টিপু: বাংলা ব্যান্ড সঙ্গীতের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র

টিপু: বাংলা ব্যান্ড সঙ্গীতের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র

442
0
SHARE

 কবিও কাব্যফজলে এলাহী পাপ্পু

আমার সমবয়সী বাংলা গানের শ্রোতাদের যদি জিজ্ঞেস করি ছবির মানুষটিকে চিনেন কিনা? তাহলে সেটা হবে খুব হাস্যকর একটি প্রশ্ন। তার চেয়ে বরং যদি জিজ্ঞেস করি ছবির এই মানুষটির কোন গান সবচেয়ে প্রিয়? তাহলে প্রশ্নটি হয়ে যাবে অনেক কঠিন একটি প্রশ্ন । কারন এই মানুষটির কোন গান রেখে কোন গানের নাম বলবে সেটা নিয়ে অনেকক্ষণ ভাবতে হবে। একটি গানও যে বাতিলের খাতায় ফেলে দিতে পারবে না। একটি গানকে সবচেয়ে প্রিয় বলাটা কঠিন কারন বহু গান আছে এই মানুষটির যা আজো বারবার শুনতে ইচ্ছে করে । ছবির এই মানুষটির নাম টিপু । পুরো নাম সাইদ হাসান টিপু। আমাদের কাছে যিনি পরিচিত ছিলেন ‘অবসকিউর’ ব্যান্ড এর টিপু নামে । বাংলা ব্যান্ড সঙ্গীতের প্রতিষ্ঠার পেছনে যে কজন মেধাবী মানুষদের অবদান তাদের মধ্যে অন্যতম হলেন এই টিপু। সেই ৮০র দশকের মাঝামাঝি সময়ে যখন বাংলা ব্যান্ড সঙ্গীত ছিল স্রোতের বিপরীতে চলা একটি কঠিন ও বন্ধুর পথ সেই সময়ের শ্রোতাদের কাছে টিপুর গান বা ‘অবসকিউর’ ব্যান্ড এর গান পৌঁছে যায় সব শ্রেণীর শ্রোতাদের কাছে। অর্থাৎ ড্রইংরুমের শ্রোতা থেকে শুরু করে গ্রামের শ্রোতাদের কাছে । কারন টিপু’র কণ্ঠটা ছিল অসম্ভব সুন্দর মেলোডি ভরা এক কণ্ঠ। কিশোর, তরুন থেকে শুরু করে মধ্য বয়সী (যারা ব্যান্ড গানের বিপক্ষে ছিলেন) সবার কাছে ‘অবসকিউর’ ব্যান্ডটি জনপ্রিয়তা পায় ।

সাইদ হাসান টিপু। আমাদের কাছে যিনি পরিচিত ছিলেন 'অবসকিউর' ব্যান্ড এর টিপু নামে । বাংলা ব্যান্ড সঙ্গীতের প্রতিষ্ঠার পেছনে যে কজন মেধাবী মানুষদের অবদান তাদের মধ্যে অন্যতম হলেন এই টিপু।খুলনা থেকে উঠে এসে যে কজন মেধাবী তরুন আমাদের বাংলা ব্যান্ড সঙ্গীতের উজ্জ্বল নক্ষত্র হয়েছেন তাদের অন্যতম এক নক্ষত্র হলেন এই টিপু । টিপুর যাদু ভরা কণ্ঠের অসাধারন সব গানগুলো ছিল সবার মুখে মুখে । টিপু’র গল্প নিয়ে অনেক আগে আমি ব্লগে একটি পোষ্ট দিয়েছিলাম সেখান থেকে ফ্রেন্ডলিস্টের নতুন বন্ধুদের জন্য আজ আবার গল্পটি তুলে ধরলাম ।

১৯৬৭ সালের ১৬ ই জানুয়ারী খুলনার এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্ম নেয়া টিপু’র ছেলেবেলাটা আর দশজনের মতোই কেটেছে। লেখাপড়ায় ভালোই ছিলেন তিনি। গান করতেন নিজের মনে। বাংলা গান খুব বেশি গাওয়া হতো না, গলা খুলে ইংরেজি গানই বেশি করতেন। স্কুল কলেজে গানের জন্য বিখ্যাতই ছিলেন টিপু। বন্ধুরা টিপুকে পেলেই জেঁকে ধরতো আর তিনিও একটার পর একটা গান গেয়েই চলতেন।

টিপু যখন কলেজে পড়তেন তখন প্রায়ই ক্লাসমেটদের সঙ্গে রিকশায় ঘুরে বেড়াতেন। তার ভাষ্যমতে, ‘তখন এটাই ছিলো আমাদের এক ধরনের আনন্দ করা উপায়। রিকশা যেমন চলতে থাকত, তেমনি চলত আমাদের পালা করে গান গাওয়া। মানাম আহমেদ আমার সহপাঠী ছিলেন। তিনি গান করতেন, সঙ্গে আমিও।’

তখন ১৯৮৪ সাল। একদিন মানাম আহমেদ টিপুকে প্রস্তাব দেন ব্যান্ডে যোগ দিতে। ব্যান্ড সংগীতের স্বর্ণযুগে নিজেকে যুক্ত করতে দ্বিধা করলেন না টিপু। তিনি যোগ দিলেন চাইমে। টিপু জানালেন, ‘১৯৮৪ সালে আমি চাইমে যোগ দিই। টিএসসিতে আমার অডিশন হয়। সেই সময় টুলু ভাই ছিলেন চাইমে। তিনি টিপুকে সিলেক্ট করেন এবং তখন টিপু চাইমে ইংরেজি গান গাইতে শুরু করেন।

তবে টিপু খুব বেশি দিন ছিলেন না চাইমে। বছর খানেক পর তিনি উপলব্ধি করলেন, তার বাংলা গান করা উচিত। নিজের একটি ব্যান্ড গড়ে তুলবেন বলেও সিদ্ধান্ত নিলেন। অনেক ভেবে-চিন্তে তিনি জন্মস্থান খুলনায় চলে গেলেন। সেখানেই কয়েকজন মিলে তৈরি করলেন একটি ব্যান্ড। নাম দিলেন অবসকিউর। এমন নামকরণের কারণ সম্পর্কে টিপু বললেন, ‘অবসকিউর মানে অস্বচ্ছ বা অস্পষ্ট। আমরা লুকিয়ে থাকা জনপ্রিয়তা অর্থে নামটি ব্যবহার করেন টিপু ও তাঁর সহযোদ্ধারা । তখন একটি হারমোনিয়াম এবং গিটার নিয়ে ব্যান্ড তৈরি করে বাড়ির নিচের একটি পরিত্যক্ত ঘরে তাঁরা প্র্যাকটিস করতেন’।
ব্যান্ড গঠনের পর গান গাওয়ার চেয়ে গান লেখা এবং সুর করার কাজটাই বেশি হতো তাদের। এভাবে তারা ৩০টি গান তৈরি করে ফেলেন। এরপর সারগাম স্টুডিওর রেকর্ডারের সঙ্গে টিপুর পরিচয় হয়। অবসকিউরের গান শুনে মুগ্ধ হয়ে যান তিনি। গান রেকর্ডিং করে ক্যাসেট বের করার কথা বলেন তিনি। এমন অসাধারণ সুযোগ হাতছাড়া করতে চাননি টিপু।

সেই সেলফ টাইটেল প্রথম ‘অবসকিউর’ ব্যান্ড এর অ্যালবাম বাংলা ব্যান্ড সঙ্গীতের ইতিহাসে চিরঠাই করে নেয়। যেখানে পেয়েছিলাম ‘ মাঝরাতে চাঁদ’ ছাইড়া গেলাম মাটির পৃথিবী’ ‘ভণ্ড বাবা’ ‘মমতায় চেয়ে থাকা’ মত ১২ টি সেরা গান। যা সেই ছোটবেলা থেকে আজো হৃদয়ে গেঁথে আছে এবং থাকবে চিরকাল ।

এরপর ১৯৯০ সালে বের হয় ২য় অ্যালবাম যেটিও সেলফ টাইটেলড । যার মাঝে পাই ‘ তুমি ছিলে কাল রাতে’, খোদা ‘তোমায় ডাকবো যখন’ ‘আধার ঘেরা স্বপ্ন ‘ সন্ধ্যা আকাশ’ ‘ দৃষ্টিরই সীমানায়’ এর মত চিরসবুজ ও চিরকাল মনে রাখার মত প্রিয় সব গান। এরপরে খানিক বিরতি দিয়ে ৯৩/৯৪ এর দিকে আসে অবসকিউর এর একটু অন্যরকম রকিং অ্যালবাম ‘স্বপ্নচারিণী’ যেখানে এতদিনের চেনা শান্ত শিষ্ট, রোমান্টিক ‘টিপু’ অনেক দুর্দান্ত, বুকের ভেতর জমে থাকা কোন ক্ষোভ যেন বারুদ হয়ে বিস্ফোরণ ঘটাচ্ছে সেইরকম একটি অ্যালবাম ছিল ‘সপ্নচারিনি’। এই অ্যালবাম এর আগে খুলনার ২ জনপ্রিয় তারা ফ্রম ওয়েস্ট (প্রিন্স মাহমুদ) ও ডীফরেন্ট টাচ (মেজবাহ) কে নিয়ে একটি অসাধারণ ব্যান্ড মিক্সড অ্যালবাম “আবেগ’ বের করে অবসকিউর । যে অ্যালবাম এর প্রতিটা গানই ছিল ‘আবেগ’ নিয়ে খেলা করা দুর্দান্ত সুন্দর সব গান।
‘স্বপ্নচারিণী’ অ্যালবাম এর ‘সপ্নচারিনি’ ‘তুমি অকারণে ‘ ‘আধার ঘেরা রাত’ ‘সেই তুমি কোথায়’ ‘সেই তুমি’ র মত দুর্দান্ত কিছু গান। এরপর অবসকিউর কে আর পাওয়া না গেলেও শ্রোতারা প্রিয় ‘টিপু’ কে পেয়েছিল সবসময় বিভিন্ন মিক্সড অ্যালবাম এর চরম জনপ্রিয় ও দুর্দান্ত সব গানে। সেই মিক্সড অ্যালবাম এর যুগে শ্রোতারা পায় প্রিয় ‘টিপু’র প্রথম একক অ্যালবাম ‘একাকী একজন’ । যা এক কথায় একটি অসাধারণ অ্যালবাম ছিল। যেখানে ‘টিপু’ আবার সেই পুরনো শান্ত শিষ্ট বিরহের আগুনে জ্বলা সুন্দরতম একজন মানুষ। সেই অ্যালবাম এর ‘একাকী একজন’ ‘আমার আমি ছাড়া’ ‘আমার মন’ গানগুলো ছিল চোখে জল আসার মত সব গান। ব্যক্তিগত জীবনে শহীদ আলতাফ মাহমুদ এর কন্যা শাওন মাহমুদ কে নিয়ে তাঁর সুখের সংসার যিনি ‘টিপু’কে সর্বক্ষণ অনুপ্রেরণা দিয়ে যাচ্ছেন গান করার জন্য।

২০০৭ থেকে আবার নতুন রূপে অবসকিউর এর হাল ধরে ফিরে আসেন ‘টিপু’ ও অবসকিউর। বাংলা গান যতদিন বেঁচে থাকবে ততদিন সেই ইতিহাসের একটি উজ্জ্বলতম তারা হয়ে জ্বলজ্বল করে বাংলা গানের আকাশে জ্বলবে যে তারাটি তাঁর নাম ‘টিপু’। যাদের অক্লান্ত পরিশ্রম, গানের প্রতি ভালোবাসা আর স্রোতাদের প্রতি দায়বদ্ধ থেকে সবসময় বাংলা গানের সম্ভারকে এক একটি ফুল দিয়ে ভরিয়ে দিয়েছেন তাদর মধ্য টিপু অন্যতম। আজকের এই ভালো ও শ্রুতিমধুর মানসম্পন্ন বাংলা গানের দুর্ভিক্ষের সময়কে যারা দূর করতে পারেন তাদেরই একজন টিপু। তাঁদের ফিরে আসাটা এবং আবার সেই কাণ্ডারির ভূমিকায় অবতীর্ণ দেখার জন্য কোটি কোটি বাংলার মানুষ আশায় বুক বেঁধে আছে। কারন তাঁদের যে আছে অনেক তারার ভিড়ে উজ্জ্বল হয়ে জ্বলতে থাকা একটি তারা যার নাম টিপু! যিনি এখনো ফুরিয়ে যাননি। তিনি যে বাংলা গানেরই এক ‘যুবরাজ’ ,যার কণ্ঠে সুরের মুচ্ছনায় ভাসিয়ে নিয়ে যাবে আর আমাদের মুক্তি দিবে কোটি কোটি বাংলা গান পাগল স্রোতাদের খাদের কিনারায় যাওয়া মানহীন বস্তাপচা গানের এই আকালের যুগ থেকে ।

শুরু থেকে ১৯৯৯ সাল পর্যন্ত টিপু’র কণ্ঠ থেকে পাওয়া গানগুলোর মধ্যে থেকে উল্লেখযোগ্য কিছু গান। সবগুলো গান শুনে দেখুন যে কোন গান বাতিলের খাতায় ফেলতে পারেন কিনা? পারবেন না জানি। শুধু এই একজন টিপু গত শতাব্দিতে যত দারুন গান আমাদের উপহার দিয়েছে তা গত ১০ বছরে ইন্ডাস্ট্রিতে আসা সব নতুন শিল্পিদের গান এক করলেও টিপুর গানের সমান হবে না ।

মাঝরাতে চাঁদ – https://app.box.com/s/46gdkkeq7dfe74ulnq17
মনে পড়ে এক জোছনা রাতে- https://app.box.com/s/qx1aqe7gj0t3k62lxogu
সূর্যটা আলো দিয়ে – https://app.box.com/s/4b3c9794939cf3f5cd09
নিঝুম রাতের আঁধারে – https://app.box.com/s/a4c50bc18def61cf527f
রজনী কাটে – https://app.box.com/s/ec2b66451918a4451664
তুমি ছিলে কালরাতে – https://app.box.com/s/4a3457c8e6d6042e1320
দৃষ্টির সীমানায় – https://app.box.com/s/tl2da56bos3m2bz10muz
সন্ধ্যা আকাশ- https://app.box.com/s/xtd226iyeklq2xu61s1j
আঁধার ঘেরা স্বপ্ন – https://app.box.com/s/0lz9fifygkyolodub60f
তোমায় খুঁজেছি – https://app.box.com/s/cww9k9m3iatuqvdbv81l
স্বপ্নচারিণী – https://app.box.com/s/jvh648vmeq64f9jm3e7g
তুমি অকারনে – https://app.box.com/s/v8asdyub4fizjc8b7764
আঁধার ঘেরা এরাতে – https://app.box.com/s/7m8ilms19lkde09zd5k4
চোখে চোখে কথা – https://app.box.com/s/g8sbz6ypkmbjc7ccv74a
সেই তুমি কোথায় – https://app.box.com/s/xi1tvrelfibn57o288vc
তুমি এখনও প্রিয়া – https://app.box.com/s/0ebe05a39721384a8d89
স্বপ্ন দিয়ে সাজানো রাত – https://app.box.com/s/b92798mpdxr95q64zne9
আমার মন – https://app.box.com/s/3s0vgu9kug5x5hz69c7q
মনের মাঝে তুমি এলে – https://app.box.com/s/03hnvznu4gq826qitx7t
একাকী একজন – https://app.box.com/s/mtf2o7k1ooghe3i03m6v
বদলে গেছে পৃথিবী – https://app.box.com/s/zmivntyefiqdx406jat4
তুমি ছিলেনা সেদিন – https://app.box.com/s/4o67cxpyjqgr21jpyf3v
তোমার জন্য হয়েছি শুন্য – https://app.box.com/s/5knc5uz6rmgyj40382db
হাত বাড়ালেই বন্ধু হবো – https://app.box.com/s/fyqm86h3xhvjl2cspvag
চাঁদ জাগা এই রাতে- https://app.box.com/s/2451c86c60f84d121656
কি করে তোমাকে ভুলে যাবো – https://app.box.com/s/625a3cc573fab9b2b566

ফজলে এলাহী পাপ্পুব্লগার, বাংলা চলচ্চিত্র ও দেশীয় গান সংগ্রাহক। ব্যক্তিগত উদ্যোগে পরিচালিত রেডিও বিজি ২৪ নামক দেশের সবচেয়ে বড় গানের সংগ্রহশালার কর্ণধার। বর্তমানে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত।

Comments

comments