিক বিভিন্ন সময়ে লন্ডনে গিয়ে টেলিভিশন টক শোতে অংশ নিয়ে রাজনৈতিক বক্তব্য রাখেন।শাসকদলের পক্ষে ও বিরোধী দলের বিপক্ষে বক্তব্য রাখেন এসব টক শো-তে।  হাইকোর্টের আইনজীবী হিসেবে কর্মজীবন শুরু, ১৯৭৮ সালে। সমালোচনা তার কখনই পিছু ছাড়েনি। শেষ মুহূর্তে এসে জড়িয়েছেন আরো বড় বিতর্কে।

তিনি সর্বোচ্চ বিচার প্রতিষ্ঠান সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের বিচারপতি এ এইচ এম শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক। আগামী ১ অক্টোবর তিনি অবসরে যাচ্ছেন।

এর আগে বৃহস্পতিবার শেষ কর্মদিবস কাটালেন বিচারপতি মানিক। তবে কোনো এজলাসে নয়, নিজ চেম্বারে বসে দিন পার করেন তিনি।

বিচারপতি এ এইচ এম শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিকের বিরুদ্ধে মানি লন্ডারিং (মুদ্রা পাচার), বৈদেশিক মুদ্রা বিনিময় আইন ভঙ্গ ও মিথ্যা তথ্য দিয়ে সম্পদের হিসাব গোপন এবং সুপ্রিম কোর্টের বিচারকদের শপথ ও আচরণবিধি ভঙ্গের সুনির্দিষ্ট ২৯টি অভিযোগ করেছিলেন দৈনিক আমার দেশ’র ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক মাহমুদুর রহমান।

২০১২ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর মাহমুদুর এসব অভিযোগ উত্থাপন করেছিলেন। তখন হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতি ছিলেন তিনি।

মাহমুদুর রাষ্ট্রপতি ও প্রধান বিচারপতির কাছে ইংরেজিতে লেখা ১৬ পৃষ্ঠার অভিযোগ নিজে উপস্থিত হয়ে পেশ করেছিলেন। সুপ্রিম কোর্টের তৎকালীন রেজিস্ট্রার এ অভিযোগ গ্রহণ করেছেন।

তারপরই তৎকালীন রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ জিল্লুর রহমানের কাছে অভিযোগের অনুলিপি পেশ করা হয়।

আমার দেশ সম্পাদকের পক্ষে পত্রিকাটির বিশেষ প্রতিনিধি অলিউল্লাহ নোমানের কাছ থেকে দুপুর একটার দিকে আবেদনটি গ্রহণ করেন রাষ্ট্রপতির সামরিক সচিব।

সংবিধানের ৯৬ অনুচ্ছেদ অনুসারে সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের মাধ্যমে এসব অভিযোগ তদন্তের আবেদন করেন মাহমুদুর রহমান।

সুর্নিদিষ্ট ২৯ অভিযোগ

আমার দেশ সম্পাদক তার অভিযোগে বলেন, মানিলন্ডারিং (মূদ্রা পাচার) আইন, বৈদেশিক মুদ্রা বিনিময় আইন ও আয়কর আইন অনুযায়ী বিচারক এ এইচ এম শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক শাস্তিযোগ্য অপরাধ করেছেন। মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দিয়ে টাকা আত্মসাতের অভিযোগে বিচারপতি মানিকের বিরুদ্ধে লন্ডনের একটি আদালতে মামলা বিচারাধীন রয়েছে। এই মামলায় শামসুদ্দিন চৌধুরী জবাব দেয়ার জন্য সময়ের আবেদন করেছেন।

মানিলন্ডারিং আইন ভঙ্গের অভিযোগে বলা হয়, বিচারপতি মানিক ২০১০-১১ সালের আয়কর হিসাবে দেখিয়েছেন লন্ডনে তার তিনটি বাড়ি রয়েছে। এই বাড়িগুলো কিনেছেন ৪০ লাখ টাকার বিনিময়ে। তিনটি বাড়ির মধ্যে একটি বাড়ির ঠিকানাও অসম্পূর্ণ বা ভুল দেয়া হয়েছে। আয়কর নথিতে উল্লেখ করা 6 Ruskin Wa, London SW17 বাড়িটির অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায়নি। আয়কর নথিতে দেখানো হয় তিনি ৫০ লাখ টাকায় এলিফ্যান্ট রোডের একটি বাড়ি বিক্রি করেছেন। এর মধ্যে ৪০ লাখ টাকা লন্ডনে তিনটি বাড়ি ক্রয় করতে ব্যয় হয়।

দৈনিক আমার দেশের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, আয়কর নথিতে উল্লেখিত ৩টি বাড়ির বাইরেও লন্ডনে তার অপর একটি বাড়ি রয়েছে। আয়কর নথিতে লন্ডনে তিন বাড়ি ক্রয়ে যে পরিমাণ টাকা ব্যয় দেখিয়েছেন তার কয়েক গুণ বেশি মূল্য পরিশোধ করা হয়েছে। অতিরিক্ত এই টাকার কোনো হিসাব বা উৎস আয়কর নথিতে দেখানো হয়নি।

বাংলাদেশ থেকে টাকা লন্ডনে কী উপায়ে পাঠানো হয়েছে তার কোনো উল্লেখ আয়কর নথিতে নেই। বৈদেশিক মুদ্রা বিনিময় আইন ও মানিলন্ডারিং (মূদ্রা পাচার) আইন অনুযায়ী বাংলাদেশের বাইরে এত বিপুল পরিমাণ টাকা সরাসরি পাঠানোর কোনো সুযোগ নেই।

আরো অনুসন্ধানে দেখা যায়, লন্ডনের ভুমি অফিসের তথ্য অনুযায়ী বিচারপতি মানিকের লন্ডনের 108 Sheppey Road, Dagenham (RM9 4LB) ঠিকানার বাড়িটি কিনেছেন সেখানকার স্থানীয় মুদ্রা এক লাখ ৮৬ হাজার পাউন্ডে। বাংলাদেশি টাকায় যার পরিমাণ ২০০৮ সালের ৭ অক্টোবর তিনি এই টাকা পরিশোধ করে সম্পত্তি রেজিস্ট্রি করেছেন।

লন্ডন ভূমি অফিসের তথ্য অনুযায়ী 26 The Warrent, London (E12 5HY) ঠিকানার বাড়িটির মালিক হলেন বিচারক এ এইচ এম শামসুদ্দিন চৌধুরী। ২০০৭ সালের ১ ফেব্রুয়ারি তিনি এই বাড়িটি কিনেছেন। রেজিস্ট্রি দলিলের তথ্য অনুযায়ী বাড়িটির ক্রয় মূল্য হচ্ছে লন্ডনের স্থানীয় মুদ্রায় ২ লাখ ৪০ হাজার পাউন্ড।

ভুমি অফিসের রেকর্ড অনুযায়ী 94 East Hill. London (SW18 2HF) বাড়িটির মালিক হলেন বিচারপতি মানিক এবং নাদিয়া চৌধুরী। ২০১১ সালের ২১ নভেম্বর বাড়িটি তাদের নামে রেজিস্ট্রি করা হয়। এর ক্রয় মূল হচ্ছে লন্ডনের স্থানীয় মূদ্রায় ১০ হাজার পাউন্ড। এই বাড়িটির ক্রয় রেজিস্ট্রারে তাদের ঠিকানা দেখানো হয়েছে 108 Sheppey Road, Dagenham (RM9 4LB)| 94 East Hill. London (SW18 2HF এই সম্পত্তিটি আয়কর নথিতে দেখানো নেই।

তার আয়কর নথিতে 6 Ruskin Way, London SW17 ঠিকানায় আরো একটি সম্পত্তি দেখানো হয়েছে। এই ঠিকানাটি ভূল অথবা অসম্পূর্ণ অথবা তিনি ঠিকানা গোপন করেছেন। লন্ডন ভূমি অফিসের রেকর্ডে এই ঠিকানায় কোনো সম্পত্তি তার নামে নেই।

বিচারপতি মানিকের Sheppey Road, Dagenham (RM9 4LB) ঠিকানার বাড়িটি ক্রয়ের ক্ষেত্রে Mortgage express নামের একটি অর্থ ঋন কোম্পানি থেকে ঋণের জন্য আবেদন করেন। এই আবেদনে তিনি নিজেকে লন্ডনের একটি কোম্পানিতে মার্কেটিং ম্যানেজার হিসাবে কর্মরত বলে দাবি করেন। মার্কেটিং ম্যানেজার হিসাবে তিনি বছরে লন্ডনের স্থানীয় মুদ্রায় ৩৪ হাজার ৪৫০ পাউন্ড বেতন পান বলেও উল্লেখ করা হয় ঋণের আবেদনে।

ঋণের আবেদনে তিনি ২০০৩ সালের ১ জুন তারিখে এই বর্ণনা উল্লেখ করেন। অথচ তিনি তখন সুপ্রিম কোর্টের হাই কোর্ট বিভাগে কর্মরত একজন বিচারক। তিনি হাইকোর্ট বিভাগে ২০০৩ সালের ২ জুলাই পর্যন্ত অস্থায়ী বিচারক হিসাবে কর্মরত ছিলেন।

আবেদনে বলা হয় সুপ্রিম কোর্টের আচরণ বিধি অনুযায়ী বিচারপতি মানিককে হাইকোর্ট বিভাগের বিচারক থাকা অবস্থায় ভিন্ন কোনো চাকরি করতে পারেন না। তিনি বিচারক থাকা অবস্থায় লন্ডনে ঋণের আবেদনে নিজেকে সেখানে একটি কোম্পানির মার্কেটিং ম্যানেজার হিসেবে দাবি করে আচরণ বিধি লঙ্ঘন করেছেন।

অভিযোগে আরো জানানো হয়, ২০১২ সালের ২৫ জুন জিসান নাসিম নামে এক ব্যক্তি লন্ডনের আদালতে বিচারপতি মানিকের বিরুদ্ধে প্রতারণা মামলা দায়ের করেছেন। মামলায় দাবি করা হয় ওই ব্যক্তির কাছে বিচারপতি মানিক নিজেকে একজন ইমিগ্রেশন অ্যাডভাইজার হিসেবে পরিচয় দেন। ইমিগ্রেশন অ্যাডভাইজার হিসেবে তিনি ওই ব্যক্তিকে লন্ডন ওয়েস্টমিনিস্টার কলেজে ভর্তি হওয়ার পরামর্শ দেন এবং বলেন এই কলেজের সঙ্গে তার সম্পৃক্ততা রয়েছে। ওই মামলায় দাবি করা হয় বিচারপতি মানিক ইমিগ্রেশন অ্যাডভাইজারের পাশাপাশি নিজেকে বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের একজন বিচারক হিসাবে দাবি করে এবং তাকে কলেজটিতে ভর্তি হওয়ার জন্য উদ্বুদ্ধ করেন।

বিচারপতি মানিকের পরামর্শে সেই কলেজে ভর্তি হয়ে জিসান নাসিম ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় লন্ডনের স্থানীয় মুদ্রায় ১৫ হাজার পাউন্ড ক্ষতিপূরণের মামলা দায়ের করেছেন। লন্ডনের The Northhampton County Court-এ দায়ের করা মামলাটির নম্বর হচ্ছে 2QT70489।

মামলার নোটিশ পাওয়ার পর ২০১২ সালের ৭ জুলাই বিচারপতি মানিক আদালতে একটি সময়ের আবেদন জানান। মামলাটির নোটিশের জবাব দিতে সময়ে আবেদনে তিনি নিজেকে বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের হাই কোর্ট বিভাগের একজন বিচারক হিসেবে উল্লেখ করেন। এছাড়া ভিত্তিহীন অভিযোগে তার বিরুদ্ধে এই মামলা দায়ের করা হয়েছে দাবি করে বলা হয় জবাবে জন্য পর্যাপ্ত সময়ের দরকার।

আবেদনে আরো জানানো হয়, বিচারপতি মানিক বিভিন্ন সময়ে লন্ডনে গিয়ে টেলিভিশন টক শো-তে অংশ নিয়ে রাজনৈতিক বক্তব্য রাখেন। বর্তমান শাসকদলের পক্ষে ও বিরোধী দলের বিপক্ষে বক্তব্য রাখেন এসব টক শো-তে।

আবেদনে উল্লেখ করা হয়, পুলিশের নির্যাতনে ২০১১ সালের ২৬ আগস্ট সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী এম ইউ আহমদ নিহত হন। এই ঘটনার পর সেপ্টেম্বরে বিচারপতি মানিক লন্ডনে সেখানকার চ্যানেল আই-তে একটি অনুষ্ঠানে অংশ নেন। চ্যানেলটির লন্ডনের প্রধান নির্বাহী রিয়াজ আহমদ ফয়সলের উপস্থাপনায় অনুষ্ঠিত এই টক শো-তে বিচারপতি মানিক বিভিন্ন রাজনৈতিক বিতর্কিত বিষয়ে বক্তব্য দেন। পুলিশি নির্যাতনে সুপ্রিমকোর্টের আইনজীবী এম এউ আহমদের হত্যাকাণ্ডের বিষয়েও তিনি বিশদ বক্তব্য রাখেন।

তিনি সুস্পষ্ট করে বলেন, এই ইউ আহমদের বিভিন্ন ধরনের রোগ ছিল। পুলিশের নির্যাতনে নয়, তিনি রোগে মারা গেছেন। তদন্তাধীন ও বিচারাধীন কোনো বিষয় নিয়ে উচ্চ আদালতের বিচারক এ ধরনের প্রকাশ্য বক্তব্য দিয়ে বিচারকদের জন্য তৈরি করা আচরণ বিধি লঙ্ঘন করেছেন।

আবেদনে বলা হয়, বিচারপতি মানিকের গাড়ি ট্রাফিক সিগন্যালে লালবাতির কারণে আটকে দেয়ায় পুলিশ ও ট্রাফিক সদস্যদের রাস্তায় কান ধরিয়ে উঠা-বসা করানো, রুল জারি করে আদালতে ডেকে এনে গালাগালি করা, সমাজের বিভিন্ন পর্যায়ের সম্মানিত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে রুল জারি করে তলব করা এবং তাদের অকথ্য ভাষায় গালি দেয়ার বিষয়টিও আবেদন উল্লেখ করা হয়েছে। এবং এতে বিচারকদের জন্য সর্বশেষ প্রণীত আচরণবিধির ১, ২, ৩, ৯ ও ১১ লঙ্ঘিত হয়েছে বলেও দাবি করা হয় রাষ্ট্রপতি এবং প্রধান বিচারপতির কাছে করা আবেদনে।

বিচারপতি মানিকের বিরুদ্ধে আনা এই ২৯ অভিযোগ সুপ্রিম জুডিসিয়াল কাউন্সিলের মাধ্যমে তদন্ত করার জন্য রাষ্ট্রপতি ও প্রধান বিচারপতির কাছে মাহমুদুর রহমান আবেদন জানান।

এর আগে ২০১২ সালের ৬ জুন বিচারপতি মানিকের বিরুদ্ধে অসদারণের বেশ কিছু অভিযোগ এনে তাকে অপসারণে দ্রুত সুপ্রিম জুডিসিয়াল কাউন্সিলের মাধ্যমে তদন্ত করে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য রাষ্ট্রপতির কাছে আবেদন করেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মোজাম্মেল হক।

তবে এসব আবেদনের বিষয়ে কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়নি।

এছাড়া জাতীয় সংসদের স্পিকারের বিষয়ে বিচারপতি মানিক মন্তব্য করে তার বিরুদ্ধে সংবিধান লঙ্ঘনের অভিযোগ এনে সংসদ সদস্যরা সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল গঠনে সংসদের পক্ষ থেকে রাষ্ট্রপতিকে প্রস্তাব পাঠানোর দাবি করেন।

তবে সেই দাবি নাকচ করে ২০১২ সালের ১৮ জুন তৎকালীন স্পিকার আব্দুল হামিদ জাতীয় সংসদের রুলিংয়ে এ বিষয়ে ভেবে ব্যবস্থা নেয়ার আহ্বান জানান প্রধান বিচারপতিকে। কিন্তু স্পিকারের রুলিংকে অসাংবিধানিক ঘোষণা করে রায় দেয় হাই কোর্ট বিভাগের বিচারক হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী ও এবিএম আলতাফ হোসেনের বেঞ্চ।

বিচারপতি মানিক হাইকোর্টে থাকাকালে একটি মামলায় অভিযুক্তদের পাকিস্তানের পাঠিয়ে দেয়ার হুমকি দিয়ে সমালোচিত হয়েছিলেন। আপিল বিভাগে এসেও তিনি বাংলাদেশে কর্মরত ব্রিটিশ সাংবাদিক ডেভিড বার্গম্যানকে এজলাস থেকে বের করে দিয়েছিলেন।

তবে এতসব অভিযোগ ও সমালোচনা সত্ত্বেও বিচারপতি মানিকের কিছুই হয়নি। উপরন্তু ২০১৩ সালের ৩১ মার্চ তাকে আপিল বিভাগে নিয়োগ দেয়া হয়।

সাপ্তাহিক ছুটি ও সুপ্রিম কোর্টের বার্ষিক অবকাশ আজ শুক্রবার থেকে শুরু হয়েছে। অবকাশ শেষে ১ নভেম্বর নিয়মিত আদালত বসবে। সেই হিসেবে বৃহস্পতিবারই ছিল বিচারপতি মানিকের শেষ কর্মদিবস।

অবসরে যাওয়ার আগে প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার অভিশংসন চেয়ে আলোচনার জন্ম দিয়েছেন বিচারপতি মানিক।

প্রথা অনুসারে উচ্চ আদালতের কোনো বিচারকের দায়িত্ব গ্রহণ ও অবসরের আগে তাকে বেঞ্চে (এজলাস) সংবর্ধনা দেওয়া হয়ে থাকে। তা দেয় সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতি ও অ্যার্টনি জেনারেল।

তবে শেষ সময়ে কোনো বেঞ্চে ছিলেন না বিচারপতি মানিক। প্রধান বিচারপতির অভিশংসন চেয়ে গত ১৩ সেপ্টেম্বর রাষ্ট্রপতির বরাবরে পাঠানো চিঠিতে তিনি দাবি করেন, ৮ সেপ্টেম্বর থেকে তাকে বিচারিক কার্যক্রম থেকে সরিয়ে রাখা হয়।

সংবর্ধনার বিষয়ে অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম বলেন, ‘যেহেতু তিনি বেঞ্চে আসীন হননি, তাই বিদায় সংবর্ধনা জানানো সম্ভব হয়নি।’

তবে বিচারিক জীবনের শেষ কর্মদিবসে বিচারপতি শামসুদ্দিন চৌধুরীকে তার কক্ষে গিয়ে বিদায় সম্ভাষণ জানিয়েছেন আওয়ামী লীগ সমর্থক আইনজীবীরা।

তার কক্ষে গিয়ে দেখা করে বিদায়ী সম্ভাষণ জানান- ব্যারিস্টার এম আমীর-উল ইসলাম, ইউসুফ হোসেন হুমায়ূন, আবদুল বাসেত মজুমদার, রোকন উদ্দিন মাহমুদ, পরিমল চন্দ্র গুহ, শ ম রেজাউল করিম, লায়েকুজ্জামান মোল্লা, মনজিল মোরসেদ ও ব্যারিস্টার তানিয়া আমীর প্রমুখ।

শ ম রেজাউল করিম বলেন, ‘যেহেতু তিনি কোনো এজলাসে ছিলেন না, সে কারণে তার চেম্বারে গিয়েই বিদায়ী সম্ভাষণ জানানো হয়েছে।’

বিচারপতি মানিক ১৯৭৮ সালে হাইকোর্টের আইনজীবী হিসেবে কাজ শুরু করেন। ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল হিসেবে বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলায় রাষ্ট্রপক্ষে দায়িত্ব পালন করেন তিনি। ইয়াসমিন হত্যা মামলায়ও ছিলেন তিনি।

২০০৯ সালের ২৫ মার্চ হাইকোর্টের বিচারক হিসেবে নিয়োগ পান শামসুদ্দিন চৌধুরী। ২০১৩ সালের ৩১ মার্চ আপিল বিভাগে পদোন্নতি পান তিনি।

হাইকোর্টের বিচারক থাকাকালে সংবিধানের সপ্তম সংশোধনী, কর্নেল তাহেরের গোপন বিচার, বিজিএমইএ ভবন সংক্রান্ত মামলাসহ বহু আলোচিত রায় তার হাত দিয়ে আসে।

একই সঙ্গে সব সময়ই কিছু না কিছু বিতর্ক দিয়ে আলোচনায় থেকেছেন বিচারপতি শামসুদ্দিন চৌধুরী। রাষ্ট্রের অনেক বিশিষ্ট ব্যক্তি, গণমাধ্যম সম্পাদকরা তার আদালতে গিয়ে কাঠগড়ায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থেকেছেন। শুনেছেন ভর্ৎসনা ও তীর্যক সব মন্তব্য, যা বিচারপতি বিচারপতি মানিকের পেশাদারিত্বকে করেছে প্রশ্নবিদ্ধ।

তবে পর্যবেক্ষকরা বলছেন, আপিল বিভাগের বিচারপতি পদে পদোন্নতি পেলেও দিন দিন তার ক্ষমতা হ্রাস পেতে থাকে। প্রধান বিচারপতি পদের জন্য বহু চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়েও তিনি বর্তমান প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার সঙ্গে বিরোধে জড়িয়ে পড়েন। এতে কার্যত দিন দিন কোণঠাসা হয়ে পড়েন বিচারপতি মানিক। অবশেষে নীরবেই তার প্রস্থান ঘটল।

শিরোনাম ডট কম
শিরোনাম ডট কম । অনলাইন নিউজ পোর্টাল Shironaam Dot Com । An Online News Portal
http://www.shironaam.com/

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *