আওয়ামী লীগের সাথে জামায়াতে ইসলামীর এক ধরনের কৌশলগত ঐক্য হয়েছে। ঐক্যের খবরটি আনুষ্ঠানিকভাবে প্রচারিত হতে হয়তো আরো কিছু সময় লাগবে করতে হবে।
মতামত

বিশ্লেষণ: জামায়াত ছাড়লে বিএনপির লাভ-ক্ষতি

আওয়ামী লীগের সাথে জামায়াতে ইসলামীর এক ধরনের কৌশলগত ঐক্য হয়েছে। ঐক্যের খবরটি আনুষ্ঠানিকভাবে প্রচারিত হতে হয়তো আরো কিছু সময় লাগবে করতে হবে।তাহসিন আহমেদ

প্রায় সাড়ে ১৭ বছরের সম্পর্ক; বার বার ভাঙ্গনের গুজব শোনা গেলেও এবার গুজবের ডালপালা অনেকদূর বিস্তৃতি লাভ করেছে। ২০১৭ নাগাদ মধ্যবর্তী নির্বাচনের কথা শোনা যায় রাজনৈতিক মহলে। তবে সেই নির্বাচন আরেকটি ৫ জানুরারি মার্কা নির্বাচন নাকি ৩ সিটিতে ভোটের আগের রাতে ব্যালট ভরার মত জালিয়াতির হবে কিনা সেই বিষয়ে সরকারের অবস্থান পরিষ্কার নয়।

তবে সাম্প্রতিক সময়ে আওয়ামী লীগের অনেক বড় নেতা আগামী নির্বাচন তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক হবার ইঙ্গিত দিয়েছেন। তবে শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রী থেকে আদৌ নিরপেক্ষ, গ্রহণযোগ্য আর তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক নির্বাচন হবে কিনা সেই শঙ্কা রয়েই গেছে। আওয়ামী লীগের সুহৃদ অনেকে মনে করেন ১৯৯৬ সালের নির্বাচনের মত ফলাফল হতে পারে ২০১৭ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনে। অর্থাৎ কেউ সরকার গঠনের মত সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাবে না। তৃতীয় কোন দল নিয়ে জোট সরকার গঠন হবার মত কিছু একটা।

আওয়ামী লীগের সাথে জামায়াতে ইসলামীর এক ধরনের কৌশলগত ঐক্য হয়েছে। আগে সরকার আনুষ্ঠানিকভাকে জামায়াতে ইসলামীকে হয়তো নিষিদ্ধ করতে পারে। এই সূত্র ধরে বিএনপির সাথে জামায়াতে ইসলামীর আনুষ্ঠানিক সম্পর্ক ছেদের ব্যাপারটি হয়তো ঘটে যাবে।

সরকার বিএনপিকে সেই মধ্যবর্তী নির্বাচনে আনতে চেষ্টা চালিয়ে যাবে কিন্তু সেই বিএনপি কী খালেদা জিয়ার বিএনপি নাকি খালেদা জিয়াকে নির্বাচনে অযোগ্য করে বিএনপি ভেঙ্গে নতুন বিএনপি সেই শঙ্কাও আছে। জাতীয় নির্বাচনের এখনো দুই বছরের বেশি সময় বাকি। কিন্তু এখনই বাতাসে ভাসছে নানা গুজব। সরকার সামনে কীভাবে নির্বাচন করবে তার নানা ফর্মুলা বাজারে ছড়িয়ে পড়ছে। কেউ বলছে গুজব। কেউ বলছে সরকারের নীলনকশা। বিএনপি ভাঙবে। নতুন বিএনপি হবে। আর সেই নতুন বিএনপি নির্বাচনে যাবে। বিষয়টি খুব সরলিকরণ বলে কেউ কেউ উড়িয়ে দিতে পারেন। কিন্তু এসবের কিছু একটা হবে না তা বলা মুশকিল। কারণ সরকার বিএনপি ভাঙার জন্য তৎপর যে হবেই, সেটি মনে করলে খুব ভুল করা হবে না। হয়তো বিষয়টি কেউ কেউ সময়ের ওপর ছেড়ে দিতে চাইবেন। তবে রাজনীতিতে কোনো কিছুতেই খুব বেশি সময় নেয় না।

জামায়াত-বিএনপি জোট: পেছনে ফিরে দেখা
১৯৯৯ সালের ৬ জানুয়ারি আওয়ামী সরকার বিরোধী আন্দোলনের অংশ হিসেবে বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট গঠিত হয়েছিল। ওইদিন তৎকালীন বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া, জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ, তৎকালীন জামায়াতের আমির অধ্যাপক গোলাম আযম এবং ইসলামী ঐক্যজোটের চেয়ারম্যান শায়খুল হাদিস আল্লামা আজিজুল হক এক যৌথ ঘোষণা দিয়ে চারদলীয় জোট গঠন করেন। ঘোষণার এক মাসের মধ্যে সরকারকে পদত্যাগের আহ্বান জানানো হয়।

এরপর ১৯৯৯ সালের ৩০ নভেম্বর খালেদা জিয়াসহ চার দলের এই চার শীর্ষ নেতা তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেতার সরকারি বাসভবন ২৯ মিন্টো রোডে এক বৈঠকের পর এক ঘোষণাপত্রে নিজ নিজ দলের পক্ষে স্বাক্ষর করেন। ওই ঘোষণায় সরকার পতনের এক দফা আন্দোলন গড়ে তোলার প্রত্যয় ব্যক্ত করে দেশের সব জাতীয়তাবাদী শক্তি, গণতন্ত্রকামী ও ইসলামী দলসহ সব শ্রেণী ও পেশার মানুষকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার উদাত্ত আহ্বান জানানো হয়। সেই সঙ্গে দেশজুড়ে পাড়ায়-মহল্লায়, শহরে-বন্দরে সর্বদলীয় সংগ্রাম পরিষদ গঠনের আহ্বান জানানো হয়।

১৯৯৯ সালে যৌথ ঘোষণার খসড়া তৈরির সাব-কমিটির প্রধান ছিলেন বিএনপির তৎকালীন স্থায়ী কমিটির সিনিয়র সদস্য অধ্যাপক একিউএম বদরুদ্দোজা চৌধুরী। যদিও তার তৈরি ওই খসড়ার অনেক কিছু পরে কাটছাঁট করা হয়েছে। তখন চারদলীয় জোট গঠনের অন্যতম রূপকার ছিলেন বিএনপি চেয়ারপারসনের তৎকালীন তথ্য উপদেষ্টা প্রয়াত আনোয়ার জাহিদ। ওই সময় ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন,এম শামসুল ইসলাম, সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী, মির্জা আব্বাস, ফজলুর রহমান পটল, বরকতউল্লা বুলু, ফেনীর মোশাররফ হোসেনসহ দলের বড় একটি অংশ জামায়াত ও জাতীয় পার্টিকে নিয়ে জোট গঠনের পক্ষে থাকলেও নেপথ্যে মূল ভূমিকা পালন করেন আনোয়ার জাহিদ।

১৫ বছর পর চারদলীয় জোট ১৮ দলীয় জোট ১৯ দলীয় জোটে পরিণত হওয়ার মধ্য দিয়ে সরকার বিরোধী জোট সুদৃঢ় হল।

এরশাদের জাতীয় পার্টি শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন নির্বাচনকালীন সরকারে অংশ নেওয়ায় ২০১৩ সালের ২৩ নভেম্বর এক বিবৃতিতে এরশাদকে ‘বিশ্বাসঘাতক’ বলে অভিহিত করেন দলের প্রেসিডিয়াম সদস্য ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী কাজী জাফর আহমেদ।

এই বক্তব্যের পরই জাফরকে দল থেকে বহিষ্কারের গুঞ্জন উঠলেও তা নাকচ করে এরশাদ সে সময় বলেন, ‘অভিমানী` কোনো বক্তব্যের কারণে তিনি কাউকে শাস্তি দেবেন না। জাফর জাতীয় পার্টির সঙ্গেই থাকবেন। কিন্তু জাফরকে তার বক্তব্য প্রত্যাহার করতে বলেন এরশাদ।

২০১৩ সালের ২৭ নভেম্বর কাজী জাফর সংবাদ মাধ্যমের কাছে ‘নীতির প্রশ্নে’ অটল থাকার কথা বলার পর বৃহস্পতিবার তাকে দল থেকে বহিষ্কার করেন জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ। তারপর তিনি এরশাদকে পাল্টা বহিষ্কার করে গড়ে তুলেন আলাদা জাতীয় পার্টি।

এরপর থেকে নির্বাচনের জন্য নির্দলীয় সরকারের দাবিতে ১৮ দলের আন্দোলনের সাথে সমর্থন জানিয়ে আসছিলেন কাজী জাফরের নেতৃত্বাধীন জাতীয় পার্টি। এরপর ২০১৪ সালের ২৫ জানুয়ারি আনুষ্টানিকভাবে ঘোষণা দিয়ে ১৮ দলে যোগ দিলেন কাজী জাফরের নেতৃত্বাধীন জাতীয় পার্টি।

জামায়াত ছাড়লে বিএনপির লাভ
জামায়াত ছাড়লে বিএনপি সাময়িকভাবে ক্ষতির সম্মুখীন হতে পারে। কিন্তু অদূর ভবিষ্যতে বিএনপি সবচেয়ে বেশি লাভবান হবে। মূলত ৫ টি কারণে লাভ বেশি হবেঃ

১. তরুণ প্রজন্মের মাঝে বিএনপিকে জামায়াতের অংশীদার রাজাকারের দল থেকে দায়মুক্তি,

২. মুক্তিযুদ্ধে বিএনপির অবদান প্রচারের বেশি সুযোগ,

৩. যুদ্ধাপরাধের দায়ে জামায়াতের পাপের দায় থেকে মুক্তি,

৪. মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়ার মুক্তিযুদ্ধে অবদানের পরও জামায়াতের কারণে যারা বিএনপির প্রতি অসন্তুষ্ট তারাও বিএনপির প্রতি ঝুঁকতে পারে,

৫. আওয়ামী লীগ ও তাঁদের অনুগত মিডিয়ার প্রপাগণ্ডার অস্ত্র দুর্বল হবে।

জামায়াত ছাড়লে বিএনপির ক্ষতি
জামায়াত ছাড়লে বিএনপির ক্ষতি ২০১৬ সালে এসে খুব বেশি হবার কারণ নেই। ২০১৪ সালের উপজেলা নির্বাচনে আওয়ামী লীগ-জায়ামাত সমঝোতার কথা শোনা গিয়েছিল। বিশ্বাস করেনি বিএনপির অনেকেই।

সেখানে জামায়াতী খেলা থেমে থাকেনি। ২০১৫ সালের ৫ জানুয়ারি ভোটারবিহীন কলঙ্কিত নির্বাচনের বর্ষপূর্তির দিন থেকে বিএনপি জোটের আন্দোলন কর্মসূচীতে জামায়াতের তৎপরতা চোখে পড়েনি। জামায়াতী অনেকে যুক্তি দিয়ে বোঝায় আওয়ামী-জামায়াতী সমঝোতা হলে কাদের মোল্লা কিংবা কামারুজ্জামানের ফাঁসি হতো না। তখন যুক্তি দাড়া করা যায় ২ জনের ফাঁসিতো বিএনপিকে ছেড়ে আওয়ামী লীগের প্রতি নীরব সমর্থন আদায়ের কৌশল বলে উড়িয়ে দেয়া যায় না। সবশেষ ঢাকা উত্তর, দক্ষিণ ও চট্টগ্রাম সিটি নির্বাচনে দলটির ভূমিকা নিয়েও অস্বস্তি বিরাজ করছে বিএনপিতে। বারবার উদ্যোগ নিয়েও কাউন্সিলরদের ব্যাপারে সমঝোতায় পৌঁছানো সম্ভব হয়নি। শত চেষ্টা করেও জামায়াতকে জোট সমর্থিত মেয়র প্রার্থীদের পক্ষে প্রচারণায় নামানো যায়নি। এমনকি ভোটের দিন মাঝামাঝি সময়ে কারচুপিসহ নানা অভিযোগে নির্বাচন বর্জন করলেও জামায়াতের কাউন্সিলর প্রার্থীরা শেষ পর্যন্ত ভোটের মাঠে ছিল। জাতীয় বা স্থানীয় যেকোনো নির্বাচন আসলেই জামায়াত দরকষাকষিতে নেমে পড়ে। তাদের মূল কাজই হচ্ছে নির্বাচনে ভাগাভাগি করা। বেশির ভাগ সময়েই তারা তাদের সিদ্ধান্তে অটল থাকে। বিএনপির সিদ্ধান্তকে না মেনে তারাও প্রার্থী ঘোষণা করে। একই কাজ সিটি নির্বাচনে করেছে। বেশির ভাগ ওয়ার্ডে বিএনপি একক প্রার্থী চূড়ান্ত করে। কিন্তু জামায়াত একক সিদ্ধান্তে ২০-২৫টি ওয়ার্ডে কাউন্সিলর প্রার্থী দেয়। আসলে জামায়াত বিএনপির থেকে নিয়েছে কেবল ২০০১ সালের নির্বাচন ছাড়া জামায়াতকে দিয়ে বিএনপি কোন লাভ হয়নি। মাঝে জামায়াত-শিবিরের কর্মকাণ্ডের দায় বিএনপিকে নিয়ে হয়েছে। যেহেতু বিএনপির কোন আন্দোলনে গত ১ বছরে জামায়াতের ভূমিকা ছিল না সেহেতু বলা যায় জামায়াতকে ছাড়া বিএনপিকে আন্দোলনের মাঠে টিকে থাকতে বেশি বেগ পেতে হবে না।

বিএনপিবিদ্বেষী নিত্যনতুন গবেষণা
বিএনপি-জামায়াত জোট প্রসঙ্গ যখন নানা মহলে আলোচনার নতুন বিষয়ে পরিনত হয়েছে তখন বিএনপির ভবিষ্যৎ নিয়ে জামায়াতপন্থী বলে কথিত বুদ্ধিজীবীদের একটি বিশ্লেষণ মিডিয়ায় প্রকাশিত হয়।

কলকাতার প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক মইদুল ইসলাম ‘লিমিটস অব ইসলামিজম জামায়াতে ইসলামী ইন কনটেম্পরারি ইন্ডিয়া অ্যান্ড বাংলাদেশ’ বই-এ জামায়াতে ইসলামীর বুদ্ধিজীবীও সদস্য বলে বর্নিত কয়েকজনের সাক্ষাৎকারে বিএনপি সম্পর্কে কিছু মন্তব্য প্রকাশিত হয়েছে। বই-এ প্রদত্ত তথ্য মতে, লেখক ২০০৯ সালে ঢাকায় এসে পৃথক পৃথকভাবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মেসি অনুষদের অধ্যাপক চৌধুরি মাহমুদ হাসান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামী ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের অধ্যাপক ওমর ফারুক এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক এটিএম ফজলুল হকের সাক্ষাৎকার নেন।

সাক্ষাৎকারে অধ্যাপক চৌধুরি মাহমুদ হাসান জানান, জামায়াত বর্তমানে একটি সমৃদ্ধ বুদ্ধিবৃত্তিক ও গবেষণা সেল না থাকার সঙ্কটে ভুগছে। বিএনপি দুর্বল হয়ে গেলে জামায়াত সাফল্যের সাথে ভারতবিরোধী ও আওয়ামী লীগবিরোধী বিপুলসংখ্যক জনগোষ্ঠীকে সংগঠিত করতে পারে। দীর্ঘ মেয়াদে এটা একটা প্রকৃত সম্ভাবনা হিসেবে দেখা দেবে। তিনি মনে করেন, বেগম খালেদা জিয়ার পরে বিএনপি টুকরো টুকরো হয়ে যাবে। বিএনপি মতাদর্শগতভাবে একটি শিথিল এবং অসংগঠিত দল। অধ্যাপক ওমর ফারুকের মতে, আওয়ামী লীগ ও জামায়াতের মতো বিএনপি কোনো আদর্শগত সংগঠন নয়। বিএনপি বাম, ডান ও মধ্যপন্থীদের কৌতূহলোদ্দীপক মিশ্র সংগঠন, অন্যদিকে বাংলাদেশের স্বাধীনতার আগে থেকেই আওয়ামী লীগের একটি আদর্শগত উত্তরাধিকার ছিল।

ঢাকার সরকারি আলীয়া মাদরাসার গণিতের শিক্ষক ও জামায়াতের একজন সদস্য বলেন, ২০০৮-এর নির্বাচনে বিএনপির দুর্নীতি অবশ্যই একটি ইস্যু ছিল। জামায়াতী বুদ্ধিজীবী বলে যাদের বক্তব্য প্রকাশিত হয়েছে তারা দলটির কোন পর্যায়ের বা দলে তাদের অবস্থান কোথায় সে বিবেচনা বাদ রাখলেও দলের একজন সদস্যের যে বক্তব্য উদ্ধৃত হয়েছে তাকে হালকা করে দেখার কোনো সুযোগ নেই।

যারা খোঁজ-খবর রাখেন, তারা প্রায় সকলেই একমত যে, আওয়ামী লীগের সাথে জামায়াতে ইসলামীর এক ধরনের কৌশলগত ঐক্য হয়েছে। ঐক্যের খবরটি আনুষ্ঠানিকভাবে প্রচারিত হতে হয়তো আরো কিছু সময় লাগবে করতে হবে। আগে সরকার আনুষ্ঠানিকভাকে জামায়াতে ইসলামীকে হয়তো নিষিদ্ধ করতে পারে। এই সূত্র ধরে বিএনপির সাথে জামায়াতে ইসলামীর আনুষ্ঠানিক সম্পর্ক ছেদের ব্যাপারটি হয়তো ঘটে যাবে। বিলুপ্ত জামায়াত নতুন নামে সংগঠিত হয়ে নতুন সিদ্ধান্ত নেবে। মনে করা হচ্ছে, একটি গ্রহণযোগ্য সরকারের অধীনে নির্বাচনের ব্যাপারে সরকারের প্রতি জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ের যে চাপ রয়েছে হয়তো সরকারী মহল তা বিবেচনায় নিয়েছে। এ ক্ষেত্রে গ্রহণযোগ্য নির্বাচন প্রসঙ্গে সরকারের কোনো কোনো মহলে যে ভীতি সক্রিয় রয়েছে তা কাটিয়ে উঠতেই নতুন প্রবণতা কাজ করছে। জামায়াতে ইসলামীর নাম পরিবর্তনের প্রসঙ্গ নতুন নয়।

আওয়ামী লীগ-জামায়াত সম্পর্ক পেছন ফিরে দেখা
বিএনপির সাথে জোটের আগে আওয়ামী লীগকে দলটি একবার ক্ষমতায় যাওয়ার সুযোগ করে দেয় ১৯৯৬ সালের নির্বাচনের মাধ্যমে। ঐ নির্বাচনে অধ্যাপক গোলাম আজম বিএনপিকে ভোটদানে বিরত থাকার আহ্বান জানিয়েছিলেন। নির্বাচনে বিএনপি এককভাবে সরকার গঠনের মতো আসন না পেলেও জামায়াতে ইসলামীর আসন সংখ্যা ছিল নামেমাত্র। এর পরের নির্বাচনের আগে জোট গঠিত হয়েছিল। নির্বাচনে বিজয়ী হলে জামায়াতের দুজন দায়িত্বশীল বেগম জিয়ার মন্ত্রিসভায় অন্তর্ভুক্ত হন। এরপর থেকেই জাতীয় রাজনীতিতে নতুন পোলারাইজেশন শুরু হয়। উল্লেখ করা দরকার, ’৯০-এ গণতান্ত্রিক আন্দোলনের সময় লিয়াজোঁ কমিটির মাধ্যমেই

জামায়াতের সাথে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যে যোগসূত্র স্থাপিত হয়। ২০০৬ সালের ২৮ অক্টোবর বিএনপি ক্ষমতা হস্তান্তরের পর ২০০৭ সালের ২২ জানুয়ারির বাতিল হওয়া নির্বাচনের পর এ যাবৎকালে অনেক পরিবর্তন সাধিত হয়েছে। ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বরের নির্বাচনে বিপর্যয়কর ফলাফল ও ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি নির্বাচন বর্জনের পর ২০১৫ সালের ৫ জানুয়ারি কালো দিবস পালনকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট রাজনৈতিক পরিস্থিতির প্রেক্ষিতে বিএনপির রাজনৈতিক মতাদর্শ নিয়ে জামায়াতের কথিত বুদ্ধিজীবীরা যে ধরনের মন্তব্য করছেন তার নির্মোহ বিশ্লেষণ প্রয়োজন।

বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান। তিনি কোনো দল ভেঙে বা কোনো দলের তলবী সভা করে বিএনপি গঠন করেননি। তিনি দল গঠন করেছেন তার নিজস্ব প্রক্রিয়ায়। জনগণের ডাকে সাড়া দিয়ে ক্ষমতায় গিয়ে তিনি দেশ শাসনে সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়েছেন দেশপ্রেমকে। সে কারণেই তার রাজনৈতিক দর্শনে দেশই বড় হয়ে ওঠে। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি ছিলেন দুর্নীতিমুক্ত, সহনশীল, ধৈর্যশীল মানুষ। বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রদের বিক্ষোভের মুখেও তিনি অতীতের কোনো শাসকের মতো চোখ রাঙ্গাননি। শিক্ষার্থীদের দায়ী করেননি বরং ইতিবাচক চিন্তা-চেতনা মেধা-মননের শিক্ষার্থীদের সমবেত করে দেশ গঠনের প্রক্রিয়ায় সম্পৃক্ত করে ।

রাজনৈতিক অঙ্গনে তিনি মুসলীম লীগ, ন্যাপ, তফসিলি ফেডারেশনসহ সকলকেই এক কাতারে নিয়ে আসেন। তিনি কোনো প্রলোভন বা অসততার আশ্রয় নেননি। যারা তার সাথে থাকতে চেয়েছেন তাদেরই তিনি সাথে রেখেছেন। তিনি নিজের কমিটমেন্ট থেকে সরে যাননি এবং কাউকে সন্তুষ্ট করার জন্য প্রতারণারও আশ্রয় নেননি। দেশের মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করার চিন্তা থেকেই তিনি একটি জাতীয় ঐক্য গড়ে তোলার চেষ্টা করে । বর্তমান সময়ের আলোচিত ডান-বাম-মধ্যপন্থী সকলের জন্যই প্লাটফর্ম তৈরি করেন। মূলত বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময়ে ভারতে মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী যে জাতীয় সরকার গঠনের প্রস্তাব করেছিলেন এবং যে কথার কারণে গৃহবন্দি হয়েছিলেন জিয়াউর রহমান সেই প্রস্তাবেরই বাস্তব রূপ দিতে চান এবং। সে কারণেই তিনি সফল হন। তার জনপ্রিয়তা এখনও যে কোনো শাসকের তুলনায় ঈর্ষণীয়। যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ গঠনে প্রকৃতই যে চেতনাবোধের দরকার সেটি তিনি জাতির অন্তরে সঞ্চারিত করতে সক্ষম হয়েছিলেন। প্রেসিডেন্ট জিয়াকে হত্যার পর অনেকে মনে করেছিলেন বিএনপির আর কোনো ভবিষ্যৎ নেই। এমনকি অনেক পরীক্ষিতরাও তখন সামরিক শাসকের পক্ষপুটে আশ্রয় নিয়েছিলেন। নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট বিচারপতি আব্দুস সাত্তারকে হটিয়ে দেয়ার মধ্য দিয়ে কার্যত জনগণের আকাংক্ষাকে নস্যাৎ করার যে অপচেষ্টা হয়েছিল তার প্রতি আওয়ামী লীগেরও সমর্থন ছিল। বেগম খালেদা জিয়া যখন বিএনপির হাল ধরলেন তখনও বলা হতো, বিএনপি একটি অসংগঠিত দল। এ দিয়ে কিছু হবে না। আজকে জামায়াতের কেউ কেউ যাদের আদর্শবাদী বলে মনে করছেন তারা ওই সরকারের সাথে আপস করলেও শেষ পর্যন্ত এই ‘অসংগঠিত’ বিএনপির মাধ্যমে দেশে গণতন্ত্র ফিরে এসেছিল।

শিরোনাম ডট কম
শিরোনাম ডট কম । অনলাইন নিউজ পোর্টাল Shironaam Dot Com । An Online News Portal
http://www.shironaam.com/

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *