ঢাকা-চট্টগ্রামে তীব্র গ্যাস সংকট, প্রতিবাদে ঝাড়ু মিছিল
জাতীয়

ঢাকা-চট্টগ্রামে তীব্র গ্যাস সংকট, প্রতিবাদে ঝাড়ু মিছিল

ঢাকা-চট্টগ্রামে তীব্র গ্যাস সংকট, প্রতিবাদে ঝাড়ু মিছিলরাজধানী ঢাকা ও চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকায় তীব্র গ্যাস সংকট দেখা দিয়েছে। গ্যাসের দেখা মিলছে না মধ্যরাতের আগে। কোথাও কোথাও গ্যাস থাকলেও চাপ একেবারেই কম। সব মিলিয়ে গৃহিণীদের ভোগান্তির শেষ নেই। কোনো কোনো এলাকায় সকাল থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত গ্যাস থাকে না। সরবরাহ স্বাভাবিক হতে হতে গভীর রাত গড়ায়। কখনও আবার টিম টিম করে চুলা জ্বললেও সন্ধ্যার পর বন্ধ হয়ে যায়।

এদিকে গ্যাস না পেয়ে চরম ভোগান্তির শিকার হয়ে এলাকাবাসী বাধ্য হয়ে রাস্তায় নেমেছে। ‘গ্যাস নাই গ্যাস চাই, পাক করে খেতে চাই’ স্লোগান সংবলিত ব্যানার নিয়ে সোমবার সকাল সাড়ে ১০টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত নারায়গঞ্জ-ঢাকা লিংক রোড অবরোধ করে এলাকাবাসী। এ সময় তারা ঝাড়ু হাতে বিক্ষোভ করে। আগামী তিন দিনের মধ্যে গ্যাস সংকটের সমাধান করে এলাকায় নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহ না হলে বৃহত্তর আন্দোলনের হুমকি দিয়েছেন ভুক্তভোগী এলাকাবাসী।

গ্রাহকদের অভিযোগ, বছরের পর বছর গ্যাস সংকটে ভোগান্তির পর মোটা পাইপ লাইন স্থাপন করা হলেও ফের গ্যাস সংকট দেখা দিচ্ছে। দ্রুত তারা এ সমস্যার প্রতিকার চান। তবে তিতাস গ্যাস কর্তৃপক্ষ জানিয়েছেন, পাইপলাইনে জমে থাকা ময়লা অপসারণের কাজ চলছে। এজন্য গ্যাস সরবরাহে বিঘ্ন ঘটছে। গ্যাসের সংকট তীব্র হওয়ায় শহরের রেস্তরাঁগুলোয় ভিড় বেড়েছে। সেখানেও গ্যাসের সংকট থাকায় লাকড়ি ও এলপি গ্যাসের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে হোটেল মালিকরা।

চট্টগ্রামের অধিকাংশ এলাকায় দিন-রাত ২৪ ঘণ্টার মধ্যে মাত্র একবার গ্যাসের দেখা মেলে। তাও ২-৩ ঘণ্টার বেশি স্থায়ী হয় না। পাইপলাইনে গ্যাস আসামাত্রই পাড়া-মহল্লাগুলোতে মহিলাদের দৌড়াদৌড়ি হুলস্থুল পড়ে। তখন রান্নাবান্নার ধুম লেগে যায়। সকালে ঘুম থেকে জেগেই মহিলারা অপেক্ষায় থাকেন গ্যাসের জন্য।

রাজধানীর মিরপুর, মোহাম্মদপুর, ডেমরা ও চট্টগ্রামের বেশকিছু এলাকায় লাকড়িই এখন রান্নাবান্নার প্রধান ভরসা। সিএনজি স্টেশনগুলোতেও একই অবস্থা। গ্যাসের এ সংকটের কারণে বেড়ে গেছে গ্যাস সিলিন্ডারের দাম। ফলে নগরবাসীর জনজীবনে দুর্ভোগ চরমে উঠেছে।

বর্তমানে গ্যাসের চাহিদার এক-চতুর্থাংশও পাওয়া যাচ্ছে না। বন্ধ হয়ে গেছে ছোট-বড় অনেক প্রতিষ্ঠান। অনেক কারখানা ২৫-৩০ শতাংশ উৎপাদন করে ধুঁকে ধুঁকে চলছে। গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ায় গত এক মাসে বিভিন্ন এলাকার তৈরি পোশাক, কম্পোজিট টেক্সটাইল, পাট, স্টিল, রি-রোলিং, সিমেন্টসহ শত শত ছোট-বড় শিল্প-কারখানা বন্ধ হওয়ার উপক্রম। সকাল ৯টা থেকে দুপুরে ২-৩ ঘণ্টা বাদ দিয়ে রাত ৯টা পর্যন্ত টানা এক-চতুর্থাংশ গ্যাসের চাপও থাকে না। শিল্পোদ্যোক্তাদের বক্তব্য, ঠিকমতো উৎপাদন না হলেও ব্যাংকের ঋণের কিস্তি ঠিকই দিতে হচ্ছে তাদের। আর তাতে হিমশিম খাচ্ছেন তারা।

রাজধানীর মিরপুরের অধিকাংশ এলাকা, লালমাটিয়ার কিছু এলাকা, মোহাম্মদপুর, শেখেরটেক, কামরাঙ্গীরচর, পুরান ঢাকার বেশিরভাগ এলাকা, রামপুরা, যাত্রাবাড়ী, বাড্ডা, ফকিরাপুল, আরামবাগ, দনিয়া, যাত্রাবাড়ী, শ্যামপুর, হাজারীবাগে দিনের অধিকাংশ সময় গ্যাস থাকে না। গভীর রাতে গ্যাস এলেও পর্যাপ্ত প্রেসার না থাকায় তীব্র ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে সাধারণ বাসিন্দাদের। গ্রাহকদের অভিযোগ, গ্যাসের দাম একলাফে ৪০০ থেকে ৬৫০ টাকা করা হয়েছে। কিন্তু নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস থাকে না অধিকাংশ এলাকায়। মিরপুরের বাসিন্দারা জানান, সকাল ৭টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত গ্যাসের কোনো চাপ থাকে না। দুপুর ২টা থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত কিছুটা গ্যাস গ্যাওয়া যায়। আবার সন্ধ্যা ৭টা থেকে রাত ১১টা পর্যন্ত গ্যাস থাকে না। গভীর রাতে এ এলাকায় গ্যাস পাওয়া যায়।

গত এক মাস ধরে রাজধানীর ধানমণ্ডি, লালমাটিয়া, গেণ্ডারিয়া, মীরহাজিরবাগ, রায়ের বাজার, ট্যানারি মোড়, শাহীনবাগ, মিরপুর, শ্যামলী, হাজারীবাগ, মোহাম্মদপুর, মুগদা, রামপুরা, উলুন, বাড্ডা, বনশ্রী, কাওলা, উত্তরা, শাহজাহানপুর, পুরান ঢাকার হাজারীবাগ, শাঁখারীবাজার, গোয়ালনগর, মালিটোলা, লালবাগ, চকবাজার, ইসলামপুর, দারুসসালাম, কাজীপাড়া, গোড়ান, খিলগাঁও, যাত্রাবাড়ী, ধনিয়া এলাকায় গ্যাস সংকট চলছে। কিছু কিছু এলাকায় সংকট আরও দীর্ঘদিনের। রাজধানীর বাইরে গাজীপুর, সাভার, কোনাবাড়ি, নারায়ণগঞ্জ, চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন এলাকার শত শত বিভিন্ন শিল্প-কারখানা গ্যাসের কারণে ২০ থেকে ৩০ ভাগও উৎপাদন করতে পারছে না। কারখানায় শ্রমিক আছে, মেশিন আছে শুধু গ্যাস নেই। এসব কারখানায় ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ১৬-১৭ ঘণ্টা গ্যাস থাকে না বলে অভিযোগ সংশ্লিষ্টদের।

তিতাসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী নওশাদুল ইসলাম বলেন, মৌসুম পরিবর্তনের কারণে গ্যাসের চাহিদা বেড়েছে। তবে যেখানে অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে, সেখানে তিতাসের টিম গিয়ে সংকট সমাধান করছে। গ্যাস থাকলেও কোথাও সরবরাহজনিত সমস্যার কারণে গ্রাহকরা গ্যাস পাচ্ছেন না। তার মতে, বর্তমানে চাহিদার তুলনায় উৎপাদন কম হওয়ায় রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় সংকট তৈরি হয়েছে। রাজধানীর কিছু কিছু গ্যাসলাইন দীর্ঘদিনের পুরনো হওয়ায় এসব লাইনে মরিচা পড়েছে। এসব কারণে গ্যাসের চাপ কমে গেছে। তিনি বলেন, ইতিমধ্যে লালমাটিয়া, গেণ্ডারিয়, পুুুরান ঢাকা, মিরপুর ও নারায়ণগঞ্জের কিছু আবাসিক ও বাণিজ্যিক লাইনে এ ধরনের সমস্যা চিহ্নিত করা হয়েছে।

তিতাস এমডি নওশাদুল ইসলাম জানান, তীব্র্র শীত থেকে রক্ষা পেতে এখন মানুষজন রান্নার চুলা বন্ধ করছেন না। এ কারণে হঠাৎ চাহিদা বেড়ে গেছে। তাছাড়া শিল্প-কারখানাগুলো এখন দ্বিগুণ উৎপাদনে গেছে। সিএনজি স্টেশনে যানবাহন বেড়ে গেছে। তাছাড়া সার কারখানাগুলো চালু হওয়ায় আগের চেয়ে বেশি গ্যাস দিতে হচ্ছে।

তিনি বলেন, শীত মৌসুমে প্রাকৃতিক গ্যাসের সহজাত তরল হাইড্রোকার্বন জমার কারণে পাইপলাইনে মরিচা পড়ে। তখন গ্যাসের চাপ কম হয়। এ কারণে পাইপলাইনে গ্যাস থাকলেও তা কাজে লাগছে না। তবে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, শীত একটু কমলে চাহিদা কমে যাবে। তখন পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে।

তবে ভুক্তভোগীরা বলেছেন, গ্যাসের অভাবে দিনের পর দিন বাসাবাড়িতে রান্না বন্ধ থাকলেও নির্বিকার তিতাস কর্তৃপক্ষ। রাজধানী ঢাকায় তিতাসের অধিকাংশ লাইন মান্ধাতা আমলে স্থাপন করা। অনেক জায়গায় এসব পাইপলাইনের ভেতর মাটি ঢুকে বন্ধ হয়ে গেছে। সরকারি হিসাবে বর্তমানে যে পরিমাণ সংযোগ আছে, তার জন্য প্রতিদিন অতিরিক্ত গ্যাস প্রয়োজন কমপক্ষে ৫০০ মিলিয়ন ঘনফুট। বর্তমানে উৎপাদন হচ্ছে দৈনিক গড়ে ২ হাজার ৭৪০ মিলিয়ন ঘনফুট। গড়ে প্রতিদিন ৫০০ থেকে ৮০০ মিলিয়ন ঘনফুটের বেশি ঘাটতি থাকছে। বেসরকারি হিসাবে এ ঘাটতি আরও বেশি।

চট্টগ্রাম মহানগরীতে জাতীয় গ্রিডের গ্যাস সরবরাহ অস্বাভাবিকভাবে কমে গেছে। এমনিতেই চাহিদার অর্ধেকের সামান্য বেশি গ্যাসের জোগান দেয়া হয় বন্দর শহর চট্টগ্রামে। এর ওপর গত প্রায় ২ সপ্তাহ ধরে গ্যাসের সরবরাহ কমে যাওয়ায় বন্দরনগরী চট্টগ্রামের বাসাবাড়ি, শিল্প-কারখানা, বিদ্যুৎ কেন্দ্রসহ সর্বত্র গ্যাসের জন্য হাহাকার চলছে। গত ৫ দিনে পরিস্থিতির ভয়ানক অবনতি ঘটেছে। রাত-দিন বাসাবাড়ির রান্নার চুলা না জ্বলায় মানবেতর জীবনযাপন করছেন চট্টগ্রামের নাগরিকরা। চট্টগ্রামে এতদিন গ্যাসের সরবরাহ ২৯০ মিলিয়ন ঘনফুটের অধিক ছিল। কিন্তু জাতীয়ভাবে গ্যাসের উৎপাদন স্বাভাবিক থাকলেও অজ্ঞাত কারণে চট্টগ্রামে সরবরাহ প্রায় ৫০ মিলিয়ন ঘনফুট পর্যন্ত কমিয়ে দেয়া হয়েছে। পেট্রোবাংলার হিসাব অনুযায়ী, ২ হাজার ৭৪০ মিলিয়ন ঘনফুট উৎপাদন ক্ষমতার বিপরীতে শুক্রবার গ্যাস উৎপাদন হয় ২ হাজার ৭১৩ মিলিয়ন ঘনফুট।

কর্ণফুলী গ্যাস বিতরণ কোম্পানি (কেজিডিসিএল) ও গ্যাস ট্রান্সমিশন কোম্পানি (জিটিসিএল) সূত্র জানিয়েছে, চট্টগ্রামের লাইন শেষপ্রান্তে হওয়ায় তিতাস ও বাখরাবাদ যদি গ্যাসের সরবরাহ বেশি নেয় তাহলে স্বাভাবিকভাবেই চট্টগ্রামে সরবরাহ কমে যাবে। সূত্রমতে গত এক সপ্তাহ ধরে তিতাস গ্যাস বিতরণ কর্তৃপক্ষ জানায়, বাখরাবাদে গ্যাসের সরবরাহ বেড়েছে। ফলে চট্টগ্রামে গ্যাস সরবরাহ পরিস্থিতি নাজুক পর্যায়ে ঠেকেছে।

গ্যাস সংকটের কারণে চট্টগ্রামের পরিস্থিতি একেবারেই নাজুক। গ্যাস সংকটে বন্ধ রয়েছে তিনটি বৃহদায়তন বিদ্যুৎ কেন্দ্র ও রাষ্ট্রায়ত্ত সার কারখানা সিইউএফএলে। এ ছাড়া সংকটে পড়েছে কয়েকশ’ শিল্প-কারখানা। জ্বলছে না বাসাবাড়ির রান্নার চুলা। গ্যাস সংকটের কারণে চাকরিজীবী, ব্যবসায়ী ও শিক্ষার্থীদের সময়মতো খাওয়া-দাওয়া করা দুরূহ হয়ে পড়েছে। নিত্য খাবারের জোগান দেয়া কঠিন হয়ে পড়েছে বিশেষ করে শিশুখাদ্য প্রস্তুতে হিমশিম খেতে হচ্ছে মায়েদের। হোটেল-রেস্তোরাঁগুলো চাহিদানুযায়ী খাবার সরবরাহ করতে পারছে না।

সিএনজি ফিলিং স্টেশনগুলোতে চাপ সংকটের কারণে স্টেশনগুলোর সামনে যানবাহনের লম্বা লাইন তৈরি হয়েছে। গ্যাসের চাপ না থাকায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়েও তারা গ্যাস পাচ্ছেন না বলে অভিযোগ ভুক্তভোগীদের।

নগরীতে সিএনজি স্টেশন রয়েছে ২৫টি। আর এসব স্টেশন থেকে গ্যাস নিয়ে চলাচল করে বৈধ-অবৈধ ৩০ হাজার সিএনজি অটোরিকশার পাশাপাশি অন্তত ১ লাখ যানবাহন।

ব্যবসায়ী নেতাদের দাবি, গ্যাস সংকটের কারণে অনেক শিল্প-কারখানায় ব্যবহৃত যন্ত্রপাতি কয়েক ঘণ্টা চালিয়ে উৎপাদনের জন্য প্রস্তুত হওয়ার পরে গ্যাসের অভাবেই বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। তাই শিল্প-কারখানার উৎপাদন বন্ধ থাকায় উদ্যোক্তারা পণ্য উৎপাদনের কার্যাদেশ হারাচ্ছেন। পাশাপাশি ব্যাংক ঋণের সুদ ও শ্রমিক-কর্মচারীদের বেতন-ভাতার দায়ভারে আর্থিকভাবে ভয়াবহ ক্ষতির শিকার হচ্ছেন তারা। অন্য দিকে গৃহস্থালি খাত, হাসপাতাল, সিএনজি স্টেশনসহ সমগ্র চট্টগ্রামে গ্যাসের জন্য হাহাকার সৃষ্টি হয়েছে। কর্ণফুলী গ্যাস বিতরণ কোম্পানির উপ-মহাব্যবস্থাপক (বিতরণ) প্রকৌশলী আজিজুল হক জানান, তিতাস ও বাখরাবাদ সরবরাহ বেশি নিলে আমরা কম গ্যাস পাই। এক্ষেত্রেও তাই হচ্ছে। গত রোববার থেকে পরিস্থিতি একেবারেই ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে মন্তব্য করে তিনি বলেন, কিভাবে রেশনিং করা হবে তা নিয়ে হিমশিম খাওয়ার অবস্থা তাদের।

শিরোনাম ডট কম
শিরোনাম ডট কম । অনলাইন নিউজ পোর্টাল Shironaam Dot Com । An Online News Portal
http://www.shironaam.com/

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *