জিম্বাবুয়েকে হারিয়ে টানা পাঁচ সিরিজ জয়ের গৌরব

জিম্বাবুয়েকে হারিয়ে টানা পাঁচ সিরিজ জয়ের গৌরব

জিম্বাবুয়েকে হারিয়ে টানা পাঁচ সিরিজ জয়ের গৌরবসিরিজের তৃতীয় ও শেষ ওয়ানডেতে জিম্বাবুয়েকে ৬১ রানে হারিয়ে তৃতীয়বার বাংলাধোলাই দিয়েছে বাংলাদেশ। এ নিয়ে প্রতিপক্ষকে ১১ বার বাংলাধোলাই করেছে লাল-সবুজের দেশ। জিম্বাবুয়েকে হারিয়ে প্রথমবারের মতো টানা পাঁচ সিরিজ জয়ের গৌরব অর্জন করেছিল মাশরাফি বিন মর্তুজার দল।

ফ্লাড লাইটের আলোর রোশনাই দীপ্তি ছড়াচ্ছে। তার মাঝেও মিরপুর স্টেডিয়ামের গ্যালারিতে শতশত মোবাইলের ক্যামেরার ফ্ল্যাশ জ্বলছে। জিম্বাবুয়ের শেষ ব্যাটসম্যানকে আউট করার আশায় ততক্ষণে অধিনায়ক মাশরাফি মানববৃত্ত তৈরি করেছেন উইকেটের পেছনে। উইকেটরক্ষক মুশফিকসহ ৯ জনের বৃত্ত। যা পয়েন্ট পর্যন্ত বিস্তৃত। অসাধারণ সেই দৃশ্য ধারণ করতেই জ্বলছিল মোবাইলের ক্যামেরাগুলো।

মুস্তাফিজের ওই ওভারে উইকেটটা আসেনি। পরের ওভারের তৃতীয় বলেই কাজটা সেরেছেন আরাফাত সানি। মুজারাবানিকে কট এন্ড বোল্ড করেছেন। সিরিজের শেষ ম্যাচেও জিম্বাবুয়েকে ৬১ রানে পরাজিত করলো বাংলাদেশ। প্রাণ আপ তিন ম্যাচের ওয়ানডে সিরিজ ৩-০ তে জিতলে টাইগাররা। সম্পন্ন করলো ওয়ানডে ইতিহাসে প্রতিপক্ষকে করা নিজেদের ১১তম হোয়াইটওয়াশের গল্প। জিম্বাবুয়ের বিরুদ্ধে যা তৃতীয় ধবলধোলাইয়ের ঘটনা।

তামিম ইকবাল, ইমরুল কায়েস ও শেষান্তে মাহমুদউল্লাহ রিয়াদের হাফ সেঞ্চুরিতে প্রথমে ব্যাট করে ৯ উইকেটে ২৭৬ রান করেছিল বাংলাদেশ। জবাবে ৪৩.৩ ওভারে ২১৫ রানে অলআউট হয় জিম্বাবুয়ে। তামিম ম্যাচ সেরা ও মুশফিক সিরিজ সেরা হন।

অনেকটা আগের দুই ম্যাচের মতোই এগিয়েছে জিম্বাবুয়ের ইনিংস। বুধবার প্রতিরোধ গড়া দুটি জুটির গল্প ছিল। শেষ অবধি আত্মসমর্পণ দিয়েই যার ইতি ঘটেছে। ইনিংসের দ্বিতীয় বলে মুস্তাফিজ উড়িয়ে দেন চিবাবার অফ স্ট্যাম্প। ৪৭ রানের মধ্যে চাকাভা (১৭), আরভিনও (২১) ফিরেন। অধিনায়ক চিগুম্বুরা-শন উইলিয়ামাসের ৮০ রানের জুটি দলটাকে লক্ষ্য তাড়া করার কক্ষপথে ভালোভাবেই টিকিয়ে রেখেছিল।

চিগুম্বুরা সাব্বিরের বলে বোল্ড হলে যে চেষ্টায় কিছুটা ভাটা পড়ে। চিগুম্বুরা ৪৫ রান করেন। পঞ্চম উইকেটে ওয়ালারের সঙ্গেও ৫৯ রানের জুটি গড়েন উইলিয়ামস। ৩৬তম ওভারে সেই প্রতিরোধে ফাটল ধরান আল-আমিন। ওয়ালার ৩২ রান করেন। পরের ওভারে মাশরাফির শিকার হন জিম্বাবুয়ের শেষ ভরসা উইলিয়ামস। ৬৪ রান করা আরভিন ক্যাচ দেন সাব্বিরের হাতে।

৪১তম ওভারে পরপর দুই বলে মুস্তাফিজ তুলে নেন সিকান্দার রাজা (৯) ও জংউইয়ের (১১) উইকেট। দুজনের ক্যাচই নিয়েছেন সাব্বির। তবে রাজাকে আউটের কৃতিত্ব মুস্তাফিজের চেয়ে সাব্বিরকেই বেশি দিতে হয়। মিড অন থেকে দৌড়ে এসে ঝাঁপিয়ে পড়ে দৃষ্টিনন্দন এক ক্যাচ তালুবন্দী করেন তিনি। পরে মুস্তাফিজ, আরাফাত সানি মিলে জিম্বাবুয়ের ইনিংসের লেজটা মুড়ে দেন। মুস্তাফিজ ৩৪ রানে নেন ৫ উইকেট। ক্যারিয়ারে এটি তার তৃতীয়বার পাঁচ উইকেট। মাশরাফি, নাসির, আল-আমিন, আরাফাত সানি ও সাব্বির ১টি করে উইকেট নেন।

এর আগে প্রত্যাশিত শুরু, শক্ত ভিত পাওয়ার পর বাংলাদেশের রানটা তিনশো ছাড়ায়নি মিডল অর্ডার ব্যাটসম্যানদের ব্যর্থতায়। আগের দুই ম্যাচে ২, ৩২ রানে থেমে পড়া ওপেনিং জুটি বুধবার আর সেই পথে হাঁটেনি। দলীয় ১৪৭ রানে ইমরুল আউট হলে ভাঙে ওপেনিং জুটি। ওপেনিংয়ে বাংলাদেশি এটি পঞ্চম সর্বোচ্চ রানের জুটি। চার ওভার পরে আউট হলেও সতীর্থ ইমরুলের মতোই হয়েছে তামিমের ফেরার পর্বটা।

দুজনেই ৭৩ রান করেছেন। আউট হয়েছেন ডাউন দ্য উইকেট এসে স্ট্যাম্পিং হয়ে। তবে ৯৫ বল খেলা ইমরুল ৬টি চার ও ৪টি ছয় মেরেছেন। আর তিন বল বেশি খেলা তামিম মেরেছেন ৭টি চার ও ১টি ছয়। তামিম-ইমরুলের যুগলবন্দিতে ওয়ানডেতে (৫৩ ম্যাচে) ওপেনিংয়ে এটি প্রথম শতরানের জুটি। এর আগে সর্বোচ্চ ৮০ রানের জুটি গড়েছিলেন তারা ২০১০ সালে ভারতের বিরুদ্ধে এই মিরপুরে। বলা ভালো, সাকিবের পর দ্বিতীয় ব্যাটসম্যান হিসেবে তামিম মিরপুরে ২ হাজার পূর্ণ করেছেন বুধবার। নির্দিষ্ট ভেন্যুতে ২ হাজারের বেশি রান করার ঘটনা ওয়ানডে ইতিহাসে এটি সপ্তম।

ইনফর্ম মুশফিকের আশা জাগানিয়া ইনিংস শেষ হয় ২৮ রানে। ক্রেমারের বলে আউট হওয়ার আগে লিটন দাস ১৭ রান করেছেন। জং উইয়ের করা ৪৪তম ওভারে তিন বলের মধ্যে সাব্বির (১), নাসির (০) ব্যাকওয়ার্ড পয়েন্টে ক্যাচ দিয়ে ফিরলে বড় স্কোরের আশা থমকে যায়। ২২৬ রানে ৬ উইকেট হারায় বাংলাদেশ।

৪৫ ওভারের শেষ বলে মিনিট পাঁচেকের নাটক শেষে রান আউট হওয়া থেকে বেঁচে যান মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ। মাশরাফির সঙ্গে ৩৭ রানের জুটি গড়েন তিনি। মাশরাফি ফিরেন ১১ বলে ১৬ রান করে। ইনিংসের শেষ ওভারে ১৪তম হাফ সেঞ্চুরি পূর্ণ করা মাহমুদউল্লাহ রান আউট হওয়ার আগে ৪০ বলে ৫২ রান (৩ চার, ১ ছয়) করেন। ইনিংসের শেষ বলে মুস্তাফিজও রান আউট হন। আরাফাত সানি অপরাজিত ৩ রান করেন। জিম্বাবুয়ের জংউই ও ক্রেমার ২টি করে উইকেট পান।

ব্যাটে সেরা মুশফিক, বোলিংয়ে মুস্তাফিজ

মুশফিক প্রথম ম্যাচে করেছিলেন ১০৭ রান। অবশ্য এর পরবর্তী ২ ম্যাচে সেই ধারাবাহিকতা রাখতে পারেননি এই উইকেটরক্ষক ব্যাটসম্যান। দ্বিতীয় ম্যাচে ২১ ও তৃতীয় ম্যাচে করেছেন ২৮ রান। সবমিলিয়ে ৩ ম্যাচে মুশফিকের সংগ্রহ ১৫৬ রান। কন্যা সন্তানকে বরণ করে নিতে সাকিব আল হাসান যুক্তরাষ্ট্রে চলে যাওয়ায় শেষ দুই ম্যাচে একাদশে জায়গা পেয়েছেন ইমরুল কায়েস। সুযোগ পেয়েই যেন করলেন বাজিমাত। শেষ দুই ম্যাচের প্রথমটিতে ৭৬ ও দ্বিতীয়টিতে করেছেন ৭৩ রান। সেই সুবাদে সিরিজে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন নিজেকে। ২ ম্যাচে করেছেন ১৪৯ রান। সিরিজে তৃতীয় সর্বোচ্চ রান করেছেন জিম্বাবুয়ে অধিনায়ক এল্টন চিগুম্বুরা। কোনো হাফসেঞ্চুরি না থাকলেও ৩ ম্যাচে (৪১, ৪৭ ও ৪৫) তার রান ১৩৩।

ব্যাট হাতে ৩ ম্যাচেই মোটামুটি ধারাবাহিক খেলেছেন তামিম ইকবাল। প্রথম ২ ম্যাচে করেছিলেন যথাক্রমে ৪০ ও ১৯ রান। বুধবার তৃতীয় ম্যাচে করেছেন ৭৩ রান। সেই সুবাদে ৩ ম্যাচে ১৩২ রান করে চতুর্থ সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহক হয়েছেন তিনি। ৩ ম্যাচে এক হাফসেঞ্চুরিসহ ৯১ করে রান সংগ্রহের তালিকায় সাব্বিরের অবস্থান পঞ্চম।

এদিকে বোলিংয়ে শেষ ম্যাচে দুর্দান্ত নৈপুণ্য দেখিয়েছেন মুস্তাফিজুর রহমান। সাকিবের পর প্রথম বোলার হিসেবে এক ইনিংসে ৫ উইকেট নেওয়ার কৃতিত্ব দেখিয়েছেন তিনি। সেই সুবাদে সিরিজে সর্বোচ্চ ৮ উইকেটের মালিক তিনি। সেরা উইকেট নেওয়ার তালিকায় দ্বিতীয় স্থানেই রয়েছেন সাকিব। প্রথম ম্যাচেই ৫ উইকেট নিয়েছিলেন তিনি। ৫ উইকেট নিয়েছেন জিম্বাবুয়ের পানিয়াঙ্গারাও। এ ছাড়া ৪টি করে উইকেট নিয়েছেন বাংলাদেশের ৩ বোলার নাসির হোসেন, আল আমিন ও মাশরাফি বিন মর্তুজা।

বাংলাদেশের ১১ নম্বর বাংলাধোলাই

প্রথমবার কেনিয়ার বিপক্ষে হোয়াইটওয়াশ বা এই বাংলাধোলাই করার স্বাদ পেয়েছিল বাংলাদেশ; দেশের মাটিতে ২০০৫-০৬ মৌসুমে। এরপর ২০০৬ সালে সেই কেনিয়ার বিপক্ষে তাদের মাটিতেই দেখা মিলেছিল আরেকটি বাংলাধোলাইয়ের।

এরপর ২০০৬/০৭ মৌসুমে জিম্বাবুয়েকে ৫ ম্যাচের সিরিজে ৫-০ ব্যবধানে আউট করে স্বাগতিক বাংলাদেশ উপভোগ করেছিল তৃতীয় বাংলাধোলাই দেওয়ার আনন্দ।

সময়ের পরিক্রমায় এরপর একে একে স্কটল্যান্ড (১ বার), আয়ারল্যান্ড (১ বার), ওয়েস্ট ইন্ডিজ (১ বার), নিউজিল্যান্ড (২ বার) ও পাকিস্তানকে (১ বার) বাংলাধোলাই দিয়েছে টাইগাররা। আর বুধবার তৃতীয়বারের মতো জিম্বাবুয়েকে এই লজ্জায় রাঙিয়েছে তারা।

শক্তির বিচারে একটা সময় জিম্বাবুয়ে-বাংলাদেশ সমমানের দলই ছিল। বরং শুরুতে এগিয়ে ছিল জিম্বাবুয়েই। কিন্তু ধীরে ধীরে বিশ্ব ক্রিকেটে বাংলাদেশ নিজেকে টেনে নিয়েছে অনন্য উচ্চতায়। সেখানে জিম্বাবুয়ে যেন বাংলাদেশের সঙ্গে পেরে উঠার দল নয়। তাই ৩ ম্যাচের এই সিরিজ বাংলাদেশের জয় করে নেওয়াটা যেন একপ্রকার নিশ্চিতই ছিল। শুরুর আগেই। কেবল সংশয় ছিল বাংলাধোলাই নিয়ে; কেননা গৌরবময় অনিশ্চয়তার খেলা ক্রিকেটে জিম্বাবুয়ে একটা ম্যাচ জিতলেও জিততে পারে। কিন্তু দাপুটে পারফরম্যান্সে প্রথম দুই ম্যাচ জয়; এরপর বুধবার ৬১ রানের জয়ে সেই শঙ্কা দূর করে দিয়ে প্রতিপক্ষকে বাংলাধোলাই দেওয়ার আনন্দ পুরো দেশে ছড়িয়ে দিয়েছেন মাশরাফি ও তার অদম্য বাঘের দল।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *