ঢাকা-সিলেট রুটে যাত্রী পরিবহণের পূর্বকথা

ঢাকা-সিলেট রুটে যাত্রী পরিবহণের পূর্বকথা

602
0
SHARE

যাত্রী পরিবহণ জগতে হাজী মোহাম্মদ সৈয়দ আহমেদ এক অনন্য নাম। যাত্রী পরিবহণ জগতে হাজী মোহাম্মদ সৈয়দ আহমেদ এক অনন্য নাম। তিনি ১৯৮৪ সালের ২২শে নভেম্বর সায়েদাবাদ ঢাকা হতে সিলেট কদমতলী রুটে সর্বপ্রথম যাত্রী পরিবহণ ব্যবসা শুরু করেন ‘ঊজালা ট্রান্সপোর্ট এন্টারপ্রাইজ লিমিটেড’ নামে। এটাই ছিল তৎকালীন সময়ে ঢাকা থেকে সিলেট যাবার একমাত্র নন-এসি বাস সার্ভিস।

পরবর্তীতে তিনি তার আপন বড় ভাই মরহুম মোহাম্মদ সৈয়দ ইয়ার আহমেদকে পরিবহণ ব্যবসায় নিয়ে আসেন ১৯৮৮ সালে। তৎকালীন সময়ে ছোট ভাইয়ের উৎসাহে বড় ভাই শুরু করলেন একই রুটে ‘রাশেদ পরিবহণ লিমিটেড’ নামে ব্যবসা। যা সে সময়ে ঢাকা থেকে সিলেট যাবার দ্বিতীয় নন-এসি বাস সার্ভিস। ১৯৮৮ সালেই ঢাকা (সায়েদাবাদ) হতে সুনামগঞ্জ (কেন্দ্রীয় বাস স্ট্যান্ড) রুটে ‘হাজী মোহাম্মদ সৈয়দ আহমেদ’ আরো একটি যাত্রী পরিবহণ সংস্থা চালু করে ‘এস এ ট্র্যাভেলস এন্টারপ্রাইজ লিমিটেড’ নামে এবং এই রুটে এটাই ছিলো তৎকালীন সময়ে একমাত্র নন-এসি বাস সার্ভিস। একই বিভাগের দুই ভিন্ন রুটে ‘হাজী মোহাম্মদ সৈয়দ আহমেদ’ এর বাস সার্ভিস হয়ে গেলো দু’টি। অতঃপর হাজী মোহাম্মদ সৈয়দ আহমেদ এবং তার আপন বড় ভাই মরহুম মোহাম্মদ সৈয়দ ইয়ার আহমেদ মিলে তাদের আরেক ছোট ভাইকে (মরহুম মোহাম্মদ সৈয়দ নাজিম আহমেদ) উৎসাহ দিয়ে পরিবহণ ব্যবসায় নিয়ে আসলেন ১৯৯১ সালে। ‘এন পি পরিবহণ লিমিটেড’ নামে যাত্রা শুরু করলো আধুনিক ধারার বিলাসবহুল বাস সার্ভিস। ঢাকা (সায়েদাবাদ) হতে সিলেট (কদম তলী) সুনামগঞ্জ (কেন্দ্রীয় বাস স্ট্যান্ড) রুটে যারা যাতায়াত করতো সবার মন জয় করে নেয় ‘এন.পি.পরিবহণ লিমিটেড’।

সৈয়দ পরিবারের পরিবহণ ব্যবসার সফলতা দেখে কিছু মানুষ মোটেই সন্তুষ্ট ছিলো না। তারা এক হয়ে সৈয়দ পরিবারকে নিম্নগামী করতে ১৯৯৯ সালে ১৭ই মে মরহুম মোহাম্মদ সৈয়দ নাজিম আহমেদকে নিমর্ম ভাবে হত্যা করে। মরহুম মোহাম্মদ সৈয়দ নাজিম আহমেদ নিহত হবার পর থেকেই এই পরিবারের পরিবহণ ব্যবসায় ধস নামে। ১৯৮৪ সালের নভেম্বর থেকে ১৯৯৯ সালের মে পর্যন্ত ১৫ বছরে ‘ঊজালা’, ‘এস এ’, ‘রাশেদ’, ‘এন পি’ এই ৪টি সংস্থার বাস সংখ্যা ছিলো ৮৮টি। কিন্তু ১৯৯৯ সালের জুলাইতে এসে বাস সংখ্যা ১১তে নেমে আসে; যার ফলে ‘এস এ ট্র্যাভেলস এন্টারপ্রাইজ লিমিটেড’ সাময়িক বন্ধ করে দেয়া হয় (যা আজ পর্যন্ত বন্ধ) এবং ২০০২ সালে ৬টি বাস এবং দুইটি কাউন্টারসহ ‘রাশেদ পরিবহণ লিমিটেড’ সম্পূর্ণ বিক্রি দেয়া হয়। ঊজালা ৬টি বাস ও ৪টি কাউন্টার এবং এন পি ৫টি বাস ও ৪টি কাউন্টার নিয়ে শুরু করে ঐতিহ্য টিকেয়ে রাখার অসীম যুদ্ধ।

এরই মধ্যে সৈয়দ পরিবারে সবার আশার বাণী হয়ে পরিবহণ ব্যবসা শুরু করে হাজী মোহাম্মদ সৈয়দ আহমেদ এর বড় ভাইয়ের (মরহুম মোহাম্মদ সৈয়দ ইয়ার আহমেদ) দুই সন্তানেরা। ‘আল মোবারাকা পরিবহণ লিমিটেড’ নামে ২০০৪ সালে। ঢাকা (সায়েদাবাদ) হতে সিলেট,সুনামগঞ্জ, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ, তামাবিল, জাফলং এই রুটগুলোতে যাত্রা শুরু করে। বহুমুখী সমস্যার পরও ‘আল মোবারাকা পরিবহণ লিমিটেড’কে নিয়ে ভেঙে পরেনি সৈয়দ পরিবারের কেউই। ‘আল মোবারাকা পরিবহণ লিমিটেড’ এর সফলতা দেখে সৈয়দ পরিবারের আরো দুই ভাই সিলেট বিভাগেই আরো দুটি যাত্রী পরিবহণ ব্যবসা শুরু করেন। ২০০৬ সালে জুলাই মাসে ‘আল আরজু পরিবহণ লিমিটেড’ এবং ২০০৬ সালের ডিসেম্বরে ‘লাকী এক্সপ্রেস বাস সার্ভিসেস লিমিটেড’ নামে যাএা শুরু করে। ২০১১ সালের সেপ্টেম্বর মাসে সৈয়দ পরিবার ‘ভি আই পি বাস সার্ভিসেস লিমিটেড’ এবং ২০১৩ সালের নভেম্বরে ‘বিলাস বাস সার্ভিসেস লিমিটেড’ নামে দুটি প্রতিষ্ঠিত যাত্রী পরিবহণ সংস্থা সম্পূর্ণ কিনে নেয়।

সৈয়দ পরিবারের আরো এক ধাপ সফলতা দেখে কিছু মানুষ আবারো তাদেরকে ব্যর্থ করতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে এবং ২০১৩ সালের ৩ ডিসেম্বর কাউন্টারের সামনে পাকিং অবস্থায় ‘হাজী মোহাম্মদ সৈয়দ আহমেদ’ এর একান্ত নিজস্ব বাস (ঊজালা ট্র্যান্সপোর্ট এন্টারপ্রাইজ লিমিটেড) এ আগুন ধরিয়ে দেয়। ওই হিংসার আগুনে ‘হাজী মোহাম্মদ সৈয়দ আহমেদ’ এর বাসটি তাদের চোখের সামনে পুড়ে সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে যায়। আর এই ঘটনায় হাজী মোহাম্মদ সৈয়দ আহমেদ ৬টি বাস (আগুনে পুড়ে যাওয়া সহ ৬টি) বিক্রি করে পরিবহণ জগৎ থেকে অবসর নেন ২০১৩ সালের ডিসেম্বরের শেষ দিকে। হাজী মোহাম্মদ সৈয়দ আহমেদ তার ছেলের নিকট বুঝিয়ে দেন অনেক কষ্টে প্রতিষ্ঠা করা দুটি পরিবহণ সংস্থাকে (এস এ ট্র্যাভেলস এন্টারপ্রাইজ লিমিটেড / ঊজালা ট্র্যান্সর্পোট এন্টারপ্রাইজ লিমিটেড)।

নতুন করে উন্নতি সাধন করার শর্তে প্রায় এক বছর বন্ধ থাকা ‘ঊজালা ট্র্যান্সর্পোট এন্টারপ্রাইজ লিমিটেড’কে আবারো চালু করার সিদ্ধান্ত গ্রহন করেন হাজী মোহাম্মদ সৈয়দ আহমেদের বড় ছেলে সৈয়দ অরিয়ন আহমেদ। সর্বশেষ সৈয়দ পরিবারের অন্য সদস্যদের (আল মোবারাকা পরিবহণ লিমিটেড) বিশেষ সাহায্য নিয়ে ২০১৪ সালের ১৬ই ডিসেম্বর পূনরায় যাত্রা শুরু করে ১৯৮৪ সালের ঐতিহ্যবাহী ‘ঊজালা ট্র্যান্সর্পোট এন্টারপ্রাইজ লিমিটেড’। ঢাকা (সায়েদাবাদ) হতে সিলেট (কদম তলী) সুনামগঞ্জ (কেন্দ্রীয় বাস স্ট্যান্ড)রুটে এবং তাদেরই আরেক ঐতিহ্যবাহী পরিবহণ যাত্রী সংস্থা ‘এস এ ট্র্যাভেলস এন্টারপ্রাইজ লিমিটেড’ পূনরায় যাত্রা শুরু করার পথে ঢাকা (সায়েদাবাদ”) হইতে সিলেট, সুনামগঞ্জ, মৌলভী বাজার, হবিগঞ্জ, তামাবিল, জাফলং রুটগুলোতে। সৈয়দ পরিবারের সর্বপ্রধান সংস্থা এখন ‘আল মোবারাকা পরিবহণ লিমিটেড’। এই সংস্থার বাস সার্ভিস এখন সিলেট বিভাগের গন্ডি পেরিয়ে ঢাকা (সায়েদাবাদ) হতে চৌমুহনী, মাঈজদী, সোনাপূর, নোয়াখালী, লাকসাম, ফেনী, চট্রগ্রাম, কক্স বাজার, টেকনাফ, বান্দরবান, রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়িতে যাত্রীসেবা দিচ্ছে এবং পরবর্তীতে পদ্মা সেতু হলে বাস সার্ভিস খুলনা এবং বরিশাল বিভাগেও সেবা দিবে।

বর্তমানে এই সৈয়দ পরিবারকে বলা হয় ‘ব্রাদার্স অব ট্র্যান্সর্পোটেশন / ফ্রেন্ডর্স অব ট্র্যান্সর্পোটার’। সৈয়দ পরিবারের ভাইয়েরা তারা আজ আধুনিক এবং সুস্থধারার যাত্রী পরিবহণ ব্যবসার অগ্রদূত; সৈয়দ পরিবারের ভাইয়েরা মিলে তৈরী করেছে ‘ল্যান্ড লাইন ট্র্যান্সর্পোট গ্রুপ লিমিটেড / রোড লাইন সার্ভিসেস লিমিটেড’ নামে নতুন ব্যানার এবং এটির অধীনে বর্তমানে যে সকল যাত্রী পরিবহণ সংস্থা রয়েজাত্রগুলো হলো-ঊজালা ট্র্যান্সর্পোট এন্টারপ্রাইজ লিমিটেড; এসএ ট্র্যাভেলস এন্টারপ্রাইজ লিমিটেড; আল মোবারাকা পরিবহণ লিমিটেড; ভি আই পি বাস সার্ভিসেস লিমিটেড; বিলাস বাস সার্ভিসেস লিমিটেড; আল আরজু পরিবহণ লিমিটেড; এন.পি.পরিবহণ লিমিটেড; লাকী এক্সপ্রেস বাস সার্ভিসেস লিমিটেড। এই সব যাত্রী পরিবহণ সংস্থা মিলিয়ে বর্তমানে বাস সংখ্যা প্রায় ৮৮টি এবং কাউন্টার সংখ্যা প্রায় ৩৩টি ; কর্মকর্তা-কর্মচারীর সংখ্যা প্রায় ২২২জন।

Comments

comments